কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিএসইসি ভবনে ফের অগ্নিকাণ্ড

প্রকাশিত : ১ নভেম্বর ২০১৪
  • কেউ হতাহত হয়নি, ১১ তলা থেকে সূত্রপাত

স্টাফ রিপোর্টার ॥ আবারও রাজধানীর কাওরানবাজার বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল অধিদফতর (বিএসইসি) ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটেছে। অগ্নিকা-ের সময় বেশকিছু মানুষ ভবনে আটকা পড়লেও কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তাদের নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। প্রায় আড়াই ঘণ্টার চেষ্টায় ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

এসার তলা ভবনটির শেষ তলায় থাকা দৈনিক আমার দেশ পত্রিকা অফিসে আগুন লাগে। আগুনে বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়। এমন ঘটনায় আমার দেশ পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ, ভবনটিতে অবস্থিত বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভি ছয় ঘণ্টা পর সম্প্রচার চালু করে। কিন্তু রাত আটটা পর্যন্ত আরটিভি সম্প্রচার চালু করতে পারেনি। তবে দ্রুত চালুর চেষ্টা চলছে। অগ্নিকা-ের ঘটনাটি রহস্যময় ও পরিকল্পিত নাশকতা বলে সংবাদ মাধ্যম তিনটির তরফ থেকে দাবি করা হয়েছে। তবে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও ঘটনার সময় বৈদ্যুতিক কাজ করা আমার দেশ পত্রিকার বিদ্যুত বিভাগের এক কর্মকর্তা ও ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তাদের ধারণা, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকেই অগ্নিকা-ের ঘটনাটি ঘটার সম্ভবনা সবচেয়ে বেশি। ঘটনা তদন্তে বিএসইসি কর্তৃপক্ষ ও ফায়ার সার্ভিসের তরফ থেকে ৫ সদস্যবিশিষ্ট পৃথক দুইটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি শুক্রবার থেকেই তদন্ত শুরু করেছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী আমির হোসেন আমু ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং এ ব্যাপারে সার্বিক পর্যালোচনা চলছে বলে সাংবাদিকদের জানান। মন্ত্রী ছাড়াও ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান, বিএসইসির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী ইমতিয়াজ হোসেন চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট উর্ধতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

শুক্রবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে রাজধানীর কাওরানবাজার কাজী নজরুল ইসলাম এ্যাভিনিউয়ের ১০২ নম্বর ১১ তলা বিএসইসি ভবনের এসার তলায় আগুন লাগে। এসার তলায় দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার অফিসের স্টোররুম থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে আমার দেশ পত্রিকার বিদ্যুত বিভাগের কর্মকর্তা ও ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ধারণা। তাদের ধারণা বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট হয়ে ফ্লোরে আগুন লাগতে পারে। ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিট প্রায় আড়াই ঘণ্টার চেষ্টায় দুপুর দুইটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

জানা গেছে, ভবনটিতে বহু অফিস রয়েছে। হিরো হোন্ডা, এটলাস বাংলাদেশ লিমিটেড, বিএসইসি অফিস, এবি (আরব বাংলাদেশ) ব্যাংক, বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভি, আরটিভি ছাড়াও ভবনটির এসার তলায় দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার অফিস। পত্রিকাটির অনলাইন সংস্করণ বের হচ্ছিল। ফ্লোরটি বিএসইসি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে অফিস স্থাপন করেছিল আমার দেশ। পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভাড়ার মোটা অঙ্কের টাকা বাকি পড়ে। এ নিয়ে দেনদরবার চলছিল। গত সেপ্টেম্বরেই আমার দেশ পত্রিকার অফিস স্থানান্তরের কথা ছিল। কিন্তু বকেয়া পরিশোধ করতে না পারায় দেরি হয়। তারপরও অফিসের আসবাবপত্র গোছগাছের কাজ চলছিল। ১৫ দিন আগে আমার দেশ পত্রিকার ৩৫টি এসিসহ বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি খোলা হয়। মাত্র ৮টি এসি ভবনটির নিচ তলায় নামানো হয়েছিল। বাকিগুলো উপরেই ছিল। তবে এসব এসিতে কোন বৈদ্যুতিক সংযোগ ছিল না।

গত ২২ অক্টোবর আমার দেশ পত্রিকার যাবতীয় মালামাল সরিয়ে নেয়ার কথা ছিল। পত্রিকাটির অনলাইন সংস্করণের অফিসের জন্য রাজধানীর গুলশান নিকেতনের ১ নম্বর সড়কের এ ব্লকের ৩৯/এ নম্বর বাড়ির একটি ফ্লোর ভাড়া করা হয়েছে।

নবেম্বর মাস থেকেই সেখানেই অফিস চালু করার কথা ছিল। বন্ধ থাকা দৈনিক আমার দেশের নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পত্রিকা অফিসটির জায়গা বিএসইসি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ভাড়া নেয়া। পত্রিকা বন্ধ হওয়ার কারণে ভাড়া বাবদ বিএসইসি কর্তৃপক্ষের কাছে প্রচুর ঋণ ছিল। গত বৃহস্পতিবার রাতে বিষয়টি বিএসইসি কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা হয়। সমস্ত পাওনা পরিশোধ করে দেয়া হয়েছে। এরপর থেকেই চূড়ান্তভাবে যাবতীয় মালামাল সরানোর কাজ চলছিল। এরইমধ্যে অগ্নিকা-ের ঘটনাটি ঘটে। এটি পরিকল্পিত নাশকতা। আগুন তাদের ১১ বছরের বহু মূল্যবান কাগজপত্র, ডকুমেন্ট ছাড়াও ১১০টি কম্পিউটার ও ৩৫টি এসি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ অন্তত কয়েক কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার। তিনি সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে এর ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।

আমার দেশ পত্রিকার বিদ্যুত বিভাগের কর্মকর্তা আহমদ আলী বলেন, পাওনা মিটানোর পর ভবন থেকে যাবতীয় মালামাল নামানোর কাজ শুরু হয়। সকাল ১০টা থেকে তারা ১০ জন যাবতীয় মালামাল নামানোর কাজ শুরু করেন। এর মধ্যে ৫ জন গুলশান থেকে আসে। আর আমরা ৫ জন আমার দেশ পত্রিকার স্টাফ। গুলশান থেকে আসা ৫ জনকে আমি চিনি না। আমি ছাড়াও আমার দেশ পত্রিকার স্টাফ পারভেজ, স্টোরকিপার মোহসীন, ক্লিনার তরল দাস, পিয়ন আব্বাস আলী ও নিরাপত্তা প্রহরী মাসুদও মালামাল সরানোর কাজে সহযোগিতা করছিল।

বেলা সোয়া ১১টার দিকে ভবনটির পূর্বদিকের কোনার স্টোর রুমের সিলিংয়ের উপরের দিকে শর্টসার্কিটের আওয়াজ শুনি। বিষয়টি তেমন আমলে না নিয়ে আমার কাজ করছিলাম। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই স্টোর রুম থেকে ধেঁাঁয়া বের হতে থাকে। স্টোর রুম তালা দেয়া ছিল। স্টোর রুমের তালা খুলতে খুলতেই মুর্হূতেই ধোঁয়া পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

তারা দ্রুত ভবনে থাকা অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডার থেকে গ্যাস ছাড়তে থাকেন। তারা সবাই মিলে চেষ্টা করেও আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলেন না। এ সময় তারা ফায়ার সার্ভিসে ফোন করে দৌড়ে নিচে নামতে থাকেন। কয়েকজন অবশ্যই লিফট দিয়েই নিচে নেমেছেন। তিনি দৌড়ে নামার সময় ভবনের যেসব ফ্লোরের অফিস খোলা ছিল সেইসব ফ্লোরে চিৎকার করে আগুন লেগেছে বলে জানায়। ওই সময় ভবনটির চতুর্থ তলায় এনটিভির কন্ফারেন্স রুমে স্কীল ডেভেলপমেন্ট নামের একটি ওয়ার্কশপ চলছিল। দ্বিতীয় সেশনে দৈনিক মানব জমিন পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর বক্তব্য দেয়ার কথা ছিল। এমন খবর শুনে সবাই সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নিচে নামেন।

আলী আহমেদের দাবি, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট হয়ে অগ্নিকা-ের ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে। ভবনে কাগজসহ কাঠের জিনিসপত্র থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে যায়। শুক্রবার থাকায় এনটিভি, আরটিভি আর আমার দেশ পত্রিকা ব্যতীত প্রায় সব অফিসই বন্ধ ছিল। সব মিলিয়ে ভবনে প্রায় আড়াইশ’ থেকে তিনশ’ মানুষের অবস্থান ছিল। তবে এসার তলায় মাত্র ১২ থেকে ১৩ জন ছিল।

ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার কর্মীরা জানান, মাত্র ৭ মিনিটের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে হাজির হয়। তারা ভবনের সামনে দুইটি সুউচ্চ মই স্থাপন করে। এ দুইটি মই দিয়ে ২৩ তলা ভবনের ছাদের আগুন পর্যন্ত নেভানো সম্ভব। পাশাপাশি এসব মই দিয়ে সুউচ্চ ভবনে আটকাপড়া মানুষদের উদ্ধার করা হয়ে থাকে। এদের সঙ্গে যোগ দেয় বসুন্ধরা গ্রুপের ফায়ার সার্ভিসের ২৫ জন কর্মী ও তাদের অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি। বেলা সাড়ে ১১টার মধ্যে পুরো এসার তলায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিস ভবনটির চারদিক থেকে ভবনটি পানি ছিটাতে থাকে। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান জানান, ফায়ার সার্ভিস খবর পাওয়ার ৭ মিনিটের মধ্যেই ঘটনাস্থলে হাজির হয়। ২০টি ইউনিট কাজ করে। আগুন লাগার পর স্বাভাবিক কারণেই ভবনের ভেতরের সব বৈদ্যুতিক ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় কর্তৃপক্ষ। এমন পরিস্থিতিতে সার্চ লাইট জ্বালিয়ে অক্সিজেন মাস্ক নিয়ে ফায়ার সার্ভিসের একশ’ উদ্ধারকারী ভবনটিতে অভিযান শুরু করে। ভবনে বেশকিছু লোক আটকা পড়েছিল। তবে এসার তলায় কোন লোক আটকা পড়েনি। বেশির ভাগই ভবনটির নীচতলা থেকে শুরু করে ৮ তলা পর্যন্ত আটকা পড়েছিলেন। এদের প্রায় সবাই ভয়ে আর ধোঁয়ার কারণে বিভিন্ন সিঁড়ির গোড়ায় আটকা ছিলেন। তাদের ফায়ার সার্ভিস আধঘণ্টার মধ্যেই উদ্ধার করেন। কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ভবনটির আগুন এগার তলা থেকে নিচে নামতে পারেনি। কারণ প্রথমেই পানি ছিটিয়ে ১০ তলায় পর্যাপ্ত পানি জমিয়ে দেয়া হয়েছে। পুরো ভবনে ৭টি মোটা পাইপ দিয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি দেয়া হয়। পানি ভবনের বিভিন্ন ফ্লোরে আটকে থাকায় আগুন আর নিচে নামতে পারেনি। তবে ধোঁয়ায় অনেকটাই আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল ভবনটি। পানির ছিটানোর কারণে ভবনের সামনের দিকের কিছু কাঁচ ভেঙ্গে পড়ে। দুপুর ২টায় আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। অগ্নিকা-ের কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরুপণের চেষ্টা চলছে। ভবনটিতে ফায়ার সার্ভিসের প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতির অভাব থাকার বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশনস) মেজর মাহবুবুর রহমান জানান, ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক শেখ মিজানুর রহমানকে প্রধান করে ৫ সদস্যবিশিষ্ট গঠিত তদন্ত কমিটিকে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিএসইসি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী ইমতিয়াজ হোসেন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ২০০৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ৩ জনের মৃত্যুর পর গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশ মোতাবেক ভবনটিতে অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হয়েছে। তারপরও কি কারণে অগ্নিকা-ের ঘটনাটি ঘটতে পারে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনা তদন্তে বিএসইসির পরিচালক (অর্থ) সৈয়দ মোজাম্মেল হককে প্রধান করে ৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে। যে ফ্লোরে আগুন লেগেছে সেই ফ্লোরটি ব্যবহারের উপযোগী কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন বিষয়টি বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষা- নিরীক্ষার পর মতামতের উপর নির্ভর করছে। বেসরকারী এনটিভির চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক আলী ফালু বলেন, ঘটনাটি রহস্যময়। ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঘটনাস্থলে যান। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকদের সান্ত¡না দেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, অগ্নিকা-ের ঘটনাটি রহস্যময়। ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন তিনি।

প্রকাশিত : ১ নভেম্বর ২০১৪

০১/১১/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: