মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

১১ অভিযোগের দশটিই প্রমাণিত ॥ খোকন রাজাকারের ফাঁসি

প্রকাশিত : ১৪ নভেম্বর ২০১৪

বিকাশ দত্ত ॥ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা,গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটের অভিযোগে ফরিদপুরের নগরকান্দা পৌর মেয়র ও পৌর বিএনপির সহ-সভাপতি পলাতক জাহিদ হোসেন খোকন ওরফে খোকন রাজাকারকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- প্রদান করেছে ট্রাইব্যুনাল। খোকনের বিরুদ্ধে আনা ১১টি অভিযোগের মধ্যে ১০টি অভিযোগ প্রমাণিত। এর মধ্যে ছয়টি অভিযোগে মৃত্যুদ- ও চারটি অভিযোগে ৪০ বছর কারাদ- প্রদান করেছে। একটি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেয়া হয়েছে। চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ বৃহস্পতিবার এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। ট্রাইব্যুনালে অন্য দু’সদস্য ছিলেন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক। এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পঞ্চম রায় । আর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ১২ তম রায়। প্রসিকিউশন পক্ষ ও তদন্ত সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, নগরকান্দা পৌরসভার মেয়র হিসেবে শপথ নেয়ার পরপরই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান খোকন রাজাকার । সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী তিনি সুইডেনে বহাল তবিয়তে অবস্থান করছেন।

এর আগে, উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ১৭ এপ্রিল মামলার রায় অপেক্ষমাণ রাখা হয়। খোকন রাজাকারের বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ধর্মান্তরিতকরণসহ ১১টি অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে ৫, ৬, ৭, ৮, ৯ ও ১০ নম্বর অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। এছাড়া ২নং অভিযোগে ৫ বছর, ৩নং অভিযোগে ১০ বছর, ৪নং অভিযোগে ২০ ও ১১নং অভিযোগে ৫ বছর কারাদ- প্রদান করা হয়। তার বিরুদ্ধে আনা ১নং অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। সে জন্য এই অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়েছে।

রায় ঘোষণার পর প্রসিকিউশন পক্ষের প্রসিকিউটর মোখলেসুর রহমান বাদল সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, জাহিদ হোসেন খোকনের বিরুদ্ধে আমরা অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছিলাম। আদালত সেটা আমলে নিয়ে এ রায় প্রদানের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে। অন্যদিকে রাষ্ট্র থেকে নিযুক্ত খোকনের পক্ষের আইনজীবী আব্দুস শুকুর খান তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আমার মক্কেলের প্রতি অবিচার করা হয়েছে। আমরা ন্যায়বিচার পাইনি। ‘এ সময় রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করা হবে কিনা’ জানতে চাইলে তিনি বলেন, জাহিদ হোসেন খোকন পলাতক আছে। নিয়ম অনুযায়ী তাকে নিজে হাজির হয়ে আপীল করতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম,তারা সহযোগিতা করেনি। সহযোগিতা করলে এ ধরনের রায় হয়ত হতো না।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল খোকন রাজাকার নিয়ে এ পর্যন্ত চার পলাতক আসামির বিরুদ্ধে মামলার রায় ঘোষণা করেছে। এর আগে যে সমস্ত পলাতক আসামির বিরুদ্ধে মামলার রায় প্রদান করা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন বাচ্চু রাজাকার হিসেবে পরিচিত আবুল কালাম আজাদ, চৌধুরী মাঈনুদ্দিন এবং মোঃ আশরাফুজ্জামান খান।

ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম ॥ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ট্রাইব্যুনাল অঙ্গনে সাংবাদিক,আইনজীবী,আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যগণ আসতে থাকেন। তবে অন্যান্য মামলার তুলনায় এই সংখ্যা ছিল কম। সকালে চেয়ারম্যান এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এজলাসে এসে আসন গ্রহণ করেন। প্রথমেই চেয়ারম্যান সূচনা বক্তব্য দেন। এর পর ট্রাইব্যুনালের সদস্য বিচারপতি আনোয়ারুল হক সকাল ১১টা ৪ মিনিটে মামলার কি পয়েন্টের ওপর অংশবিশেষ পড়েন। এর পর সাড়ে ১১টায় বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম রায়ের অভিযোগের ওপর এবং চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ১১টা ৪৫ মিনিটে রায় পড়া শুরু করেন । ১০৯ পৃষ্ঠার রায়ে সংক্ষিপ্তসার পড়া হয় ১৪ পৃষ্ঠার। দ- প্রদান করার পর রায়ে বলা হয়, এই রায়ের বিরুদ্ধে আসামি হাজির হয়ে ৩০ দিনের মধ্যে উচ্চ আদালতে আপীল করতে পারবেন। পাশাপাশি আসামিকে গ্রেফতারের পদক্ষেপ নিতে আইজিপি এবং ঢাকা ও ফরিদপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশ দিয়েছেন।

যে অভিযোগে মৃত্যুদ- ॥ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ খোকন রাজাকারের বিরুদ্ধে ৫, ৬, ৭, ৮, ৯ ও ১০ নং চার্জে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- প্রদান করেছে। চার্জ-৫এ লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ,হত্যা, গণহত্যা,নিপীড়ন,জখম, আটক করা প্রমাণিত হয়। ১৯৭১ সালের ৩০ মে সকাল অনুমান ৮টার দিকে ফরিদপুর জেলাধীন নগরকান্দা থানার অন্তর্গত নগরকান্দা গ্রামের জাহিদ হাসান খোকন তার রাজাকার বাহিনী নিয়ে কোদালিয়া শহীদনগর গ্রামে প্রবেশ করে। এ সময় পাকিস্তানী আর্মিরা গ্রামের অনেক বাড়িঘরে লুটপাট চালায়। ভেলুরভিটা জঙ্গল থেকে প্রায় ৫০/৬০ জনকে এক জায়গায় আত্মগোপন থাকা অবস্থায় জাহিদ হাসান খোকন ও পাকিস্তানী সেনারা তাদের ধরে আনে। আটকদের তিন ভাগে ভাগ করে লাইনে দাঁড় করায়। এক পর্যায়ে খোকন রাজাকার ও তার সঙ্গীরা গুলি ও ব্রাশ ফায়ার করে। এতে ১৬ নারী ও শিশু নিহত হয়।

চার্জ-৬ এ হত্যা, গণহত্যা ও গুরুতর জখম,অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠন প্রমািণত। ১৯৭১ সালের ৩০ মে অনুমান দেড়টার সময় সশস্ত্র রাজাকার জাহিদ হোসেন খোকনের নেতৃত্বে আতাহার ও আয়নাল রাজাকারসহ সঙ্গীয় অন্য রাজাকাররা ঈশ্বরদী গ্রামে প্রবেশ করে। এ সময় তাদের সঙ্গে পাকিস্তানী আর্মি ছিল। তারা অনেক বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। গ্রামের লোকজন পাণভয়ে ছোটাছুটি করতে থাকলে রাজাকার খোকন এবং পাকিস্তানী আর্মিরা পলায়নরত সালাম মাতুব্বর,শ্রীমতি খাতুন, লাল মিয়া, আঃ মাজেদ এই চারজনকে উত্তর মাঠ নামক স্থানে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে।

চার্জ-৭ এ হত্যা, গণহত্যা,অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠন প্রমাণিত। ১৯৭১ সালের ৩১ মে সকাল অনুমান সাড়ে সাতটার দিকে খোকন রাজাকারের নেতৃত্বে সশস্ত্র রাজাকাররা পাকিস্তানী সৈন্যদের নিয়ে শহীদনগর কোদালিয়া গ্রামের পাশে দিঘলিয়া-ঘোড়ামারা বিলে আসে। এ সময় রাজাকাররা অসুস্থ পিজিরের বসতঘরসহ তার ঘরের পার্শ্ববর্তী তার ভাই আফাজ এবং তাদের বাড়ির পার্শ্ববর্তী সাদেকের বসতঘর পুড়িয়ে দেয়। খোকন রাজাকাররা আছির উদ্দিন মাতুব্বরকে গুলি করে হত্যা করে। ইদ্রিস সদ্দারের পিতা সফিজউদ্দিনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

চার্জ-৮এ হত্যা-গণহত্যা,লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৭১ সালের ৩১ মে অনুমান দেড়টায় সময় সশস্ত্র রাজাকার জাহিদ হোসেন খোকনের নেতৃত্বাধীন তার সঙ্গীয় আয়নাল রাজাকারসহ অন্যরা একদল পাকিস্তানী আর্মিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষের লোকজন, আওয়ামী লীগের কর্মীসমর্থক,হিন্দুদের নির্মূল করার জন্য পশ্চিম দিক দিয়ে গোয়ালদী গ্রামে প্রবেশ করে। ভয়ে নিরীহ জনগণ পালানোর জন্য ছোটাছুটি করে। পলায়নরত বৃদ্ধ রাজেন্দ্রনাথ রায়কে গুলি করে হত্যা করা হয়।

চার্জ-৯ এ হত্যা, গণহত্যা, লুণ্ঠন ও ্অগ্নিসংযোগ প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৭১ সালের ৩১ মে বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে সশস্ত্র রাজাকার জাহিদ হোসেন খোকেনের নেতৃত্বে তার সঙ্গীয় আতাহার,আয়নাল রাজাকারসহ অন্য রাজাকাররা একদল পাকিস্তানী সৈন্যকে নিয়ে উত্তর দিক দিয়ে পুড়াপাড়া গ্রামে প্রবেশ করে। তারা এক পর্যায়ে রতন শেখ, বারেক মোল্লা,ছোট খাতুন, সফিজউদ্দিন শেখসহ ৬ জনকে গুলি করে হত্যা করে।

চার্জ-১০এ হত্যা, গণহত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৭১ সালের ১ জুন সকাল অনুমান ৬টার দিকে জাহিদ হোসেন খোকন বাগাট চুড়িয়ারচর গ্রামে প্রবেশ করে। তারা ফজলুল হকের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া অনেকের বািড়ঘরে লুটপাট চালায় । এছাড়া গ্রামের পশ্চিম পাড়ার দক্ষিণ মাঠের মধ্যে পলায়নরত অবস্থায় রত্তন মাতুব্বর, আইয়ুব, মজ্ঞু রানীসহ ১০/১৫ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

যে অভিযোগে ৪০ বছরের দ- ॥ চার্জ-২ এ হত্যা, লুণ্ঠন,ধমান্তরিত করার অভিযোগ প্রমাণিত। এ ই অভিযোগ ট্রাইব্যুনাল আসামিকে ৫ বছরের কারাদ- প্রদান করেছে।

চার্জ-৩ এ হিন্দুদের ধরে হত্যাসহ নানবিধ ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক বাধ্য করে ধর্মান্তরিতকরণ অভিযোগ প্রমাণিত। এই অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল আসামিকে ১০ বছরের কারাদ- প্রদান করেছে। ১৯৭১ সালের ১৬ মে থেকে ২৮ মে যে কোন দিন সকালের দিকে আসামি সশস্ত্র রাজাকার জাহিদ হোসেন খোকন ওরফে খোকন মাতুব্বর ও তার আপন বড় ভাই জাফরের নেতৃত্বে তাদের সঙ্গীয় আয়নালসহ অন্য রাজাকাররা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে একজন অজ্ঞাত মৌলভীসহ জীবন দাশের বাড়িতে আসে এবং তাদের ধরে । জীবন দাশসহ তার চার ভাইকে জোরপূর্বক মুসলমান বানায়। এবং তাদের মুসলিম নাম দেয়া হয়। এর পর চার ভাইয়ের স্ত্রীদের হাতের শাখা ভাঙ্গিয়ে সিঁথির সিঁদুর মুছে মৌলভী দ্বারা কলেমা পড়িয়ে ধর্মান্তরিত করে। এর পরে জীবন দাশসহ তার ভাইয়েরা প্রাণভয়ে ভারতে চলে যায়, পরবর্তীতে তারা আবার হিন্দু ধর্মে ফিরে আসে। দেশ স্বাধীন হবার পর সন্তোষ দাশ (খবির চৌধুরী) ও তার স্ত্রী কমলা রানী দাস (আমেনা বেগম) পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায় ও হিন্দু আচার-অনুষ্ঠান পালন অব্যাহত রাখে।

চার্জ-৪ এ লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ,মন্দিরসহ বসতবাড়ি ধ্বংস করা,ে জার করে ধর্ষণ করার অভিযোগটি প্রমাণিত। এই অভিযোগে আসামিকে ২০ বছরের কারাদ- প্রদান করা হয়েছে। ১৯৭১ সালের ২৭ মে নগরকান্দা থানার রাজাকার জাহিদ হোসেন খোকন ও তার আপন ভাই রাজাকার জাফরদের নেতৃত্বাধীন অন্য রাজাকাররা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সকাল অনুমান নয়টার দিকে চাঁদহাট গ্রামের হিন্দু এলাকা বণিক পাড়ায় প্রবেশ করে। রাজাকারদের গ্রামে প্রবেশ করতে দেখে গ্রামের মানুষ এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। জাহিদ হোসেন খোকন ভিকটিম জগন্নাথ দত্তের বাড়িতে প্রবেশ করে। পলায়নরত জগন্নাথ দত্তের পিতা ভুবন মোহন দত্ত,ভুবন মোহন দত্তের ভাইদের সহ ১৬/১৭ জনকে ধরে। এ সময় ভয়ভীতি দেখিয়ে জগন্নাথ দত্তের কাকি সুচিত্রা দত্তের (বর্তমানে মৃত) নিকট থেকে ৪২ ভরি স্বর্ণালঙ্কার,৩২৮ ভরি রুপার অলঙ্কার, রেডিও ও ঘড়ি ছিনিয়ে নেয়। ভিকটিম জগন্নাথ দত্তের বসতঘর ও মন্দিরে লুটপাট চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। চাঁদহাট গ্রামের বণিকপাড়ায় আসামি খোকন রাজাকার ঠাকুর দাশের স্ত্রী রাধা রানীকে ধর্ষণ করে। একইভাবে মৃত হলধর দের অবিবাহিত কন্যা খুকুমনিকেও জাহিদ খোকন ধর্ষণ করে। পরবর্তীতে ধর্ষিতারা তাদের পরিবারপরিজনসহ ভারতে চরে যায়।

চার্জ-১১এ আটক ও হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করে গুরুতর জখম করা এবং দেশ ত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগটি প্রমাণিত। এই অভিযোগে আসামিকে ৫ বছরের কারাদ- প্রদান করা হয়েছে।

মামলার কার্যক্রম ॥ খোকান রাজাকারের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয় ২০১২ সালের ১২ এপ্রিল। তদন্ত শেষ হয় ২০১৩ সালের ২৮মে। তদন্ত সংস্থা দীর্ঘ তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে ১৩টি অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন শাখায়। ২০১৩ সালের ১৮জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল খোকন রাজাকারের অভিযোগ আমলে নেন।

আসামিকে হাজির হবার জন্য একই বছরের ৩০জুলাই দৈনিক জনকণ্ঠসহ দুটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। আসামি হাজির না হওয়ায় তার অনুপস্থিতিতেই ২০১৩ সালে ১৪আগস্ট খোকন রাজাকারের বিচার শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী নিয়োগ। ২০১৩ সালের ৯ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল খোকান রাজাকারের বিরুদ্ধে ১১টি চার্জ গঠন করে। ১৯ নবেম্বর তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। ২০১৪ সালের ২ এপ্রিল খোকন রাজাকারের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয় । চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল থেকে যুক্তিতর্ক শুরু হয়। যুক্তিতর্ক শেষে ১৭ এপ্রিল রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়।

দ্বাদশ রায় ॥ বিএনপির পলাতক মেয়র জাহিদ হোসেন খোকন ওরফে খোকন রাজাকারের বিরুদ্ধে রায়টি হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দ্বাদশ রায়। এর আগে দুটি ্ট্রাইব্যুনাল আরও ১১টি রায় প্রদান করেছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ পাঁচটি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ সাতটি রায় প্রদান করেছে। রায়গুলোর মধ্যে রয়েছেÑ বাচ্চু রাজাকার হিসেবে পরিচিত আবুল কালাম আজাদ (মৃত্যুদ-), কাদের মোল্লা (আমৃত্যু কারাদ- (আপীলে মৃত্যুদ-,পরবর্তীতে রায় কার্যকর), দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (মৃত্যুদ-) আপীলে আমৃত্যু কারাদ-, মোহাম্মদ কামারুজ্জামান (মৃত্যুদ- ) আপীল বিভাগেও মৃত্যুদ- বহাল, গোলাম আযম (৯০ বছরের কারাদ-) অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ, আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ (মৃত্যুদ- ), সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (মৃত্যুদ-), আব্দুল আলীম (আমৃত্যু কারাদ-)অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ , চৌধুরী মাঈনুদ্দিন এবং চীফ মোঃ আশরাফুজ্জামান খান( মৃত্যুদ-), মতিউর রহমান নিজামী (মৃত্যুদ-), মীর কাশেম আলী (মৃত্যুদ-) ।

দুটি ট্রাইব্যুনালে তিনটি সিএভি ॥ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২ তিন মামলা রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়েছে। সিএভিকৃত মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতীয় পাটির নেতা সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার,আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত মোঃ মোবারক হোসেন ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলাম।

ন্যায় বিচার পেয়েছি ॥ রায় ঘোষণার পর এই মামলার সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটর মোখলেসুর রহমান বাদল জনকণ্ঠকে বলেছেন,আমরা রায়ে ন্যায় বিচার পেয়েছি। জাহিদ হোসেন খোকন ওরফে খোকন রাজাকারের অপরাধ এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, তার হাত থেকে শিশু, বৃদ্ধ, নারী কেউই রক্ষা পায়নি। তার অপরাধের নৃশংসতা সভ্যতার জঘন্যতম নৃশংসতাকেও হার মানিয়েছে। তিনি নিজেকে রাজাকার বলতে গর্ববোধ করতেন। সাক্ষীর মাধ্যমে আমরা তার অভিযোগগুলো প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। যারা সাক্ষী দিয়েছেন তারা বেশিরভাগই ভিক্টিম পরিবারের সদস্য।

প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম বলেন, আমরা এ রায়ে খুশি। খোকন রাজাকার জামায়াতের লোক ছিল। আমাদের কাছে তথ্য আছে সে ইউরোপের কোন একটি দেশে অবস্থান করছে। ওই সব দেশে আইনগত ভিন্নতা থাকায় তাদের হস্তান্তর করছে না সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার। ফলে ফাঁসির দ-প্রাপ্ত আসামি মঈনুদ্দিনকেও দেশে আনা সম্ভব হচ্ছে না। ওই দেশের সরকার বলে ফাঁসির আদেশ কমিয়ে দিলে আসামিকে দেশে ফেরত পাঠাবে। অন্যথায় নয়।

ন্যায় বিচার পাইনি ॥ অন্যদিকে রাষ্ট্র নিযুক্ত আসামি পক্ষের আইনজীবী আব্দুস শুকুর খান বলেছেন, এ রায়ে আমরা ন্যায় বিচার পাইনি। অপরাধ সংঘটনের সময় জাহিদ হোসেনের সঙ্গে অন্য রাজাকাররাও সম্পৃক্ত ছিল। কিন্তু এখানে শুধু জাহিদ হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়নি। মামলার তদন্তেও আসামি করার ক্ষেত্রে ত্রুটি রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

নিরাপত্তা ব্যাবস্থা জোরদার ॥ বিএনপি নেতা জাহিদ হোসেন খোকন ওরফে খোকন রাজাকারের রায়কে ঘিরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। অন্যান্য রায়ের মতোই ট্রাইব্যুনালের প্রধান ফটকে আইডি কার্ড নিয়ে প্রথমে চেকিং করে ট্রাইব্যুনাল এলাকায় প্রবেশ করতে দেয়া হয়।

কে এই খোকন রাজাকার ॥ জাহিদ হোসেন খোকন ওরফে এম এ জাহিদ হোসেন খোকন ওরফে খোকন মাতুব্বর ওরফে খোকন রাজাকার নগরকান্দার একজন মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। তার পিতার নাম আব্দুল মোতালেব মিয়া ওরফে মোতালেব মাতুব্বর ওরফে মোতালেব দফাদার। সাং-নগরকান্দা,নগরকান্দা পৌরসভা, থানা-নগরকান্দা,জেলা-ফরিদপুর। ১৯৭০-৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর নেতা ছিলেন। তার নেতৃত্বে নগরকান্দায় রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়।

পরবর্তীতে খোকন রাজাকার বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হয়। বর্তমানে নগরকান্দা পৌরসভার মেয়র। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্ত শুরু হবার পর থেকেই তিনি দেশ থেকে পালিয়ে যান। সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, খোকন রাজাকারের ছেলে লিনকন, মেয়ে সামছুন্নাহার বেগম ও জামাতা মোঃ বদিউজ্জামান শেখ সুইডেনে বসবাস করছেন ।

প্রকাশিত : ১৪ নভেম্বর ২০১৪

১৪/১১/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: