মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

আশুলিয়ায় ব্যাংক ডাকাতির চেষ্টা ॥ নিহত ৮

প্রকাশিত : ২২ এপ্রিল ২০১৫
আশুলিয়ায় ব্যাংক ডাকাতির চেষ্টা ॥ নিহত ৮
  • ডাকাতদলের গুলি ও বোমাবাজিতে প্রাণ গেল ৭ জনের, আর গণপিটুনিতে নিহত এক ডাকাত,
  • আহত ২৫

জনকণ্ঠ রিপোর্ট ॥ দিনে-দুপুরে দুর্ধর্ষ ডাকাতি সংঘটিত হয়েছে ঢাকার পোশাক শিল্পপল্লী খ্যাত সাভারের আশুলিয়ার কাঠগড়া বাজারে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের শাখায়। সশস্ত্র ডাকাত দলের গুলিবর্ষণ, বোমাবাজি, কুপিয়ে, গ্রেনেড নিক্ষেপ করে দুর্ধর্ষ ডাকাতি করেছে সশস্ত্র সংঘবদ্ধ ডাকাত দল। সশস্ত্র ডাকাত দলের হাতে ব্যাংক ম্যানেজার, নিরাপত্তা রক্ষী ও দোকানি এবং এলাকাবাসীর গণপিটুনিতে এক ডাকাতসহ ৮ জন নিহত এবং অন্তত ১০ জন গুলিবিদ্ধসহ প্রায় ২৫ জন আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার দুপুর প্রায় দুইটার দিকে ৩-৪টি মোটরসাইকেলযোগে ১০-১২ জনের সশস্ত্র ডাকাত দলটি গ্রাহকবেশে ব্যাংকে প্রবেশ করেই ম্যানেজারকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে গুলি ও বোমাবর্ষণ শুরু করে। এ সময় কাঠগড়া বাজারের পাশের মসজিদের মাইক থেকে ‘ডাকাত পড়েছে’ বলে মাইকিং করা হলে এলাকাবাসী ও জনতা এগিয়ে এসে ধাওয়া দিলে বিক্ষুব্ধ জনতার সঙ্গে সশস্ত্র ডাকাত দলের ব্যাপক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। সশস্ত্র ডাকাত দলের এলোপাতাড়ি গুলি ও বোমাবর্ষণে হতাহতের ঘটনা ঘটে। আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সশস্ত্র ডাকাত দলের হাতে নিহতরা হচ্ছেন, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক শাখার ব্যবস্থাপক অলি উল্যাহ (৪৫), ব্যাংকের গ্রাহক ব্যবসায়ী মোঃ পলাশ (৫৫), ঝালমুড়ি বিক্রেতা দোকানি মনির (৬০), নুরুজ্জামান (৪০) স্থানীয় একটি ওয়ার্কশপের মালিক জিল্লুর রহমান (৪০), এক নিরাপত্তাকর্মী (গানম্যান) বদরুল আলম (৩৮) এবং গণপিটুনিতে নিহত ডাকাতদলের এক সদস্য, যার পরিচয় পাওয়া যায়নি। ডাকাতদের ফেলে যাওয়া ব্যাংকের ৫ লাখ ৯৪ হাজার ২৫৫ টাকা ও গ্রাহকের ১ লাখ টাকাভর্তি একটি ব্যাগ উদ্ধার করা হয়। ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজিসহ উর্ধতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ডাকাতদলের সদস্যদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান চালানো হচ্ছে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, মঙ্গলবার দুপুর দুইটার দিকে ৩-৪টি মোটরসাইকেলযোগে ১০-১২ জনের একদল লোক গ্রাহকবেশে ব্যাংকের ভেতরে প্রবেশ করে। ব্যাংকের ভেতরের লোকজন কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা ব্যাংকের ব্যবস্থাপকসহ কর্মকর্তাদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ফেলে ডাকাতদল। বোমা ও গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে লুটপাট শুরু করে তারা। এ সময় তাদের বেপরোয়া গুলি ও বোমায় ব্যাংকের ভেতরেই মারা যান ব্যাংকটির শাখা ব্যবস্থাপক অলিউল্লাহ-সহ এক নিরাপত্তারক্ষী। ব্যাংকের ভেতরে যাঁরা ছিলেন তাঁরা যে যার মতো করে টেবিল, চেয়ারের নিচে লুকিয়ে থেকে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করে। ব্যাংকের ভেতর থেকে যারা বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন, তাঁরা ‘ডাকাত-ডাকাত’ বলে চিৎকার দেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ব্যাংকে ডাকাতির খবরটি মুহূর্তে এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। তখন কাঠগড়া বাজারের পাশের একটি মসজিদ থেকে মাইকিং করা হলে পাশের বাজার থেকে এলাকাবাসী এগিয়ে এসে ডাকাতদের ঘিরে ফেলে। বিক্ষুব্ধ জনতার প্রতিরোধের মুখে ডাকাতদল এলোপাতাড়িভাবে গুলি ও বোমাবর্ষণ করলে ব্যাংকের সামনেই নিহত হন মুদি দোকানদার মনির হোসেন, ব্যাংকের গ্রাহক পলাশ ও ওয়ার্কশপ মালিক জিল্লুর। বিক্ষুব্ধ জনতা গুলি উপেক্ষা করে ডাকাতদের ধাওয়া দিলে জনতার হাতে ধরা পড়ে এক ডাকাত গণপিটুনিতে মারা যায়। বিক্ষুব্ধ জনতা ডাকাতদলের মোটর-সাইকেল আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে।

পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) এসএম মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান জানান, তিনি নিজে, এডিশনাল ডিআইজি শফিকুর রহমান, ঢাকা জেলার এসপি হাবিবুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ডাকাত দল ব্যাংকের ভেতরে ঢুকেই এলোপাতাড়ি কুপিয়ে, গুলিবর্ষণ, বোমাবাজি করেছে। তাদের সঙ্গে ছিল গ্রেনেড ও পেট্রোল। তিনি মনে করেন, এটা ডাকাতির উদ্দেশ্যে ডাকাতি হয়নি। জনমনে আতঙ্ক, ভীতি ছড়িয়ে নাশকতা ঘটানোর একটি পরিকল্পিত ঘটনা হতে পারে। ঘটনার পরপরই পুলিশ এলাকায় অভিযান শুরু করেছে। একজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। লুণ্ঠিত টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। ডাকাতদলের গোলাগুলি ও বোমাবাজিতে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, এলাকাবাসীর প্রতিরোধের ফলে ডাকাতদলের সদস্য নিহত ও ধরা পড়েছে।

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) হাবিবুর রহমান বলেন, ডাকাতদলের দুই সদস্য ধরা পড়ার পর একজন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে। অপর একজন সুমন নামের ডাকাতদলের সদস্য ধরা পড়ার পর গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়েছে। পরে পুলিশ আরও একজনকে আটক করে। গণপিটুনিতে গুরুতর আহত ডাকাতদলের সদস্য সুমনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া অবস্থায় পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বলেছে, তার গ্রামের বাড়ি জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে। দিন পনেরো আগে গাজীপুরের চন্দ্রায় একটি বাসা ভাড়া নিয়েছিল। সে সুস্থ হয়ে উঠলেই জিজ্ঞাসাবাদ করে ডাকাতদলের পলাতক সদস্যদের নাম পরিচয় উদ্ধার করে ব্যাপক অভিযান চালানো হবে। ব্যাংকে ডাকাতির সময়ে ৬ লাখ ৯৪ হাজার টাকা ডাকাতি হওয়ার পর সমুদয় টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ টাকা একজন গ্রাহকের। ডাকাতদল আগ্নেয়াস্ত্র, বোমা, পেট্রোল নিয়ে এসেছিল বলে জানান পুলিশ সুপার হাবিবুর।

ঢাকা জেলার একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ঢাকার পোশাক শিল্পপল্লী খ্যাত সাভারের আশুলিয়ার কাঠগড়া কমার্স ব্যাংকের শাখায় ডাকাতি হওয়ার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান পুলিশ দল। পুলিশ দল সেখানে গিয়ে বিশমাইল-জিরাবো সড়কের বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি অভিযান শুরু করে। তবে পালিয়ে যাওয়া ডাকাতদের গ্রেফতার করা যায়নি। ব্যাংকের ভেতর থেকে লুণ্ঠিত টাকাও উদ্ধার হয়নি। নিহতদের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে। ডাকাতরা সংঘবদ্ধ দলের সদস্য।

প্রত্যক্ষদর্শী রবিন দেওয়ান নামে এক ব্যক্তি বলেন, ৩-৪টি মোটরসাইকেলে চড়ে ডাকাতরা আসে। ডাকাতরা ব্যাংকে হামলা চালানোর পর স্থানীয় মাইকে ডাকাতদের প্রতিরোধের আহ্বান জানায় এলাকাবাসী। তখন ডাকাতরা গুলি চালালে ঘটনাস্থলেই পাঁচজন নিহত হন বলে জানান তিনি। রবিন বলেন, প্রতিরোধের মুখে ডাকাতরা পালাতে থাকে। এর মধ্যে একটি মোটরসাইকেল পড়ে গেলে জনতা দুই ডাকাতকে ধরে মারধর করে। তাদের একজন ঘটনাস্থলে মারা যায়। অন্যজনকে পুলিশে দেয়া হয়।

সাভারের এএসপি রাসেল শেখ বলেন, ডাকাতের গুলিতে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। দুই ডাকাতকে ধরে ফেলে জনতা। এর মধ্যে গণপিটুনিতে একজন মারা গেছে। ঘটনাস্থলে ডাকাতদের ফেলে যাওয়া ৬ লাখ ৯৪ হাজার ২৫৫ টাকাভর্তি একটি ব্যাগ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ১ লাখ টাকা হচ্ছে গ্রাহকের। সন্দেহভাজন ডাকাতদের ওই মোটরসাইকেলটি জ্বালিয়ে দিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা।

সাভার এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরী বিভাগের চিকিৎসক মাহমুদ হাসান জানান, তাদের এখানে পাঁচটি লাশ রয়েছে। গুলিবিদ্ধসহ আহতদের এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

প্রকাশিত : ২২ এপ্রিল ২০১৫

২২/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: