ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯

monarchmart
monarchmart

রুবিনা আর আসবে না সাত ভাই-বোনের মিলনমেলায়

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ২৩:৫৫, ৩ ডিসেম্বর ২০২২

রুবিনা আর আসবে না সাত ভাই-বোনের মিলনমেলায়

রুবিনা আক্তার খান

পাঁচ ভাই, দুই বোনের মধ্যে রুবিনা আক্তার খান রুবি ছিলেন ষষ্ঠ। পাঁচ ভাইয়ের কেউ চাকরি করেন, কেউ ব্যবসা করেন। এ কারণে শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন সবাই ব্যস্ত থাকেন। আর শুক্রবার এলেই সব ভাই-বোন একত্রিত হতেন রাজধানীর হাজারীবাগের বাসায়। সাত ভাই-বোন একত্রে খাওয়া-দাওয়া করতেন, খোশগল্প আড্ডায় মেতে উঠতেন।
পারিবারিক সেই মিলনমেলায় রুবিনা সব সময় উপস্থিত থাকত। এখন থেকে তাকে আর কোনোভাবেই পাওয়া যাবে না, সেই আড্ডায়। সাত ভাই-বোন থেকে একটি সংখ্যা চিরদিনের জন্য আমাদের নাই হয়ে গেল। বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে এভাবে কথাগুলো বলছিলেন প্রাইভেটকারে টেনেহিঁচড়ে পিষে নির্মমভাবে নিহত রুবিনা আক্তারের বড় ভাই জাকির হোসেন মিলন।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গ থেকে মরদেহ নিতে এসে বোনের কথা বলতে বলতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন জাকির হোসেন। মর্গে আসা রুবিনার অন্যান্য ভাই-বোন, স্বজনদের কান্নায়ও এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কে কাকে সান্ত¡না দিবে, সঙ্গে আসা স্বজন, প্রতিবেশী তাদের সান্ত¡না দিতে গিয়ে তারাও শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েন।
গত শুক্রবার বেলা ৩টার দিকে দেবর নুরুল আমিনের মোটরসাইকেলে চড়ে তেজকুনিপাড়ার শ্বশুর বাড়ি থেকে হাজারীবাগে বাবার বাড়িতে যাওয়ার পথে ঢাবির সাবেক শিক্ষকের গাড়ি চাপায় নিহত হন গৃহবধূ রুবিনা আক্তার খান রুবি। এ ঘটনায় শুক্রবার দিবাগত মধ্যরাতে রুবিনার ভাই জাকির হোসেন বাদী হয়ে গাড়ি চালক মোহাম্মদ আজহার জাফর শাহের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মামলা দায়ের করেন। এতে ৯৮ ও ১০৫ ধারায় অভিযোগ করা হয়েছে। মামলায় ঢাবির সাবেক শিক্ষক মোহাম্মদ আজহার জাফর শাহকে গ্রেপ্তার দেখানো হলেও আহত হওয়ার কারণে তাকে শনিবারও আদালতে হাজির করতে পারেনি পুলিশ।
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূর মোহাম্মদ জানান, সড়ক পরিবহন আইনে নিহত রুবিনা আক্তারের ভাই বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। এতে আসামি করা হয়েছে প্রাইভেটকারের চালক ঢাবির সাবেক শিক্ষক মোহাম্মদ আজহার জাফর শাহকে। যিনি ঢাকা মেডিক্যালে চিকিৎসাধীন। সুস্থ হলে তাকে আদালতে হাজির করা হবে।
এদিকে শনিবার বেলা ৩টায় ঢামেক হাসপাতাল মর্গে রুবিনার মরদেহের ময়না তদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে তার মরদেহ পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। ঢামেক মর্গ থেকে রুবিনার মরদেহ প্রথমে নেওয়া হয় ৫৭/২ তেজকুনিপাড়ায় তার শ্বশুর বাড়িতে। সেখান থেকে সন্ধ্যা পাঁচটায় নেওয়া হয় পৈতৃক নিবাস হাজারীবাগের ভাগলপুর লেনের ৩ নম্বর বাসায়। সেখানে আগে থেকে অপেক্ষমাণ ছিল নিহত রুবিনার আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও ছোটবেলার খেলার সাথীরা।

মেইন রোড থেকে সাইরেন বাজিয়ে অ্যাম্বুলেন্স পাড়ায় ঢুকতেই এলাকাবাসীর উপচেপড়া ভিড় জমে সেখানে। এক নজর রুবিনার মরদেহ দেখতে শিশু, বৃদ্ধা থেকে সব বয়সী মানুষ ভিড় করেন। কান্নায় ভেঙে পড়েন তারাও। সে সময় এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ভাগলপুর লেনে রুবিনার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর চোখের জলে তাকে শেষ বিদায় জানায় ভাই, বোন, স্বজন ও এলাকাবাসী। পরে রাতে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয় রুবিনার মরদেহ।     
রুবিনার ভাই জাকির হোসেন বলেন, আমার বোনটা অত্যন্ত সহজ-সরল প্রকৃতির ছিল। আমরা প্রতি শুক্রবার সব ভাই-বোন একত্রিত হয়ে আড্ডা দিতাম। কী যে আনন্দ লাগত আমাদের। এখন থেকে শুক্রবারের আড্ডাখানায় আমার বোনকে আর পাব না। সবকিছু বিষাদে পরিণত হয়েছে। সেই মিলনমেলা, আড্ডাখানা আর হবে না।
রুহানের আর কেউ থাকল না ॥ রুবিনা তার স্বামী মাহবুবুর রহমান খান ডলারের সঙ্গে তেজকুনীপাড়ায় থাকতেন। বছরখানেক আগে তার স্বামী মাহবুবুর রহমান লিভারের রোগে মারা যান। তাদের রুহান নামের ১২ বছরের এক সন্তান রয়েছে। রুহান স্থানীয় একটি স্কুলে ৮ম শ্রেণিতে পড়ে। স্বামী মারা যাওয়ার পর রুবিনা একমাত্র ছেলে রুহানকে নিয়ে স্বামীর নিজস্ব বাড়িতেই বসবাস করে আসছিলেন। রুবিনার বাবা রফিক উল্লাহ মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা যান।
স্বজনরা বলছেন, রুবিনার স্বামী মাহবুবুর রহমানের লিভারের সমস্যা ছিল। লিভারের সমস্যা ও করোনায় আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা গেছেন। মাহবুবুর রহমান মারা যাওয়ার পর মা রুবিনার কাছেই বড় হচ্ছিল একমাত্র ছেলে রুহান। রুবিনাও একমাত্র ছেলেকে নিয়ে বেঁচে থাকতে চেয়েছেন। রুহানের সব আবদার তার মায়ের কাছেই করত। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে রুহানের শেষ অবলম্বন মাকেও হারাতে হয়েছে। তার এখন আর কেউ রইল না।
এদিকে ঘটনার দিন উত্তেজিত জনতার গণধোলাইয়ে আহত ঘাতক গাড়িচালক ও ঢাবির সাবেক শিক্ষক আজহার জাফরকে ঢামেক হাসপাতালের ১০৩ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি রাখা হয়েছে। শনিবার দুপুরে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, পুলিশি পাহারায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি। তার মাথায়, শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখমের চিহ্ন। নৈতিক স্খলনের অভিযোগে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে তার সহকর্মীদের কেউ কেউ বললেও ঢাবি’র প্রক্টর এ কে এম গোলাম রব্বানী জানান, ক্লাসসহ একাডেমিক কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে ২০১৮ সালে আজহার জাফর শাহকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
এরপর থেকে আজহার জাফর বাসায় থাকতেন। গুলশানে তার একটি ফ্ল্যাটও রয়েছে। তবে ঘটনার দিন তিনি কোথায় যাচ্ছিলেন সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। পুলিশ বলছে, আজহার জাফর সুস্থ হওয়ার পর তাকে এসব বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে এবং কোর্টে হাজির করা হবে।
হত্যাকা- বলছে পুলিশ ॥ রুবিনার মৃত্যুর ঘটনায় সড়ক পরিবহন আইনে মামলা নেওয়া হলেও এটিকে ‘হত্যাকা-’ উল্লেখ করেন পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার মো. শহিদুল্লাহ। তিনি বলেন, এটা অবশ্যই একটি হত্যাকা-। আমরা জানতে পেরেছি, নিহত মহিলা দেবরের সঙ্গে বাইকে করে শ্বশুরবাড়ি থেকে তার বাপের বাড়ি হাজারীবাগে যাচ্ছিলেন। পথে শাহবাগ থেকে টিএসসি যাওয়ার সড়কে কাজী নজরুলের মাজারের উল্টোদিকে পৌঁছান, তখন প্রাইভেটকারটি মোটরসাইকেলে ধাক্কা দিলে রুবিনা পড়ে গিয়ে প্রাইভেট কারের সঙ্গে আটকে যান।

এরপরও উনি গাড়িটি না থামিয়ে তাকে টেনেহিঁচড়ে নিতে থাকে। তাকে থামানোর অনেক চেষ্টা করা হয়। উনি টিএসসি পৌঁছালে আমাদের মোবাইল টিমও তাকে থামানোর চেষ্টা করে। তারপরও উনি না থামিয়ে আরও জোরে গাড়ি চালিয়ে নীলক্ষেত মোড়ে গেলে উত্তেজিত জনতা তাকে থামতে বাধ্য করে। এই সম্পূর্ণ সময় সেই নারীটি গাড়ির সঙ্গে ছেঁচড়ে গেছেন। তাই এটিকে হত্যাকা- বলা চলে।

monarchmart
monarchmart