মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

প্রণয় মামলা অতঃপর বিয়ের শর্তে আপোস প্রস্তাব-

প্রকাশিত : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৪
প্রণয় মামলা অতঃপর বিয়ের শর্তে আপোস প্রস্তাব-

আজাদ সুলায়মান ॥ চিত্রনায়িকা হ্যাপি নিশ্চিত জানতেন, জাতীয় দলের ক্রিকেটার রুবেলের বিরুদ্ধে ধষর্ণের অভিযোগ আনলে সহজে পার পাবেন না তিনি। থানা-পুলিশ, মামলামোকদ্দমা দিয়ে একজন ক্রিকেটারকে ঘায়েল করতে হলে যেতে হবে হাসপাতালে, সতীত্ব পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে, মিডিয়ায় ঝড় উঠবে, মান-সম্মানও যাবে। এমনটি জেনেও তিনি মামলা করেছেন। উদ্দেশ্য, রুবেলকে শাস্তি দেয়া। একদিকে রুবেলের শাস্তিও চাচ্ছেন, আবার শর্তও দিচ্ছেন, বিয়ে করলে ধর্ষণের অভিযোগসহ মামলা প্রত্যাহার করে নেবেন।

মামলা করার একদিন পর রবিবার এভাবেই মুহূর্তে মুহূর্তে মত পরিবর্তন করেছেন চিত্রনায়িকা নাজনীন আক্তার হ্যাপি। এ নিয়ে তোলপাড় চলে ক্রীড়াঙ্গনে। তবে রুবেল জাতীয় দলের একজন মেধাবী ক্রিকেটার হওয়ায় অত্যন্ত সতর্ক ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, থানা পুলিশ, হাসপাতাল। সবাই এ নিয়ে ছিলেন অত্যন্ত সতর্ক-সংযত। এমনকি মিরপুর থানার পুলিশও ছিল বেশ সাবধান। তারা পরিস্থিতি দেখেশুনে অগ্রসর হচ্ছে। অন্য আর দশটা মামলার মতো এ ঘটনায় পুলিশী মেজাজে তদন্তের নামে কোন ধরনের বাড়াবাড়ি থেকে বিরতও রয়েছে মিরপুর থানা। ওসি সালাহউদ্দিন জানিয়েছেন, ধর্ষণের প্রাথমিক প্রমাণাদি হিসেবে ডাক্তারি পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার পরই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের পেসার রুবেল হোসেনের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও নারী নির্যাতনের অভিযোগ এনে শনিবার বিকেলে মিরপুর থানায় মামলা (মামলা নং-৩৭) করেন মডেল ও অভিনেত্রী নাজনীন আকতার হ্যাপি। মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, জাতীয় দলের ক্রিকেটার রুবেল হোসেন বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তাকে একাধিকবার ভোগ করেছে। যখনই তিনি বিয়ের কথা বলতেন তখনই সে নানা অজুহাত দেখাত। এজন্য বাধ্য হয়েই এ মামলা করা হয়েছে। মামলায় হ্যাপি অভিযোগ করেন, গত ৯ মাস ধরে জাতীয় দলের এই ক্রিকেটারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা। এরই মধ্যে একাধিকবার তাদের শারীরিক সম্পর্কও হয়েছে। কিন্তু ইদানীং অন্য এক মেয়ের সঙ্গে রুবেল সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। এ ব্যাপারে সে অভিযোগ করলে রুবেল এড়িয়ে যায়। মামলা দায়েরের পর শনিবার সন্ধ্যায় তেজগাঁও ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে পাঠানো হয় হ্যাপিকে।

কে এই হ্যাপি ॥ তিনি তেমন কোন সেলিব্রিটি নন। মিডিয়ায়ও এতদিন তাকে নিয়ে খুব একটা প্রচারণা চোখে পড়েনি। হঠাৎ রুবেলের বিরুদ্ধে মামলা করার পর জানা যায় হ্যাপি নামের একজন অভিনেত্রী রয়েছে দেশীয় চলচ্চিত্রে।

তার পুরো নাম নাজনীন আক্তার হ্যাপি। গ্রামের বাড়ি খুলনার খালিশপুরে। বাবার নাম মোহাম্মদ ইউসুফ আলী। পরিবারসহ ঢাকার রূপনগর আবাসিক এলাকার ছয় নম্বর রোডের ১৬ নম্বর বাড়িতে বাস করছেন হ্যাপি। বর্তমানে তিনি একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ দ্বিতীয় সেমিস্টারে পড়ছেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি অভিনয় করেন বলেই জানান সাংবাদিকদের। চলচ্চিত্র অঙ্গন থেকে জানা যায়, ২০১৩ সালে মোস্তাফিজুর রহমান মানিকের ‘কিছু আশা কিছু ভালবাসা’ সিনেমার মাধ্যমে হ্যাপির চলচ্চিত্রে অভিষেক হয়। তিনি বর্তমানে কাজ করছেন বদরুল আমিনের ‘রিয়েলম্যান’, মুশফিকুর রহমান গুলজারের ‘লাল সবুজের সুর’, মেজবাহ শিকদারের ‘অন্যরকম’, জামশেদুর রহমানের ‘ছন্দপতন’ চলচ্চিত্রে।

অপরদিকে রুবেল বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে ২২টি টেস্টের পাশাপাশি ৫৩টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছেন। এছাড়া জাতীয় দলের হয়ে ১১টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে মাঠে নেমেছিলেন। ২০০৯ সালের জুলাইয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তার টেস্ট অভিষেক ঘটে। একই বছরের ১৪ জানুয়ারি শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ঢাকায় তার ওয়ানডে ম্যাচে অভিষেক হয়।

যেভাবে পরিচয়-প্রণয় ॥ পুলিশ জানিয়েছে, রুবেল হ্যাপির পরিচয়- প্রণয় বেশিদিনের নয়। বছরখানেক আগেই তাদের পরিচয় ঘটে ফেসবুকে। হ্যাপি নিজেও তা স্বীকার করে বলেছেন, ফেসবুকের মাধ্যমে রুবেলের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। প্রায় ৯ মাস ধরে প্রেমের সম্পর্ক। তারপর ঘনিষ্ঠতা। তারও পর মেলামেশাা। সেটা দৈহিক পর্যায়ে গড়ায়। রুবেল বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সে কয়েকবার আমার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়েছে। আর এটা হয়েছে মিরপুর কমার্স কলেজের বিপরীতে তার বাসায়। ওই ফ্ল্যাটে নিয়মিত যেতাম।

এ সম্পর্কে হ্যাপি আরও বলেন, কয়েকদিন আগেও সে ডেকে নিয়ে আমার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়েছে। এ সময় আমি তাকে বিয়ের কথা বলি; যা অনেক আগে থেকেই বলে আসছি। বিয়ের কথা বললেই সে নানা অজুহাতে পাশ কাটিয়ে চলে। এখনও বিয়ের বয়স হয়নি। কিছুদিন পরে করব। ক্যারিয়ারটা আরেকটু এগিয়ে নেই। তুমি পড়াশোনা শেষ কর। তারপর ধুমধাম করে বিয়েটা হবে। এমন সব গল্প বলে দিন পার করত আর আমাকে ভোগ করত।

হ্যাপি অভিযোগ করে বলেন, তিন-চার দিন আগে আমি তাকে বিয়ের কথা বলি। উত্তরে রুবেল বলে, মিডিয়ার মেয়েরা ভাল না। তাদের চরিত্র খুব খারাপ। তাদের সঙ্গে প্রেম করা যায়, কিন্তু বিয়ে কোনভাবেই সম্ভব না। সুতরাং, আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারব না। বিয়ে করবে না তো এতদিন আমার শরীরটা নষ্ট করলে কেন? এ কথায় ক্ষিপ্ত হয়ে রুবেল আমার গায়ে হাত তোলে। সেদিনের পর আর কোন কথা হয়নি তার সঙ্গে। আমি ভেবেছিলাম রুবেল আমাকে ফোন করবে। কিন্তু না কয়েকদিন ধরে কোন যোগাযোগ নেই তার সঙ্গে। ফলে এক প্রকার বাধ্য হয়েই আমাকে মামলা করতে হলো।

এদিকে হ্যাপির মুখে এ ধরনের বেলেল্লাপনা বক্তব্য শুনে রুবেলের এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় সাংবাদিকদের মিরপুর প্রাঙ্গণে বলেন, তার টার্গেট রুবেলের মতো একটা সেলিব্রিটিকে ঘায়েল করে ফায়দা লোটা। রাতারাতি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসা। রুবেল যদি তাকে এতবার শয্যাসঙ্গী করেও থাকে তাহলেও সে নিজের মানসম্মান থাকলে লাজলজ্জা খেয়ে রগরগে বর্ণনা দিত না।

যত দোষ ফেসবুকের ॥ এ সম্পর্কে রুবেলের অপর এক বন্ধু এ ঘটনার দায়ভার চাপায় ফেসবুকের ওপর। ওই বন্ধু গতকাল ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন, সব দোষ ফেসবুকের। যার মাধ্যমে তারা হঠাৎ একে অপরের কাছাকাছি আসার সুযোগ পান। শুধু রুবেল-হ্যাপি নয় আরও কয়েক ক্রিকেটার নিয়মিত হ্যাপির মতো শোবিজ কন্যাদের সঙ্গে একই কা-কীর্তি করছেন।

ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্ন ॥ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চলচ্চিত্র নায়িকা নাজনীন আক্তার হ্যাপির ফরেনসিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। রবিবার দুপুর একটার দিকে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের একটি নীল রঙের গাড়িতে করে আনা হয় হ্যাপিকে। পুলিশের দুই মহিলা কনস্টেবল ও দুই পুরুষ কনস্টেবল তার নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের তৃতীয় তলায় নেয়া হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে চলে তার শরীরের বিভিন্ন পরীক্ষা। তিন সদস্যের মহিলা ডাক্তার দিয়ে তার পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিবেদন দিতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগ।

ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের প্রধান ডাঃ মোহাম্মদ হাবিবুজ্জামান চৌধুরী জানান, এটি একটি স্পর্শকাতর বিষয়। এ কারণে নারী সদস্যসহ তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি বোর্ড গঠন করা হয়। সাধারণত এ ধরনের রিপোর্ট দেয়ার জন্য ৭ থেকে ১০ দিন সময় লাগে। আমরা চেষ্টা করব যত দ্রুত সম্ভব সততার সঙ্গে রিপোর্টটি দেয়ার। আমরা তার ফরেনসিক প্রতিবেদন পুলিশের কাছে হস্তান্তর করব। এর পরই হ্যাপিকে রাজধানীর তেজগাঁও ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে পাঠানো হয়।

বিয়ে করলে মামলা প্রত্যাহার ॥ নাজনীন আক্তার হ্যাপি বলেছেন, ক্রিকেটার রুবেল আমাকে বিয়ে করলে মামলা তুলে নেব। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ডাক্তারি পরীক্ষার পর মিরপুর মডেল থানায় রবিবার বিকেলে এ কথা বলেন হ্যাপি।

হ্যাপি বলেন, আমার কাছে যথেষ্ট প্রমাণ আছে। মামলায় যে অভিযোগ করা হয়েছে আমি সেটা প্রমাণ করতে পারব । প্রমাণ নিয়েই আমি প্রতারণা ও নারী নির্যাতন মামলা করেছি। সাংবাদিকরা রুবেলকে জিজ্ঞাসা করুন। তা হলেই সত্য উন্মোচিত হবে। সত্যি ঘটনা স্বীকার করে সে যদি আমাকে বিয়ে করে তাহলে এ মামলা তুলে নেব।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে হ্যাপি বলেন, রুবেল আমার ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দিয়েছে। আমি এর ন্যায়বিচার চাই। রুবেলের ক্যারিয়ার ধ্বংস হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ ধরনের মানুষের সভ্য সমাজে বসবাসের কোন অধিকারই নেই।

প্রকাশিত : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৪

১৫/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: