কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

যে যায় সে যায়

প্রকাশিত : ১২ ডিসেম্বর ২০১৪
  • নুরুল করিম নাসিম

বেড়াতে আসা দেশ-বিদেশের নারী-পুরুষের ভিড়ে তখন ভরে উঠেছে দ্বীপ শহর মাল্টা। ফিলিস্তিনী সহকর্মী সাঈদ নজর যা যা বলেছিল, সব সাবেরের মনে আছে। সে আসতে পারেনি, স্ত্রীকে নিয়ে কেনাকাটা করতে হবে। সাবেরকেও তাদের সঙ্গে যেতে বলেছিল। কিন্তু সে রাজি হয়নি। সে একা মানুষ। তার মাথায় আছে অন্য কিছু।

ভূূমধ্যসাগরের দ্বীপের দেশ মাল্টায় এসে এভাবে শূন্যহাতে ফিরে যাওয়া যায় না। গিফ্ট শপগুলোতে উপচে পড়ছে ভিড়। পর্যটকদের স্বর্গ এই মাল্টা। আরও দু’তিনটি দ্বীপ নিয়ে এই দ্বীপের দেশ। গ্রীষ্মে প্রতিবেশী দেশ লিবিয়া, ঈজিপ্ট ও অন্যান্য দেশ থেকে পর্যটকরা আসে। কেউ আসে ভ্রমণে, কেউ আসে বিনোদন কিনতে। কেউ আসে নিছক ঘুরতে। বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মীদের কাছে অনেক গল্প শুনেছে সাবের। কিন্তু কখনও আসা হয়নি। তার কর্মস্থল লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপলী। সেখান থেকে আধঘণ্টার বিমান যাত্রা মাল্টা। ঢাকা থেকে কলকাতা বিমানে যতটুকু দুরত্ব, যতটুকু সময়, ঠিক সেই রকম।

সাবেররা উঠেছিল ভিলায়। আরও দুটো পরিবার ছিল সঙ্গে। সাবেরই এই ভিলা ঠিক করেছে ত্রিপলী থেকে টেলিফোনে। মালিক অবসরপ্রাপ্ত ইংরেজীর শিক্ষক। জাতিতে মাল্টিজ, ধর্মে ক্যাথলিক খ্রিস্টান।

রাত দশটা পর্যন্ত ভিলা খালি। অন্য দুটো পরিবার কেনাকাটা করতে বাইরে গেছে। যা কিছু এই সময়টার ভেতর করতে হবে।

দু’তিনটি গিফ্টশপ ঘুরল সাবের। প্রতিটি দোকানে আপরূপ সব বিক্রয়বালিকা, স্নিগ্ধতা ও লাবণ্যে কেউ কারো চেয়ে কম যায় না। ফিলিস্তিনী সহকর্মী সাঈদ নজরের দেয়া টিপস এবং পরামর্শ কাজে লেগেছে।

এসব বিক্রয়বালিকা সম্ভবত কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। সন্ধ্যায় ডিউটির পর এরা অবসর সময়ে টুরিস্ট গাইড হিসেবে কাজ করে। কখনও বিনোদন-সঙ্গী হিসেবেও সঙ্গ দেয়। অনেক সময় এরা হোটেলেও যায়। তবে যাকে ভালো লেগেছে সাবেরের, তার নাম মেরিনা গাউচি, কোথায় যেন দেশে ফেলে আসা প্রিয় বান্ধবী বিনীতার সঙ্গে মিল আছে। মেরিনা প্রধমেই হোটেলে যেতে অস্বীকৃতি জানাল। সাবের তাকে ভিলার কথা বলতে উনিশ বছরের লাবণ্যময় মেয়েটি খুশিতে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল।

ভিলাগুলো কেমন চুপচাপ আর নির্জন। রাস্তাগুলো এত পরিষ্কার আর ছিমছাম যে মনে হয় এইমাত্র সমুদ্র স্নান করে উঠেছে। কোথাও শব্দ নেই, ভিনদেশী আকাশ কী রকম ম্লান চোখে চেয়ে থাকে।

চমৎকার উচ্চারণে কথা বলে মেরিনা। সেই কতদিন হয়ে গেছে সাবের দেশ থেকে এই প্রবাসে এসেছে। গাদ্দাফির অবরুদ্ধ নগরী লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপলীতে দু’বছর অতিবাহিত হলো। সন্ধ্যা হলে সমস্ত শহরের দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। রেস্তোরাঁ নেই, নাইট ক্লাব আগে ছিল, গাদ্দাফি দেশের সর্বময় ক্ষমতা নেয়ার পরে, বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ক্লাবগুলো। চারদিকে ভয় আর নির্জনতা বিরাজ করছে। মানুষ মানুষকে বিশ্বাস করে না। কেমন যেন এক অসহনীয় পরিবেশ।

দু’বছরে সাবেরের জীবন অসহনীয় হয়ে উঠেছে। আড্ডা নেই, সিনেমা হল আছে, কিন্তু সেখানে বস্তাপচা অনেক দিনের পুরনো হিন্দিছবি দেখানো হচ্ছে । সহকর্মী সাঈদ সমস্যাটা অনুধাবন করতে পেরে একদিন লাঞ্চব্রেকে মাল্টায় ঘুরে আসার পরামর্শ দিয়েছিল সাবেরকে। তারপর কতদিন চলে গেছে।

তেল কোম্পানিতে চাকরি; সকাল সন্ধ্যা ব্যস্ত থাকতে হয়। মাঝে মাঝে তেল শোধনাগারে সাদা চামড়ার আমেরিকানদের সঙ্গে ব্রেগা অঞ্চলে যেতে হয়। এমনিতে আমেরিকার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক লিবিয়া সরকার সম্প্রতি ছিন্ন করেছে, কিন্তু কয়েকজন মার্কিনী কনসালটেন্টকে জামাই আদরে কঠিন নিরাপত্তা দিয়ে রেখেছে। টেলিভিশনে বক্তৃতায় সারাক্ষণ গাদ্দাফি মার্কিনীদের মু-ুপাত করছে, অইদিকে আবার তাদের প্রযুক্তি ছাড়া চলছে না।

হেঁটেই ভিলায় চলে এলো ওরা। এখন শেষ বিকেল ভালবাসা ছড়িয়ে দিচ্ছে দ্বীপ শহরে। কিছুক্ষণ পরে সন্ধ্যার সঙ্গে অভিসারে যাবে। চমৎকার সুসজ্জিত কক্ষ। ভিলাটি কোন অংশে তিনতারা হোটেলের চেয়ে কম নয় কোন কিছুতে। সাবেরের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরে হলেও কিছুদিন লন্ডনে একটি পত্রিকা অফিসে কেটেছে। ব্যবহার, আচরণ, ভদ্রতায় বেশ পারদর্শী। মেরিনা মুগ্ধ। এক সময় বলেই ফেলল, তোমার উচ্চারণ, তোমার ব্যবহার অন্যসব এশিয়ানদের চেয়ে আলাদা। আই লাইক ইট।

সাবেরের এসব স্তুতিবাক্যে গলে যাওয়ার কারণ নেই। তবুও কিছু একটা বলতে হয়। তাই চোখে মুখে আবেগ এনে বলে, দ্যাটস গ্রেট।

ততক্ষণে সাবের তার অনুমতি নিয়ে দুটো ভিন্ন মাপের গ্লাসে স্যাম্পেন ঢেলে বিনীত ভঙ্গিতে ট্রে টা এগিয়ে দেয়। সঙ্গে বাদাম। সাবের বলে, তোমার কি ফ্রাইড চিকেন পছন্দ?

মেয়েটি সারাদিন দোকানে মূর্তির মতো একঠায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বকবক করেছে বিভিন্ন কিসিমের ক্রেতাদের সঙ্গে এবং ক্লান্ত হয়েছে। ক্ষুধা লেগে আছে তার চোখে মুখে। ঠোঁট শুকনো। সাবেরের কি রকম যেন মায়া হলো।

খুশিতে ঝলমল করে ওঠে মেরিনার ম্লান ঠোঁট দুটো। বলে, আই লাইক ইট, ডিয়ার। দু’জনই পোশাক খুলে মুখোমুখি বসেছে। ঘরে ঠা-া। গ্লাসে টুকরো টুকরো স্বপ্নের মতো বরফ ভাসছে। মেরিনের বসার ভঙ্গিটা সুন্দর। উরুটা সুন্দর। হাসিটা সুন্দর। মেরিন বলে, তোমাকে প্রথমে দেখেই চমকে উঠেছিলাম।

Ñকেন?

Ñনা, সেটা বলা যাবে না।

Ñসিক্রেট? খুবই গোপনীয়?

Ñনট রিয়েলি? আসলে আমার বাবা ছিলেন আপনার মতো দীর্ঘকায়। আপনার চোখ দুটোর সঙ্গে অপূর্ব মিল।

Ñহয়। মানুষের এরকম হয় কখনও। তিনি এখন কোথায়?

Ñআমার বয়স যখন পাঁচ, তখন আমার মায়ের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। বাবা ছিলেন শান্ত প্রকৃতির। সরল, সহজ ও ফ্রাঙ্ক।

Ñতোমাকে কে সবচেয়ে বেশি ভাল বাসতো? কার কথা বেশি মনে পড়ে?

Ñবাবা। বাবার কথা। আমার মনে আছে, বাবা চাননি বিচ্ছেদ। মা তখন তার চেয়ে বয়সে ছোট একজন ব্যক্তির সঙ্গে মজে গেছে। প্রথম দেড় বছর আমি বাবার কাছে ছিলাম। অই লোকের সঙ্গে, মানে দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গেও ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।

Ñতারপর?

Ñতারপর তিনি একজন মাতাল গায়ককে বিয়ে করেন। সে তাকে বোতল দিয়ে যোনিতে আঘাত করে। ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।

Ñতোমার মা’র সমস্যাটা কোথায়?

Ñলোভ, টাকার লোভ। বাবা খুব ভাল মানুষ ছিলেন। তিনি চাননি সংসারটা ভাঙুক। মা যেদিন আমাকে জোর করে নিয়ে গেলেন, সেদিন আমিও কেঁদেছিলাম। বাবাও কেঁদেছেন।

Ñএর পর তোমার বাবার সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি?

Ñমা ছিলেন খুবই রূঢ় প্রকৃতির। আর সেক্স-ক্রেজি। তিনি বাবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে দেননি আমাকে।

মেরিনার চোখের পানি সোনালি স্যাম্পেনের সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেল। নিষ্পাপ চোখের জলের কী অপরাধ? ঘরের ভেতর এক আলো-আঁধারীর মায়াবী খেলা। মেরিন বলল, দিলাম তো তোমার মুড নষ্ট করে? সরি, আমি পুষিয়ে দেব।

সাবেরের চোখ ছল ছল করছে; সবার জীবনেই গল্প আছে। আমার মাকে ছেড়ে বাবা একদিন চলে গেছেন। সেদিনের কথা আজো আমার মনে আছে। মা আর বিয়ে করেননি। আমাকে মানুষ করেছেন। সারাটা জীবন কী যে কষ্ট করেছে মা!

Ñতোমরা প্রাচ্যের মানুষরা খুবই ভাল।

কথায় কথায় অনেক সময় পার হয়ে গেল। সাবের প্রতিশ্রুত ডলার তুলে দিল মেরিনের হাতে। মেরিন বলল, তা হয় না। আমি তো তোমাকে কিছুই দেইনি। বরং তুমি আমাকে খাইয়েছ। সঙ্গ দিয়েছো। চমৎকার সময় কেটেছে আমার। তুমি এখানে কতদিন আছো?

Ñআমি আরো দু’তিন দিন আছি। তুমি আমাকে একটি চমৎকার গল্প দিয়েছ। কাল ভেলেত্তা রেস্তোরাঁয় সন্ধ্যার পরে সম্ভব হলে এসো। রাতের খাবার খাব আমরা।

Ñআমার এক বান্ধবীকে নিয়ে আসব? ওর জীবন আমার চেয়েও করুণ। তুমি আরও গল্প পাবে।

নিচে নামতেই ভিলার মালিক রডরিকের সঙ্গে দেখা। মেরিনাকে চেনে। গেট পর্যন্ত এগিয়ে এলো বিদায় জানাতে।

মেরিনা লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে গেল।

সাবের অনেক্ষণ তাকিয়ে রইল সেই দিকে।

রডরিক বলল, তোমার গাইড দরকার হলে আমার মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে পার। আজ ও এক আমেরিকান টুরিস্টের সঙ্গে বাইরে গেছে। কাল ও ফ্রি আছে। বাট ইউ হ্যাভ টু পে ফর দ্যাট।

সাবের জানে, কিছুটা সময়তো পাশ্চাত্যের শহর লন্ডনে ছিল। প্রতিটি মুহূর্ত পয়সার হিসেবে চলে। মানি ম্যাটার্স। মানি স্পিক্স। সাবের বলে, না, কাল আমার অন্য কাজ আছে। প্রয়োজন হলে আমি তোমাকে জানাব।

বাইরে তখন বারবনিতা রাত তার সমস্ত বেলেল্লাপনা নিয়ে মেতে উঠেছে। দূর থেকে ভেসে আসা ডিস্কোর প্রবল শব্দে মাল্টার আকাশ বাতাস মুখরিত।

হঁৎঁষ.হধংরস@মসধরষ.পড়স

প্রকাশিত : ১২ ডিসেম্বর ২০১৪

১২/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: