মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

বড়দিন দেশে দেশে

প্রকাশিত : ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪
  • বাংলাদেশে বড়দিন

প্রায় সোয়া দু’শ বছর আগে বাংলাদেশে পালিত হয় বড়দিন। ১৬ শতকে পর্তুগীজরা এদেশে খ্রিস্টধর্মের প্রচার শুরু করেন। এদেশে প্রথম চার্চ তৈরি হয় ১৫৯৯ সালে, পুরাতন যশোরের কালীগঞ্জের কাছে সুন্দরবন এলাকায়। এই উপমহাদেশে কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা জব চার্নকই প্রথম এই দিন উদযাপন করেন। ১৬৬৮ সালে হিজলির পথে যাবার পথে সুতানুটি গ্রামে বড়দিন উৎসব পালনের জন্য তিনি যাত্রা বিরতি করেন। এই অঞ্চলে ইংরেজদের সেই প্রথম বড়দিন পালন। বিশ্বের অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বড়দিন পালন হয় গুরুত্বের সঙ্গে। গীর্জার আলোকসজ্জা, ক্রিসমাস ট্রি সাজানো, সান্তা ক্লজের উপহার বণ্টন, পারিবারিক পুনর্মিলন এসবই আমাদের দেশে ক্রিসমাস পালনের অনুষঙ্গ। এছাড়াও শহরের বিলাসবহুল হোটেলগুলোতে, বিশেষ করে পাঁচতারা হোটেলে ক্রিসমাস ট্রি সাজানো হয় বিশেষভাবে।

ভারত

ভারতে খ্রীস্টানদের বড়দিন পালন করা হয় বেশ জাঁকজমকপূর্ণভাবে। এই দিন সরকারী ছুটি থাকে। অন্যান্য দেশের খ্রীস্টানরা ক্রিসমাস ট্রি দিয়ে ঘর সাজালেও, ভারতে শহরের বাইরের খ্রিস্টানরা আমগাছ বা কলাগাছ দিয়ে ঘর সাজায়। দক্ষিণ ভারতে জানালা বা ছাদের ওপর জ্বালানো হয় ছোট ছোট মাটির বাতি, যা অনেকটা দেওয়ালির মতো।

ইতালি

ইতালিতে ১ ডিসেম্বর থেকে বড়দিন উৎসব শুরু হয়। তারা বড়দিনকে বলে নভেনা। অন্যদের মতো ইতালিয়রাও ক্রিসমাস ট্রি সাজায়। এ সময় তারা যিশুর জন্ম মুহূর্তের ঘটনা ফুটিয়ে তুলতে মা মেরি, জোসেফ, যিশু, একটি গাধা ও একটি হাঁসের ক্ষুদ্র মডেল তৈরি করে। যাকে বলা হয় প্রিসেপে। গ্রামের রাখালরা বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বাজিয়ে বড়দিনের গান গায়। ছোট বাচ্চারা রাখালদের পোশাক পড়ে পাইপ বাজিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বড়দিনের গান গায় ও ছড়া আবৃত্তি করে।

আর্জেন্টিনা

ম্যারাডোনার দেশ আর্জেন্টিনায়ও বড়দিনে সবাই পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটায়। অন্যদের মতো তারাও ক্রিসমাস ট্রি, উপহার ও সুস্বাদু খাবারের আয়োজন করে। সাদা ও লাল রঙের কাগজ দিয়ে তারা বাড়িঘর সাজায়। ক্রিসমাস ট্রি, মোমবাতি, অলঙ্কার ও আলোকসজ্জা দিয়ে সাজানো হয়। অনেকেই দল বেঁধে পিকনিক বা বারবিকিউ আয়োজন করে। বড়দিনে মাংস, সিদ্ধ ডিম, রসুন ও মশলা দিয়ে বানানো ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘নিনোস এনভুয়েটা’ খেতেও ভালবাসে আর্জেন্টাইনরা।

স্কটল্যান্ড

১৬ শতক থেকে স্কটল্যান্ডে বড়দিন পালন করা হয়। এদেশে বড়দিন পালনের রীতি অন্যদেশের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। খ্রিস্টধর্মের আগে এখানে বড়দিনের বদলে পালন করা হতো প্যাগান উৎসব। পরবর্তীতে সেটাই বড়দিন হিসেবে পালন করা হয়। এখানে বড়দিনকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘ঘড়ষষধরম ইবধম’, যার অর্থ ‘ছোট্ট ক্রিসমাস’। এখানেও ক্রিসমাস ট্রি, সান্তাক্লজ বা সান্তা নিকোলাস ইত্যাদির মাধ্যমেই বড়দিন পালন করা হয়। এছাড়া ক্রিসমাস কার্ড দিয়ে প্রিয়জনদের দাওয়াত দেয়া হয়। ক্রিসমাসে আলোকসজ্জার জন্য স্কটল্যান্ড বিখ্যাত।

চীন

ক্রিসমাস ট্রিকে চীনারা বলে ‘ঃৎববং ড়ভ ষরমযঃ’ বা আলোর গাছ। বড়দিন উপলক্ষে চীনারা কাগজ দিয়ে বানানো শিকল, ফুল ও বাতি দিয়ে সাজায় ক্রিসমাস ট্রি। শিশুরা এদিন নতুন পোশাক পড়ে। তারা আশা করে এদিন ডান চি লাও রেন (চীনাদের সান্তা) তাদের উপহারে ভরে দেবে। বড় শপিংমলে অনেকেই সান্তাক্লোজের পোশাক পড়ে ক্যান্ডি বিলি করে।

অস্ট্রেলিয়া

বড়দিনে সাধারণত অস্ট্রেলিয়ায় প্রচণ্ড গরম পড়ে। এদিন অস্ট্রেলীয়রা ঐতিহ্যবাহী খাবার ছাড়াও টার্কি ডিনার খেয়ে থাকে। এছাড়াও বিশেষ এক ধরনের পুডিং তৈরি করা হয়। এর মধ্যে সোনার টুকরা থাকে। সবাই মিলে সেই পুডিং খাবার সময় যার ভাগ্যে সোনার টুকরাটি পড়ে তাকে সৌভাগ্যবান বলে ধরা হয়।

বেলজিয়াম

বেলজিয়ামে ডিসেম্বরের ৬ তারিখ ‘সিন্টারক্লজ বা সেইন্ট নিকোলাস’ নামের একটি অনুষ্ঠান উদযাপন করা হয়। এটি ক্রিসমাস থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন অনুষ্ঠান। সান্তাক্লজকে বেলজিয়ামে বলা হয় ‘কেরস্টম্যান’ বা ‘লি পেরে নোয়েল’। এ দিনে সান্তা বেলজিয়ামের তোমাদের মতো ছোটদের জন্য উপহার নিয়ে আসেন।

ব্রাজিল

ব্রাজিলে সান্তাক্লজকে পাপাই নোয়েল বলে ডাকা হয়। ব্রাজিলে যারা ধনী তারা ক্রিসমাসে খাবারের তালিকায় মুরগি, টার্কিসহ বিভিন্ন সুস্বাদু খাবারের আয়োজন করে থাকে। এছাড়াও চকোলেট আর কনডেন্সড মিল্কের মিশ্রণে তৈরি মিষ্টিও থাকে। এর নাম ব্রিগেডেইরো।

ফ্রান্স

ফ্রান্সে ক্রিসমাসকে বলা হয় নোয়েল। ক্রিসমাস ফাদার বা সান্তাক্লজকে বলা হয় পেরি নোয়েল। ফ্রান্সের সবাই ক্রিসমাস ট্রিকে পুরনো ধাঁচের সাজে সাজাতেই বেশি ভালবাসে। তারা তাদের ট্রির ওপরে লাল রঙের রিবন মুড়িয়ে তার সঙ্গে সাদা মোমবাতি দিয়ে ক্রিসমাস ট্রি সাজায়। এছাড়াও কারও বাগানে যদি ফারগাছ থাকে তাহলে ছোট ছোট বাল্ব লাগিয়ে তারা সেগুলোকেও রঙিন করে তোলে। ফ্রান্সের সবাই ক্রিসমাসের রাতের খাবারটি পরিবারের সঙ্গে খেয়ে থাকে।

নিউজিল্যান্ড

নিউজিল্যান্ডে ক্রিসমাসের দিনটি শুরু হয় ক্রিসমাস ট্রির নিচে রাখা উপহারের প্যাকেট খোলা দিয়ে। এরপর ক্রিসমাসের দুপুরের খাবার পরিবারের সবাই একসঙ্গে খাবার খায়। টার্কি আর মুরগির মাংস দিয়েই চলে খাওয়ার পর্ব। এরপর শুরু হয় চা পানের আসর। রাতে পরিবার আর বন্ধুদের সঙ্গে চলে বার-বি-কিউ পার্টি।

পর্তুগাল

পর্তুগালেও ক্রিসমাসের অন্যতম আকর্ষণ ক্রিসমাস ফাদারের আনা উপহার। ক্রিসমাসের আগের দিন সন্ধ্যায় অর্থাৎ ক্রিসমাস ইভ-এ ক্রিসমাস ট্রির নিচে বা চিমনির সামনে ঝোলানো মোজার মধ্যে ক্রিসমাস ফাদার উপহার দিয়ে যান।

জার্মানি

জার্মানীতে বড়দিন উপলক্ষে কাঠের ফ্রেমে ইলেক্ট্রিক মোমবাতি জ্বালিয়ে ঘর সাজানো হয়। যা রাতের বেলা বাইরে থেকে দেখতে খুবই সুন্দর লাগে। এছাড়াও জার্মানরা যেখানে যিশুখ্রিস্ট জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেই গোশালার মতো করে ঘর তৈরি করে থাকে।

রাশিয়া

পুরো পৃথিবীতে ২৫ ডিসেম্বর ক্রিসমাস পালন করা হলেও রাশিয়ায় ক্রিসমাস পালিত হয় ৭ জানুয়ারি। এর কারণ রাশিয়ার অর্থোডক্স চার্চ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে পুরনো জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে। কেউ চাইলে ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন পালন করতে পারে। তবে সবাই ৭ জানুয়ারিই বড়দিন পালন করে থাকে। মূলত রাশিয়ায় ক্রিসমাসের চাইতে নববর্ষকেই বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়ে থাকে।

সুইডেন

সুইডেনে ক্রিসমাস আয়োজনে অন্যতম দিন হলো ক্রিসমাস ইভ। ক্রিসমাসে সুইডেনবাসীরা একে অপরকে উপহার দিয়ে আর ক্রিসমাসের শুভেচ্ছা জানায়। এছাড়াও ক্রিসমাসের দিন অর্থাৎ ২৫ ডিসেম্বর সকাল সকাল তারা সবাই চার্চে মিলিত হন।

আমেরিকা

ঘর সাজানোর ক্ষেত্রে আমেরিকানরাও জার্মানদের মতোই সরেশ। আমেরিকানরা সারা বছর বাচ্চাদের লক্ষ্মী হয়ে থাকতে বলে। যদি তারা লক্ষ্মী হয়ে না থাকে তাহলে ক্রিসমাসের আগে তাদের স্টকিং এ ভাল উপহার পাবে না।

ফিনল্যান্ড

ফিনল্যান্ডের অধিবাসীরা মনে করে সান্তা থাকেন ফিনল্যান্ডের উত্তর দিকের কর্ভটুন্ডুরি নামের একটা জায়গায়। ক্রিসমাস ইভ, ক্রিসমাস আর বক্সিং ডে এ তিনটি দিন তারা বিশেষভাবে পালন করে থাকে। ক্রিসমাস ইভ এ তারা ভাত, নানা ফলের মিশ্রণে তৈরি এক প্রকার মিষ্টি স্যুপ খেয়ে থাকে।

এসএম নাজমুল হক ইমন

প্রকাশিত : ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪

২৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: