কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অবিস্মরণীয় সুচিত্রা সেন

প্রকাশিত : ২৫ ডিসেম্বর ২০১৪
অবিস্মরণীয় সুচিত্রা সেন
  • আলমগীর রেজা চৌধুরী

সুচিত্রা সেনের প্রেমে পড়েছিলেন আমার বাবা, আমি পড়িনি। নইলে আমাদের শহরের ‘রওশন টকিজ’ হলে সুচিত্রা সেনের ছবি এলেই বাবা মাকে নতুন কাপড় পরিয়ে রিকশায় বসে হুড তুলে, ভাইবোনদের যার যার দাঁড়ানো রিক্সা ভরে নিয়ে যেত সুচিত্রা দর্শনে। আমি তখন সিনেমা বোঝার বয়সে পড়িনি। কিন্তু সিনেমা হলে বাবার দেয়া চানাচুর ভাজা, দুধ মালাই তো নিশ্চিত। আমি ওতেই সন্তুষ্ট।

রিক্সার টুনটুন বাজিয়ে মধ্যরাতে যখন বাসায় ফেরা হতো তখন বড় চাচা গলা খাকারি দিয়ে বলত, ‘কিরে বই দেখে ফিরলি?’

বাবা বলত, ‘জ্বী মিয়া ভাই। সুচিত্রা সেনের ছবি।’ ওই পর্যন্তই। পরবর্তীতে সুচিত্রা সেনের প্রেমে পড়ে বড় ভাই। কলেজে ওঠার পরপর তার মাথার ভিতর রমা ঢুকে যায়। আর যাবে কোথায়? বাবার দুশ্চিন্তার শেষ নেই। বড় ভাই সুচিত্রার বই দেখে দেখে ঈষৎ রোমান্টিক, ঈষৎ বিরহ লালন করতে করতে যৌবন অতিক্রম করে। বাবা এবং বড় ভাইয়ের আরদ্ধ নারীর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা হয় আরও পরে। যখন স্কুল শেষ কলেজে উঠেছি।

স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশে ভারতীয ছবি ‘চ্যারেটি শো’ হিসেবে প্রদর্শিত হতে থাকে সিনেমা হলগুলোতে। আর ঠিক তখন সুচিত্রা সেনের সঙ্গে আমার পরিচয়। ‘দ্বীপ জ্বেলে যাই’ ছবিতে বসন্ত চৌধুরীর সঙ্গে সুচিত্রা সেন। পাগল বসন্ত চৌধুরীর সেবার দায়িত্বে নার্স সুচিত্রা সেন। সহশিল্পী পাহাড়ী সান্ন্যাল। অসাধারণ এক নারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যৌবনে পা দেয়া এক যুবক। মধ্যনিশিতে মস্তিষ্কের কোষে কোষে দূরতর শিস অনুরণন তুলতে থাকে। ‘এই রাত তোমার আমার।’ চোখের তারায় যার ব্যাকুল নিমন্ত্রণ! সে কোন সাধারণ নারী নয়। যুবকের ভূভাগে নারীর বাঁকা অক্ষির মোহনীয় চতুরতা, তা কেবল গহীন সাগরে হাবুডুব খাওয়া কাতর ডলফিন। কণ্ঠের মধুরিমায় যে প্রকাশ, তার নাম মমতাময়ী প্রেমিকা। আমিতো তার জন্যই অপেক্ষা করছি।

বাবা এবং বড় ভাইয়ের ভালবাসায় ভ্রান্তি ছিল। তাদের সঙ্গে সুচিত্রা সেনকে মানায়নি। আমি তার যথার্থ প্রেমিক। আকণ্ঠ তৃষ্ণা নিয়ে হাজার বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছি।

না। ও মুখ দেখে তৃষ্ণা মেটেনি আমার। তারপর শুধু সুচিত্রা সেনকে আবিষ্কার করা। বাংলা-হিন্দী ছবি মিলিয়ে সুচিত্রা সেন অভিনয় করেছেন মোট ৬০টি ছবিতে। ৫৩টি বাংলা ছবি, বাকি সাতটি হিন্দী ছবি। প্রথম বাংলা ছবি, ‘সাত নম্বর কয়েদি’ মুক্তি পায় ১৯৫৩ সালে। শেষ ছবি ‘প্রণয় পাশা’ মুক্তি পায় ১৯৭৮ সালে। হিন্দী ছবি ‘দেবদাস’ মুক্তি পায় ১৯৫৫ সালে। শেষ হিন্দী ছবি ‘আঁধি’ মুক্তি পায় ১৯৭৮ সালে।

সুচিত্রা সেন অভিনীত ছবির নায়করা, বাংলা ছবি- সমর রায়, উত্তম কুমার, রবীন মজুমদার, বিকাশ বায়, অশোক কুমার, অসিত বরণ, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, দিলীপ মুখোপাধ্যায়, প্রদীপ কুমার, নির্মল কুমার, উৎপল দত্ত, ‘সমিত ভঞ্জ ও রঞ্জিত মল্লিক।

হিন্দী ছবির নায়করা দিলীপ কুমার, শেখর, ভারত ভূষণ, দেব আনন্দ, ধর্মেন্দ্র ও সঞ্জীব কুমার। সুচিত্রা সেন অভিনীত সর্বাধিক জুটির মুক্তিপ্রাপ্ত ছবির নায়ক উত্তম কুমার। উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত ছবি ৩০টি। সুচিত্রা সেনের পঁয়ত্রিশ বছর অভিনয় জীবনের উত্তম-সুচিত্রা সফল এবং চিরায়ত জুটি হিসেবে চিহ্নিত। কেন কি কারণে সফল এবং চিরায়ত সে ব্যাখ্যা দেবার প্রয়োজন নেই। পরিসংখ্যানে দেখা যায় তার সময়ে বাংলা এবং হিন্দী চলচিত্রের সফল তারকাদের সঙ্গে সুচিত্রা সেন অভিনয় করেছেন। বলা যায়, ভারত উপমহাদেশের সবচেয়ে সফল এবং দর্শকনন্দিত নায়িকা হিসেবে সুদীর্ঘ সময় দীপ্যমান। ২০১৪ সালে দাঁড়িয়ে যে কাউকে জিজ্ঞেস করুন, আপনার প্রিয় নায়িকা কে? অন্তত ষাট ভাগ দর্শক জবাব দেবেন, সুচিত্রা সেন।

কেন কি কারণে সূচিতার এ সফল অভিনয় শৈলী তার একটু ঠিকুজি থাকা দরকার।

সুচিত্রা সেনের জন্ম ১৯২৯ সালের ৬ এপ্রিল, সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচির মামাবাড়িতে। পাবনা শহরের গোপালপুর মহল্লার একতলা পাকা পৈতৃক বাড়িতে শিশুকাল, শৈশব ও কৈশোর কেটেছে। স্কুলে ভর্তি করার সময় ওর নাম রাখেন কৃষ্ণা দাশগুপ্ত।

ডাক নাম রমা। বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত স্থানীয় স্কুলের প্রধান শিক্ষক। ভাইবোনদের মধ্যে সুচিত্রা পঞ্চম। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হবার পর পাবনা ছেড়ে সবার সঙ্গে চলে যান কলকাতায়। ওই বছর তাঁর বিয়ে হয় আদিনাথ সেনের পুত্র দিবানাথ সেনের সঙ্গে। রমা সেন ভালবেশেই দিবানাথ সেনকে বিয়ে করেছিলেন ১৯৪৮ সালে। স্বামীর সম্মতিতেই ১৯৫২ সালে ‘শেষ কোথায়’ ছবির মাধ্যমে চিত্রজগতে আত্মপ্রকাশ। কিন্তু ছবিটি মুক্তি পায়নি।

সুচিত্রা সেন সম্পর্কে চিত্র পরিচালক সুকুমার দাশগুপ্ত বলেছেন, ‘১৯৫১ সালে, সাত নম্বর কয়েদি ছবির জন্য নতুন মুখ খুঁজছি। এমন সময় অসিত চৌধুরী বললেন, একটি ভাল শিক্ষিত পরিবারের মেয়ে আছে। মনে হয় সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে নাম করবে। তাঁর কথায় মেয়েটিকে পাঠিয়ে দিতে বললাম। প্রথম দিন ওর স্বামী দিবানাথ সেনের সঙ্গে এসেছিল দেখা করতে আরোরা স্টুডিওতে। দেখলাম, ছিপছিপে চেহারার ডাগর ধরনের চোখ। চোখ দুটি ভারি সুন্দর, আর খুব এক্সপ্রেসিভ।

চাহনীতে স্বচ্ছ গভীরতা। মিষ্টি হাসিতে সারা মুখখানা যেন উচ্ছলতায় ভরে যায়। এক নজরে পছন্দ হয়ে গেল। কণ্ঠস্বরও বেশ মিষ্টি। কথার মধ্যে বাঙাল টোন আছে। আমি সঙ্গে সঙ্গেই তাকে নিতে রাজি হয়ে গেলাম।

সেই ‘সাত নম্বর কয়েদি’ দিয়ে শুরু। তখনও রমা সেন নামেই পরিচিত। ১৯৫২ সালে রমা সেন পাল্টিয়ে সুচিত্রা সেন নামে আত্মপ্রকাশ নীরেণ লাহিড়ীর, ‘কাজরী’ ছবিতে। পাঁচ ফুট সাড়ে চার ইঞ্চির সুচিত্রা হয়ত আজকে সুস্মিতা, ঐশ্বর্যদের মতো দীর্ঘাঙ্গী নয়। ফিতার মাপে তিনি সিøম নন, নন আন্তর্জাতিক রূপসী। সুচিতা সেন সুন্দরী। বড় বড় ভাসা ভাসা চোখ। সুগঠিত নাক। লম্বাটে ভরাট মুখম-ল, ছোট কপাল, এক তাল কালো চুল। শ্যামবরণ ত্বক। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘কালো মেয়ের প্রেমে পড়লে ওঠা যায় না।’ সুচিত্রা সেনের সৌন্দর্য অনেকটা সেই ঘরানার।

আকৃষ্ট করে, একই সঙ্গে দূরত্বও রচনা করে। রোমান্টিক এবং বিরহী।

আমার মতো লাখো প্রেমিক আছে সুচিত্রা সেনের। যে কোন রকমের প্রেমিক। সিনেমা জগতে এত দীর্ঘকাল প্রেমিকা থাকা খুব কঠিন। সুচিত্রা সেন ছিলেন এবং আছেন। মনময়ূরী স্বপ্নের দেবী। কি চমৎকার রূপ, কী তার চাহনী, কি অভিনয়। যেন বার বার হৃদয় পোড়ে। সুচিত্রা সেন মানেই স্বতন্ত্র স্টাইল। বলা যায়, দ্যা স্টাইল ইজ দ্য ওম্যান। তাঁর সময়ে এমন গগনচুম্বী স্টার ইমেজ কারও ছিল না। দর্শককুল তাঁকে গভীর ভালবাসেন। তাতে কোন চাওয়া-পাওয়ার হিসেব নেই। কাম, ক্রোধহীন নিষ্পাপ প্রেম, যে প্রেম একজন পুরুষকে জীবনকে ভালবাসতে শেখায়। বিরহের অনল হৃদয়ে উত্তাপ ছড়ায় তার মাঝে সহস্র রেণু ঝরে পড়ে, যা মানুষকে অনন্ত এক সহযাত্রীর সন্ধান দেয়।

বাংলা ছবির গ্ল্যামার কুইন। রোমান্টিক নায়িকা হিসেবে তাঁর খ্যাতি চিরায়ত। তাঁর মিষ্টি রোমান্সের সমকক্ষ অভিনেত্রী সে যুগে কেউ ছিল না, এ যুগেও কেউ নেই।

তো কলেজ পড়ুয়া যুবকের ঝুলবারান্দায় হাঁটাহাঁটি করে যে নারী, সে প্রণয়রসে জারিত সুন্দরী। এক রকম গহীন রহস্যের অনঙ্গ পরী। সৌন্দর্যের অনন্য উপমা। ‘দ্বীপ জ্বেলে যাই’ দিয়ে যে নারীকে আবিষ্কার করা। একজন সাধারণ নার্স, শুভ্র বসনা। চোখের অনন্য চাওনীতে উল্টে দিয়েছিল পৃথিবীর দেয়াল। প্রেমান্ধ পরিব্রাজক আস্তে আস্তে খুঁজে পায় ‘পথে হল দেরী’র মল্লিকা, ‘উত্তর ফাল্গুনী‘র ব্যথিত মা ও কন্যা। অপূর্ব অভিনয় শৈলী হৃদয়িক মহিমায় তাকে কেবলি উচ্চ শিখরে নিয়ে গেছে।

বলা যায়, উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত ৩০টি ছবি বাংলা সিনেমায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যখন পর্দায় দু’জনকে দেখা, তখন তা আর অভিনয় থাকেনি, হয়ে উঠেছে বাঙালী জীবন কাহিনীর দৃশ্যমান সহজ চালচিত্র। অসাধারণ ব্যক্তিত্বে দু’জনই কিংবদন্তি। কী চলনে, কী বলনে। এখনও সুচিত্রা-উত্তমের ছবি চ্যানেলগুলোতে প্রদর্শনের সময় বাংলা সিনেমার দর্শককুল দয়িতা অথবা প্রেমিক হয়ে ওঠে।আমি যখন সুচিত্রা সেনকে খুঁজে পাই, তখন প্রায় অভিনয় ছেড়ে দেবার প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন।’ অর্থাৎ সত্তর দশকের প্রথমদিকে। ১৯৭৮ সালে তাঁর অভিনীত শেষ বাংলা ছবি ‘প্রণয় পাশা’ মুক্তি পায়। তারপর রূপালী পর্দা থেকে অবসর নিয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান। ধর্মের প্রতি গভীর অভিনিবেশ তাঁকে জাগতিক চাওয়া পাওয়ার উর্ধে নিয়ে যায়। শেষদিকে বলতেন, ‘এক সময়ে বাসনার রূপ ছিলাম, এখন তাই সরিয়ে নিয়েছি নিজেকে, ওই চোখগুলো থেকে অনেক দূরে।’দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের আলো ঝলমল জীবন তাকে ধরে রাখতে পারেনি। গৃহকোণে নিভৃতে ঈশ্বরের খোঁজে বসবাস করে সাধারণ হয়ে বাঁচতে চেয়েছেন। ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই উত্তম কুমারের মৃত্যুর পর তার গলায় মালা রেখে গিয়েছিলেন। এরপর মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলেননি। একাকী নিঃসঙ্গ জীবনযাপন।হলিউডের গ্রেটা গার্বো, টালিউডের সুচিত্রা সেন খ্যাতির তুঙ্গে থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছিলেন। গ্রেটা গার্বো ১৯৪১ সালে, সুচিত্রা ১৯৮০ সালে। প্রচারের হ্যালোজেন থেকে নির্বাসিত দুই কিংবদন্তি ফিরে আসেনি রূপালী পর্দায়। সেই দুই অধরা মাধুরী। দুই নারী ঢেকে রেখেছেন তাদের গভীর গোপন সেই অন্ধকার, পিচ্ছিল গহ্বর। ব্যক্তিগত জীবন।১৭ জানুয়ারি ২০১৪ সালে কলকাতার এক হাসপাতালে ৮৪ বছর বয়সে শেষ হয় তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনচরিত। একমাত্র কন্যা মুনমুন সেন, নাতনি রিয়া সেন, রাইমা সেন। যাঁরা হিন্দী ছবিতে উত্তরাধিকারের উজ্জ্বল উপস্থিতি রেখেছে।আর আমি নামক মানুষটি যে নারীর উর্ণনাভে জড়িয়ে মধ্যাহ্নে পৌঁছে গেছি, আজও তার প্রতি অনুরাগের এতটুকু কমতি নেই। তাঁকে সন্ধান করতে করতে একসময় মনে হয়েছে, না আমার কিছুই হারায়নি। এমন মগ্নতায় কি ছল থাকে? সুচিত্রা সেন অভিনীত চরিত্রগুলো হেঁটে আসে। কখনও রমা, কখনও মল্লিকা। মল্লিকা বলছে, ‘আমার মনে হচ্ছে আমাদের ভালবাসা দেখার জন্য ঐ কাঞ্চনজংঘার নিচে এত সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে...। ভাটার ফুল ঝরে যাবে। চাঁদ ডুবে যাবে। কিন্তু আজকের লগন কোনদিন শেষ হয়ে যাবে না।’ প্রিয় সুচিত্রা সেন, আপনার চোখের মায়াময় দ্যুতি, হৃদয়কাড়া হাসি, অব্যক্ত ক্রন্দনের দৃশ্যকল্প খুঁজে খুঁজে এত দিনরাত্রির মুগ্ধতা। তা কি বিস্মরণের অকূলে হারিয়ে যেতে পারে? আপনাকে চোখের তারায় ক্রুশবিদ্ধ করেছি। বর দিন। তিন পুরুষের প্রণয়পাশার খেলোয়াড় কেমন কাঙাল হয়ে আছে।

প্রকাশিত : ২৫ ডিসেম্বর ২০১৪

২৫/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: