কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মুক্তিযুদ্ধে নিহত ভারতীয় সৈন্য নিয়ে নোংরা বিতর্কে গো-আযম পুত্র

প্রকাশিত : ২ জুন ২০১৫

স্টাফ রিপোর্টার ॥ মহান মুক্তিযুদ্ধে বীর শহীদদের পর এবার ভারতীয় সেনাবাহিনীর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন একাত্তরের ঘাতককুল শিরোমণি গো আযমের পুত্র আব্দুল্লাহিল আমান আযমী। নিজেদের পাকি প্রীতির চেহারা প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ ও ভারতবিরোধী ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে তোপের মুখে পড়েছেন গোলাম আযমের ছেলে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সর্বত্র বইছে নিন্দার ঝড়। মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একের পর এক ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য ও তৎপরতার জন্য যুদ্ধাপরাধীর এ পুত্রের গ্রেফতার ও বিচারের দাবি উঠেছে। অনেকেই ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলছেন, স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও আমাদের এমনই দুর্ভাগ্য যে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শেখাচ্ছে রাজাকারের বাচ্চা।

জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধে চার হাজার ভারতীয় সেনা শহীদের তথ্য দিয়ে সুশীল সমাজের সমালোচনা করে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও সাংবাদিক অঞ্জন রায় গত ২৮ মে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সেনা সদস্যদের শহীদ হওয়া ও তাদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের বিষয়ে একটি মানবিক স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন তিনি। আর সে স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে গোলাম আযম পুত্র আযমী সরাসরি অঞ্জন রায়কে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য ও তাকে হুমকি দিয়ে পাল্টা স্ট্যাটাস দেয়। অঞ্জন রায়ের স্ট্যাটাসের সূত্র ধরে তাকে ‘দালাল’ আখ্যায়িত করে পোস্ট দেন গোলাম আযমের ছেলে। এখানেও মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের তথ্যকে ‘কাল্পনিক’ বলে ঔদ্ধত্য দেখান সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া এই কর্মকর্তা। জামায়াত ও সমমনারা এর আগেও বিভিন্ন সময়ে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক তোলার চেষ্টা করেছে। সম্প্রতি এ আলোচনার সূত্র ধরে কথিত সুশীল সমাজের একটি অংশ ট্রাইব্যুনালে অবমাননার অভিযোগের মুখে পড়েছেন। অঞ্জন রায় তার স্ট্যাটাসে বলেছিলেন, ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রায় চার হাজার সদস্য তাদের জীবন দিয়েছেন, মারাত্মক আহত হয়েছেন প্রায় ১০ হাজার সেনা সদস্য। আমাদের সুশীলজনরা ভারত ইস্যুতে বিভিন্ন কথা বলেন- ভারতবিরোধী কার্ড খেলার বুদ্ধি দেন। কিন্তু কখনও তারা বলেন না- এই চার হাজার জীবন দেয়া ভারতীয় সেনাদের জন্য অন্তত একটা স্মারক স্তম্ভ হলেও নির্মাণ করার কথা। ভুলে গেলে চলবে নাÑ প্রতিবেশী দেশের ১ কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়া আর চার হাজার সেনা সদস্যের জীবনদানের বিষয়টি কিন্তু বিশ্ব ইতিহাসে খুব বেশি নেই। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভুলে গিয়ে ভারতবিরোধী কার্ডের ব্যবহার ‘রাজনৈতিক অসততা’ বলে মন্তব্য করেন সাংবাদিক অঞ্জন রায়। এরপর অঞ্জন রায়ের সমালোচনায় আযমী যে পোস্ট দিয়েছেন তার শিরোনাম ‘অদ্ভুত এক দালাল!!’ সেখানে যুদ্ধাপরাধীর ছেলে বলেন, ‘১৯৭১ এর ৩ থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতীয় বাহিনী যে যুদ্ধ করেছে এই (ইস্টার্ন) ফ্রন্টে, তাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তেমন কোন প্রতিরোধই করেনি, মাত্র ২/১টা ব্যাটল ছাড়া। তাহলে, এই ৪০০০ এর তত্ত্ব/তথ্য তিনি কোথায় পেলেন? ১৯৭১ এর সেই যুদ্ধ নিয়ে পড়াশোনা করেও কোথাও তো এই সংখ্যা কোনদিন পাইনি! রায় বাবু কি ‘তিন মিলিয়ন’ এর মতো কোন কাল্পনিক নতুন সংখ্যা নতুন প্রজন্মকে গিলাতে চাইছেন? অঞ্জন রায়কে উপদেশ দিয়ে গো-আযমের পুত্র বলেছে, ভারতের দালালি বন্ধ করুন। আর, যদি কোন ‘হিডেন এজেন্ডা’ থেকে থাকে, তাহলে প্রকাশ্যে বলেই ফেলুন না! দেখুন, এদেশের মানুষ আপনাদের মতো ‘দেশবিরোধী’দের কি ‘উপহার’ দেয়!! গোলাম আজম পুত্রের এহেন বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের মাঝে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

মহান মুক্তিযুদ্ধে বীর শহীদ, ভারতীয় সেনাবাহিনীর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে গোলাম আযম পুত্রের দেয়া মন্তব্যের পর থেকেই চলছে এর প্রতিবাদ। তীব্র প্রতিক্রিয়া হচ্ছে ফেসবুকসহ সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। প্রতিবাদ হচ্ছে অন্যান্য ক্ষেত্রেও। একজন দ-িত যুদ্ধাপরাধীর ছেলের এ ধরনের বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা হচ্ছে।

আযমীর সমালোচনায় নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আবদুর রশিদ লিখেছেন, ‘ইতিহাসের অজ্ঞতা। সামরিক জ্ঞানের নামে মিথ্যাচার। পাকিস্তানী বাহিনীর পরাজয়ের গ্লানি ঢাকতে মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান স্বীকার করার কুণ্ঠা বোধ থেকে ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টা।’

অনলাইন এ্যাকটিভিস্ট মাহমুদুল হক মুন্সী ফেসবুকে লিখেছেন, ‘স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও আমাদের এমনই দুর্ভাগ্য, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শেখাচ্ছে রাজাকারের বাচ্চা!’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘গোলাম আযমের পোলা আবদুল্লাহিল আমান আযমী বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানী বাহিনী ও তার বাপের তৈরি রাজাকার বাহিনীর হাতে মৃত ভারতীয় সেনাদের সংখ্যার ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। দেশে তাদের (ভারতীয় বাহিনীর শহীদ) স্মরণে একটি স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত নেই, এইটা বলা কি ভারতের দালালি করা? মুক্তিযোদ্ধার সন্তান অঞ্জন রায়ের ওপর তাই রাজাকারের বাচ্চা আযমী চেতেছে। তাদের ভারতের ওপর রাগ, ভারত কেন ১ কোটি শরণার্থীদের স্থান দিল? তাদের ভারতের ওপর রাগ, কেন ভারত জামায়াতের ইচ্ছামতো মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ হত্যা করল না?

মাহমুদুল হক মুন্সী ফেসবুকে তার লেখায় মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ দেয়া ভারতীয় সৈন্যদের সংখ্যার বিষয়ে একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, অফিসিয়াল হিসাবে ডিসেম্বরের ১৩ দিনে ভারতীয় বাহিনীর চার হাজারের মতো সেনা মারা গেছে। ৩০ লাখ শহীদের সবার নাম-ঠিকানা নেই, কিন্তু ভারতীয় সৈন্যদের নাম-ঠিকানা তাদের সরকারের কাছে ‘ঠিকই আছে’। যেটা কখনও মুখ ফুটে বলা যায় না, সেটা হলো ভারত অফিসিয়ালি শুধু এই ১৩ দিন আমাদের মুক্তিবাহিনীর পক্ষে যুদ্ধ করেছে, তার আগের নয় মাসে গোপনে সাহায্য সহযোগিতা করতে গিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও ‘র’ এর আরও ১৪ হাজারের মতো মারা গেছেন। এই চার হাজার জনের স্বীকৃতি আছে, বাকিদের যে প্রকাশ্য কোন স্বীকৃতিই নেই।

কামাল পাশা চৌধুরী তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেছেন- রাজাকার প্রধান গোলাম আযমের পুত ‘বেজন্মা’ আব্দুল্লাহিল আমান আযমী ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে একজন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধার সন্তান সাংবাদিক অঞ্জন রায় এবং মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মুনতাসীর মামুন এর প্রতি বিষোদগার করে। এই বরাহ শাবকের বাড়াবাড়ির সকল সীমা আজ অতিক্রম করেছে। এর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকার ও প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি। এই রাষ্ট্র এই দেশ আমাদের, আমরা লক্ষ শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধার উল্টরসূরী। তাদের প্রদর্শিত পথ এখনও আমরা বিস্মৃত হইনি। শুধু বিচারের দাবি নিয়ে পথে-ঘাটে কেঁলে বেড়ানোর ধৈর্য আর আমাদের নেই।

মাহাবুব রাজীব তার এক স্ট্যাটাসে বলেছে- ‘রাজারকার কা বাচ্চা, কাভি নেহি আচ্ছা, যোভি আচ্ছা, ওভি এক শুয়র কি বাচ্চা’ রাজাকার শিরোমণি গো আযমের পুত ‘বেজন্মা’ আব্দুল্লাহিল আমান আযমীর ঔদ্ধত্য দিনকে দিন বেড়ে চলেছে! একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান সাংবাদিক অঞ্জন রায় এবং মুক্তিযুদ্ধ গবেষক মুনতাসীর মামুন এর প্রতি বিষোদগার করে এই কুত্তার বাচ্চা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে। গোলামের পুত গোলামকে যদি এখনই থামানো না যায় সে ভবিষ্যতে আরও বিতর্ক তৈরি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করবে। এই জানোয়ারের বিষদাঁত এখনই ভেঙ্গে দিতে হবে।

অঞ্জন রায় অবশ্য তার ফিরতি স্ট্যাটাসে গোলাম আযমের ছেলের ‘গালিকে’ ভিন্নভাবে দেখেছেন। শনিবার ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, যখন বঙ্গবন্ধুকে খুন করা হলো- তার পরই গ্রেফতার হয়েছিলেন বাবা (সিপিবির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য কমরেড প্রসাদ রায়)। কয়েক বছর আমরা জানতাম না কোথায় তিনি? বেঁচে আছেন কি না? তারপরও পরিবারের কেউ মাথানত করেননি। ভিক্টর যারা, কর্নেল তাহের, বেঞ্জামিন মলোয়েস, খালেদ মোশারফের ইতিহাস আমাকে সাহস দেয়। সেই আমাকে নিয়ে খামোখা লিখে, পোস্ট দিয়ে কি লাভ? আমি যা বিশ্বাস করি- সেটা বলি। আর আমি জানি সহসা অপমৃত্যুর সঙ্গে দেখা হওয়াটা আমার জন্য খুবই স্বাভাবিক। তবে একটাই কথা- আমি ভদ্রলোক না, স্টিট ফাইটার। শেষ পর্যন্ত দাঁত আর নখ দিয়ে লড়াইটা জানি। আযমপুত্রের উদ্দেশে তিনি লিখেছেন, আমি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে গর্বিত, কারণ আমাকে নিয়ে যিনি পোস্টটি দিয়েছেন তার পিতার নাম গোলাম আযম। আজ আবার বুঝলাম- আমার ট্র্যাকটা ঠিকই আছে।

প্রকাশিত : ২ জুন ২০১৫

০২/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: