কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

চিরবিদায় হে কৌতুকাভিনেতা...

প্রকাশিত : ২ জুলাই ২০১৫

হাসির মানুষও কাঁদায় তাহলে! খুবই দুঃখজনক যে, এটা অভিনয় ছিল না। অভিনয় হলেই ভাল হতো। তার অভিনয়ে হেসেছি প্রচুর, কাঁদতেও আপত্তি ছিল না। কিন্তু... সত্যি সত্যি কাঁদতে কষ্ট হচ্ছে। চলে গেছে গত সোমবার, চলে গেছে সেদিনের সেহরি খাওয়ার পরের মুহূর্ত, সেই সঙ্গে সঙ্গেই চলে গেছেন পাপ্পু। হ্যাঁ... ‘শুভেচ্ছা’র সেই রাশেদুজ্জামান পাপ্পু। সত্যি সত্যিই চলে গেছেন অন্য কোন পৃথিবীতে। বিস্তারিত লিখেছেন-

মাহবুবুর রহমান সজীব

৪৭ বছর বয়সী পাপ্পুর জীবনে সোমবার এসেছে বহুবার। রমজানও এসেছে অনেক। কিন্তু এমন একটি রমজান মাস, এমন একটি সোমবার কি তিনিও প্রত্যাশা করেছিলেন? হয়তো না... হৃদরোগে ভুগছিলেন তিনি। মাস কয়েক আগে ক’দিন হাসপাতালেও থেকে এসেছেন। তারপর থেকেই অসুস্থতা তার নিত্যসঙ্গী। তবে, সেটা খুব খারাপ অসুস্থতা নয়, অল্প অসুস্থতা। কাজও করেছেন এর ফাঁকে বেশ। হঠাৎ করেই কী যে হলো এদিন! সেহরি খেয়েছেন ঠিকঠাক। তারপরই অনুভব হলো চিনচিনে ব্যথার। আস্তে আস্তে বাড়তে থাকল সে ব্যথা। ওষুধ কিনতে স্ত্রীসহ নিচে নামবেন ঠিক করেছিলেন, তার আগে একটু ওয়াশরুমে ঢুকেছিলেন ফ্রেশ হতে; ফিরেছেনও সেখান থেকে... তবে, সদা হাস্যোজ্জ্বল পাপ্পু ফেরেননি। ফিরেছেন অন্য পাপ্পু, নিথর পাপ্পু...।

তার মামা জাভেদ বললেন, ‘দুই-তিন মাস আগে পাপ্পুর স্ট্রোক করেছিল একবার। একটু সুস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঈদের শূটিং নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায়। গত সপ্তাহেও ও আমাকে বলেছিল- মামা, ঈদের ব্যস্ততা শেষ করেই তোমাকে নিয়ে ভাল একজন ডাক্তারের কাছে যাব। আমাকে আর নিল না। ভাগিনা একা একাই চলে গেল আসল ডাক্তারের কাছে।’

‘ইত্যাদি’তে দলীয় নাচের মাধ্যমে ক্যারিয়ার শুরু করেন ভোজনরসিক পাপ্পু। তবে, সবচেয়ে বেশি খ্যাতি এনে দেয় তাকে বিটিভির ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘শুভেচ্ছা’ আর ‘মোল্লা লবণ’ এর বিজ্ঞাপন। কিভাবে আসলেন তিনি শুভেচ্ছায়? ছাড়লেন কিভাবে ইত্যাদি? কিভাবে হলেন নৃত্যশিল্পী থেকে কৌতুকাভিনেতা? জানালেন শুভেচ্ছার জনক-উপস্থাপক-নির্মাতা ডা. আব্দুন নূর তুষার।

‘পাপ্পুর সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৯৫ সালের কোন এক বিকেলে। মাসটাও মনে আছে, সেপ্টেম্বর। আমি তখন হন্যে হয়ে কিছু স্টেজ পারফর্মার খুঁজছি, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান শুভেচ্ছার জন্য। তখন আরেক জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ইত্যাদির বদৌলতে আমি খানিকটা বিপাকে ছিলাম। কারণ, এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পীরা অন্য কোন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারত না। কড়া নিষেধ ছিল। যার ফলে শুভেচ্ছার প্রতিটি পর্বে সঠিক পারফর্মার খুঁজতে খুঁজতে আমাকে নাকানি-চুবানি খেতে হতো।

যাই হোক, এমন এক পরিস্থিতিতে দেখা পাই পাপ্পুর। জানতে পারি, নানা বাধা-নিষেধ সত্ত্বেও সে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। জেনে প্রীত হলাম। আরও জানতে পারি, সে ইত্যাদির বিভিন্ন দলীয় নাচের নিয়মিত শিল্পী। পাপ্পুকে বললাম- নাচের শিল্পী তো আমার লাগবে না। সে আমাকে চমকে দিয়ে বলল- ভাই আমি কৌতুক করতে চাই। নাচতে আর ভাল লাগে না। আমি বললাম- ভাল কথা। দেখি তোমার কৌতুক শোনাও। শোনাল। তেমন ভাল লাগল না। তবে লক্ষ্য করলাম- তার গল্প ভাল না হলেও বলার ধরন অসাধারণ।

শুধু অভিনয় গুণ দেখে তাকে নিয়ে ঝুঁকি নিলাম। আমি নিজেই কিছু কৌতুক লিখে দিলাম। দেখলাম, অসাধারণ অভিনয় করছে ও। সাহস পেলাম। সেপ্টেম্বরের শুভেচ্ছাতেই নৃত্যশিল্পী পাপ্পুকে তুলে ধরলাম কৌতুক অভিনেতা হিসেবে। পাপ্পুর জন্য বন্ধ হয়ে গেল ইত্যাদির দরজা। বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে শুরু হলো শুভেচ্ছা আর পাপ্পুর একসঙ্গে সফল পথচলা।

এখানেই ক্যারিয়ারকে সীমাবদ্ধ রাখেননি পাপ্পু। কাজ করেছেন প্রচুর। তার অসংখ্য কৌতুকের অডিও এ্যালবাম বাজারে ছিল, হয়ত এখনও আছে। ‘আরে তুই!’, ‘সাইড লন’, ‘মাফ চাই’ ইত্যাদি যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। তিনি বড় পর্দায়ও ছিলেন সাবলীলভাবে। অভিনয় করেছেন ১৪টি চলচ্চিত্রে। শুরুটা সিরাজ হায়দারের ‘সুখ’ দিয়ে। আর থেমে থাকেননি। একের পর এক কাজ করেছেন ‘আখেরি হামলা’, ‘শত্রু সাবধান’, ‘মেয়েরা মাস্তান’, ‘ফায়ার’, ‘ভ- বাবা’, ‘কালো চশমা’, ‘আজ গায়ে হলুদ’ প্রভৃতি ছবিতে। সর্বশেষ তিনি অভিনয় করেন ‘ময়নামতির সংসার’-এ।

কেমন কাজ করতেন তিনি? ভক্তরা ভালই জানে তা। আরও ভাল জানে ওই কাজগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। আবদুন নূর তুষার জানালেন, ‘পাপ্পু অনেক শক্তিশালী একজন অভিনেতা। কোন বিষয় একবার বুঝিয়ে দিলেই সে খুব দ্রুত তা আয়ত্ত করে নিতে পারত। তাছাড়া খুব সহজে অন্যকে অনুকরণও করতে পারত।’

ঈদ আসছে ক’দিন পরই। এই ঈদেও পাপ্পুকে দেখা যাবে ছোটপর্দায়। বিটিভির প্রকাশিতব্য ঈদ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘যখন তখন’ ও ‘পথ চলার গল্প’তে পাপ্পু কাজ করেছেন। দুটি অনুষ্ঠানই গ্রন্থনা ও পরিকল্পনা করেছেন আনজির লিটন। তিনি জানালেন, ‘পাপ্পু সর্বশেষ শূটিংয়ে অংশ নেন ২৬ জুন, বিটিভির অডিটরিয়ামে। এদিন তিনি ছোটদের ঈদ অনুষ্ঠান ‘পথ চলার গল্প’তে কৌতুক পরিবেশন করেন।’

অনুষ্ঠান দুটি চলাকালীন সময়ে পাপ্পুর স্ত্রী, সন্তান ও অসংখ্য ভক্তরা তাকে জীবন্ত দেখবেন ঠিকই, শুনবেন ঠিকই, খুঁজে পাবেন না হাতড়ে কোথাও... ব্যাপারটা কেমন লাগছে তার স্ত্রী ও সন্তানের কাছে! কেমন লাগছে ভক্তদের কাছে! তেহারি খেতে খুব পছন্দ করতেন পাপ্পু, তার বেঁচে থাকার শেষ রাতেও তেহারিই খেয়েছেন। আর কি কখনও তেহারি রান্না হবে পুরান ঢাকার লালবাগের ওই বাসায়? আর কি কখনও রিনিঝিনি বৃষ্টিতে আয়োজন হবে ভুনা খিঁচুড়ির? উত্তর জানে না কেউ...

ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে চারদিক। সেই বৃষ্টির জল ভিজিয়ে দিচ্ছে আজিমপুরের গোরস্তান, পাপ্পুর নিথর দেহ, স্ত্রী নিপা আর আট বছর বয়সী ছেলে আবিরসহ অসংখ্য ভক্তের রক্তলাল চোখের পানি...।

প্রকাশিত : ২ জুলাই ২০১৫

০২/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: