কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নিষিদ্ধ নজরুল ও যুগবাণী

প্রকাশিত : ২৯ মে ২০১৫
  • জাফর ওয়াজেদ

(পূর্ব প্রকাশের পর)

এর প্রকাশক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, গ্রন্থকার। নেপথ্যে যদিও পেশাদার প্রকাশনা সংস্থা ছিল। গ্রন্থটি যে উপনিবেশিক সরকারের ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে এমন ধারণা তো প্রবন্ধগুলো নবযুগে প্রকাশের সময়ই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে নজরুল লিখলেন সম্পাদকীয়। “খুব সোজা করিয়া বলিতে গেলে নন কো-অপারেশন হইতেছে বিছুটা বা আলকুসি, এবং আমলাতন্ত্র হইতেছেন ছাগল। ছাগলের গায়ে বিছুটি লাগিলে যেমন দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হইয়া ছুটাছুটি করিতে থাকে, এই আমলাতন্ত্রও তেমন জ্বালায় বেসামাল হইয়া ছুটাছুটি আরম্ভ করিয়া দিয়াছেন। কিছুতেই যখন জ্বলন ঠা-া হয় না তখন ছাগ বেচারী জলে গিয়া লাফাইয়া পড়ে দেওয়ালে গা ঘষিতে থাকে, উলটো ঘষাঘষির চোটে তাহার চামড়াটি দিব্যি ক্ষৌরকর্ম করার মতোই লোমশূন্য হইয়া যায়। আমলাতন্ত্রের গায়েও বিছুটা লাগিয়েছে এবং তাই তিনি কখনো জলে নামিতেছেন; কখনো ডাঙ্গায় ছুটিতেছেন, আর কখনো বা দেওয়ালে গা ঘেঁসড়াইয়া খামকা নিজেরই নুনছাল তুলিতেছেন। তবু কিন্তু জনবল থামিতেছে না; বরং ক্রমেই বাড়িতেছে। ... তাঁহারা যেসব বুদ্ধির পরিচয় দিতেছেন তাহার সকলগুলির পরিচয় দিতে হইলে একটি মস্তকা- ‘আমলায়ণ’ লিখিতে হয়। তবে সব চেয়ে ঝাঁজালো বুদ্ধিটা দেখাইতেছেন যাহার-তাহার যে কোন সময় সটান মুখ বন্ধ করিয়া দিয়া।” নিজের গ্রন্থ বাজেয়াফত হওয়ার পর তা গোপনে বিক্রি হলেও নজরুল কোন রয়্যালিটি পেতেন না। ‘মুখবন্ধ’ শীর্ষক সম্পাদকীয় নিবন্ধে নজরুল বাঙালীর প্রাণের আর্তিকে তুলে ধরেছিলেন। যখন নেতারা সাহস করে সত্য উচ্চারণ নয়, শাসকের তল্পিবাহক বা মোসাহেবীতে লিপ্ত, নজরুল সেখানে সাহস করে গণজাগরণের পথনির্দেশনাই দিলেন। লিখলেন, “জোর জবরদস্তি করিয়া কি কখনও সচেতন জাগ্রত জন-সংঘকে চুপ করানো যায়? বালির বাঁধ দিয়া কি দামোদরের স্রোত আটকানো যায়? যতদিন ঘুমাইয়া ছিলাম বা কিছু বুঝি নাই ততদিন যাহা করিয়াছ সাজিয়াছে। এতদিন মোয়া দেখাইয়া ছেলে ভুলাইয়াছ এখনও কি আর ও রকম ছেলেমানুষী চলিবে মনে কর? আমাদের বড় ভয় হয়, এ মুখবন্ধ আমাদের নয় তোমাদের। আশা করি আমাদের এ ভয় মিথ্যা হইবে না। ইংরেজ রাজত্বে ইংরেজের বিরুদ্ধে এভাবে সরাসরি ক্ষোভ, বিষোদ্গার প্রকাশের সাহস নজরুলই দেখিয়েছিলেন।

বাজেয়াফপ্তের পরও বইটি গোপনে ছাপা ও বিক্রির কাজটি চলেছে। ফৌজদারি আইনের ৯৯-এ ধারানুযায়ী বাজেয়াপ্ত গ্রন্থটি সম্পর্কে ১৯৪১ সালেও হুঁশিয়ারি সঙ্কেত দেয়া হয়েছিল পুলিশের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। এমনিতে সরকারী গোয়েন্দারা নজরুলের ওপর তীক্ষè নজর রাখত। তাঁর সকল কাজের ওপর তাদের দৃষ্টিতে ‘আপত্তিকর’ বিষয়গুলো উত্থাপন করে নানা সুপারিশ করত পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। বাস্তবতা হচ্ছে, নজরুলের রচনায় তখন যুগমানসই প্রতিবিম্বিত হচ্ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর রাজনৈতিক সামাজিক পটভূমিতে নজরুল ছুটে এসেছিলেন ঝড়ো হাওয়ার বেগে। বাংলা সাহিত্যে নিয়ে এলেন চির বিদ্রোহের বাণী। সংবাদপত্রের মাধ্যমে গণজাগরণের দিশা তুলে ধরলেন। কেবল লেখার মধ্য দিয়ে নজরুল দেশবাসীকে অনুপ্রাণিত করেননি, জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গেও তাঁর ছিল প্রত্যক্ষ যোগ। বিপ্লবীদের সঙ্গে ছিল তাঁর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর দেশে দ্বিতীয় পর্যায়ের বৈপ্লবিক আন্দোলন মাথাচাড়া দেয়, তার পেছনে তাঁর লেখনীর প্রেরণা অনস্বীকার্য। একদিকে রাজনৈতিক কার্যকলাপ ও অপরদিকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা সমকালীন আর কোন কবির মধ্যে মেলেনি। এই তৎপরতাই নজরুলকে ব্রিটিশ শাসকের চোখে ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে মূল্যায়িত করেছে। তাই তাঁর কণ্ঠরোধ করার জন্য শাসকরা বার বার তৎপর হয়েছে। কারাগারে আটকাবস্থায় ‘সেøা পয়জন’ দিয়েও নিরস্ত করা যায়নি। শাসক চেয়েছিলেন কারাগারে অনশনে কবির মৃত্যু ঘটুক। কিন্তু রবীন্দ্রনাথসহ দেশবাসী চায়নি বলেই নজরুলকে অনশন ভঙ্গ করতে হয়েছিল। এটা তো আজকের সময় এসে বলা যায়, একজন লেখক-সাংবাদিক হিসেবে সমসাময়িককালে নজরুল ইসলামের রচনাই সবচেয়ে বেশি শাস্তিপ্রাপ্ত। নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে তাঁকে বন্দীর হাজারো প্রচেষ্টা চলেছে। কিন্তু নজরুল কোনভাবেই দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। অকুতোভয় সাহস তাঁকে যে কোন বিপদকে মোকাবেলার শক্তি দিয়েছিল বুঝি।

নবযুগ পত্রিকা বা যুগবাণী গ্রন্থে প্রকাশিত যে প্রবন্ধটির বিষয়ে শাসকগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি আপত্তি জানিয়েছিল, তা হচ্ছে ‘ডায়ারের স্মৃতিস্তম্ভ’। লিখেছেন নজরুল, ... “এই ডায়ারের মত দুর্দান্ত কসাই সেনানী যদি সেদিন আমাদিগকে এমন কুকুরের মত করিয়া না মারিত, তাহা হইলে কি আজিকার মত আমাদের এই হিম নিরেট প্রাণ অভিমানে ক্ষোভে গুমরিয়া উঠিতে পারিত না, আমাদের আহত আত্মসম্মান এমন দলিত সর্পের মত গর্জিয়া উঠিতে পারিত? কখনই না। আজ আমাদের সত্যিকার শোচনীয় অবস্থা সাদা চোখে দেখিতে পারিয়াছি এই ডায়ারেরই জন্য। ... ডায়ারই আমাদের অন্ধত্ব ঘুচাইয়া দিয়াছে। অন্য প্রতারকদের মত গলায় পায়ে শৃঙ্খল পরাইয়া আদর দেখাইতে যায় নাই- সেই নারীর সামনে উলঙ্গ করিয়া মেথরের হাতে বেত্র দিয়া তোমার পিঠের চামড়া তুলিয়াছে। গর্দানে পাথর চাপা দিয়া বুকের উপর হাঁটাইয়াছে, তাহাদের পায়ে তোমাদিগকে সিজদ বা সাষ্টাঙ্গ করাইয়া ছাড়িয়াছে। তোমাদিগকে জাগাইতে চাই এমনি প্রচ- নির্মম কসাইশক্তি।” নজরুল এখানেই থেমে থাকেননি। জালিনওয়ালাবাগের গণহত্যাকে কেউ সমর্থন করতে পারেনি। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশ সরকার প্রদত্ত ‘নাইটহুড’ খেতাব ফেরত দেন। নজরুল বুঝেছেন, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতির চিত্তে যদি আঘাত হানা যায়, তবে তারা জেগে উঠবে। পরাধীনতায় ন্যুব্জ জাতিকে জাগরণের স্বপ্নই তো তাকে দিয়ে গণজাগরণমূলক ও রাজদ্রোহী বিরোধী রচনা সৃষ্টিতে নিরত রেখেছে। তাই ডায়ার প্রসঙ্গ টেনে জনগণকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, “ডায়ারের বুট এমন করিয়া তোমাদের কলিজা মথিত না করিয়া গেলে তোমাদের চেতনা হইত না। তোমাদের মুখের সামনে তোমাদের আত্মীয়-আত্মীয়ার মুখে এমনি করিয়া থুথু না দিলে তোমাদের মানবশক্তি ক্ষেপিয়া উঠিত না। তাই আজ আমরা ডায়ারকে প্রাণ ভরিয়া আশীর্বাদ করিতেছি, খোদা তোমার মঙ্গল করুন। ... নিশ্চয়ই তুলিব তোমার স্মৃতিস্তম্ভ, মহৎ প্রতিহিংসারূপে নয়, প্রতিদান স্বরূপে। আজ আমাদের এ মিলনের দিনে তোমাকে ভুলিতে পারিব না ভাই। এই মহামানবের সাগরতীরে ভারতবাসী জাগিয়াছেÑ বড় সুন্দর মোহন মূর্তিতে জাগিয়াছে। সেই তোমার আনন্দের হত্যার দিনে, সেই জালিয়ানওয়ালাবাগের হতভাগাদের রক্তের উপর দাঁড়াইয়া হিন্দু-মুসলমান দুই ভাই গলাগলি করিয়া কাঁদিয়াছে। ... কাঁদিয়াছিÑ গলা জড়াজড়ি করিয়া কাঁদিয়াছিÑ আমাদের ভাইদের খুন-মাখানো সমাধির উপর দাঁড়াইয়া আমরা এক ভাই অন্য ভাইকে চিনিয়াছি, আর বড় প্রাণ ভরিয়াই গাইয়াছিÑ ‘আমরা মিলেছি আজ মায়ের ডাকে।’ আজ এস ডায়ার, আমাদের এই মহামিলনের পবিত্র দৃশ্য দেখিয়া যাও।’ তবে লেখাটি ছাপা হওয়ার পর হাইকোর্টের জজ পত্রিকার প্রকাশক-পরিচালক ফজলুল হককে আবারও সতর্ক করে দেন। কিন্তু এদিকে পত্রিকার কাটতি ক্রমশ বাড়তে থাকে। ফজলুল হক অবশ্য নজরুলকে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, ‘চুটিয়ে লেখো। বেটাদের টনক নাড়িয়ে দাও।’ শেরে বাংলার উৎসাহ নজরুলকে আরও বেশি উচ্চকিত করে। তাঁর কলম আরও শাণিত হয়ে ওঠে। নজরুলের প্রতিবেদনের পরই নবযুগের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে গেল। আর স্বাভাবিক কারণে এসব প্রবন্ধে সমৃদ্ধ যুগবাণী বাজেয়াফত হবেই। যুগবাণীর প্রতিটি প্রবন্ধ বা নিবন্ধই ছিল উপনিবেশিক শাসকের শোষণ, শাসন, ত্রাসনের বিরুদ্ধে।

নজরুল গ্রন্থে মোট ২১টি রচনা সন্নিবেশিত করেন। উল্লিখিত প্রবন্ধগুলো ছাড়াও রয়েছে ধর্মঘট, লোকমান্য তিলকের মৃত্যুতে বেদনাতুর কলিকাতার দৃশ্য, ছুঁৎমার্গ, উপেক্ষিত শক্তির উদ্বোধন, রোজ কেয়ামত বা প্রলয়দিন, বাঙালির ব্যবসাদারী, ভাব ও কাজ, আমাদের শক্তি স্থায়ী হয় না কেন, কালা আদমীকে গুলি মারা, শ্যাম রাখি না কুল রাখি, লাট প্রেমিক আলি ইমাম, জাতীয় শিক্ষা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও জাগরণী। এরমধ্যে ‘জাগরণী’ প্রবন্ধটি নবযুগের জন্য লেখা হলেও পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তা অন্য একটি কাগজে ছাপা হয়। গ্রন্থটি ২৬ অক্টোবর ১৯২২ সালে প্রকাশিত হয় আর নিষিদ্ধ হয় একই বছরের ২৩ নবেম্বর। ইতোমধ্যে গ্রন্থটির প্রায় সব কপিই বিক্রি হয়ে যায়।

নজরুল তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থে স্বাধীনতার জন্য ছিলেন সোচ্চার। পরাধীনতার বিরুদ্ধে তিনি তাঁর শক্তিমত্তা তাতে প্রয়োগ করেছিলেন। নজরুল নিজেকে সর্বহারা শ্রেণীর প্রতিনিধি হিসেবে অবস্থান তৈরি করেছিলেন বলে তাঁর হারাবার কিছু ছিল না। নজরুলের প্রবন্ধসমূহ মূলত তাঁর সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব, কর্তব্য ও চেতনার প্রতিফলন। তাই জাতীয় শিক্ষা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি বিষয়েও তাঁর চিন্তার প্রতিফলন দেখা যায় প্রবন্ধসমূহে।

নজরুলের সাংবাদিকতার জীবন দীর্ঘ না হলেও ধূমকেতুর মতো এসে তিনি ধূমবেতুর মতোই আবার সরে গিয়েছেন। স্বাধীনতার জন্য রাজনীতি করা যখন দ্বিধা দ্বন্দ্বে, তখন নজরুল একাই কলম ধরেছেন, গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন, বাজেয়াফতও হয়েছে। কিন্তু থেমে থাকেননি। আর তা থাকেননি বলে এখনো এই নব্বই বছর পর পরও এদেশে স্বাধীন ও সাহসী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রগুলো প্রসারিত রয়েছে। (শেষ)

প্রকাশিত : ২৯ মে ২০১৫

২৯/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: