মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

লোডশেডিং? ॥ বিদ্যুত উৎপাদনে নয়, সমস্যা সঞ্চালন বিতরণ ত্রুটিতে

প্রকাশিত : ১১ মে ২০১৫
  • উৎপাদিত ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যমান অবকাঠামোয় ৭৭ মেগাওয়াটের বেশি সরবরাহ করা যাচ্ছে না

রশিদ মামুন ॥ সঞ্চালন-বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতায় ‘লোডশেডিং মুক্ত বাংলাদেশ’ ঘোষণা করা যাচ্ছে না। প্রতিদিন আট হাজার মেগাওয়াটের চেয়ে বেশি বিদ্যুত উৎপাদন ক্ষমতার স্থলে সাত হাজার ৭০০ মেগওয়াটের বেশি বিদ্যুত নিতে পারছে না ন্যাশনাল লোড ডেসপাস সেন্টার (এনএলডিসি)। সমন্বয়হীন উৎপাদন-সঞ্চালন এবং বিতরণ ব্যবস্থায় কেন্দ্র প্রস্তুত থাকার পরও বিদ্যুত হীনতার যন্ত্রণা পোহাতে হচ্ছে গ্রাহককে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সঞ্চালন বিতরণে নজর না দেয়ায় বিদ্যুত খাত বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছে। শুধু সঞ্চালন ব্যবস্থায়ই নয়, বিতরণ ব্যবস্থায়ও ত্রুটি দেখা গেছে। শহরের তুলনায় গ্রামে এই সঙ্কট আরও প্রকট। মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুত ব্যবহারের মাত্রা বৃদ্ধির হার বিবেচনা না করে অপেক্ষাকৃত কম ক্ষমতার বিতরণ লাইন নির্মাণ এবং ট্রান্সফরমার বসানোতে গ্রামে গ্রামে সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করছে।

পিডিবি সূত্র জানায়, গত ৬ মে দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যুত উৎপাদন হয় রাত আটটায় সাত হাজার ৭১২ মেগাওয়াট কিন্তু ওই দিন এনএলডিসি আর বিদ্যুত নিতে না পারায় উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায়নি। পিডিবি বলছে, আট হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের জন্য কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছিল ওই দিন। এর আগের সাত হাজার ৬০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের দিনও রাতে গিয়ে এনএলডিসি বিদ্যুত নিতে না পারায় ১০০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র বন্ধ করতে হয়।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, আমাদের উৎপাদন ক্ষমতা থাকলেও সঞ্চালন ব্যবস্থায় ত্রুটির কারণে বিদ্যুত সরবরাহ বিঘিœত হচ্ছে। আগামীতে সরকার এই দিকে নজর দেবে। বাজেট নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনায় বিদ্যুত নিয়ে তাঁদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী মুহিত এ কথা বলেন।

সরকারের পরিকল্পনা ছিল চলতি বছরের মধ্যে লোডশেডিংমুক্ত বাংলাদেশ ঘোষণা করা হবে। প্রথমিক পরিকল্পনায় বলা হয়, ২০১৪ তেই লোডশেডিংমুক্ত হবে দেশ। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এখনও লোডশেডিং চলছেই। খোদ রাজধানী ঢাকায়ও এলাকা ভেদে এক থেকে দুই ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। কিন্তু পিডিবির খাতা-কলমে কোন লোডশেডিং নেই। সরকারী সকল প্রতিবেদনে প্রতিদিন শূন্য লোডশেডিং দেখানো হচ্ছে। বাস্তবের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ এই প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে চাইলে পিডিবির একজন কর্মকর্তা বলেন, যেহেতু চাহিদা ওই পরিমাণই দেখানো হচ্ছে আর আমরা চাহিদার পুরো বিদ্যুত দিতে পারছি সঙ্গত কারণে আমরা মনে করছি লোডশেডিং নেই। কিন্তু গ্রাহক এখনও লোডশেডিংমুক্ত হতে পারেননি। এ কথা সত্য আগের থেকে বিদ্যুতের অবস্থা অনেক ভাল হয়েছে কিন্তু তাকে জিরো লোডশেডিং বলা যাবে না। আমাদের সঞ্চালন এবং বিতরণ ব্যবস্থার ত্রুটির বিষয়টি প্রত্যেক গ্রহকের জানার কথা নয়। এই সংকট সমাধানে ছয় মাসের একটি ঝটিকা কর্মসূচী হাতে নেয়া উচিত। যার মধ্যে সকল ওভারলোডেড লাইন এবং ট্রন্সফরমার প্রতিস্থাপন করতে হবে।

বিদ্যুত প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এ প্রসঙ্গে জানান, পুরোপুরি লোডশেডিংমুক্ত হতে এখনও তিন থেকে চার বছর সময় প্রয়োজন হবে। এজন্য সরকার কাজ করছে। লোড নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রিপেইড মিটার সংযোজন ছাড়াও বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে বিদ্যুত বিভাগ। পর্যায়ক্রমে তা বাস্তবায়ন হবে।

পাওয়ারগ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ পিজিসিবি সূত্র জানায়, দেশে এখন একই সঙ্গে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত সঞ্চালনের অবকাঠামো রয়েছে। কিন্তু কিছু পকেটের কারণে সাত হাজার ৭০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুত সরবরাহ করা যায় না। ঈশ্বরদী-ভেড়ামারা, গোয়ালপাড়া-বাগেরহাট, কবিরপুর-জয়দেবপুর সঞ্চালন লাইনগুলো ওভারলোডে রয়েছে। এছাড়া ঘোড়াশাল বিদ্যুত কেন্দ্রে কিছু যান্ত্রিক সমস্যার কারণে সঞ্চালন ব্যবস্থা বিঘিœত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টারা বলছেন, এই সঙ্কট সমাধানের জন্য বিদ্যুত কেন্দ্রগুলো নির্মাণে স্থান নির্ধারণকে গুরুত্বর সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। ভিন্ন ভিন্ন লোকেশনে বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ করতে হয় এতে বিভিন্ন দিক থেকে বিদ্যুত সরবরাহ করলে এই সমস্যা থাকে না।

জানতে চাইলে পিজিসিবির মহাব্যবস্থাপক (সিস্টেম অপারেশন) তপন কুমার রায় জানান, আমাদের কিছু সমস্যা আছে। গাজীপুরের কড্ডা বিদ্যুত কেন্দ্র এবং ভোলা বিদ্যুত কেন্দ্র উৎপাদনে এলে সমস্যার কিছু সমাধান হয়ে যাবে। এখন বিদ্যুত কেন্দ্রগুলো উৎপাদনে আসার অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়া এসব সমস্যা দূর করার জন্য আরও ১৪টি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। যা বাস্তবায়ন হলে সঙ্কট আর থাকবে না।

অন্যদিকে পুরাতন, ত্রুটিযুক্ত সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে অনেকটা খুঁড়িয়ে চলছে সারাদেশের বিদ্যুতের বিতরণ। খোদ রাজধানী ঢাকার দুই বিদ্যুত বিতরণ কোম্পানি ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) এবং ঢাকা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানিতেও (ডেসকো) এই সমস্যা প্রকট। সামান্য ঝড় বৃষ্টিতে বিদ্যুত বিচ্ছিন্ন হচ্ছেন রাজধানীবাসী। আবার ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থার খোঁড়াখুঁড়িতে প্রায়সই বিপত্তি ঘটছে ভূগর্ভস্থ বিদ্যুত বিতরণ ব্যবস্থার। দেশের বৃহত্তর এলাকায় বিদ্যুত সরবরাহকারী সংস্থা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডে (আরইবি) এই সমস্যা সব থেকে প্রকট। দেশের সব পল্লীবিদ্যুতের গ্রাহকের এই অবস্থা অনেকটা গাসওয়া হয়ে গেছে। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) এবং বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) বিতরণ ব্যবস্থায়ও যথেষ্ট ত্রুটি রয়েছে। দেখা গেছে বছরের পর বছর ধরে এখানকার কোন কোন লাইন ট্রান্সফরমার এবং সাবস্টেশন ওভারলোডে রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করে প্রকল্প বাস্তবায়ন না করায় সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া যাচ্ছে না।

তবে উৎপাদন পর্যায়েও কিছু সমস্যা এখনও রয়ে গেছে। জানা যায়, কাপ্তাই জলবিদ্যুত কেন্দ্র, ময়মনসিংহর আরপিসিএল, শাহজিবাজার, সিলেট, বাঘাবাড়ি, রংপুর, সৈয়দপুর, ভেড়ামারা, বরিশাল গ্যাস টারবাইন মেশিনগুলোতে ব্ল্যাক স্ট্রাট সুবিধা রয়েছে। কিন্তু গত পহেলা নবেম্বর ব্ল্যাক আউটের ঘটনার দিন কিন্তু আরপিসিএল ৩০ মেগাওয়াট এবং শাহজিবাজার ২০ মেগাওয়াট ছাড়া আর কোন বিদ্যুত কেন্দ্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হতে পারেনি। এজন্য সকল বিদ্যুত কেন্দ্রে ব্ল্যাক স্ট্রাট ব্যবস্থার সংযোজন করতে বলা হলেও পুরাতন কেন্দ্রে তা করা সম্ভব নয়। এজন্য জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয় হলে বিতরণ ব্যবস্থা বিঘিœত হয়।

সেবার মান বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়ে বার বার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি হলেও এখনও পর্যন্ত তা বাড়েনি। সরকার বিদ্যুত উৎপাদনে ভর্তুকি দিয়ে থাকে। অন্যদিকে বিতরণ কোম্পানির প্রত্যেকটি লাভ করছে। অর্থাৎ গ্রাহক তার সেবার জন্য যে মূল্য পরিশোধ করছে তাতে বিতরণ কোম্পানি সকল ব্যয় নির্বাহ করে অতিরিক্ত অর্থ জমা হচ্ছে। কিন্তু এরপরও সেবার মান কেন বাড়ছে না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন আর্থিকভাবে ক্ষতিতে থাকলে বিতরণ কোম্পানিগুলো বলতে পারত সেবার মান বৃদ্ধি করা সম্ভব নয় কিন্তু লাভজনক কোন কোম্পানির এ ধরনের দোহাই অগ্রহণযোগ্য।

আরইবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মঈন উদ্দিন বলেন, আমরা সর্বোচ্চ গ্রাহক সেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। কিছু কিছু এলাকায় ওভারলোডের কারণে সমস্যা হচ্ছে। আমরা এই সমস্যা দূর করতে প্রকল্প হাতে নিয়েছি। কিন্তু কিছু সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেই তা বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে। আমাদের প্রকল্পগুলো ২০১৮ সালের মধ্যে শেষ হবে। তখন আর সমস্যা হবে না।

প্রকাশিত : ১১ মে ২০১৫

১১/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: