কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাংলা মায়ের বরপুত্র

প্রকাশিত : ৬ ডিসেম্বর ২০১৪
  • মইনুদ্দীন খালেদ

সুরের মঞ্চে রচিত হলো তাঁর মৃত্যু-বাসর। শিল্পী সুরের ঝরনাতলে চিরনিদ্রায় শুয়ে রইলেন। তাঁর মৃত্যুতে মধ্যরাত পর্যন্ত সরোদ বাজাল দেবদূতের মতো দেখতে দুই কিশোরপ্রতিম সরোদিয়া। তারপর শিল্পী যখন হিমঘরে শুয়ে তখন করুণতর হলো তাঁর মৃত্যু হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়ার বাঁশির সুরে। একটা বেদনাহত কুয়াশামাখা সকাল এলো। একটা শোকার্দ্র সূর্য উঠল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রাঙ্গণের গাছ-গাছালির মূহ্যমানতা ভেঙ্গে একটা পাখি মাঝে মাঝে করুণ হিমসুরে জানিয়ে দিল কাইয়ুম চৌধুরী নেই। শোকবিহ্বল চিত্রবৎ অনেক মুখ তাকিয়ে আছে। তাদের তাকিয়ে থাকার মধ্যে অধীরতা নেই। তারা জানে দীর্ঘদেহ ছিমছাম মানুষটি আর আসবেন না। শোকাকুল সমাবেশের সবারই জানা আছে বলে লাশবাহী এ্যাম্বুলেন্সে সাইরেন বাজে না। একটা নীরব গতির এ্যাম্বুলেন্সে এসে থামে। শিল্পীর লাশ স্থাপিত হয় পুষ্প মঞ্চে। অবিরাম অজস্র ক্যামেরায় ছবি উঠতে থাকে। এতটা শান্ত-মুখে শিল্পীকে তো আর দেখা যাবে না! ক্যামেরার আলোয় আঁকা হতে থাকে মৃত্যুতে স্থির শিল্পীর মুখ। হায়! ক্যামেরা শিল্পীদের কেউ আজ কাকুতি-মিনতি করে বলছে না ‘কাইয়ুম ভাই, এদিকে তাকান,’ ‘স্যার, আরেকটু উপরে তাকান।’

কতবার পাশাপাশি বসে দূর দূর বাংলার পথ পাড়ি দিয়েছি শিল্পীর সঙ্গে। তিনি আকুল চোখে তাকিয়ে দেখতেন স্বদেশ। বাংলার প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিদিনই তিনি কথা বলেছেন। যাত্রা শেষে বিরাম পেলেই সাদা কাগজে লতিয়ে দিতেন রেখা। রেখারা বাঁক নিয়ে হতে যেত নারী বা নদী। রেখারা ঝুলে পড়ত কুমড়ো লতার মতো। রেখারা নির্দেশ করত নদীমাতৃক বাংলার জলের স্বরলিপি।

শিল্পীর মৃত্যুর পর তাঁর চিত্রমালার দিকে তাকিয়ে আমি কিছুই লিখতে পারি না। তাঁর সৃষ্টি ছাপিয়ে মনে মুদ্রিত হয়ে পড়ে তাঁর মুখ। স্মৃতির ঘোরে কান পেতে শুনি তাঁর কণ্ঠস্বর। মস্তিষ্ককে আজ আর খুব ক্ষমতাশীল বলে কিছু মনে হয় না। কই, বুদ্ধির জোরে যদি সবই মেনে নেয়া যেত তা হলে কেন থেমে থেমে মনে পড়ে সত্যিই কি কাইয়ুম চৌধুরী নেই। হৃদয়ের আবেগের অভিঘাত বার বার নাকচ করে দেয় বুদ্ধির হিসেব। নিজেকে নিজেই বার বার বলি, সত্যিই কি কাইয়ুম ভাই নেই!

শিল্পীর জন্য শুধু শ্রদ্ধাঞ্জলি রচনা করেই স্বস্তি পাই না। বার বার মনে হয় পাঠ করি আবার তাঁর শিল্পকৃতি। আমি তাঁর চিত্ররাশির দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট বুঝতে পারি যে, নদীর দেশের শিল্পী সবচেয়ে বেশি ভ্রমণ করেছেন নৌকায় চড়ে। ভ্রমণ মানে শিল্পযাত্রা। তাঁর ছবিতে মন্ত্রচালিতের মতো ধীরলয়ে একটা নৌকার গলুই ঢুকে পড়ে। কখনও ছই-নৌকাটাই হয়ে যায় তাঁর ছবির প্রধান বিষয়। নৌকায় চড়ে নদীর দুলুনিতে দুলে যে বাংলার জলের হর্ষ অনুভব করেনি তার জন্য যেন নদীর দেশের সত্যিকার ছবি আঁকাই সম্ভব নয়।

কবির ভাষায়, ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়।’ সহস্র ছবির মধ্যে তার শুধুই বাংলাদেশ। বাল্লাবিত শ্যামল শীর্ষে রঙিন পুষ্প, ছায়া সুনিবিড় গ্রামের শান্তির নীড়, দূরের কাজল-কালো গ্রাম, নারীর আলুলায়িত কেশ, দীঘল গ্রীবা, বাঁকানো কটিদেশ কৃষকের হাসিমুখ, মাথায় লালগামছাÑ এসব আমৃত্যু অবিরাম এঁকেছেন তিনি। বাবার চাকরি সূত্রে নানা জেলা ও মহকুমা শহরে থাকতে হয়েছে তাঁকে। দীর্ঘকাল কাটিয়ে গেছেন এই ঢাকা শহরে। এই শহরের মহানগর হওয়ার বৃত্তান্তও তিনি জানেন। তবু তাঁর ক্যানভাসে শহর নেই। তিনি কি নগরকে ভালবাসতে পারেননি! নগরে বাস করেও সিংহভাগ প্রতিভা নগরকে হৃদয়ে ঠাঁই দেয় না। তাদের স্বস্তি দেয় না শহর। কিন্তু শহরেই তো সবচেয়ে বেশি জীবনের স্রোত। কিন্তু শিল্পীরা ভালবাসে নিসর্গলগ্ন জীবনের রূপ। কলকাতার মতো মহানগর দেখে এবং পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত নগর ঘুরেও একজন রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর।’ প্যারিস শহর যখন তৃতীয় নেপোলিয়নের পরিকল্পনায় সবচেয়ে রঙিনভাবে সাজতে শুরু করেছে তখন বাস্তববাদী শিল্পীরা সুখের খোঁজে গ্রামে পাড়ি জমিয়েছেন। ইস্পেশনিস্ট শিল্পীরা নগরে বাস করলেও রঙিন প্রকৃতি ছিল তাদের ধ্যানের প্রধান বিষয়। কেন চোখের কাছের বাস্তবতা আঁকায় মন শায় দেয় না? কেন জয়নুল, কামরুল, সুলতান ও একজন কাইয়ুম চৌধুরী নগরে বাস করে গ্রামীণ জীবন ভালবাসেন এবং সেখানেই ঘুরে ফিরে খুঁজে পান জন্মভূমিকে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে জ্ঞান-বিদ্যার প-িতেরা অনেক তত্ত্ব ও অনুমান উপস্থাপন করেছেন। তাদের ধারণায় মানুষ মূলত বেঁচে থাকে হৃদয়ের গভীরে। সেখানে আদিম আত্মীয়রা তাঁর কথা বলে। পূর্বপুরুষের রক্তের স্পন্দন তাঁকে নিসর্গের নিরালা নীড়ের সন্ধান করতে বলে। কেননা সেখানে মানুষ প্রতিদিনের সূর্যের সঙ্গে কথা বলেছে। সেখানে চাঁদের আলো পান করে তারা তৃপ্ত হয়েছে। যেখানে গাছপালা আর পুশু-পাখির সঙ্গে পরমাত্মীয়ের মতো মানুষ কথা বিনিময় করেছে। ওই আপন সময়টা, ওই অমল বন্ধুতার পরিবেশটা তাঁকে মানবিকতার দর্শনে স্নিগ্ধ করেছে। প্রকৃতি ও মানুষের মিতালিতে যে স্নিগ্ধ জীবনের বোধ জন্ম নেয় তার কাছে তুলি-কলম হাতে আজন্ম নতজানু বসেছিলেন শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী।

পশ্চিমের জীবনভাবনা, শিল্পবোধ ও শিল্পভাষা তিনি কখনও মেনে নেননি। একাডেমি তাঁকে শিখিয়েছিল পশ্চিমের শিল্পভাষা। এ ভাষা বৈজ্ঞানিক। এতে পরিপ্রেক্ষিত আছে এবং বস্তুর প্রামাণিক রূপ ফুটে ওঠে আলো-ছায়ার দোলাচলে। এতে দ্বিমাত্রিকপটে জন্ম নেয় ত্রিমাত্রার বিভ্রম। এ ভাষা জন্ম নিয়েছিল ইতালির রেনেসায়। রেনেসা মানে নতুন জন্ম। কিন্তু এ ভাষায় ভর করে কাইয়ুম চৌধুরী নবজন্ম লাভ করেননি। তিনি তাকিয়েছেন স্বদেশ বাংলাদেশের দিকে। আত্মপ্রতিকৃতি দেখেছেন বাংলার জলের দর্পণে। বাংলার মাটি আর বাংলার জল তাঁর চেতনাকে পূতপবিত্র হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। গভীর অভিনিবেশে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন আত্মজাগৃতির কেন্দ্র রোম নয়- স্বদেশ বাংলাদেশ। পশ্চিম এদেশের নাম জানে না। তাতে বাংলার শিল্প জয়নুল কামরুল-কাইয়ুমের কিছু আসে যায় না। তারা নিবিড় ধ্যানে জেনেছেন এই সত্য যে এখানে জীবনযাপন করে তাদের পূর্বপরুষেরা ফসলের মতো ফলিয়েছেন অজস্র সোনালি শিল্প। এখানে প্রতিটি গ্রামে কৃষির কৃষ্টিতে সৃজনী আয়োজন আছে। এখানে জল ও জালের সমাচারে রেখার রহস্যকে নিরন্তর পাঠ করা যায়। এখানে প্রতিটি জনপদে বাউল একতারা হাতে গান গায়। মানবজীবনের মর্মবাণী সম্প্রচার করে। এখানেই কর্মের মধ্যে সংস্কৃতি-চারুশিল্পী তালপাতা বলে আমি পাখা হব। নরম মাটি হাতের তালুর স্পর্শে তৈজসপত্র হয়ে যায়। লক্ষ্মীমন্ত মেয়েটি জেনে যায় তার নরম পায়ের স্পর্শের অপেক্ষায় আছে টসটসে লাল পুঁইয়ের ফল। এই লোজক জীবন দেখে পশ্চিমের ভাষাকে কাইয়ুম উপেক্ষা করেন। আমরা তার ছবির রেখার দিকে তাকালে বুঝে যাই এ রেখারাশি তো লতাবীথিময় আমার প্রকৃতিতেই ঝুলছে। তার জলের ধারার মতো বর্ণলহরি বলে দেয় গ্রীষ্মম-লীর দেশের বিকাশমান প্রকৃতির সচলতাই সচল রাখে তার সৃজনচৈতন্য।

স্বদেশ মানে উজ্জ্বল রং। প্রাথমিক রং লাল-হলুদ- নীল তাদের সবটুকু হাসি ফুটিয়ে তোলে সবুজ বনানির প্রেক্ষাপটে। ওই রঙের মধ্যে আমরা দেখি কলসি কাঁখে নারী, লাল গামছা মাথায় বেঁধে কৃষকের হাসি, মোষের পিঠে রাখাল ছেলে। চিরকালের এই বাংলাই শুধু কাইয়ুমের বিষয় নয়। সেই উনিশ শ’ উনসত্তর থেকে তিনি প্রতিবাদ করে আসছেন। অনেক মানুষের উত্তোলিত মুষ্ঠিবদ্ধ হতে নয়, গাছের শাখা-প্রশাখা পাখ-পাখালি সব কিছুই উঁচিয়ে এঁকে শিল্পী জানিয়ে দিতে চেয়েছিল যে, বাংলার নিসর্গ দুঃশাসনকে রুখে দিতে চাচ্ছে। কলাপাতা প্লাকার্ডের মতো উত্তেলিত হয়ে বলছে ‘মানি না মানি না’। এভাবে লোকদর্শনে স্নিগ্ধ হয়ে লোককলার মধ্যে নন্দনসূত্র পেয়ে বাংলাদেশকে প্রতিবাদী রূপ দিয়েছেন এবং একাত্তরে ধর্ষিত বাংলাকেও এঁকেছেন শিল্পী।

কাইয়ুম চৌধুরী মূলত আশাজাগানিয়া শিল্পবোধের শিল্পী। প্রবহমান গ্রামবাংলার জীবন দেখে তিনি শিল্পমুদ্রা সঞ্চয় করেছেন। তাঁর অভিজ্ঞ চোখ সীমিত অনুষঙ্গে বাংলার রূপকে বিধৃত করতে পেরেছে। আমাদের প্রকাশনা শিল্পের সবচেয়ে’ বড় শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। তাঁর আঁকা বইয়ের প্রচ্ছদ ও বইয়ের অলঙ্করণ ও অঙ্গসজ্জা মূল্যায়নের জন্য গবেষণা প্রয়োজন। যত ইলাসট্রেশন তিনি করেছেন তত আর কেউ করেননি। যত বইকে তিনি শিল্পম-িত করেছেন তত আর কেউ করতে পারেননি। বাংলাভাষার অক্ষর লিপির যে নতুন শ্রী ছাদ তিনি আবিষ্কার করেছেন তা অন্য কোন শিল্পীর পক্ষে করা সম্ভব হয়নি। এ কাজ সত্যজিৎ রায় করেছেন গভীর নিষ্ঠায়। সংখ্যায় ও বৈচিত্র্যে কাইয়ুম সত্যজিৎকে ছাড়িয়ে গেছেন। অবশ্য সত্যজিতের ভুবন তো শুধু ছিল চারুশিল্প।

কাইয়ুমের শিল্পীত হাত পরাস্ত করেছে প্রিন্টিংয়ের কম্পিউটার প্রযুক্তি। বাংলা বর্ণমালাকে রাগ-রাগিণীর মতো ললিত ভঙ্গিতে প্রকাশ করতে জানে না প্রযুক্তি। কাইয়ুমের তুলি-কলমই শুধু জানত কীভাবে দেশরাগের আবহে ললিত বিস্তার লাভ করে বাংলা মায়ের বর্ণমালা। মাতৃভাষা আর স্বদেশ মায়ের সমান জ্ঞান করলেই এ রকম সৃষ্টি সম্ভব।

প্রকাশিত : ৬ ডিসেম্বর ২০১৪

০৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: