কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাংলা প্রয়োগ অভিধানের ভূত-ভবিষ্যৎ

প্রকাশিত : ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • জাফর ওয়াজেদ

বাংলা ভাষার বিশুদ্ধ রূপ যদি পাওয়া যেত, তাহলে ভুল বাংলা লেখার দায়ভার চাপত না কারও ওপর। ভুল বানান আর ভুল শব্দ প্রয়োগের কবল থেকে মুক্ত হওয়া যেত। কিন্তু এমন প্রশ্ন তো শোনাই যায়, বাংলা ভাষার কি কোন বিশুদ্ধ রূপ আছে? যদি থাকে, তাহলে সেটি কী? আর যদি নাই-ই থাকে, তবে ভুল লেখা নিয়ে আপত্তিই বা কেন? একুশ শতকে এসে দেখা গেছে, বাংলাভাষা যেসব বিধিবিধানের প্রশ্নে কঠোর, সেগুলোর কোন কোনটিকে মেনে চলবার কোন প্রয়োজন অনেকেই বোধ করেন না। বাংলা ভাষার যদি বিশুদ্ধ রূপ পাওয়া যেত, তবে বাংলা বাক্যগঠন ও বানানে যে স্বেচ্ছাচারিতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রতিবিধানে,শৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রয়োজনে আনুশাসনিক বিধান দরকার, তা বাংলা ভাষা চর্চাকারী মাত্রই উপলব্ধি করেন। বানানের বিশৃঙ্খলা যেমন মোটেও কাম্য হতে পারে না, তেমনি কাম্য নয় শব্দের অশুদ্ধ প্রয়োগ। শব্দের প্রয়োগ বৈচিত্র্য বোঝার ক্ষেত্র যদি না থাকে, তবে শুদ্ধতা সুদূরপরাহত। বাংলা ভাষা যথাযথ প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্য হওয়ার সুযোগ না দিলে সমস্যা বাড়ে বৈকি। বাংলা ভাষা ব্যবহারকারী অর্থাৎ যাঁরা পড়েন বা লেখালেখি করেন, তাঁদের হরেক রকম সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। কখনও তা উচ্চারণের, কখনও ঠিক শব্দ বাছাইয়ের কিংবা যথাযথ বাক্য গঠনের। লেখার ক্ষেত্রে ঝকমারি কম নয়। যতি চিহ্নের ব্যবহার বা সঠিক বানান প্রয়োগÑ এসবের নিয়ম মানা কিংবা নিয়মভাঙ্গার কাজটি করতে হয়। ব্যাকরণের নিয়মে গ্রাহ্য নয়, এমন বহু শব্দ বা বাক্যের প্রয়োগ প্রচলিত-তার অনেকগুলোই ব্যবহার করা হয়। আবার এমন প্রয়োগও দেখা যায়, যা ব্যাপকভাবে প্রচলিত, কিন্তু শুধু সেই কারণেই তাকে মেনে নেয়া যায় না। সুতরাং কোন প্রচলন গ্রাহ্য এবং কোন প্রচলন গ্রাহ্য নয়, তা নিয়ে লেখকের মতো পাঠককেও মাথা ঘামাতে হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বাংলা ভাষা পরিচয়’ গ্রন্থে তো লিখেছেনই, ‘আমরা লিখি এক আর পড়ি আর। অর্থাৎ আমরা লিখি সংস্কৃত ভাষায়, আর ঠিক সেইটে পড়ি প্রাকৃত বাংলা ভাষায়।’

প্রত্যেক ভাষায় শব্দ তৈরির নিজস্ব কিছু নিয়মরীতি রয়েছে। আছে নিজস্ব শব্দ সংগঠন। বাংলা ভাষায় শব্দ তৈরি হয় একটি মুক্ত রূপমূলে। অথবা মুক্তরূপমূলের আগে-পরে এক বা একাধিক বদ্ধরূপমূল (প্রত্যয়-বিভক্তি) যোগ করে। মুক্তরূপমূলের সঙ্গে বদ্ধরূপমূল যুক্ত হওয়ার সময় অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধ্বনি পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকে। উচ্চারণে আসে পার্থক্য। বাংলা ভাষার ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্যের কারণে বানান সমস্যা একটা গুরুতর ব্যাপার। আবার বাংলা ভাষার ভা-ারে যেসব শব্দ আছে তা তারা সবাই এক জাতের নয়। অবশ্য প্রায় সব ভাষাতেই তা-ই। কিন্তু বাংলা ভাষায় বিশেষভাবে যা আছে তা হচ্ছে, বিভিন্ন জাতের শব্দের অস্তিত্ব এবং জাত অনুসারে অনেকসময়ই তাদের বানানে নিয়মের ভিন্নœতা। এক জাতের শব্দ, যেমন তৎসম শব্দ। তার মধ্যেও আছে আবার ব্যাকরণসিদ্ধভাবেই বানানের বিকল্পের অস্তিত্ব বা অবস্থান। অতৎসম যেসব শব্দ আছে, তার মধ্যে বানানের নিয়মের রয়েছে শিথিলতা, ফলে তাতে আছে সু-প্রচুর ব্যতিক্রম ও বিকল্পের অস্তিত্ব। দেখা যাচ্ছে, বাংলা শব্দের বানানের ক্ষেত্রে একটি ঐক্যবদ্ধ নিয়মে পৌঁছানো সম্ভব নয়। অনেক নিয়ম, যা কখনও কখনও স্ববিরোধী; তাকেও মেনে নিতে হয়। কেবল প্রচলনের কারণেই বহু তৎসম শব্দে নিয়ম লঙ্ঘন ধীরে ধীরে স্বীকৃত হয়ে গেছে। এ নিয়ে আর আপত্তি মেলে না।

বাংলা ভাষা যারাই সচেতনভাবে ব্যবহার করেন, তাদেরই সর্বাগ্রে প্রয়োজন হয়ে পড়ে বাংলা ব্যবহারের বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে একসঙ্গে কাজে লাগতে পারে এমন একটি অভিধান। যাকে বলা হয় প্রয়োগ অভিধান। ব্রিটেনে বিশ শতকের গোড়ায় দুই ভাই ফাউলারের জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থের বিষয় ছিল রাজভাষা ইংরেজির ব্যবহার। তারই বিবর্তনে এক ভাই হেনরি ওয়াটাসন ফাউলার ১৯২৬ সালে লিখলেন অভিধান। যাকে বলা হয় প্রয়োগ অভিধান। ১৯৮৫ সালে ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত হয় জি প্ল্যাট রিচার্ড এবং এইচ ওয়েভার সম্পাদিত ‘লং ম্যান ডিকসনারি অব এপ্লাইড লিঙ্গুইস্টিকস।’ প্রকাশিত হয় আর সত্যতা হচ্ছে, বাংলা ভাষায় প্রয়োগ অভিধান দূরে থাক, একটি পূর্ণাঙ্গ অভিধান বা শব্দকোষ সে অর্থে আজো প্রণীত হয়নি।

‘অভিধান’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘শব্দার্থ প্রতিপাদক গ্রন্থ’ বা শব্দকোষ। অভিধান শব্দটি তৎসম বা সংস্কৃতজাত হলেও আধুনিক সংকলন রীতি ও আদর্শ মোটেই সংস্কৃত প্রভাবিত নয়। যদিও অভিধানের ধ্যানধারণা সংস্কৃত শব্দকোষ চর্চা থেকে আগত। অবশ্য এ যুগে অভিধান শব্দটি ইংরেজী ‘ডিকশনারি’ শব্দের পরিভাষা হিসেবেই গৃহীত। অভিধান প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য ব্যবহারিক। তাই সব অভিধানই ব্যবহার্য ও প্রয়োজনীয়। ব্যবহারিক অভিধান হচ্ছে প্রধানত বাংলা শব্দের চলমান রূপের পরিচায়ক। বাংলা ভাষায় এযাবতকাল যত অভিধান সঙ্কলিত হয়েছে, তা মূলত ‘ব্যবহারিক অভিধান।’ আদর্শ তাত্ত্বিক অভিধান রচনার কাজটিও হয়নি। যেমন হয়নি প্রয়োগ অভিধান প্রণয়ন। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘বাংলা ভাষাকে চিনতে হবে ভাল করে; কোথায় তার শক্তি কোথায় তার দূর্বলতা, দুই-ই আমাদের জানা চাই।’ ভাষার অন্তর্নিহিত শক্তির ভেতর যে ভাষার প্রাণ তা তিনি বোঝাতে চেয়েছেন। অবশ্য বাংলা ভাষা রবীন্দ্রনাথের কাছে ‘ভঙ্গীওয়ালা ভাষা’। বলেছেন, ‘ভাবপ্রকাশের এ রকম সাহিত্যিক রীতি অন্য কোন ভাষায় আমার জানা নাই।’ বাংলা ভাষায় বাক্যবিন্যাসও মূলত বিচিত্রমুখী। আর শব্দের প্রায়োগিক লক্ষ্য অনুযায়ী শব্দার্থের প্রকারভেদও বহুমুখী। বাংলা ভাষায় বাচ্যার্থ, লক্ষ্যার্থ ও ব্যাঙ্গার্থÑ এই তিন ধারায় শব্দার্থ হয়ে থাকে। বাংলা ভাষার বাগধারা প্রবাদ-প্রবচনে শব্দার্থের এই প্রকারভেদ ভাষার প্রকাশভঙ্গিতে বিপুল বৈচিত্র্য এনেছে। বাংলা ভাষার মতো এত ‘ইডিয়োমেটিক ইমেজ’ পৃথিবীর আর কোন ভাষায় নেই। তাই এই ইমেজ ভাষা ব্যবহারকারীর ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন স্বয়ংসম্পূর্ণ পূর্ণাঙ্গ শব্দবোধ অভিধান। যে অভিধান অনুসরণ করে ব্যবহারকারী বা পাঠক শব্দটির যথার্থ প্রয়োগের দিকনির্দেশনামূলক সহায়তা পেতে পারে। এই অভিধানে বানান, উচ্চারণ, অর্থ, উৎস, ব্যুৎপত্তি, প্রতিশব্দ, পরিভাষা, প্রতিবর্ণ, ব্যাকরণবিষয়ক নির্দেশ, বিশেষ শব্দের দৃষ্টান্ত, সম্ভব হলে প্রথম প্রয়োগের ইতিহাস সন্নিবেশ করা। সেই সঙ্গে বাচ্যার্থ, লক্ষ্যার্থ ও সাঙ্কেতিক অর্থনির্দেশ প্রদান করা। একটি শব্দ বাক্যের মধ্যে কত অর্থে প্রযুক্ত হতে পারে, এই অভিধানেও তা নির্দেশিত হয়। একই অভিধানে সবকিছু সন্নিবেশিত করে বাংলাদেশে একটি প্রয়োগ অভিধান রচনা করা হয়নি। বাজার চলতি যেসব অভিধান রয়েছে, তা পূর্ণাঙ্গ নয়। এসব অভিধানে আছে নানা ভুলভ্রান্তি।

জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চায় বাংলা ভাষার প্রয়োগ ব্যবহারিক জীবনে তার প্রয়োগের থেকে ভিন্নতর। কেননা সেখানে ভাষাকে অনেক বেশি শক্তিশালী, দৃঢ় ও অর্থবহ হতে হয়। প্রয়োগ অভিধানের পদ্ধতি ও অন্তর্ভুক্তির বিষয়ও প্রত্যেক ভাষার প্রকৃতির অনুসারে ভিন্ন হতে বাধ্য। আবার প্রয়োগের সমস্যা বাক্য গঠনের ক্ষেত্রেও অনেক। একসময় লেখাতে আঁকাড়া সংস্কৃত বা ইংরেজীর প্রভাব বাংলা বাক্যেও পড়েছিল। অবশ্য বাংলা গদ্য লেখার শুরু থেকেই প্রায় এর একটা ইতিহাস আছে। কিন্তু মুখের ভাষাই ছিল বরাবরের প্রধান নির্ভর। যদিও এর সঙ্গে সংস্কৃত সমাসনির্ভর অন্বয়ের বা ইংরেজী সিনটেক্সের আদল বাঙালীর লেখায়, এমনকি কথোপকথনে মিশে গেছে অনেক আগেই। এবং তা চলিত শিষ্ট, বাংলার একটা আদর্শ বা চাল তৈরি হয়ে গেছে। আর সেটাই এখন বাংলা ভাষার গড়ন। রবীন্দ্রনাথ বলেছেনও, ‘কথার ভাষার বদল চলছে লেখার ভাষার মাপে। পঞ্চাশ বছর পূর্বে চলতি ভাষায় যেসব কথা ব্যবহার করলে হাসির রোল ওঠত, আজ মুখের বাক্যে তাদের চলাফেরা চলছে অনায়াসেই।’ বিদেশী শব্দের উচ্চারণ ও বানানরীতি অনুসারে তা বাংলা ভাষায় গ্রহণ করতে হবে, নাকি বিদেশী শব্দসমূহকে বাংলা ভাষায় উচ্চারণ ও বানানরীতি অনুসারে লিখতে হবে- সে নিয়ে বিতর্ক অনেক দিনের। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, বিদেশী শব্দকে বিদেশী উচ্চারণ ও বানানরীতি মেনে লিখতে হলে বাংলায় নতুন নতুন বর্ণ তৈরি করা আবশ্যক। বাংলার বাক্য গঠনে শব্দ প্রয়োগ-অপপ্রয়োগের সীমারেখা জানা না থাকায় নিয়ত ভুল শব্দ, ভুল বাক্যের মুখোমুখি হতে হয়। অন্য ভাষায় যা-ই হোক, বাংলার মতো জীবন্ত ভাষাতে প্রয়োগের সমস্যার ক্ষেত্র অনেক ব্যাপক ও ক্রমবর্ধমান।

‘দিন দিন বাঙ্গালা ভাষার উন্নতি ও তৎসঙ্গেই বিবিধ নতুন শব্দ ব্যবহৃত হইতেছে। বাঙ্গালা ভাষায় বিবিধ ভাব প্রকাশক শব্দের অত্যন্ত অভাব আছে। সুতরাং বাঙ্গালা গ্রন্থ প্রণেতা মাত্রেই নতুন নতুন শব্দ প্রণয়ন ও অনেক অব্যহৃত শব্দ প্রয়োগ করিয়াছেন, সেই সমুদয় শব্দের অর্থ প্রায় কোন অভিধানেই পাওয়া যায় না, তন্নিমিত্ত বাঙ্গালা পাঠকগণের নিকট এই ভাষা সময়ে সময়ে এক অভিনব ভাষা বলিয়া প্রতীয়মান হয়; আমি সেই অভাব পরিহারে কৃত সংকল্প হইয়া প্রথমত নানাবিধ বাঙ্গালা পুস্তকপাঠ করিয়া বহুসংখ্যক নতুন শব্দ সংগ্রহ করিয়া ধাতু ও লিঙ্গ সহিত শব্দদীধিত নামে এই অভিধানখানি প্রচারিত করিলাম।’ ঢাকা থেকে ১৮৬৪ সালে প্রকাশিত প্রথম বাংলা অভিধানের ভূমিকায় সংকলক ঢাকা নর্মাল স্কুলের প-িত শ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যায় এই ভাষ্য রেখেছেন । আর বিশ শতকের সূচনা সময় থেকে বাংলা ভাষা সাহিত্যের দ্রুতবৃদ্ধি, সংবাদপত্র সাময়িকপত্রের সংখ্যাবৃদ্ধি, আইন-আদালতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, জ্ঞান-বিজ্ঞান, ধর্ম দর্শনের বিতর্ক বিচারে অর্থাৎ বাঙালী জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধ হয় তীব্রভাবে। ফলে সঙ্গতকারণেই বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও অভিধান চর্চার ক্ষেত্রে সূচিত হয় এক নতুন অধ্যায়ের। নানা আকারে বিচিত্র উদ্দেশ্যে বাংলা ভাষায় সঙ্কলিত হতে থাকে বহুবিধ পরিভাষা কোষগ্রন্থ এবং অভিধান। কিন্তু ব্যবহারিক ব্যাকরণ বা ব্যবহারিক অভিধান পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি আজো।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রূপান্তরিত হয় জীবন্ত ভাষা। জীবনে এবং সাহিত্যে শব্দের অর্থান্তর, অর্থ সঙ্কোচন, কিংবা সম্প্রসারণ হয়ে ওঠে অবশ্যম্ভাবী। ভাষার রীতিতে, বানানে, বাকবিন্যাসে, শব্দ যোজনার একালিক পরিবর্তনে প্রয়োজন হয় নতুন যুগের নতুন অভিধান। ব্যাকরণ ও অভিধান মানবজাতির সকল জীবন্ত ভাষা ও সাহিত্যের অনুগামী হয় এবং উভয় জাতীয় জীবনে বর্তমানের প্রয়োজন সাধক, ভবিষ্যতের ভিত্তিভূমি এবং নতুন নতুন সংস্করণের যোগ্য হয়ে থাকে। অর্থগত না হয়ে শব্দগত লিঙ্গানুশাসন স্ত্রীলিঙ্গবাচক ও ক্রিয়ান্বয়ী বিশেষণ প্রয়োগ পদ্ধতি যে কোন ভাষাকে জটিল করে তোলে। বাংলা ভাষায় এমন অনুশাসনের তেমন প্রয়োজন নেই অবশ্য। জীবন্ত ভাষার রূপ পরিবর্তনে মৌখিক ভঙ্গির প্রভাব থাকে। এটি ধরা পড়ে বাক্যের অঙ্গ সংগঠনে, শব্দের উচ্চারণে, বানানের রীতি বদলে। তথ্যপ্রযুক্তি তথা বিজ্ঞানের বিপুল অগ্রগতি ও বিকাশ এবং শিল্প-বাণিজ্যের প্রসার ও বিনিময় এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ভাষার অঙ্গরূপে আনে অভিনবত্ব এবং এভাবে ভাষার প্রয়োগবৈচিত্র্য ও ব্যবহার উপযোগিতা বেড়ে যায়। প্রয়োগের পৌনঃপুনিকতাই অভিধানে ঘুমন্ত শব্দগুলোর জাগ্রত সত্তা ও উপযোগিতা। ব্যবহারিক উপযোগিতাহীন শব্দ স্থিরবদ্ধ, নিশ্চল মৃত। ব্যবহার না হতে হতে অনেক শব্দ স্মৃতিতেও লুপ্ত হয়ে যায়। গত চারদশকে আমাদেরই ব্যবহৃত অনেক শব্দ, বাক্য আর উচ্চারিত হয় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বদলে বা মুছে গেছে। শিল্প, সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের ব্যাপক প্রসার এবং ভাষা ব্যবহারকারীর সংখ্যাবৃদ্ধির কারণে ভাষার প্রয়োগ বৈচিত্র্যেরও রয়েছে বহুমাত্রিকতা। প্রকাশক্ষম ঋদ্ধ ভাষা এবং জীবন্ত ভাষা বাংলার ব্যবহারগত এই শব্দভা-ারের জন্যই প্রয়োগ অভিধান আবশ্যিক। শব্দের প্রয়োগ বৈচিত্র্য যাতে অনায়াসে লব্ধ হওয়া যায়, অর্থাৎ বাংলা শব্দের চলমান রূপের পরিচায়ক-আকারে যা-ই হোক, ব্যবহারিক প্রয়োজনে কার্যকর এমন অভিধান অর্থাৎ প্রয়োগ অভিধান প্রয়োজন তীব্রতর হলেও কাজটিতে এগিয়ে আসার লক্ষণ নেই কোথাও। বানানের বিশৃঙ্খলা যেমন কাম্য নয়। তেমনি কাম্য নয় শব্দের অশুদ্ধ প্রয়োগ। প্রয়োগ অভিধান এই সমস্যার সমাধানে সহায়ক অবশ্যই। রবীন্দ্রনাথ তার বাংলা ভাষা পরিচয় গ্রন্থে বলেছেন, ‘আমাদের দেহের মধ্যে নানা প্রকার শরীর যন্ত্র মিলে বিচিত্র কর্মপ্রণালীর যোগে শক্তি পাচ্ছে প্রাণ সমগ্রভাবে। আমরা তাদের বহন করে চলেছি কিন্তু কিছুই চিন্তা না করে। তাদের কোন জায়গায় বিকার ঘটলে তবেই তার দুঃখবোধে দেহব্যবস্থা সম্বন্ধে বিশেষ করে চেতনা জেগে ওঠে। আমাদের ভাষাকেও আমরা তেমনি দিবারাত্র বহন করে নিয়ে চলেছি। শব্দপুঞ্জে বিশেষ্য বিশেষণে সর্বনামে বচনে লিঙ্গে সন্ধি প্রত্যয়ে এই ভাষ্য অত্যন্ত বিপুল ও জটিল। অথচ তার কোন ভার নেই আমাদের মনে। বিশেষ কোন চিন্তুা নেই। তার নিয়মগুলো কোথাও সঙ্গত কোথাও অসঙ্গত, তা নিয়ে পদে পদে বিচার করে চলতে হয় না। আমাদের প্রাণশক্তি যেমন প্রতিনিয়ত বর্ণে গন্ধে রূপে রসে বোধের জাল বিস্তার করে চলেছে, আমাদের ভাষায় তেমনি সৃষ্টি করেছে কত ছবি, কত রস- তার ছন্দে, তার শব্দে। কত রকমের জাদুশক্তি।’

বাংলাদেশে দেখা যায়, পদ্যের শব্দ গদ্যে যথেচ্ছ ব্যবহার করা হচ্ছে। ‘সাথে’ আর ‘সঙ্গে’র পার্থক্য যে আছে, তা-ও মানা হয় না। রবীন্দ্রনাথ ‘সবার সাথে যোগে যেথায় বিহারো’ এবং ‘আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ’ কেন লিখেছিলেন, সেটাই স্পষ্ট নয় অনেকের কাছে। ‘অনবরত’ বা ‘অবিরাম’ এর মতো সুন্দর শব্দ থাকা সত্ত্বেও ‘লাগাতর’ শব্দ ব্যবহার করা হয় সংবাদপত্রে। আরও দেখা গেছে বাঙালী চেঁচামেচির ভাষা হিসেবে বাংলার চেয়ে ইংরেজী পছন্দ করে।

বাংলা বানানের ক্ষেত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। যুক্তাক্ষরকে ভাঙা, ই ঈ-কারের সংস্কার সাধন, ‘র’ ফলা ‘ব’ ফলা, অনুস্বর-বিসর্গ ইত্যাদির ব্যবহার নানাভাবে করা হচ্ছে। সে জন্য সম্ভবত প্রয়োজন বাংলা বানানের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা দূরীকরণ ও তৎসম তদ্ভব শব্দের সংস্কার সাধন। ভাষাকে চলমান রাখে মূলত: ভাষার ব্যাকরণ। কথ্য ভাষাতেও রয়েছে ব্যাকরণের অনুশাসন। শব্দ যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করা যায় না। আর লেখার ক্ষেত্রে ব্যাকরণের অনুপস্থিতি তো ভাবা যায় না। ব্যাকরণ মূলত ভাষার মেরুদ-কে সোজা রাখে। তার সচল, সরল প্রবাহমানতা ক্ষুণœ করে না। অনুরূপভাবে অভিধান ভাষার ক্ষেত্রে পরিভাষা, বানান প্রভৃতির অভিভাবক স্বরূপ। ভাষাশিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যাকরণের চাপটা একুশ শতকে কিছুটা হলেও কমেছে। বাংলা বানানের ক্ষেত্রেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। কম্পিউটার তথা তথ্যপ্রযুক্তির কারণে বানান রীতিতে পরিবর্তন দেখা যায়। বানানবিধিও পরিবর্তিত হচ্ছে তাই স্বাভাবিক কারণে।

এটাতো প্রভাব ফেলেছে যে, সংস্কৃত প্রভাবিত সাধুভাষা লেখার ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার যাত্রারম্ভ হয়েছিল। পরে চলিত ভাষা চালু হয়। বঙ্কিমচন্দ্রের বাংলা আর রবীন্দ্রনাথের বাংলা কিংবা বিদ্যাসাগরের বাংলা আর শরৎচন্দ্রের বাংলা কিংবা আমাদের কালে হাসান আজিজুল হক আর হুমায়ূন আহমদের বাংলা এক নয়। উপন্যাসের ক্ষেত্রে বিভিন্ন অঞ্চলের কথ্য ভাষা ঠাঁই পেয়েছে। বাংলা ভাষা ব্যবহারকারীরা এই একুশ শতকে এসেও সাধু ও চলিতের ফারাক টানায় শ্রমবিমুখ। সাধু-চলিতের গুরুচ-ালি এখনও মেলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চ দফতরেও। ‘বাংলা সাহিত্যের প্রতি অবজ্ঞা’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘যাহারা বাংলা লেখেন তাহারাই বাংলা ভাষার বাস্তবিক চর্চা করেন; অগত্যাই তাহাদিগকে বাংলা চর্চা করিতে হয়। বাংলা ভাষার প্রতি তাহাদের অনুরাগ শ্রদ্ধা অবশ্যই আছে। বঙ্গভাষা রাজভাষা নহে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা নহে, সম্মানলাভের ভাষা নহে, অর্থোপার্জনের ভাষা নহে, কেবলমাত্র মাতৃভাষা। যাহাদের হৃদয়ে ইহার প্রতি একান্ত অনুরাগ ও অটল ভরসা আছে তাহাদেরই ভাষা। যাহারা উপেক্ষা করে দূরে থাকেন তাহারা বাংলা ভাষার প্রকৃত পরিচয় লাভ করিতে কোন সুযোগই পান নাই তাহারা তর্জমা করিয়া বাংলার বিচার করেন। অতএব সভয়ে নিবেদন করিতেছি, এরূপ স্থলে তাহাদের মতের অধিক মূল্য নাই।‘ বাংলা ভাষা, শব্দতত্ত্ব, ব্যাকরণ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ। তাঁরও জানা ছিল, বাংলা ভাষার গঠন রীতিতে অনেক কিছু অনাবিষ্কৃত রয়েছে। এবং বাংলা ব্যাকরণ নতুনভাবে বর্ণনা করা প্রয়োজন। চলিত বাংলাকে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন প্রাকৃত বাংলা। রবীন্দ্রনাথ পরবর্তী সময় থেকেই প্রয়োগ অভিধান প্রয়োজনÑ এমন আপ্তবাক্য উচ্চারিত হলেও উদ্যোগ দেখা যায়নি। প্রয়োগ বা বানান সংক্রান্ত অভিধানের প্রয়োজন প্রতিমুহূর্তে। যুগ, সময়, উচ্চারণ বদলে যাচ্ছে। ভাষার আলোকে নিত্য নতুন শব্দ আবার লুপ্তও হচ্ছে। অথচ ভাষা ব্যবহারকারীর কাছে এখনও ভাষার জটিল গিঁট খুলছে না।

১৮১৭ সালে মুদ্রিত রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ সঙ্কলিত ‘বঙ্গভাষাভিধান’কে প্রয়োগ অভিধানের প্রাথমিক প্রয়াস বলা যায়। এ শব্দকোষকে অবশ্য বলা হয়, বাংলা ভাষায় মুদ্রিত প্রথম বাংলা অভিধান। ভূমিকায় তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘স্বদেশবাসীর মধ্যে অনেকেই পত্র অথবা দলিলাদি লিখনে সাধু শব্দের অভাব অনুভব করিয়া থাকেন। এই অভাব দূরীকরণার্থ সংস্কৃত হইতে উদ্ভূত সকল প্রচলিত সকল বাঙ্গালা শব্দ সংগ্রহ করিয়া তাহাদের মূল ও প্রতিশব্দসহ এই অভিধান সঙ্কলন করিয়াছি।’ তিনি আশাপ্রকাশ করেছিলেন যে, এ অভিধানের সহায়তায় বাংলাভাষী মানুষেরা বাংলা শব্দের শুদ্ধ বানান ও তার যথার্থ অর্থ বুঝতে পারবে। অভিধানটি সেকালে বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল।

ভাষার ব্যবহার যেহেতু নিজেকে প্রকাশ করার প্রয়োজন থেকে উদ্ভূত, সেহেতু যে কোন ভাষার প্রচলন-তার প্রয়োগের ব্যাপ্তি, অর্থবহনের ক্ষমতা ও ব্যঞ্জনার গভীরতাÑ সে ভাষা ব্যবহারকারীদের মানসিক অভ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিটি ভাষার অন্তর্লীন প্রকৃতি যেহেতু পরস্পর থেকে সম্পূর্ণ পৃথক এবং প্রতিটি ভাষার শব্দ ব্যবহারের ও বাক্য গঠনের যেহেতু নিজস্ব স্বতন্ত্ররীতি রয়েছে, সেহেতু একটি বিশেষ ভাষা ব্যবহারের মানসিক অভ্যাসের ওপর ভিত্তি করে অন্য ভাষায় নিজেকে প্রকাশ করার চেষ্টা নিষ্ফল। ভাষায় পরিবর্তন ঘটছে। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন, ‘আস্তে আস্তে বদল তার চলেইছে, দু-তিন শো বছর আগেকার ভাষার সঙ্গে পরের ভাষার তফাত ঘটে আসছেই। তবু বিশেষ জাতের ভাষার মূল স্বভাবটা থেকে যায়, কেবল তার আচারের কিছু কিছু বদল হয়ে চলে। সেই জন্যেই প্রাচীন বাংলা ভাষা বদল হতে হতে আধুনিক বাংলায় এসে দাঁড়িয়েছে, অমিল আছে যথেষ্ট, তবু তার স্বভাবের কাঠামোটা নিয়ে আছে ঐক্য।’

বাংলা ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখন তো ব্যাকরণ ধরাশায়ী। ভাষা ও শব্দ প্রয়োগ অযতœ লালিত। কোথাও বিশেষণের ভারে ন্যুব্জ। ১৯৭৫ সালের ২১ জুলাই বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের অধিবেশনে জীবনের শেষভাষণে ভাষাচায সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় সখেদে বলেছিলেন, ‘মাতৃভাষার চর্চায় যে কিছুটা পরিশ্রম অবশ্য কর্তব্য, কিছুটা জিজ্ঞাসা ও বিচার বিবেচনা বিশেষভাবে অপেক্ষিত-সে কথা আমরা ভুলিয়া যাইতেছি। কি বানানে, কি ব্যাকরণে, কি শব্দ প্রয়োগ, কি বাক্যরীতিতে, কি ভাষায় স্বকীয় প্রকৃতির সহিত পরিচয় কিঞ্চিৎ অভিনিবেশ না থাকিলে যে সেই ভাষা ঠিকমতো সানন্দ-সাবলীলভাবে লিখিত পারা যায় না, তা আমাদের বোধ-বিচারের বাহিরে চলিয়া যাইতেছে।’ হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ‘বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘বাংলা ভাষা লিখিতে গেলে প্রথমত রচনা প্রণালী লইয়া বড়ই গোল বাঁধে। একদল জনমেজয় যেমন সাপ দেখিলেই আহূতি দিতেন সেই রূপ পারসী কথা দেখিলেই তাহাতে তাঁহারা আহূতি দিতেন। আর একদল আছেন তাহারা সংস্কৃত কথার প্রতি সেইরূপ সদয়।’

শব্দ তৈরিতে রবীন্দ্রনাথের অভিজ্ঞতা ছিল। অভিধান পর্যায়ের কাজ তিনি যা করেছেন, তা হলো কিছু ইংরেজী শব্দের বাংলাকরণ। সেগুলো সংস্কৃত শব্দভা-ার থেকে নেয়া। বাংলা ও ইংরেজী বর্ণানুক্রমিক তালিকায় সেগুলো সাজিয়েছেন। বলেছেন তিনি, ‘বাংলা ভাষায় গদ্য লিখতে নতুন শব্দের প্রয়োজন প্রতিদিনই ঘটে। অনেকদিন ধরে অনেক রকম লেখা লিখে এসেছি সেই উপলক্ষে অনেক শব্দ আমাকে বানাতে হলো। কিন্তু প্রায়ই মনের ভেতরে খটকা থেকে যায়। সুবিধা এই যে বারবার ব্যবহারের দ্বারাই শব্দ বিশেষের অর্থ আপনি পাকা হয়ে ওঠে, মূলে যেটা অসঙ্গত, অভ্যাসে সেটা সঙ্গতি লাভ করে।’

বুদ্ধিমুক্তি আন্দোলনের প্রবক্তা কাজী আবদুল ওদুদ প্রণয়ন করেছিলেন ব্যবহারিক শব্দকোষ ১৯৫৩ সালে। ভূমিকায় লিখেছিলেন, ‘বাংলা ভাষা তার বিচিত্রমূল সাধারণ অ-সাধারণ শব্দ ও শব্দ সংক্ষেপ নিয়ে বর্তমানে যে বিশিষ্ট রূপ ধারণ করেছে, ক্ষেত্র বিশেষে করতে চাচ্ছে, সে সবের সঙ্গে প্রধানত শিক্ষার্থীদের যথাসম্ভব অন্তরঙ্গ পরিচয় ঘটানো ব্যবহারিক শব্দকোষের উদ্দেশ্য।’ তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন শব্দের সুষ্ঠু প্রয়োগের ওপর। শব্দের প্রয়োগ রূপ ও প্রয়োগ উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন। একই শব্দের আওতাধীন আর যত শব্দ বা প্রয়োগ রূপ আছে; তার প্রত্যেকটিকে সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ করে অর্থও দিয়েছেন। প্রবাদ প্রবচন ও বিশিষ্টার্থক বাক্যাংশের নমুনাও দিয়েছেন বেশ। সে সময় খুব জনপ্রিয় হয়েছিল এই শব্দকোষ। যা প্রয়োগ অভিধানেরই প্রাক অভিধান বলা যায়। কাজী আবদুল ওদুদ অধিকাংশ শব্দের ব্যুৎপত্তি দিয়েছেন। সংস্কৃত শব্দ, সংস্কৃতজাত শব্দ, দেশী ও বিদেশী শব্দ, আরবী-ফারসী শব্দ রয়েছে। সংস্কৃত শব্দগুলোর যথাসম্ভব ব্যুৎপত্তি নির্দেশ করা হয়েছে। সঙ্কেত দিয়ে শব্দের জাতি ও পদ পরিচয় দেয়া হয়েছে। এতে বাংলা বানানের নিয়মাবলী এবং বিভিন্ন জ্ঞান বিষয়ের পরিভাষা সংযুক্ত ছিল।

ষাটের দশকের মাঝামাঝি বাংলা একাডেমির বাংলা ভাষা সমীক্ষায় বর্ণবৈচিত্র্য ও অপপ্রয়োগের আধিক্য দেখে ভাষাবিদ শহীদ মুনীর চৌধুরী আক্ষেপ করে ‘বাংলা গদ্যরীতি’ প্রবন্ধে বলেছিলেন, ‘যদি উচ্চশিক্ষিত পূর্বপাকিস্তানীর বাংলা এত গুরুতর রূপে অশুদ্ধ হয় তা হলে স্বল্পশিক্ষিতদের লেখা সম্ভবত আদ্যোপান্ত প্রমাদপূর্ণ। এই সিদ্ধান্তকে সম্প্রসারিত করে কেউ হয়ত এমন দাবিও করতে পারেন যে, ব্যাকরণের এই নিয়ম ভঙ্গতাই পূর্বপাকিস্তানী গদ্যরীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আমরা তা মনে করি না। কারণ সমগ্র ভাষার স্বকীয় প্রবণতা অক্ষমের অপটু রচনার আলোকে নিরূপিত হতে পারে না। এমন কি প্রতিষ্ঠিত লেখকের অযতœ লালিত আঞ্চলিক পুষ্ট, শিরভ্রষ্ট অশুদ্ধ প্রয়োগও ভাষার পূর্ণ তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্যরূপে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য নয়।’ বাংলা শব্দ বা বাক্য সুপ্রয়োগের প্রসঙ্গ যখন আসে, তখন অপপ্রয়োগের বিষয়টিও সামনে আসে। দূরন্বয় বা স্থানভ্রষ্ট শব্দ, অপ্রচলিত বা পরিত্যক্ত শব্দ, অশিষ্ট ও গ্রাম্য শব্দ, গতানুগতিক বা ব্যবহারজীর্ণ শব্দ, ভুঁয়ো শব্দ ইত্যাদি প্রত্যেকটির স্বতন্ত্র উপস্থাপনা থাকা যথাযথ প্রয়োগ অভিধানে। এসব শব্দ ব্যবহার কতদূর সমীচীন তা নির্ভর করে অবশ্য প্রয়োজনের ওপর, রচনাশৈলীর ওপর। কেননা অনাবশ্যক শব্দও প্রচলিত হয়ে যায় এবং সেই সঙ্গে নতুন মাত্রা ও দ্যোতনা পায়। আরও আছে দীর্ঘ অস্বচ্ছ বাক্যর শৈলীগত দিকের উল্লেখ। বাংলা ভাষা ব্যবহারকারীরা এমনিতেই শব্দবাহুল্য পছন্দ করে। অকারণে সংস্কৃত ব্যাকরণকে অনুসরণ করে স্ত্রী বাচক বিশেষণ ব্যবহার করাও আর একটা লক্ষণ। কিংবা ঝোঁক দেয়ার জন্য শব্দের সঙ্গে ‘ই’ বা ‘ও’ র যোগ অনেক সময় অনিবার্য হলেও, অনেক সময়ই আবার বাড়াবাড়ি। কানকে পীড়িত করে এমন শব্দও ব্যবহৃত হয়। শব্দের ফাঁক ফাঁক বসা আর জড়াজড়ি করে বসার ক্ষেত্রে আছে ভ্রান্তি। একেকজন একেকভাবে ব্যবহার করে। বাংলায় যতি চিহ্ন ঐতিহাসিক ক্রমে ইংরেজীর যতি চিহ্নের অনুসারী। কিন্তু এ ভাষায় যতি চিহ্নের ব্যবহারে কানেও অতিনির্দিষ্টতা নেই, ইংরেজীর তুলনায় এমনকি বিরাম চিহ্নও বাংলায় সন্ধি বা বাংলায় বিভক্তি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ভেবেছেন। বাংলা ভাষায় যে এদের স্বতন্ত্র ধরন থাকা প্রয়োজন, সেও তিনি বলেছেন।

বাংলা ভাষায় সহজিয়া সাধনার জোয়ার বইছে। টানা বাংলা বেশ কয়েকছত্র লিখে ফেলবেন, এমন লেখকের সংখ্যা ক্রমহ্রাসমান। ভাষাবিদ জ্যোতিভূষণ চাকী গত শতকের শেষে লিখেছেন, ‘যাহা প্রথমে মনে আসিল তাহাই লিখিয়া ফেলিলাম, তাহা আবাক্য কি কুবাক্য তাহাতে ভ্রুক্ষেপই করিলাম না। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, হরপ্রসাদ, রামেন্দ্রসুন্দর, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র যে ঐতিহ্য গড়িয়া তুলিয়াছেন তাহার প্রাণরস হৃদয়ে প্রবাহিত না করিয়া লইলে যে রূপ লেখা হওয়া সম্ভব তাহাই হইতেছে। পুরাতনের মূল স্রোতের সহিত বিচ্ছেদ ঘটিলে আধুনিকতা যেন নির্জীব হইয়া পড়ে। সেই নির্জীবতার লক্ষণই আমরা দেখিতেছি। মুদ্রণ নির্ভুল করিবার সযতœ প্রয়াসই বা কোথায়? মুদ্রণপ্রমাদ যে রসাপকর্ষ ঘটায় তাতে কোন সন্দেই নাই। প্রথমশ্রেণীর পত্র-পত্রিকাতে এ বিষয়ে তেমন সতর্কতা দেখি না। একটি বিদেশী প্রবাদে বলা হইয়াছে সুমুদ্রণই সুসংস্কৃতির মাপকাঠি। মুদ্রণে ঔদাসীন্যের দরুন নর্মদা নর্দমা হইয়া যায়।

বিদেশে শব্দ বা ভাষার সুব্যবহার ও অপব্যবহার নিয়ে অনেক অভিধান রয়েছে। বিশ শতকের গোড়ায় প্রকাশিত দুই ভাই ফাউলারের জগদ্বিখ্যাত বইয়ের বিষয় ছিল ‘রাজভাষা ইংরেজীর ব্যবহার’। তারই বিবর্তনে এক ভাই হেনরি ওয়াটসন ফাউলার ১৯২৬ সালে লিখেছিলেন প্রয়োগ অভিধান। তাদের গ্রন্থের অনেক সংস্করণ বেরিয়েছে। ‘বাংলা ভাষার প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ’ নামে আশির দশকে বাংলা একাডেমি থেকে বেরিয়েছিল একটি গ্রন্থ। সম্পাদকম-লীতে ছিলেন শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী, আহমদ শরীফ, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম ও আনিসুজ্জামান। কিন্তু একে প্রয়োগ অভিধান বলা যাবে না। কারণ প্রয়োগ অভিধানের রয়েছে স্বতন্ত্র ক্ষেত্র। আংশিক আলোচনায় তা পূর্ণতা পায় না। প্রয়োগ অভিধানে অন্তর্ভুক্ত হয় এমন বিষয় নিয়ে গত একশতকে নানা আলোচনা হয়েছে। কার্যকর উদ্যোগ তেমন নেই। কলকাতার আনন্দ পাবিলিশার্স থেকে ১৯৮৪ সালে বেরিয়েছিল ভাষাবিদ সুভাষ ভট্টচার্য রচিত ‘বাংলা প্রয়োগ অভিধান’ ‘নামে অভিধান হলেও বস্তুতপক্ষে এটি একটি আলোচনা’ লেখক নিজেই স্বীকার করেছেন।

জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন, ‘মানুষের ভাষা তবু অনুভূতি দেশ থেকে আলো/না পেলে নিছক ক্রিয়া, বিশেষণ, এলোমেলো নিরাশ্রয়/শব্দের কংকাল।’ বাঙালী বাংলা ভাষার জন্য রক্ত ঢেলেছে। ভাষার জন্য আন্দোলনকে সে স্বাধীনতা আন্দোলন ও যুদ্ধে পরিণত করে ভাষাভিত্তিক নতুন রাষ্ট্র গড়েছে। কিন্তু সেই বাংলা ভাষাকে সর্বজনসম্মত ও সর্বজনগ্রাহ্য করে তোলা থেকে ভাষার উন্নয়ন ও বিকাশে কার্যকর উদ্যোগ ও অবদান দৃশ্যমান নয়। একুশ শতকে এসেও শুদ্ধভাবে বাংলা লেখা না গেলে সকলি বৃথা, ‘সকলি গরল ভেল’ যেন।

প্রকাশিত : ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২৭/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: