কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

উজানের ঢল ও টানা বৃষ্টিতে পাঁচ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি

প্রকাশিত : ১৩ জুন ২০১৫
  • লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দী, কয়েক হাজার হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে

জনকণ্ঠ ডেস্ক ॥ উজানের ঢল ও টানা বৃষ্টির কারণে কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাট, সুনামগঞ্জ ও সিলেটে বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। হঠাৎ বন্যায় এসব জেলার লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ফলে মানবেতর জীবন যাপন করছে তারা। রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়া এবং বৃষ্টির কারণে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। এসব জেলায় কয়েক নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তলিয়ে গেছে কয়েক হাজার হেক্টর জমির ফসল। ধান, শাক-সবজি ও বীজতলা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। ইতোমধ্যে কয়েক জায়গায় ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। বন্যা পরিস্থিতি মনিটরিং করতে কয়েক জাগায় কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। খবর স্টাফ রিপোর্টার ও নিজস্ব সংবাদদাতার।

কুড়িগ্রাম ॥ পাহাড়ী ঢল ও টানা বৃষ্টির কারণে কুড়িগ্রাম জেলায় বন্যা দেখা দিয়েছে। জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ১৬ নদ-নদীর পানি ফুলে ফেপে উঠেছে। ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার নিকট দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানে নদীর পানি ঢুকে নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হয়ে পড়েছে। ১০ স্থানে দেখা দিয়েছে ভাঙ্গন। অবিরাম বর্ষণে শহরের বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। জেলার ৭ উপজেলার প্রায় ৪০ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এসব বন্যাকবলিত মানুষ এখন মানবেতর জীবন যাপন করছে।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র ২৯ সে.মি., ধরলায় ৩০ সে.মি, তিস্তায় ২২ সে.মি. এবং দুধকুমার নদে ৩১ সে.মি. পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সময় চিলমারীর ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় চিলমারীতে ১৫০মি.মি. ও ধরলা ফেরীঘাট পয়েন্টে ৮৪ দশমিক ৫ মি. মিটার ও তিস্তার কাউনিয়া পয়েন্টে ১২৭মি.মি. বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। প্রবল বৃষ্টিতে কুড়িগ্রাম শহরে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, খাদ্য অফিস, আদর্শ জামে মসজিদ ও মাদ্রাসা, খাদ্যগুদাম, হাটিরপাড়, ভেলাকোপা, মজিদা কলেজসহ বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। চর ও দ্বীপ চরগুলোর নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সদর উপজেলার পাঁচগাছি, যাত্রাপুর, ঘোগাদহ, ভোগডাঙা, হলোখানা, মোঘলবাসা, উলিপুরের বুড়াবুড়ি, সাহেবের আলগা, বেগমগঞ্জ, হাতিয়া, চিলমারীর রাণীগঞ্জ, অষ্টমীরচর, নয়ারহাট, জোরগাছ ও চিলমারীসদর ইউনিয়নসহ রৌমারী এবং রাজীবপুরের কয়েকটি ইউনিয়নের নিচু এলাকায় ঘরবাড়িতে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। সদর ইউনিয়নের হলোখানার সারোডোব, বাংটুরঘাট, পাঁচগাছির ছড়ারপাড়, যাত্রাপুরের গারুহারা, চিলমারীর জেড়গাছে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহাফুজার রহমান বলেন, নদীর পানি আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় আগাম বন্যা দেখা দিয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি মনিটরিং করতে একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।

নীলফামারী ও লালমনিরহাট ॥ উজান থেকে ঢল নেমে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তিস্তায় চলছে উথাল পাতাল ঢেউয়ের সঙ্গে প্রচ- স্রোতধারা। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দেয়া হয়েছে।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস সর্তকীকরণ কেন্দ্র সূত্র মতে, পাহাড়ী ঢল ও উজানের ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে শুক্রবার তিস্তা নদীতে ঢল নেমেছে। সুত্র মতে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় পর্যন্ত তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ১৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে ১৪ সেন্টিমিটার। ফলে বিপদসীমার (৫২ দশমিক ৪০) দুই সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শুক্রবার ডালিয়া পয়েন্টে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ১৬ মিলিমিটার।

এদিকে পানি বৃদ্ধির ফলে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পূর্বছাতনাই, খগাখড়িবাড়ি, টেপাখড়িবাড়ি, খালিশা চাঁপানী, ঝুনাগাছ চাঁপানী, গয়াবাড়ি ও জলঢাকা উপজেলার, গোলমুন্ডা, ডাউয়াবাড়ি, শৌলমারী ও কৈমারী ইউনিয়নের নি¤œাঞ্চলের গ্রাম ও চর প্লাবিত হয়েছে।

পূর্বছাতনাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ খান জানান, বৃহস্পতিবার রাত থেকে তিস্তার নদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ইউনিয়নের নি¤œাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী সুরুজ্জামান বলেন, তিস্তা নদীর পানি শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে ডালিয়া পয়েন্ট বিপদসীমার ২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও বেলা তিনটায় পানি আরও কমে বিপদসীমার ৮ সেন্টিমিটার নিচে চলে এসেছে। তবে উজানের ঢল অব্যাহত থাকায় যে কোন সময় তিস্তা নদী বাংলাদেশ অংশের ডালিয়ায় বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। তাই তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট ২৪ ঘণ্টাই খুলে রাখা হচ্ছে।

ধরলার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় লালমনিরহাট জেলার মোগলগাট, দুর্গাপুর ও কুলাঘাট ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। নদীর দু’কূল উপচে দেখা দিয়েছে বন্যা। ধরলার চরাঞ্চলে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ধরলার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশ ও ভারতের ভূখ- চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। নদীতে ভারতীয় বিএসএফ স্পিডবোর্ড দিয়ে দিন রাত পাহাড়া দিচ্ছে। চরে পানিতে জলমগ্ন প্রায় কয়েক হাজার মানুষ না যেতে পারছে ভারতে, না যেতে পারছে বাংলাদেশে। এর মধ্যে বিএসএফ টহল জোরদার করায় প্রাণ ভয়ে তারা নিরাপদ স্থানেও আসতে পারছে না।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের তথ্য নিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তারা খুবস দ্রুত তালিকা তৈরি করে জেলা প্রশাসনকে অবহিত করবে।

সুনামগঞ্জ ॥ বৃষ্টিপাত ও সীমান্তের ওপাড় থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে সুনামগঞ্জের ষোলঘর পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৩৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ১২৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। সুরমা নদীর পানি বাড়ায় জেলার ছোট ছোট নদনদী ও হাওরাঞ্চলে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবার সকাল থেকে থেমে থেমে বৃষ্টিপাতের জন্য জনর্দুভোগ বেড়েছে। জেলার নদী তীরবর্তী ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার নি¤œাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকদিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে শহরের কাজির পয়েন্ট, তেঘরিয়া ও ষোলঘর এলাকার নি¤œাঞ্চলে পানি ঢুকেছে। এছাড়া দোয়ারাবাজার উপজেলার পাহাড়ী ঢলে অর্ধ শতাধিক গ্রাম প্লাবিত রয়েছে। সুরমার পানি ষোলঘর পয়েন্টে শুক্রবার দুপুর ১২টায় ৩৭ সে.মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। শুক্রবার গড় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ১২৫ মি.মি.। জেলার বেশিরভাগ হওরের পানি বৃদ্ধি অভ্যাহত রয়েছে।

জেলার পানিবন্দী ইউনিয়নগুলোর মধ্যে নোয়ারাই, ছৈলা আফজালাবাদ, চড়মহল্লা, ইসলামপুর, ভাতগাঁও, সিংচাপইর। অব্যাহত পানি বৃদ্ধির ফলে প্রায় কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়েছে। দোয়ারাবাজার উপজেলার স্থানীয় সূত্র জানায়, খাসিয়ামারা নদীর রাবারড্যাম বেড়ি বাঁধ ভেঙ্গে বোগলাবাজার, লক্ষ্মীপুর, দোয়ারাবাজার সদর ইউনিয়নসহ সুরমা ইউনিয়নের অর্ধ শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে সহাস্রাধিক মানুষ এখন পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এই বেড়ি বাঁধটি গতবারই ভেঙে গিয়েছিল। এবার কমিটি সংক্রান্ত জটিলতার কারণে বেড়ি বাঁধটি আর সংস্কার করা যায়নি। ফলে পাহাড়ী ঢলের প্রথম ধাক্কায়ই বেড়ি বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে পানি ঢুকে এই অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া উপজেলার মহব্বতপুর, টিলাগাঁও, রাজনগর, কাওয়াঘর, মামুনপুর, শিমুলতলা, গিরিশনগর, বরকতনগর, খাগোরা, পেটিরবন্দ, বক্তারপুরসহ কয়েকটি গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।

বাড়িঘরে পানি উঠে যাওয়ায় সহাস্রাধিক মানুষ এবং বর্তমানে গরু-বাছুরসহ গৃহপালিত পশু নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে। দোয়ারাবাজার উপজেলা সদরের সঙ্গে ওই অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

সিলেট ॥ বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ গোয়াইনঘাট উপজেলায় আরও নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢল উপজেলার রুস্তমপুর, তোয়াকুল লেঙ্গুড়া, আলীরগাঁও ও নন্দিরগাঁও ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামে পানি প্রবেশ করেছে। গ্রামের অধিকাংশ রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব এলাকার অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। সিলেট সালুটিকর-গোয়াইনঘাট রাস্তার বিভিন্ন অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এদিকে বন্যার কারণে উপজেলার পশ্চিম অঞ্চলে ধান, শাক-সবজি ও বীজতলা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান জানান, আউশ ১১ শত হেক্টর, আউশ বীজতলা ৬০ হেক্টর, বোনা আমন ৬০০ হেক্টর, শাক-সবজি ১০০ হেক্টর পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। ৪-৫ দিনের মধ্যে উক্ত এলাকা থেকে পানি না সরলে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। বন্যা পরিস্থিতির নিয়ে গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ সালাহ উদ্দিন বলেন, বন্যা প্লাবিত নতুন নতুন এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের বলা হয়েছে। ইতোমধ্যে পূর্ব জাফলং ইউনিয়নে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে গোয়াইনঘাট উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হাকিম চৌধুরী জানান, টানা বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে গোয়াইনঘাট এলাকার ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রাণসামগ্রী প্রদানের জন্য জেলা প্রশাসনকে বলা হয়েছে। সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে সদর উপজেলার জালালাবাদ হাটখোলা মোগলাগাঁও ইউনিয়নের হাওর অঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে।

প্রকাশিত : ১৩ জুন ২০১৫

১৩/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: