কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পাখির কলতানে মুখরিত জাবি

প্রকাশিত : ৭ ডিসেম্বর ২০১৪
  • দীপঙ্কর দাস

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি)। শীত আসার সঙ্গে সঙ্গে অতিথি পাখিরা ভিড় করে এখানে। এবারও অতিথি পাখির কলকাকলি, খুনসুটিতে মুখর সারা ক্যাম্পাস। জলাশয় জুড়ে লাল শাপলার শোভা আর নানা রঙের অতিথি পাখি ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে বহুগুন। প্রতিদিনই ক্যাম্পাসে অতিথি পাখি দেখতে ভিড় করছেন হাজারো পাখিপ্রেমী।

পাখির রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া

লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি, কমলা, সবুজ, আসমানি রঙের অতিথি পাখিদের ঝাঁকে ঝাঁকে বিচরণ, পানির ওপর ওড়াউড়ি, খুনসুটি আর জলকেলি নিসর্গম-িত এই ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। ক্যাম্পাসে ছোট-বড় আধ ভাঙ্গা উঁচু ঢিবি আর জলাশয়ের পাড়ে অনেক সরালি ঝাঁক বেঁধে উড়ছে সাঁই সাঁই করে। আবার পরক্ষণেই ঝপাৎ করে বসে যাচ্ছে স্বচ্ছ জলাধারে। কেউবা আবার সাঁতার কাটছে আপন মনে জলাশয়ের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত। আবার পরক্ষণে একঝলক বাতাসে মিশে উড়াল দিচ্ছে শূন্যে। অদূরে আবার লম্বা ঠোঁটওয়ালা শামুকভাঙ্গা পাখি জলাশয় থেকে খুঁটে খুঁটে শামুক খাচ্ছে। পানকৌড়ি, দুগ্ধধবল বকের জলাশয়ের লাল শাপলা শোভিত পাতার গা বেয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে এখান থেকে ওখান পর্যন্ত। ক্যাম্পাসে ভিনদেশ থেকে আগন্তুক পরিব্রাজক পাখির অনাবিল পদচারণা সবচেয়ে বেশি মনোরম করে তোলে ভোরের আলোয়। ভোরের সূর্যের সোনালি আভা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে গাছের শাখে শাখে, পাতায় পাতায়। ঠিক তখনই সব নির্জনতা ভেঙ্গে দুরন্ত বাস সাইরেন বাজিয়ে ছুটে চলে ক্যাম্পাসের আঁকাবাঁকা পথে। আর পরক্ষণেই পাখির ঝাঁক পত পত করে মুহুর্মুহু কিচিরমিচির শব্দে বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্ত-সমাহিত পরিবেশ হয়ে ওঠে মুখর।

হৃদয়ের টানে সুদূর পথ বেয়ে

প্রতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে হিমালয়ের উত্তরে শীত জেঁকে বসে। তখন ওই অঞ্চলে শীত ও ভারি তুষারপাতে টিকতে না পেরে পরিব্রাজক পাখিরা উষ্ণতার খোঁজে ঝাঁকে ঝাঁকে পাড়ি জমায় এ দেশে। মূলত বাংলাদেশে অক্টোবরের শেষ থেকেই এ পরিব্রাজক পাখিদের আগমন ঘটে। মার্চ মাসে যখন শীতের বিদায় ঘণ্টা বেজে ওঠে তখন এসব পরিব্রাজক পাখিরা আবার ফিরতে শুরু করে সুদূর সাইবেরিয়া, হিমালয় অঞ্চল, চীন ও ভারতে।

জলাশয়ে পাখির আবাস

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জলাশয়গুলোই পাখির প্রধান আবাসস্থল। ক্যাম্পাস অভ্যন্তরে তিনটি জলাশয়Ñরেজিস্ট্রার অফিসের সামনের জলাশয়, প্রীতিলতা হলের পেছনের জলাশয় ও পুরনো কলা ও মানবিক অনুষদ ভবনের পাশের জলাশয়ে পরিলক্ষিত হয় পাখির আনাগোনা। ক্যাম্পাস অভ্যন্তরে জলাশয় সংস্কার ও জলাশয় পরিষ্কার লিজ কমিটির অদূরদর্শিতার দরুণ পাখির সংখ্যা দিনে দিনে উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জলাশয়ে পর্যাপ্ত পানি ও জলজ খাদ্য উপস্থিত না থাকা, ক্যাম্পাস অভ্যন্তরে জলাশয়ের পাশে অস্থায়ী দোকানপাট ও গাড়ি পার্কিং এমনকি উচ্চশব্দে গাড়ির হর্ন বাজানো অন্যতম কারণ। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ ক্যাম্পাসে পাখির আবাসস্থলের পরিবেশ সুন্দর রাখার জন্য নানা কর্মসূচী গ্রহণ করেছে।

পাখির অভয়ারণ্য

বর্তমান বিশ্বে ক্রমাগত উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে জলবায়ু পরিবর্তন ও বনভূমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় প্রকৃতির অলঙ্কার পাখির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমছে। নগর জীবনের ব্যস্ততা, দূষণ আর কোলাহলমুক্ত নান্দনিক পরিবেশে অতিথি পাখিদের জন্য এক চিলতে সবুজ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পরিণত হয়েছে অভয়ারণ্যে। জাবির লেকগুলোতে অতিথি পাখির পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতিসহ বিলুপ্ত প্রজাতির পাখিরও দেখা মেলে। সচরাচর যেসব পাখি দেখা যায় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ জলময়ূর, ডুবুরি, খোঁপা ডুবুরি, ছোট পানকৌড়ি, বড় পানকৌড়ি, শামুক ভাঙ্গা বা শামুক খোলা, কালো কুট, কাদা খোঁচা বা চ্যাগা, জলের কাদাখোঁচা পাখি, ছোট জিরিয়া, বাটান, চা পাখি, সবুজ পা, লাল পা পিও, লাল লতিফা বা হটটিটি, গঙ্গা কবুতর, কাল মাখা গঙ্গা কবুতর লেঞ্জা, কুন্তি হাঁস, জিরিয়া হাঁস, নীলশির, গ্যাডওয়াল, লালশির, পাতারি হাঁস, বামনীয়া, ভুটি হাঁস, কালো হাঁস, চখা-চখি, বালি হাঁস, বড় সরালি, ছোট সরালি, রাজহাঁস, কানি বক, ধূসর বক, গো বক, সাদা বক, ছোট বক, মাঝলা বক, কালেম বা কায়েন প্রভৃতি প্রজাতি।

পেছন ফিরে দেখা

বাংলাদেশে অতিথি পাখির আগমন ঘটে অক্টোবর-নবেম্বর মাসে এবং মার্চের গরম শুরু হলে আবার তারা পাড়ি জমায় আপন ঠিকানায় । প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকগুলোতে কমপক্ষে ৮০ প্রজাতির অসংখ্য পাখির আগমন ঘটে। ১৯৮৮ সালে প্রথমবারের মতো ক্যাম্পাসের জলাশয়গুলোতে অতিথি পাখি আসে। প্রথম বছর ৩ প্রজাতির ৮৫০টি পাখি আসে। এর মধ্যে ১৯৯০ সালে অতিথি পাখির বিচরণ ঘটে সবচেয়ে বেশি। সে সময় পিন্টেল, নাকতা, কোবার্ড, গারাগানিসহ মোট দশ প্রজাতির ১০ হাজার ৫০০ পাখির সমাগম ঘটে। লেকগুলোতে প্রধানত দুই ধরনের পাখির আগমন ঘটে। এক ধরনের পাখি ডাঙ্গায় বা শুকনো স্থানে বা ডালে বসে বিশ্রাম নেয়। আরেক ধরনের পাখি থাকে পানিতে। এদের বেশিরভাগই হাঁস জাতীয় এবং এরা পানিতে বসবাস করে।

প্রকাশিত : ৭ ডিসেম্বর ২০১৪

০৭/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: