আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পাল্টে যাচ্ছে কৃষকের জীবনযাত্রা

প্রকাশিত : ২১ জুন ২০১৫
  • মানিক সরকার মানিক

রংপুর হামার রং-য়ে ভরারে, আরে ও বন্ধু আইসেন হামার বা-আ-ড়ি, মালশিরা ধানের ভাত খোয়ামো, থাকেন দিনা চারি বৈদেশী বন্ধুরে’। রংপুরের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত এই কথাগুলো আসলে একটি গানের কলি। আর এই কথা এবং গানের মধ্য দিয়েই রংপুর অঞ্চলের মানুষ সাধারণত অন্য অঞ্চলের মানুষের প্রতি ফুটিয়ে তুলত তাদের আবেগ-ভালবাসা দিয়ে অন্যেকে নিমন্ত্রণ জানানোর কথা। মালশিরা এ অঞ্চলের একটি বিশেষ ধরনের ধানের চাল। প্রবাদ আছে, রংপুর অঞ্চলের মানুষ খুব বেশি অতিথিপরায়ণ। তাই কৃষকরা ধান কাটার সময় মনের আনন্দে মেতে ওঠে গাইত এই গান। এখন সবকিছুর মতো পাল্টে গেছে কৃষকের জীবনধরন। কৃষিকাজের পাশাপাশি অনেক কাজের সঙ্গেই যুক্ত। তবে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের সীজনে ফিরে আসে সেই পুরনো দৃশ্য,পুরনো গান।কাটা-মাড়াই রীতিও পাল্টেছে এখন। নেই আগের সেই পুরনো ধারা। আগে একজন মজুর বা কামলা দৈনিক হাজিরা হিসাবে কাজ করত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা। এতে তারা মজুরি পেত ২শ’ থেকে আড়াই শ’ টাকা। আর এখন তারা চুক্তিতে কাজ করে একেকজন আয় করে দিনে কমপক্ষে ৫শ’ টাকা। সাধারণত তিনজন মিলে এক দোন জমির (২২ শতকে এক দোন) ৬-৭ ঘণ্টাতেই কেটে ফেলে। এতে তারা পায় ১৫শ’ টাকা। মূলত বছরে বোরো আর আমন ধানের এই দুটি মৌসুমে প্রায় দুই মাস ধান কাটা-মাড়াইয়ের কাজ করলেও সারাবছর তারা যুক্ত থাকে অন্য নানামুখী কর্মে। কিন্তু এই সময়টাতেও এখন ধান কাটা শ্রমিকের ঘাটতি দেখা যায় সরকারী কর্মসৃজন কর্মসূচীর কারণে। ধান কাটা-মাড়াই মৌসুমের সময়েই সরকারী কর্মসৃজন কর্মসূচী শুরু করা হয়। এতে কামলা কৃষাণিরা সবাই ওই কর্মসূচীতে ব্যস্ত থাকে। কারণ সেখানে টাকা বেশি এবং কাজও তেমন করতে হয় না। ফলে কাটা-মাড়াই মৌসুমে কামলা-মজুর সঙ্কটে পড়েন তারা। এ সময় বাড়তি খরচে দূর থেকে কামলা আনতে হয়। অথচ সরকারী এই কর্মসূচী যদি কাটা-মাড়াই মৌসুমের কয়েক দিন আগে কিংবা পরে করা হতো, তবে তাদের এই সমস্যার মুখে পড়তে হতো না।

তবে সরকার কৃষকদের ফসল উৎপাদন ও জীবনমান উন্নয়নে যে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে তা অস্বীকার করার জো নেই। প্রত্যেক উপজেলায় গঠন করা হয়েছে ন্যাশনাল এ্যাগ্রিকালচারাল টেকনোলজিস্ট প্রজেক্ট (এনএপিপি), ইন্ট্রিগ্রেটেড এ্যাগ্রিকালচারাল প্রোডাকটিভিটি প্রজেক্টসহ (আইএপিপি) নানা কমিটি। এসবের মধ্যদিয়ে ফসল এবং কৃষকের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে সরকার। চলতি বোরো মৌসুমে রংপুর অঞ্চলে বাম্পার ফলন হয়েছে বোরোর। কিন্তু বাম্পার ফলনের পরেও মাত্র ক’দিন আগেও কৃষকের মুখে হাসি ছিল না। কারণ বাজারে ধানের দাম ছিল না। ভারতীয় চালের আগ্রাসনের কারণে কৃষকরা তাদের উৎপাদন খরচ ওঠাতে পারত না। এজন্য তারা বাইরে থেকে চাল আমদানিকেই দায়ী করে থাকে। এমনকি ধান জমিতে শুকিয়ে কাঠ হতে চললেও কৃষকরা তা কাটার আগ্রহ দেখায়নি।

সম্প্রতি সরকার চাল আমদানির ওপর ১০ ভাগ শুল্ক আরোপ করায় বেজায় খুশি তারা। এ সংবাদ যেন আর্শীবাদ হয়ে এসেছে তাদের জন্য। তাইতো, এক সময়ের মঙ্গাপীড়িত রংপুর অঞ্চলের কৃষাণ-কৃষাণি আর কামলা-মজুররা এখন মহাব্যস্ত, যেন দম ফেলার ফুরসত নেই তাদের। সোনালি ধানে ভরবে গোলা, আসবে লাল পিরান (কাপড়) আর রুপালি ইলিশ। তাই তো আনন্দে ধানের গোড়ালিতে চিকচিকে কাস্তের ছোঁয়া লাগিয়ে গেয়ে বেড়াচ্ছেনÑ ‘ও মোর চ্যাংড়া বন্ধুরে, মোক ছাড়িয়া তুই কোনটে গেলুরে...’।

প্রকাশিত : ২১ জুন ২০১৫

২১/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: