আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নজরুলের জীবনে নারীর অবদান

প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৫
  • রহিমা আক্তার

১৯৯৫ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে, আমার প্রথম সন্তান রৌদ্র তখন গর্ভে, কলেজ জীবন থেকেই কবিতা পছন্দ করতাম। এরপর জীবন অন্য দিকে ঘুরে যায়। তাই আর কবিতার সঙ্গে থাকা হয়নি। নাজু আপা এসেছে আমার ৭ মাসের অনুষ্ঠান করতে। আপা একটা প্যাকেট হাতে দিল। খুলে দেখি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের ‘সঞ্চিতা’ নামক কবিতার বইটি। সেদিন এতটা আনন্দিত হয়েছি যে, প্রকাশ করতে গিয়ে কেঁদে দিয়েছি। আজ আমার ছোট লাইব্রেরীতে অনেক বই। তবে এই লাইব্রেরীর প্রথম বইটি নজরুলের ‘সঞ্চিতা’। বিদ্রোহী কবিতাটি আমার পছন্দের সেরা কবিতা। ঘাত প্রতিঘাত পার করেছি, সাহস সম্বল ছিল বিদ্রোহী কবিতাটি। আজও পাশে আছে কবির সঞ্চিতা বইটি। কাজী নজরুলের জীবনে বা সাহিত্যের গ-িতে নারীর অবদান সম্পর্কে আল মাহমুদ বলেছেনÑ ‘নজরুলের চরিত্রে এমন একটি সঙ্গীতের ব্যঞ্জনা ছিল, যা নারী ছাড়া ব্যাখ্যা করা যায় না।’ প্রসঙ্গত নজরুলের ব্যক্তি জীবনের কথা বলা যায় এভাবেওÑ যেখানে প্রমীলা, নার্গিস আরা খানমÑ এসব ব্যক্তি চরিত্র নানাভাবে নজরুলকে বিচলিত করেছে। তাঁর ভালবাসার একক কোন পাত্রীর নাম বলা অনুচিত। তিনি বহুবর্ণ, বহুবিচিত্র নারী চরিত্রের সংস্পর্শে এসেছেন। তাদের ভালবেসেছেন, ভালবেসে দুঃখ পেয়েছেন, অশ্রু বিসর্জন করেছেন, কিন্তু ভালবাসার পাত্রীকে অভিশাপ দেননি। বরং সেই ব্যথাতুর অভিজ্ঞতা দিয়ে রচনা করেছেন একের পর এক কবিতা, গান। ‘হিংসাতুর’ এবং ‘রহস্যময়ী’র মতো কবিতা এমন পটভূমিকায়ই রচিত। ফলে তাঁর নিজের জীবন বিরহের অনলে দগ্ধ হয়েছে, কিন্তু তাঁর প্রিয়তমাদের শরীরে সেই দাহের আঁচ লাগেনি।

বাংলা সাহিত্যের এই বিদ্রোহী কবির জীবন ও সাহিত্যের কথা বলতে বা ব্যাখ্যা করতে নারী বিষয় ছাড়া অসম্ভব। এক একটি নারী চরিত্রকে কবি সৃষ্টি করেছেন তার দুঃখে, অশ্রুজলে, হাসিতে আর আনন্দে। কবির সাহিত্যের নারীর মধ্যে গিরিবালা, দোলন, নার্গিস, প্রমীলা, আশালতা নামগুলো প্রথমেই উঠে আসে।

‘ধুমকেতু’ পত্রিকায় ব্রিটিশ সরকার বিরোধী লেখার জন্য কবিকে ১৩ মাসের সশ্রম কারাদ- দেয়া হয়। কারাগারে তাঁকে ডা-াবেড়িও পরানো হয়। হুগলি জেলে থাকা কালে কয়েদিদের প্রতি বৈষম্য, উৎপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতিবাদে নজরুল অনশন শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি দুর্বল ও অসুস্থ হয়ে পড়েন। অনেকের অনেক অনুরোধেও কবি তাঁর অনশন ভঙ্গ করেননি। অবশেষে কুমিল্লা থেকে বিরজা সুন্দরী দেবী এসে কারাগারে নজরুলের অনশন ভঙ্গ করান। এই বিরজা সুন্দরীকে কবি সবচেয়ে বেশি ভক্তি শ্রদ্ধা করতেন। কারাগারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কবি মুক্তি পান। তখন কলকাতায় না গিয়ে তিনি চলে আসেন কুমিল্লায়। জেলে বসে কবি ভাবতেন আশালতাকে। আশালতার আরেক নাম দোলন। আর কবি দোলনকে ‘দুলি’ বলেও ডাকতেন। অনেকের ধারনা, কবি ‘দুলির’ টানেই কুমিল্লায় এসেছেন। কবি তাঁর জীবনের নারীদের নামকরণ করতেন আলাদাভাবে। ‘দোলনচাঁপা’ কাব্যের বিন্দু বিন্দুতে ছিল কবির স্ত্রী প্রমীলা। এখানে কবি আশালতা নাম বদল করে নতুন নামকরণ করেন। কুমিল্লার দৌলতপুরের নার্গিস বেগম কবির আরেক সাহিত্য ভা-ার। ‘গত রাত্রে আপনি কি বাঁশি বাজিয়ে ছিলেন? আমি শুনেছি।’ এমন কথা বলে নার্গিস কবির মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন। নার্গিস বেগমের সঙ্গে কবির আকদ হয়। কিন্তু বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে কবি পালিয়ে যান কুমিল্লায়। দৌলতপুর থেকে ফিরে অসুস্থ হয়ে পড়েন নজরুল। তাঁকে পরিচর্যা করে সারিয়ে তোলেন কুমারী প্রমীলা দেবী। ১৯২২ সালে কবি আবার আসেন কুমিল্লায়। তখন প্রমীলার সঙ্গে তাঁর বিয়ে ঠিক হয়। প্রমীলার মা শ্রীযুক্তা গিরিবালা দেবী এ বিয়েতে পূর্ণ সম্মতি দেন। তিনিই ছিলেন প্রমীলার একমাত্র অভিভাবক। প্রমীলার কাকা শ্রী ইন্দ্র কুমার সেন এ বিয়েতে রাজি ছিলেন না। ইন্দ্র কুমারের স্ত্রী ছিলেন বিরজা সুন্দরী। বিরজা সুন্দরী নজরুলকে ছেলের মতো ভালবাসতেন। এত বাধার পরও হার মানেননি গিরিবালা। গিরিবালার দৃঢ় অবস্থানের কারণেই নজরুল-প্রমীলার বিয়ে হয়।

নারী ছাড়া নজরুলের সাহিত্য পরিপূর্ণ হতো না। তবে সত্য যে নজরুলের নারীরা কখনও কল্পনায় আবদ্ধ ছিল না। বাংলা সাহিত্যে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মতো আর কোন কবিতা হয়নি। নজরুল তাঁর সমগ্র সাহিত্যে এবং জীবনে নারীর জীবন নারীর আদর্শ, মহিমা ও অবদান অনুজ্জ্বল রাখেননি। বাঙালী নারীর জীবন আদর্শ স্বয়ংসম্পূর্ণতা দিয়ে প্রকাশ করেছেন তার সাহিত্য দিয়ে। নজরুল ‘দোলনচাঁপা’ কাব্যগ্রন্থ প্রমীলাকে উৎসর্গকালে লিখেছেনÑ ‘দেবী তুমি সতী অন্নপূর্ণা নিখিল তোমার ঋণী/ সব ত্যাজি মোর হলে সাথী/ আমার আশায় জ্বলছে বাতি/ তোমার পূজা বাজে আমার হিয়ার কানায় কানায়/ তুমি সাধ করে মোর ভিখারিণীর সেই কথা সে জানায়।’ ‘পূজারিণী’, ‘বিজয়িনী’, ‘মনের মানুষ’, ‘বুঝবে সেদিন বুঝবে’ কবিতাগুলো কবি প্রমীলাকে উদ্দেশ্য করেই লিখেছেন। বালিকা বয়সে বধূ হয়ে এসে প্রমীলা এই ছন্নছাড়া কবির জীবনকে সংসারের সাধ দিয়েছেন।

নারী বলতে নজরুলের শুধু নায়িকা চরিত্রই ছিল না। নজরুলের জীবনে ‘মা’ শব্দটি অনেক ক্ষেত্রে অনেক অবদান রেখেছে। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় কবির জীবন ও সাহিত্যে তাঁর গর্ভধারিণীর তেমন কোন প্রভাব ছিল না। ছোটবেলা থেকে অনেকটা অভিমান করেই কবি তাঁর নিজের মায়ের সঙ্গে তেমন কোন সম্পর্ক রাখেননি। এমনকি মায়ের মৃত্যুর পরও নজরুল মাকে শেষ দেখা দেখতে যাননি। অন্যদিকে কবির স্ত্রী প্রমীলার মা গিরিবালাকে কবি মায়ের মতো সম্মান ও ভক্তি শ্রদ্ধা করতেন। কিন্তু গিরিবালাকে কখনও মা বলে ডাকেননি। তাকেও মাসিমা বলে ডাকতেন। গিরিবালা নজরুলকে জামাতা নয়, নিজের ছেলের মতোই দেখতেন। এই দুই নারী ছাড়াও অনেক নারী আছেন, যাদের নজরুল মায়ের আসনে রেখেছেন, মা বলে ডেকেছেন। ভক্তি শ্রদ্ধা করেছেন।

নিজের মা জাহেদা খাতুনের সঙ্গে অভিমান করেই ছোটবেলায় চুরুলিয়ার গ্রামের বাড়ি ছেড়ে যান। এরপরই শুরু হয় কবির উদ্দেশ্যহীন ছন্নছাড়া জীবন। তবে যেখানেই যেতেন, যেন মায়ের মমতা-স্নেহ খুঁজে বেড়াতেন। কুমিল্লা দৌলতপুর গ্রামে কবির আরেক মায়ের খবর পাওয়া যায়। তাঁর নাম এখতারুননেসা। তাকেও কবি মা বলে ডেকেছেন। তাঁদের স্নেহ মমতায় কবি মা থেকে দূরে থাকার কষ্ট ভুলে ছিলেন। তবে কবি কখনও তাদের মাঝে নিজের মাকে খুঁজতে চাইতেন না। কুমিল্লার দৌলতপুরের আলী আকবর খাঁর বোনের মেয়ে সৈয়দা খাতুন বা নার্গিস এর সঙ্গেই কবির ভাব ভালবাসা হয়। নার্গিসের বড় খালাই ছিলেন এখতারুননেসা। এখতারুননেসার মাঝে কবি মাকে খুঁজতেন। মায়ের প্রতিচ্ছবি দেখতেন। কবি ‘মা’ নামক কবিতাটি লেখেন এই মাকে নিয়ে। কুমিল্লার বিখ্যাত কংগ্রেস নেত্রী ও জেলা কংগ্রেসের সভাপতি হেম প্রভা মজুমদারকেও কবি মায়ের আসন দিয়েছিলেন। হেম প্রভার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও মেধা আর তাঁর বক্তৃতায় নজরুল মুগ্ধ ছিলেন। হেম প্রভার কান্দিরপাড়ের বাসায় নজরুলের গানের আসর ও রাজনৈতিক আড্ডা হতো। তাঁকে শ্রদ্ধা সম্মান করে কবি লিখেন হেম প্রভা কবিতাটি। নজরুলের জীবনের অনেক সঙ্কটে বা আর্থিক, সামাজিক সঙ্কটে যে নারী মাতৃছায়ার মতো ছিলেন তার নাম মাসুদা রহমান। মাসুদা রহমানের তত্ত্বাবধানে নজরুলের সঙ্গে প্রমীলার বিয়ে হয়। কবির এই মায়েদের মধ্যে বিরজা সুন্দরী দেবী ও মাসুদা রহমান ছিলেন লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত থাকায় তাঁদের সঙ্গে কবির মিল হতো অনেক। ১৯২৬ সালের ডিসেম্বরে মাসুদা রহমানের মৃত্যুতে কবি হতাশায় দুর্বল হয়ে পড়েন।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসকে অনেক শ্রদ্ধা করতেন কবি। চিত্তরঞ্জন দাসের স্ত্রী বাসন্তী দেবীর প্রতিও নজরুল শ্রদ্ধান্বিত ছিলেন। তাকেও কবি মায়ের আসন দিয়েছেন। বহরমপুর জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর যে পরিবারের সঙ্গে কবির পরিচয় হয়, সে পরিবারের কর্ত্রী সুনীতি বালাকেও কবি মায়ের আসনে রাখেন। নজরুলের জীবনে সাহিত্য যেমন ছিল, ঠিক তেমনটি ছিল নারীর অবদান।

কবি তাঁর সুখ-দুঃখ অভিমান মুখে প্রকাশ না করে তার সাহিত্যের মাঝে তুলে ধরেছেন। মায়েদের নিয়ে লিখেছেন একের পর এক কবিতা। এই কবির সাহিত্য মানেই নারীর অবদান। এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৫

১৯/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: