মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা হিমালয়ের বরফ গলে বন্যার আশঙ্কা

প্রকাশিত : ৩ জুলাই ২০১৫
  • জলবায়ু বদলের নেতিবাচক প্রভাব
  • প্রকট হচ্ছে ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাস নদীভাঙ্গন ভূমিধসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ

শাহীন রহমান ॥ অব্যাহত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের ওপর দৃশ্যমান নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন একাধারে সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা সমস্যা, হিমালয়ের বরফ গলে নদীর দিক পরিবর্তন, বন্যা ইত্যাদি সবগুলো দিক দিয়েই দেশে দৃশ্যমান পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এর ক্ষতিকর প্রভাব দিনে দিনে স্পষ্ট হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রাও বেড়ে গেছে বহুগুণে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতির বিচারে বিশ্বের শীর্ষ ১০ ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকার মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশের নাম। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচের ২০১০ সালে প্রকাশিত গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতির বিচারে শীর্ষ দশটি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে প্রথমেই অবস্থান করছে বাংলাদেশের নাম। ১৯৯০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ১৯৩ দেশের ওপর চালানো সমীক্ষায় এ তথ্য উঠে আসে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ততার বিচারে বিশ্বব্যাপী গবেষকরা বাংলাদেশকে ‘পোস্টার চাইল্ড’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকেন।

দেশে অব্যাহত প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা। জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে বৃদ্ধি পেয়েছে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, নদীভাঙন এবং ভূমিধস। আগে ১৫ কিংবা ২০ বছর পরপর বড় ধরনের কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও বর্তমানে ২ থেকে ৩ বছর পরপরই বড় দুর্যোগ হানা দিচ্ছে? ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা ম্যাপলক্র্যাফটের তালিকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ ১৫ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবার আগে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা জার্মান ওয়াচের প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৯৯০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত দেশে বড় ধরনের প্রায় ২৫৪ দুর্যোগ আঘাত হেনেছে।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচীর দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসকরণ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে ঘূর্ণিঝড় সংক্রান্ত ঝুঁকির ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে শীর্ষে দেখানো হয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশে বছরে প্রতি লাখে প্রায় ৩৩ জন মারা যাচ্ছে। আবহাওয়া অধিদফতরের দেয়া তথ্যমতে, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরি ঘূর্ণিঝড়ের পর ১৯৯৫, ’৯৭, ২০০০, ’০১ সালে জলোচ্ছ্বাস ঘূর্ণিঝড় হলেও তা তেমন ক্ষয়ক্ষতি করেনি। ২০০১ থেকে ’০৭ সাল পর্যন্ত বলতে গেলে তেমন কোন ঘূর্ণিঝড়ই হয়নি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনে একদিকে যেমন বাড়ছে এসব জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা, তেমনি বাড়ছে সংখ্যাও। ২০০৭ সালের ১৫ নবেম্বর দেশে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় সিডর। তার মারাত্মক প্রভাব যেতে না যেতেই ২০০৮ সালে ২ মে ধেয়ে আসে ঘূর্ণিঝড় নার্গিস। একই বছর ২৬ অক্টোবর ঘূর্ণিঝড় রেশমি, ১৫ নবেম্বর ঘূর্ণিঝড় খাইমুক, ২৬ নবেম্বর নিসা, ২০০৯ সালে ১৭ এপ্রিল বিজলি এবং ওই বছরই ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলা। সেই আইলা ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষত নিয়ে এখনও মানবেতর জীবন যাপন করছে বিপুলসংখ্যক উপকূলীয় মানুষ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বঙ্গোপসাগর ক্রমেই উত্তাল হয়ে উঠছে। ২০০৮ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে ২০০৯ সালের ১০ নবেম্বর পর্যন্ত সাগরে ছয়টি জলোচ্ছ্বাস ঘূর্ণিঝড় এবং ১০৭ লঘু ও নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের গবেষণা মতে, বাংলাদেশের উপকূলের ১৪ শহর জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় নদ-নদীর পানিপ্রবাহ শুষ্ক মৌসুমে স্বাভাবিক মাত্রায় না থাকায় সমুদ্রের লোনা পানি স্থলভাগের কাছাকাছি চলে আসছে। ফলে লবণাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বিপুল এলাকায়। ইতোমধ্যে দেশের দাকোপসহ দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্র ভূভাগের অনেক ভেতরে পর্যন্ত লোনা পানি ঢুকে পড়েছে। এই সমস্যা উপকূলীয় অঞ্চল থেকে যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, কুমিল্লা পর্যন্ত উত্তর দিকে বিস্তৃত হয়েছে। গবেষণার ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন ১৯৯০ সালে দেশে লবণাক্ত ভূমির পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর। ২০০১ সালে এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর। তাঁদের মতে, কম বৃষ্টির কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার সমস্যা দিনে দিনে আরও প্রকট হয়ে উঠবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত তালিকায় বন্যার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ১২ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম। বাংলাদেশের ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থানের কারণে হিমালয়ের বরফ গলা পানিসহ উজানের নেপাল ও ভারতের বৃষ্টিপাতের পানি, প্রধান প্রধান নদ-নদী হয়ে সমুদ্রে গিয়ে পড়ছে। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১ হাজার ৯৪ বিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ কারণে প্রতিবছরই প্রায় ১৫ লাখ হেক্টর চাষের জমি বন্যা ও জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে থাকে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং গবেষণা তথ্যে ১৯৯৮ সালের বন্যার পর দেশে বন্যাপ্রবণ এলাকার পরিমাণ ১৮ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলের ৩৪ শহর বন্যার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধিতে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক গবেষণা তথ্যমতে, বিংশ শতাব্দীতে সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতা ১০-২০ সেন্টিমিটার বেড়েছে। ইউনেস্কোর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে সমুদ্রস্তরের ৪৫ সেন্টিমিটার উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে সুন্দরবনের ৭৫ শতাংশ ডুবে যেতে পারে। এছাড়া একই কারণে মাছের উৎপাদনের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন ইতোমধ্যে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত মাছ ও মাছের পোনা উৎপাদন একেবারে কমে গেছে। এক হিসাবে দেখানো হয়েছে অতীতে হালদায় ২ হাজার ৫শ’ থেকে ৩ হাজার কেজি পর্যন্ত রুই জাতীয় মাছের ডিম পাওয়া যেত। ৭০-এর দশকেও ডিম উৎপাদন হাজার কেজি ছিল। ২০০৪ সালে তা মাত্র ২০ কেজিতে নেমে আসে। ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে আবহাওয়ার এসব অস্বাভাবিক আচরণে রুই জাতীয় মাছের পোনার উৎপাদন আরও কমে যাবে।

প্রকাশিত : ৩ জুলাই ২০১৫

০৩/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: