কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ধর্ষকের শাস্তি হোক মৃত্যুদণ্ড

প্রকাশিত : ১২ জুন ২০১৫
  • মেধা নম্রতা

বাংলাদেশে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ধর্ষণ। প্রতিদিন দৈনিক পত্রিকার পাতা খুললেই একটি বা দুটি ধর্ষণের খবর দেখতে পাচ্ছে পাঠক। গ্রাম বা শহর, অফিস অথবা বাড়ি, রাস্তা কিম্বা গাড়ি কোথাও নিরাপদ নয় মেয়েরা। শিশু হতে প্রৌঢ়া, বোরখাধারী বা সাধারণ পোশাক পরা যে কোন নারী ধর্ষণ নামের এই সামাজিক ব্যাধির হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। ছোঁয়াচে রোগের মতো ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। আসুন তো দেখি আমরা জেনে নিই, ধর্ষণ বলতে ঠিক কি বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ ধর্ষণ কি?

ধর্ষণ বলতে বোঝায়, ‘বেআইনীভাবে কারও ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর বা শক্তি প্রয়োগ করে অথবা ভয় ভীতি, লোভ দেখিয়ে তার যৌন অঙ্গসমূহকে ব্যবহার করা’। সুতরাং পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, ধর্ষণ এক প্রকার জবরদস্তি বা আগ্রাসন। একই সঙ্গে এটি একটি অপরাধ। কেননা ব্যক্তির ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার শরীরের প্রাইভেট অঙ্গগুলো কেউ বা একাধিক ব্যক্তি ভোগ করছে। ১৯৭৭ সালে ‘আমেরিকান জার্নাল অব সাইক্রিয়াট্রি’তে নিকোলাস গ্রোথ নামের এক গবেষক ধর্ষণ এবং ধর্ষকের প্রকৃতি, আচরণ, উদ্দেশ্য নিয়ে নানা আলোচনা করেন। ধর্ষণ ধর্ষকের একটি হিংস্র আচরণ। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহীত কামাল বলেন, ধর্ষণ হচ্ছে একটি অতর্কিত হামলার মতো,যা কিনা মানুষের শরীরই কেবল নয়, মনকেও অসুস্থ করে তুলতে পারে। গবেষকদের মতে,“জধঢ়ব রং ধ ঃুঢ়ব ড়ভ ংবীঁধষ ধংংধঁষঃ ঁংঁধষষু রহাড়ষারহম ংবীঁধষ রহঃবৎপড়ঁৎংব, যিরপয রং রহরঃরধঃবফ নু ড়হব ড়ৎ সড়ৎব ঢ়বৎংড়হং ধমধরহংঃ ধহড়ঃযবৎ ঢ়বৎংড়হ রিঃযড়ঁঃ ঃযধঃ ঢ়বৎংড়হ’ং পড়হংবহঃ.” অপরাধ বিজ্ঞানীদের ভাষায় ধর্ষণ একটি প্রাচীন সামাজিক অপরাধ। সাধারণত বিজয়ী গোষ্ঠীর পুরুষরা পরাজিত গোষ্ঠীর নারীদের অপমান করার উদ্দেশ্যে তাদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে ধর্ষণ করে। যুদ্ধে অন্যান্য অস্ত্রের মতো ধর্ষণকেও যুদ্ধবাজরা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও ধর্ষণ অস্ত্রের ব্যাপক এবং যথেচ্ছ ব্যবহার হয়েছে।

কিন্তু কেন এই মানসিকতা? এটা কি বিকৃতি নাকি বীরত্ব? নারীকে পুরুষের অলঙ্কার, ইজ্জত, ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করার ফলেই কি ধর্ষণ ঘটছে? সাধারণত কোন প্রতিশোধ নেয়ার জন্য পিতার কন্যাকে, ভাইয়ের বোনকে, স্বামীর স্ত্রীকে, সন্তানের মাকে, জাতির নারী শক্তিকে ধর্ষণ করা হয়। অপরদিকে সামাজিক স্থিতিশীল পরিবেশে ঘরে বাইরে, শিক্ষাক্ষেত্রে, রাস্তা ঘাটে, অফিস ফেরত মেয়েদের যারা ধর্ষণ করে তারা বিকৃত মানসিকতার। এটি যে সব সময় হঠাৎ করে ঘটছে তাও নয়। আবার ধর্ষক পরিকল্পিতভাবেও ধর্ষণের মত কুকর্ম করে থাকে। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার কুড়িলে কর্মজীবী গারো তরুণীকে ধর্ষণ করা হয়েছে পরিকল্পনা করে। চট্টগ্রামের কর্মজীবী মেয়েটিকেও কয়েকজন মিলে পরিকল্পনা করেই ধর্ষণ করেছে। এছাড়া হরহামেশা বন্ধু, পরিচিত, আত্মীয়, শিক্ষক, অফিসের বস্, ভাই এমন কি পিতার দ্বারাও ধর্ষিত হচ্ছে নারী।

প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে মহামারীর মতো বেড়ে গেছে ধর্ষণ। ধর্ষণের সঙ্গে ধর্ষিতাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে খুন করা হচ্ছে। সেখানে প্রতিবাদ হচ্ছে। বিচার হচ্ছে। শাস্তি হচ্ছে, ফাঁসি অথবা জেল হচ্ছে। বাংলাদেশেও নজিরবিহীনভাবে ধর্ষণের মাত্রা বেড়ে গেছে। গ্রামে-গঞ্জে শহরে প্রতিদিন মেয়েরা শিকার হচ্ছে ধর্ষণের। অনেকেই চেপে যাচ্ছে। বেশিরভাগ ধর্ষিতা নারী এবং তাদের পরিবার ইজ্জত, সম্মান, বিচারহীনতার অভাবে ধর্ষণকে স্রেফ দুর্ঘটনা হিসেবে দেখে থানা পুলিশ করছে না। খুব কম নারীই গারো তরুণীর মতো সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে ধর্ষণের বিচার চায়। বাংলাদেশে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৩ মে পর্যন্ত ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২৪১টি। জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুসারে এ খবর জানা গেছে। মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ তাদের প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে, ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ১৫৮টি ধর্ষণের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৩৩, ফেব্রুয়ারিতে ৪৪, মার্চে ৪০ এবং এপ্রিলে ৪১টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবছর এ সংখ্যা ক্রমান্বয়ে উর্ধমুখী হচ্ছে। অর্থাৎ বাংলাদেশেও ধর্ষণের মতো ঘটনা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।

কেন ঘটছে এ ধর্ষণ?

ধর্ষণের অন্যতম কারণ মানুষের অনিয়ন্ত্রিত জৈবিক তাড়না। কোন পুরুষ সর্বদা নিজেকে ভোগী হিসেবে চিন্তা করার ফলে তার স্বাভাবিক যৌনতার জায়গায় স্থান পায় অনিয়ন্ত্রিত বিকৃত যৌন আকাক্সক্ষা। যার ফলে সে অনায়াসে ধর্মীয়, মানবিক, সামাজিক নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চেতনা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে।

নারীকে কেবল ভোগ্যপণ্যের মতো দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। প্রতিনিয়ত পারিবারিক পরিবেশে নারীকে মানুষ হিসেবে অসম্মানিত হতে দেখতে দেখতে পুরুষ মনে ধারণা জন্ম নেয় বিড়ি, সিগারেট, মদের মতোই নারী এক ভোগ্যবস্তু। অনেকে তো মনেই করে নারী একটি ফল এবং তাকে যত্রতত্র ভক্ষণ করার অধিকার কেবল পুরুষের।

পরকীয়া, পর্ণো, সেক্স বাজার, বিশ্ব সংস্কৃতির খারাপ দিকগুলো নিয়ন্ত্রণহীন অবাধ টেকনোলজি ব্যবহার করার ফলে বর্তমানে এত বেশি উন্মুক্ত এবং সস্তা হয়ে পড়েছে যে, কিশোর, তরুণ এমন কি পঞ্চাশোর্ধ থেকে সত্তরের পুরুষরাও অস্বাভাবিকভাবে ঝুঁকে পড়েছে এই দিকে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, কিছু সংখ্যক কিশোরী বা নারীও কম বেশি এ ব্যাপারে আগ্রহী। ফলে বর্তমানে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ধর্ষণের পেছনেই কমবেশি এই পর্ণোগ্রাফিকে দায়ী করা যায়।

পারিবারিক বন্ধন, মূল্যবোধ, শাসনের অভাব, পিতামাতার অবাধ জীবন যাপন, অবৈধ সম্পর্কের দিকে আগ্রহ, স্বামী স্ত্রীর দাম্পত্য কলহ, বিয়ে ভাঙ্গন, শিল্প সংস্কৃতি চর্চায় সুস্থধারার অভাব, নেশায় আসক্ত হওয়া, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ধনী পরিবারগুলোর দম্ভ, হঠাৎ ধনী হওয়া পরিবারের নিজেদের স্মার্ট দেখানো ইত্যাদি মিলে বর্তমান বাংলাদেশের সামাজিক অবস্থা খুব খারাপের দিকে নেমে এসেছে।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিচারহীনতার অভব্য সংস্কৃতি দেখা যাচ্ছে। এমনিতেই মেয়েরা ধর্ষিত হওয়ার পরও থানা পুলিশ নালিশ ফরিয়াদ করতে চায় না। পহেলা বৈশাখে এক শ্রেণীর শিক্ষিত, অশিক্ষিত, ধনী গরিব, ধর্মান্ধ বা বখাটেদের দ্বারা নারীরা প্রকাশ্যে নির্যাতিত হচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে কখনই দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে বিচার হবে না জেনেই খুব নির্বিঘেœ ধর্ষকরা সমাজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে এদের ছবি দেয়া সত্ত্বেও আইনগত কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করার ফলে ধর্ষকামী শ্রেণীর সাহস আর প্রশ্রয় আরও বেড়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন থাকা সত্ত্বেও তার যথার্থ ব্যবহার না করা, নাম কাওয়াস্তে লোক দেখান তদন্ত কমিটি করা, ধর্ষিতাকে সমাজের ভয় দেখিয়ে চুপ রাখা, ধনীর দুলালদের সঙ্গে আপোসরফা, ক্ষমতার অপব্যবহার করা, পারিবারিকভাবে শাসন না করে অপরাধ ঢেকে রাখার কারণে ধর্ষণ আরও বেড়ে যাচ্ছে। আইন এবং মূল্যবোধের মূল্যায়ন এতটাই নিচে নেমে গেছে যে, গারো তরুণী ধর্ষণে ধনীর দুলাল এবং তার বিবাহিত দুই বন্ধুর অবস্থান জানা সত্ত্বেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সাংবাদিক এবং ওই ধর্ষক পরিবারের কেউ ধর্ষককে জনগণের সামনে উন্মোচিত করে দেয়নি। ভবিষ্যতে এরা আবার ধর্ষণ করবে আর এদের স্ত্রীরা, মা বোনেরা আবার ক্ষমা করে ঘরে তুলে নেবে। জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক এ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, বিচারহীনতাই ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। তিনি ব্র্যাকের একটি গবেষণা প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৯ শতাংশ ধর্ষণ মামলায় আসামিদের কোন শাস্তি হয় না।

ধর্ষণ প্রতিরোধের উপায় কি?

এই মুহূর্তে ধর্ষণের একমাত্র শাস্তি ক্ষমাহীন মৃত্যুদ-। সরকারকে এ ঘোষণা দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা দরকার। বাঙালী স্বভাবতই আবেগপ্রবণ। এমন কোন সাহসী নীতিবান পিতামাতা নেই যে, তারা তাদের নৈতিক চরিত্রহীন অপরাধী সন্তানকে স্বেচ্ছায় বিচারের মুখোমুখি করবে। কিছু গরিব মধ্যবিত্তের সন্তান ধরা খাচ্ছে। ধনীর সন্তানরা বিশেষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ছাড়া পেয়ে কিছুদিন বিদেশ যাপন করে আবার ফিরে আসছে। পরিবার থেকে যেখানে অবাধ প্রশ্রয় হাসিল করছে, সেখানে বাইরের লোক কি বলছে তাতে কি আসে যায়। ঠিক সেই কারণে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ধর্ষণের শাস্তি নিঃশর্ত মৃত্যুদ- ঘোষণা করা এই মুহূর্তে জরুরী কর্তব্য। ভুলে গেলে চলবে না, জনগণের জন্যই আইন। বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গেরও অভিমত, মৃত্যুদ-ই প্রাপ্য ধর্ষকদের।

এছাড়া ব্যাপক সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যক্তিদের নীতিবান হওয়া দরকার আরও বেশি করে। মনে রাখতে হবে, এ ঘটনা তাদের নিজেদের পরিবারেও যে কোন সময় ঘটে যেতে পারে। অপরাধীর কোন স্থান কাল পাত্র নেই। ধর্ষণ একটি প্রাচীন অপরাধ। বুঝিয়ে দমন করা সম্ভব না হলে আইনের সেবকদের শক্ত হতেই হবে। প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্নভাবে ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলা। ধর্ষণকারীর ক্ষেত্রে নারীদেরও শক্ত হতে হবে। তৈরি করতে হবে এমন একটি পারিবারিক পরিবেশ, যেখানে নারীকে সম্মান দিতে শিখতে হবে। মনে রাখতে হবে নারীর যথাযথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা যে রাষ্ট্র করতে পারে না, সেই রাষ্ট্র যতই উন্নত হোক না কেন, তা সুশাসনহীন একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র মাত্র। সভ্য মানুষ রাষ্ট্র গঠন করেছিল তাদের সুনিন্ত্রিতভাবে পরিচালিত করার জন্য। সরকার বা কর্তৃপক্ষ নির্বাচিত করেছিল সুশাসিত হওয়ার জন্য। কোন জংলি রাষ্ট্রে বসবাস করার জন্য নয়। তাই ধর্ষকের শাস্তি হোক একমাত্র মৃত্যুদণ্ড।

প্রকাশিত : ১২ জুন ২০১৫

১২/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: