আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সর্বমানুষের মুক্তিচেতনার কবি

প্রকাশিত : ১২ জুন ২০১৫
  • শিমুল সালাহ্উদ্দিন

(পূর্ব প্রকাশের পর)

আপনাদের অনুসারী দলও তো ভিন্ন ছিল স্যার।

মোহাম্মদ রফিক : অনুসারীরা কখনো আসল লোক হয় না। অনুসারীরা কখনই বুঝবে না আসলে ওর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা কী ছিল! কিন্তু এমন ধরো আছে কেউ কেউ যারা দুইজনেরই অনুসারী ছিল। যেমন আমি ফরিদীর নাম বলবো। ফরিদী যেমন ধরো দু’জনের সাথেই তাল রেখে চলেছে। সুতরাং একেবারে যে আলাদা ছিল তা না। এমনকি আনু মোহাম্মদও তাই। আনুর সাথে দু’জনের সম্পর্কই খুব ভালো ছিল। যদিও আনু ঠিক সৃষ্টিশীল লেখক না, স্কলার, অন্য জগতের লোক, এরকম আরো দু-একজন আছে যাদের উভয়ের সাথে ভালো সম্পর্ক ছিল। তবে কবিতা কেন্দ্রিক যেসব সম্পর্ক তোমাদের সাথে, তোমাদের আমি অনুসারী মনে করিনি কখনো, তোমরা আমার সহযাত্রী। ফজল মাহমুদের কথা বলতে হয় যে মারা গেছে। ওর সাথে দুইজনেরই ভালো সম্পর্ক ছিল।

সুনীল সাইফুল্লাহ?

মোহাম্মদ রফিক : সুনীলের সাথে সেলিমের সম্পর্ক ছিল না। সবসময় নিজের ভেতরে থাকতো। আত্মমগ্ন। ওর কিছু প্রবলেমের কথা ও আমাকে বলেছিল। আমার মনে হয় শেষপর্যন্ত ওর আত্মঘাতী হবার কারণও ওটাই। সুমন (রহমান), কফিল (আহমেদ) কিংবা (মাহবুব) পিয়ালের কথা বলতে পারো, ওরা যেমন আমার সাথেই আড্ডা দিতো বেশি। শামীমের (শামীম রেজা) আবার দু’জনের সাথেই ভালো সম্পর্ক ছিলো।

তো স্যার, দীর্ঘসময় শিক্ষকতা করে অবসর নিয়েছেন। জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীরা আপনাকে গ্রান্ড ফেয়ারওয়েল দিয়েছে, তা বিভাগে, বিভাগের বাইরে, উভয় জায়গায়ই।

মোহাম্মদ রফিক : ঐ প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে একটা কথা তোমাকে বলে নেই, মনে পড়েছে, আমরা যখন ষাটের দশকে লিখতে শুরু করেছিলাম, এক ধরনের নির্বেদ এবং অবক্ষয়বোধ আমাদের মধ্যে কাজ করতো। সেটা কিন্তু সবার মধ্যেই ছিলো। এমনকী আমি রবীন্দ্রনাথের বলয়ে থাকলেও, আমার মধ্যেও সেটা কাজ করেছে। কিন্তু আমি সাতষট্টি সালে, আমি তখন চট্টগ্রামে চাকরি পেয়ে গেলাম। চট্টগ্রামের ভূমণ্ডল কিন্তু একটু আলাদা, পাহাড়, সমুদ্র, আমাদের দক্ষিণ বঙ্গ সেই তুলনায় সমতল।

বাগেরহাট, খুলনা হয়ে চট্টগ্রাম!

মোহাম্মদ রফিক : হ্যাঁ, আমার মূল ভূমি কিন্তু দক্ষিণবাংলা, বরিশাল, বাগেরহাট এইসব জায়গা। বরিশাল বাগেরহাটের মধ্যে কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে খুব একটা পার্থক্য নেই। যেটা আছে বরিশাল ও চট্টগ্রামের মধ্যে। যা বলতে চাচ্ছিলাম, তার পরে, তো সেই পাকিস্তানী নির্বেদ ও অবক্ষয়বোধ কাটিয়ে ওঠার একটা তাগিদ, অনুভব, চেষ্টা ছিলো আমাদের মধ্যে। আমার মধ্যে বিশেষ করে, বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের বক্তৃতা একটা বিরাট তোলপাড় ঘটিয়েছে। এবং এটা আমি লিখেছি একটা কবিতা, ব্যাঘ্রবিষয়ক এ। ঐ বক্তৃতা শোনার পরে আমার হঠাৎ মনে হলো আমি এতদিন শেয়াল ছিলাম, এই বক্তৃতা আমাকে বাঘে রূপান্তরিত করে দিল। তারপরই লেখা কবিতা ব্যাঘ্রবিষয়ক। আমি যে বঙ্গবন্ধুকে বাঘ বলেছি তা না, ঐ সাতই মার্চের ভাষণ শুনে আমার ভেতরে যে অনুভূতিটা হয়েছিল সেটাকে আমি ঐভাবে ধরার চেষ্টা করেছি। সেই বক্তৃতাকে আমার মনে হয়েছিল একটা শ্রেষ্ঠ কবিতা। আমার মনে হয়, যারা শুনেছিল সেই বক্তৃতা, তারা প্রত্যেকেইÑ

শৃগাল হইতে ব্যাঘ্রে রূপান্তরিত হইয়াছিলো!

মোহাম্মদ রফিক : হ্যাঁ। যখন পঁচিশে মার্চ পাকিস্তানীরা ক্র্যাকডাউনটা করলো তারপর মানুষের যে চেহারা আমি দেখেছি, এটা আমি আমার ছাত্রদেরও বলেছি, সেই চেহারা আজকে আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যখন আমি শুনি যে একটা গারো মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছে, তখন আমি অবাক হয়ে যাই, কারণ বাঙালী এমন নয়। আমি এই জাতির সবচেয়ে বড় বিপদের সময়ও তাদের যে চেহারা দেখেছি, এই চেহারা তাদের ছিলো না।

আপনার দেখা চেহারা কেমন স্যার?

মোহাম্মদ রফিক : এটা শুনলেই বুঝতে পারবে। ক্র্যাকডাউনের পরে আমরা যখন ভারত যাচ্ছি পালিয়ে, আমাদের দলে কমসে কম দু’শ’ জন লোক ছিল। তাদের ভেতরে ৬৫ বছরের বিধবা থেকে শুরু করে, ১৬, ১৭ বছরের নারী পর্যন্ত ছিলো। আমরা টিলাময় রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি, হঠাৎ করে বৃষ্টি হলো। রাস্তা ভয়ঙ্কর পিচ্ছিল হয়ে গেল। কেউ পা ফেলতে পারছে না। পা পিছলে যাচ্ছে। তখন আমাদের যে লিডার ছিলেন, তিনি বললেন, আপনারা একজন আরেকজনের মাজায় ধরেন। আমার সামনেই একজন তরুণী ছিলেন, ১৭/১৮ বছর বয়স হবে,

আপনার গল্পসংগ্রহে এই যাত্রা নিয়ে একটা দুর্দান্ত গল্প আছে।

মোহাম্মদ রফিক : হ্যাঁ, গল্পে আমি লিখেছি, তো, সেই তরুণী, আমি খুব ইতস্তত করছি তাকে ধরতে, সে আমাকে বললো, আপনি তো পড়ে যাবেন, আপনি আমাকে ধরেন, হ্যাঁ, এবং জানো, আমার তাকে ধরে কিছুই মনে হলো না। এবং তারপর আমরা যখন ইসে, বর্ডার পাড় হবো, লিডার বললেন, আপনারা যে দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে যাবেন, এই কাপড়চোপড় পড়ে তো আপনারা পার হতে পারবেন না। পাহাড়ের চূড়ায় পাক আর্মির টহলচৌকি আছে, দেখলেই গুলি করে দেবে। এবং গুলি চালালে সব মারা পড়বেন। সুতরাং যেতে হলে আপনাদের সব কাপড় খুলে ফেলতে হবে। মেয়েরা শুধু ব্রা- পেন্টি রাখতে পারবে। আর ছেলেরা শুধু আন্ডারওয়্যার। আর কিচ্ছু না। সেই অবস্থায় যখন আমরা পার হচ্ছি। বৃষ্টি হচ্ছে। তখন ঐ যে ৬৫ বৎসরের বিধবা ছিলেন, তিনি পা পিছলে একেবারে কাদায় পড়ে গেলেন। আমি ধরতে গেলাম, দেখি পাঁচ ছয়টা যুবক একসাথে ধরতে এসেছে। তাদের বয়স আমার চেয়ে কম। ওরা বললো, আমরা থাকতে আপনি কেনো? আমিও যুবকই কিন্তু তখন। আমি কিন্তু তখন মাত্র ২৯।

আমার এখনকার বয়সী স্যার।

মোহাম্মদ রফিক : আমি বললাম যে ঠিক আছে, ধরেন সব ধরেন। সবাই ধরে তাকে প্রায় কাঁধে করে, ঘাঁড়ে করে নিয়ে যাওয়া হলো। এতগুলো মানুষ আমরা পার হলাম, যাওয়ার পর আমি একজনের মুখ কালো দেখলাম না, সবাই হাসিমুখ, কেউ বলতে পারলো না যে কেউ কারো সাথে কোন খারাপ ব্যবহার করেছে। আমরা পঁচিশে মার্চের পরে যে বাড়িতে আশ্রয় নিলাম, সেই বাড়িতে, ছোট্ট একটা বাড়িতে বিশ্বাস করবা না, গরিব গৃহস্থের বাড়ি, সুজিত দস্তিদারের বাড়ি, ৯৯জন লোক আশ্রয় নিলো, তাদের খাওয়াও জুটলো, সবই জুটলো। সারাবছরের খোরাকের গোলা খালি করে দিয়ে। এবং কয়েকদিন পরে দেখা গেলো আর কিছুই নাই। ভদ্রলোক বাড়িতে আমাদের রেখে পটিয়ার বাজারে বাজার করতে গেলেন, সেই দিন পাকিস্তানী আর্মি বম্বিং করলো ঐ এলাকায়। তার ঊরুতে স্পিøন্টার লাগলো, ঊরুতে এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেলো। আহত অবস্থায় সুজিত দস্তিদার আশ্রিতদের জন্য বাজার নিয়ে, চাল ডাল নিয়ে বাড়ি ফিরলো। এবং সেইদিন আমাদের ক্যাপ্টেন হারুন ছিলো, পরে তো সে মেজর জেনারেল টেনারেল হয়ে রিটায়ার করেছে, হারুন আহত হয়ে ঐ পটিয়ায় হেল্থ কমúেøক্সে চিকিৎসা নিতে আসলো। আমি দেখতে গেলাম। ঐখান থেকে ফিরছি, দেখি এক ভদ্রলোক, বুক পর্যন্ত শুভ্র শাদা বড় দাড়ি, কাঁদছে আর মোনাজাত করছেÑ ‘হে আল্লাহ, এই জালেম পাকিস্তান তুমি ধ্বংস করে দাও।’ আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখি তার দুচোখ বেয়ে ঝরঝর করে পানি পড়ছে। খুব সম্ভ্রান্ত উচ্চবংশের মুসলমান হবেন। তার চোখে পানি দেখে আমি দাঁড়ালাম। উনি মোনাজাত শেষ করলেন, বললেন, খোকা তুমি কে? আমি পরিচয় দিলাম। বললাম যে দস্তিদার বাড়িতে থাকছি। উনি বাড়ির পথ বলে দিয়ে বললেন, তুমি আমার বাড়িতে এসো। সন্ধ্যাবেলায় আমি গেলাম। তখন উনি আমাকে বললেন, দেখেন, আপনি আমাকে কানতে দেখে মনে হয় অবাক হয়ে গেলেন! শোনেন, এই পাকিস্তানের জন্য আমরা কী না করেছি! শুধু জান দিতে বাকী রেখেছি। আর সবই তো করেছি। কিন্তু আজকে এই পাকিস্তান একটি জালেম রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। সেইদিনই আমি বুঝলাম যে পাকিস্তান থাকছে না। মানে আমার মধ্যে বিশ্বাসটা বদ্ধমূল হলো, এই পাকিস্তানের ভাঙন অবশ্যাম্ভাবী।

স্যার সাতই মার্চে তোÑ

মোহাম্মদ রফিক : পাকিস্তানের মৃত্যু হয়ে গেছে।

আমি বলছিলাম, স্বাধীনতার ঘোষণা একভাবে চলে এলোÑ

মোহাম্মদ রফিক : অবশ্যই, যদি কেউ অস্বীকার করতে চায় আমি বলব তার কোন বোধ নেই। মনে রেখো ইতিহাসের বহুকথা অব্যক্তই থেকে যায়!

রূপকার্থে থেকে যায় স্যার!

মোহাম্মদ রফিক : হ্যাঁ রূপকার্থে থেকে যায়! সুতরাং ঐ রূপক বাস্তবের চেয়ে অধিক বাস্তব।

স্যার, সাতই মার্চের পর শৃগাল থেকে ব্যাঘ্রতে পরিণত হলেনÑ

মোহাম্মদ রফিক : তুমি যদি আমার আগের লেখা পড়ো, ‘বৈশাখী পূর্ণিমায়’ ও ‘কীর্তিনাশা’ যদি মিলিয়ে পড়, তাহলে বুঝবে আমি নতুন জন্ম নিয়েছি। তোমাকে তো আমি বলেছি, মুক্তিযুদ্ধ নতুন করে আমাকে জন্ম দিয়েছে। এবং আমার পিতা শামসউদ্দীন আহমেদ, কিন্তু পুনর্জন্মের পিতা হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

স্যার, আপনি তো মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এক নম্বর সেক্টরের সাথে যুক্ত ছিলেন, এবং পলিটিক্যাল অফিসার হিসেবে ছিলেন। এই বিষয়গুলো নিয়ে আপনি কখনোই প্রকাশ্যে বলেননি, দেনা-পাওনার হিসেব করেন নাই। অনেক কবিসাহিত্যিকই সেটা করেছেন, সুবিধা নিয়েছেন। এই বিষয়গুলো আপনি কখনোই রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগান নাই বা তুলে ধরেন নাই। কেনো?

মোহাম্মদ রফিক : না, এটা তো আমার কাজ না। আজকে আমি তোমাকে বলি, অনেক জায়গায় আমি বিভিন্নভাবে কাজ করেছি। যেমন বগুড়া, রাজশাহীতেও আমার ভূমিকা আছে, রাজশাহীতে অনার্স তৃতীয় বর্ষে থাকা অবস্থায় আমাকে বের করে দেয়া হয়েছে, রাস্ট্রিকেট করা হয়েছে, আমি যে আজকে আমার এ অবস্থানে পৌঁছেছি, সেটা আমার কর্মগুণে, ভাগ্যগুণে বলবো না। সেসব কথা আমাকে কখনো লিখতে হবে, ভাবিনি। সে আবার আরেক ধরনের ইতিহাস। এসব কথা যে আমাকে বলতে হব তা আমি কখনো বিশ্বাস করতাম না। আমি মনে করতাম আমার ব্যক্তিকর্ম অস্তরালে থাক, আমার লেখাই সামনে আসুক।

কিন্তু ব্যক্তির যে যাপন বা প্রভাববলয় তা অনেকসময় লেখকের লেখায়ও ভূমিকা রাখে।

মোহাম্মদ রফিক : এখন মনে হয় রাখে। এসব আমি এখন না হয় ভবিষ্যতে যদি সময় পাই কিছু কিছু লিখবো।

মুক্তিযুদ্ধের ঐ সময়টার আপনি যে ঘটনাগুলো বললেন, আপনি গেলেন এবং ষোলই ডিসেম্বর আমরাÑ

মোহাম্মদ রফিক : আচ্ছা, তুমি মুক্তিযুদ্ধের ঘটনার কথা বলছো, আমি তখন এক এক নম্বর সেক্টরে কাজ করি, মেজর রফিক তখন এক নম্বর সেক্টরে ছিলেন। আমি সেখানে কাজ করতাম বেতনও পেতাম। পরে আমি সেখান থেকে গিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতারে কাজ করা শুরু করি। কিন্তু এসব ব্যাপার মিলিয়ে আমি যে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছি, তার কাগজপত্র তো আমার কাছে ছিলো। পরে আমি যখন ঢাকায় এসে নামলাম, আমার মনে হলো আমি তো এই কাগজপত্রগুলো আমার নিজের সুবিধার্থে ব্যবহার করতে পারি। কিন্তু আমি মুক্তভাবে এইদেশ থেকে গিয়েছিলাম, মুক্তভাবে ফিরতে চেয়েছি। সমস্ত কাগজপত্র রানওয়েতে উড়িয়ে দিয়ে আমি দেশে প্রবেশ করেছি। ঢুকে দেখলাম, আমি মনে হয় দেশে ফিরলাম এগারোই জানুয়ারি, ১৯৭২, তখন সেখানে আমাকে অনেক কিছু বুঝিয়ে দিতে হয়েছিলো বলে ফিরতে একটু দেরি হয়। ফিরে দেখি, আমার চাকরি নেই। আমি তখন নোমান সাহেবের কাছে যাই। উনি তখন শিক্ষা দফতরের দায়িত্বে আছেন। আমি গিয়ে বললাম, স্যার আমার তো চাকরি নাই। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, আমি জানি তুমি দেশের জন্য কী করেছো। সুতরাং তুমি যাও, তোমার চাকরি আছে। আমি গিয়ে চিটাগং এ যোগ দিলাম। যাওয়ার কিছুদিন পরÑ আমি আবার নোমান স্যারের প্রিয় ছাত্র, আমি, ইলিয়াস (আখতারুজ্জামান) উনার ছাত্র, মান্নান (সৈয়দ) উনার ছাত্র। আমি ঢাকা কলেজে আসলাম। এক লোক আমার কাছে আসলেন। তিনি বললেন তিনি মুক্তিযোদ্ধা। আমি তখন অবাক হলাম। কী বলেন এসব। আমি আপনাকে একুশ না জানি ছাব্বিশে ডিসেম্বর কফি হাউসে দেখেছি, আপনি তখন আমাকে বলেছেন, আপনি ঐ দিনই দেশ থেকে এখানে এসেছেন, তাহলে আপনি কিভাবে মুক্তিযোদ্ধা হন! তিনি, হে হে করছেন, আমতা আমতা করছেন, আমিতো, অবাক। তখন আমি তাকে বললাম, আমি তো জানি আপনি মুক্তিযোদ্ধা না। আসলে আমি এটাও জানি, এদেশে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন, যারা সত্যিকার অর্থেই মুক্তিযোদ্ধা, যাদের কোন সার্টিফিকেট নেই, এবং আমরা করলাম কী! আমরা মুক্তিযুদ্ধের পর সকল যোদ্ধাদের অস্ত্রহীন করে গ্রামে গ্রামে, তাদের গ্রামে পাঠিয়ে দিলাম, দিয়ে দেশটাকে দখল করার চেষ্টা করলাম। এখান থেকেই আমাদের বিয়োগান্তক কাহিনীর শুরু। আমার কিছু গল্পে এসব ঘটনা আছে। এবং লেখার চেষ্টা করেছি।

স্যার মুক্তিযুদ্ধের ৪৪ বছর চলে গেছে। আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছি। এবং বিশ্বরাজনীতিতেও আমরা অবদান রাখতে শুরু করেছি।

মোহাম্মদ রফিক : আরো অনেক অবদানই আমাদের থাকবে। আমি তোমাকে একটা কথা বলি, তুমি যখন আমাকে এই প্রশ্নটি করেছো তখন আমি বুঝেছি, আমি যখন আইওয়াতে গেলাম, তখন আমার কাছে ব্যাপারটি স্পষ্ট হলো। বিশেষ করে লাটিন আমেরিকা বা আফ্রিকা বা অন্যান্য দেশের লেখকদের সাথে আমার বন্ধুত্ব হলো। আমি বোঝালাম তাদের বললাম, তারাও জানতে আগ্রহী হলো, আমি তখন বুঝলাম, বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের এত উৎসাহ কেনো! আমরা সাধারণত বলে থাকি, আমাদের দেশে গ্যাস তেল পাওয়া যায়, এসব তাঁরা দখল করতে চায়। কথাটা কিছুটা হলেও সত্য। তুমি দেখো, পৃথিবীর এই যে মানচিত্র, এই মানচিত্র তৈরি করেছেন কারা?

ব্রিটিশরা

মোহাম্মদ রফিক : শুধু ব্রিটিশরাই নয়, পশ্চিমারাও। আমরা যাদের পশ্চিমা বলি, আমাদের দেশের সীমারেখা নিয়ে যাদের সমস্যা, আবার ভারতের সাথে চীনের, বা চীনের সাথে অন্যান্য দেশের। তেমনি লাতিন আমেরিকায়ও সীমান্ত সমস্যা আছে। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এ সমস্যা লাগিয়ে রেখেছে। এখানে শুধু ব্রিটিশরা একা না, টোটাল পশ্চিমা জগত। তার সাথে যুক্ত আমেরিকাও। এখন আমাদের এখানে কারা সমস্যা তৈরি করেছেন, লাইবেরিয়ায় কারা তৈরি করেছে, ওরা। আর বাংলাদেশ তৈরি করেছে কারা! স্বাধীন করেছে কারা?

আমরা।

মোহাম্মদ রফিক : তবে এটা ঠিক যে আমরা ভারতের কাছ থেকে সাহায্য নিয়েছি, রাশিয়ার কাছে সাহায্য নিয়েছি। আর আমেরিকাও যখন স্বাধীন হয় তখন তারা ফ্রান্সের কাছে সাহায্য নেয়নি? পৃথিবীর প্রত্যেক দেশই তাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে অন্য দেশের সাহায্য নেয়। আমরাও নিয়েছি। তাতে এটাকে বড় করে দেখার কিচ্ছু নেই। কিন্তু আমাদের স্বাধীন করেছি আমরা। এটা আমাদের আত্মশক্তির জায়গা। এবং এই জায়গাটার কথা ওরা জানে। এবং ওরা জানে, আমরা যদি দাঁড়াই মাথা তুলে, আমরা পৃথিবীটাকে কাঁপিয়ে দিতে পারি। শোন, তোমাকে আমি একটা কথা বলি, যে কথা আমি আমেরিকায় গিয়ে বক্তৃতায় বলেছি, নোবেল পুরস্কার যদি কোন সভ্যতার মাণদণ্ড হয় তবে আমরা বাঙালীরা তোমাদের চেয়ে তেইশ বছর এগিয়ে আছি।

কীভাবে?

মোহাম্মদ রফিক : আমরা বাংলাতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছি ১৯১৩সালে, আর তোমরা (আমেরিকানরা) পেয়েছো ১৯৩৬ সালে। সো, ডোন্ট ফরগেট ইট। এবং আমি বলি, আজ রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কারটি শুধু রবীন্দ্রনাথের জন্যই সৌভাগ্য বহন করে না, সমগ্র বাঙালী জাতীর জন্য এই সৌভাগ্য বহন করে নিয়ে এসেছে। এটা কেউ ভাবে না! রবীন্দ্রনাথকে নোবেল দেয়ার পেছনে ব্রিটিশ শক্তি কাজ করেছে। আর ওরা ভেবেছিল রবি দ্বারকানাথ ঠাকুরের বংশধর, জমিদার, আমরা ওকে পার্মানেন্টলি আমাদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারবো। কিন্তু সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যার প্রতিবাদে নাইট উপাধী ত্যাগ করলো, এবং যখন চিঠিটি লিখলো, প্রত্যাখ্যানের, এক কথায় অসাধারণ। ওদের মুখের মধ্যে থুতু মেরে দিলো। তখন তারা বুঝলো, আরে, এটা কী হলো! তার পরের কাজটা করলো সুভাষ বসু। সুভাষ বসু যখন তাদের চাকরি লাথি মেরে চলে আসলো, তখন তারা বুঝলো, খবরদার, বাঙালীকে তো একসাথে রাখা যাবে না। রাখলে ওরা আমাদের উপরই খবরদারি করবে। সো, ডিভাইড এন্ড রুল। তুমি দেখবে ওরা একই ভাবে চেষ্টা করেছে রবীন্দ্রনাথ যেনো নাইট পায়, আবার জগদীশ চন্দ্র বসু যেনো নোবেল না পায়। তারা সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার চেয়ে বিজ্ঞানে নোবেল পাওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেদিন যদি জগদীশ চন্দ্র বসু নোবেল পেয়ে যেতেন, তাহলে এর প্রভাব বাঙালী জাতীর উপর অন্যরকমভাবে পড়তো। তখন হয়তো হিন্দু-মুসলমান রায়ট বা ৬৫-এর ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ সম্ভব হতো না। এবং ধরো, আমরা ই.ইউ বিরোধী বা ইহুদী বিরোধী, ইহুদীরা যে কাণ্ডকারখানা করেছে, তাতে আমরা তাদের বিরোধী না হয়ে পারি না। কিন্তু আমরা চাই ইহুদীরা তাদের অধিকার পাক। অবশ্যই পাক। সেটা কারো প্রতিশ্রুতির ভেতর দিয়ে না , তারা নিজেদের যোগ্যতায় সেটা পাক। তবে ইহুদীরা পৃথিবীতে চেতনার দিক দিয়ে বিরাট শক্তি। মানুষ শুধু অস্ত্র দিয়েই পৃথিবী শাসন করে না। এক অর্থে ইহুদীরাই পৃথিবী শাসন করছে। কারণ আমেরিকা যে খবরদারি করে সেটা তৈরি করেছে কারা!

ইংরেজরা।

মোহাম্মদ রফিক : একটা কথা, আজ যদি বাংলা অবিভক্ত থাকতো, তাহলে দেখতে এ অঞ্চলের শুধু নয়, পৃথিবীর চিন্তা চেতনার সর্বক্ষেত্রে অধিকারটা বাঙালীরই থাকতো। এবং সেটাকে ভাঙার জন্য ১৯১৯ সাল থেকে ইংরেজরা উঠে পড়ে লেগেছে। সেটা তারা বাস্তবায়ন করেছে। তুমি তাকালে দেখবে ১৯৩৬-এর আগে হিন্দু মুসলমান মারামারি হয়েছে? মারামারি তো অন্য বিষয়, জমি নিয়ে মারামারি বা সীমানা নিয়ে মারামারি, কিন্তু যাকে বলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সেটা কিন্তু ৩৬-এর আগে এ অঞ্চলে হয়নি। এবং এটা ইংরেজের একটা প্লান। শুধু ইংরেজরা বলবো না, সমস্ত উপনিবেশবাদীরা চক্রান্ত করেছে। এবং তারা বুঝাতে চেয়েছে আমরা অসভ্য, আমরা অমুক তমুক, আমরা এটা জানিনা, সেটা জানি না। তারা সব জানে। (চলবে)

প্রকাশিত : ১২ জুন ২০১৫

১২/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: