মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

ইতিহাস কখনও বদলে যায় না

প্রকাশিত : ২২ মে ২০১৫
  • মন্দিরা ভট্টাচার্য, ইতিহাসবিদ

কতদিন পর বাংলাদেশে এলেন?

মন্দিরা ভট্টাচার্য : (প্রশ্ন শুনে হেসে ফেললেন) তুমি এমনভাবে আমাকে প্রশ্নটা করলে যে শুনে মনে হচ্ছে বাংলাদেশ বুঝি খুব দূরের কোন দেশ। এটা আমার নিজের দেশ- এই দেশে আমি জন্মগ্রহণ করেছি। পৃথিবীর যেখানেই থাকি না কেন আমার মনে হয় আমি বুঝি এই দেশেই আছি। আমার মন পড়ে থাকে এই দেশে।

শেষবার এসেছিলাম ৪-৫ বছর আগে । তারপর নিজের শরীরটা মোটেও ভাল যাচ্ছে না। পরপর তিনবার ক্যান্সার আমাকে তার সমস্ত ভালবাসা দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে বলে আবারও হাসলেন।

ক্যান্সার তার ভালবাসা দিয়ে আপনাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে- কথাটা যদি ব্যাখ্যা করতেন।

মন্দিরা ভট্টাচার্য : ক্যান্সার তো আমাকে তার সবটা দিয়েই ভাল বেসেছে না হলে পরপর তিনবার কেউ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়? আমার দু’দুবার ব্রেস্ট ক্যান্সার আর একবার কণ্ঠনালীতে ক্যান্সার হলো। এখনও চিকিৎসা চলছে তার। ওষুধপত্রের ধকল আর সহ্য করতে পারছি না। এখন হাঁটতেও খুব কষ্ট হয় আমার। বয়স তো আর কম হলো না।

কত বয়স হলো শুনি-

মন্দিরা ভট্টচার্য : ১৯৪২ সালের ২১ নবেম্বর আমি বিক্রমপুরের শ্রীনগরে জন্মেছি। বাবা ছিলেন সেই সময়ের খুব বিখ্যাত ডাক্তার। চল্লিশের দশকে ঢাকা ও তার আশেপাশের এলাকার মানুষজন ডাক্তার নন্দির নাম শোনেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ১৯৪২ থেকে হিসাব করলে আমার বয়স এখন বাহাত্তর বছর ৬ মাস।

তাহলে কি আপনাকে বিক্রমপুরের মেয়ে বলা যায়?

মন্দিরা ভট্টাচার্য : অবশ্যই জন্মসূত্রে আমি তো বিক্রমপুরের মাইয়াই।

আপনাকে দেখলে কিন্তু এত বয়স মনে হয় না-

মন্দিরা ভট্টাচার্য : শোনো আমার বয়স অনেক হয়েছে। এ বয়সে এসে আমি এখনও মানুষকে নতুন করে জানছি। দেখছি। কখনও কখনও নিজেকেও নতুন করে জানার চেষ্টা করি। সেই হিসেবে আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেকে বুঝি। দেখি। সময়ের জল তো আর কম গড়াল না। আমি ইতিহাসের ছাত্র। ত্রিশ বছর ইতিহাসের অধ্যাপনা করেছি। ইতিহাসে কিন্তু সময়টা বড় বেশি ফ্যাক্টর। সময় দিয়ে বিচার করলে ইতিহাসটা বুঝতে সুবিধা হয়। আমি অনেক সময় পার করে এসেছি। আমার মধ্যে সময় নানাভাবে কাজ করে। আমি আমার মধ্যে সময়কে নানাভাবে দেখেছি। সময়ের নিজস্ব নিয়মে সময় মানুষকে নির্মাণ করে। আমি আমার নিজের বয়স দিয়ে নিজেকে বিচার করি না। আমি বিচার করি আমার পরিপার্শ¦ দিয়ে।

আপনি তো ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে জীবনের দীর্ঘ সময় পার করে এলেন। এই দীর্ঘ সময়কে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করছেন।

মন্দিরা ভট্টাচার্য : আমি সবসময় নিজেকে ইতিহাসের একজন সামান্য ছাত্র হিসেবে দেখি। যে কেউ ইচ্ছে করলেই ইতিহাসের শিক্ষক হতে পারেন না। ইতিহাসের শিক্ষক হওয়াটা খুব কষ্টসাধ্য বিষয়। আমি অতটা কষ্ট করতে পারি না।

ইতিহাসের একজন সাধারণ ছাত্র হিসেবে আমি মনে করি, ইতিহাস কখনো বদলে যায় না। আমরা কতিপয় মানুষ নিজেদের স্বার্থে ইতিহাসের পরম্পরাকে বদলে দেয়ার চেষ্টা করি। কখনো কখনো বদলে ফেলারও চেষ্টা করি। নিকট অতীতে এ রকম বহু নজিরও আছে। কিন্তু ঐ যে আগে বলেছিলাম, ইতিহাসে সময়টা খুব বড় ফ্যাক্টর। সময় তার হিসাবের নিরিখে তথ্য উপাত্তের সমন্বয়ে সঠিক বিচার করে। আর এই বিচারের ফলে ইতিহাসটা তার আসল জায়গাটা করে নেয়।

ইতিহাস নিয়ে আমার মূল্যায়ন খুব সরল। ইতিহাস মানুষের তৈরি থিওরি, জরিপ, আবেগ দিয়ে রচিত হয় না। ইতিহাস তার নিজস্ব নিয়মে অগ্রসর হয়। ইতিহাস নিজেই নিজের পথ করে নেয়। তবে পৃথিবীতে কখনো কখনো কোন কোন মানুষ নিজে একাই মানে তার একক মেধায়, কৃতিত্বে অনবদ্য ইতিহাস তৈরি করে দিয়ে যান যা আমাদের সমৃদ্ধ করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সে রকম একজন মানুষ। তিনি নিজেই এই উপমহাদেশে একটি স্বতন্ত্র ইতিহাস রচনা করে গেছেন।

আপনার লেখালেখি নিয়ে কথা বলতে চাই। সর্বশেষ কি নিয়ে লিখলেন?

মন্দিরা ভট্টাচার্য : আমি মূলত: আর্কিওলজি নিয়ে কাজ করি। আমার বিষয়ও তাই। আর্কিওলজিক্যাল ফিল্ড সার্ভে আমার প্রিয় বিষয়। নর্থ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিতে আমি ত্রিশ বছর ইতিহাসের অধ্যাপনা করেছি। আমার পুরাকীর্তির গবেষণায় উঠে এসেছে গঙ্গার ঐ পাড় থেকে মালদহ, দিনাজপুর (উত্তর ও দক্ষিণ), কুচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং- এই বিস্তীর্ণ এলাকার ইতিহাস।

বেশ কিছুদিন আগে ডেইলি স্টার পত্রিকায় আমি আমার বাবা মন্মথ নাথ নন্দীকে নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলাম। লেখাটির শিরোনাম ছিল লার্জার দ্যান লাইফ এমএন নন্দী। লেখাটা পড়ে ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন আমাকে বললেন লেখাটা সাধারণ পাঠকের জন্য অবমুক্ত করে দেন বাংলায়। মামুনের কথা মতো আমি লেখাটা বাংলায় লিখেছিলাম। পাঠকমহলে বেশ রেসপন্স পেয়েছি লেখাটার। ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের প্রসঙ্গ যখন এলো তখন এ প্রসঙ্গে আমি একটা কথা সবাইকে বলি, ইতিহাসবিদ হিসেবে মুনতাসীর মামুন দু’বাংলায় নমস্য ব্যক্তি। আমি ওর খুব ভক্ত।

তবে আমি একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি তা হলো আমি আর একাডেমিক লেখা লিখব না। বেশ কিছুদিন হলো আমি আমার নিজের লেখা জীবনের নানা ঘটনা স্মৃতি নিয়ে লিখছি। এসব লেখা লিখতে গিয়ে কত স্মৃতি, কত বিস্মৃতি যে মনের আঙিনায় ভিড় জমাচ্ছে! খুব স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ছি এসব লিখতে গিয়ে। খুব শিগগির এসব লেখা বই আকারে বের হবে।

বইয়ের নাম ঠিক করেছেন?

মন্দিরা ভট্টাচার্য : আমি এক যাযাবর।

এটা তো ভূপেন হাজারিকার বিখ্যাত গান। নিজেকে যাযাবর মনে করার যুক্তিসঙ্গত কী কারণ দেখেন।

মন্দিরা : মাঝে মাঝে আমি যখন চিন্তা করি তখন নিজেই অবাক হয়ে যাই। ভাবি আমার জীবনটা সত্যিই যাযাবরের মতো। বিয়াল্লিশ থেকে পঞ্চাশ পর্যন্ত কাটল বিক্রমপুরে, একান্ন থেকে একষট্টি পর্যন্ত পুরান ঢাকায়, একষট্টি থেকে ঊনসত্তর পর্যন্ত কাটল কলকাতায়, ঊনসত্তর থেকে ছিয়াত্তর পর্যন্ত কাটল জলপাইগুড়ি, সাতাত্তর থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত কাটল শিলিগুড়িতে, ২০০০ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেয়ার পর আছি মেয়ের বাড়ি দিল্লীতে। তাহলেই বোঝো আমার জীবনটা কেমন কচুরিপানার মতো ভেসে ভেসে চলেছে। এর মধ্যে বেশকিছু দেশও ঘুরেছি। সব মিলিয়ে এখন আমি যখন আমার বিগত জীবনের হিসাব করি তখন দেখি নিজের জীবনটাই যেন এক যাযাবরের জীবন।

আপনি ঢাকা ছেড়ে গেলেন কবে?

মন্দিরা ভট্টাচার্য : আসলে আমি কখনোই ঢাকা ছেড়ে যাইনি। আমি পাড়শোনা করেছি নারীশিক্ষা মন্দির, বিদ্যাময়ী স্কুল আর সবশেষে বাংলা বাজার স্কুলে। ঐ স্কুল থেকেই আমি মেট্রিক পাস করি । আমার মা শান্তি নন্দী বাংলাবাজার স্কুলের হেড মিসট্রেস ছিলেন। মেট্রিক পাস করার পর হলিক্রস কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট। কলেজ শেষ করার পর আমার বাবা আমাকে পড়াশোনার জন্য কলকাতা পাঠিয়ে দেন। এ কথা ধ্রুব সত্য ১৯৬১ সালে আমি ঢাকা ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম কিন্তু আমার জীবন থেকে ঢাকা কখনো আমাকে ছেড়ে যায়নি।

আপনাদের সময়কার ঢাকা আর এখনকার ঢাকা- এই দুইয়ের মধ্যে কেমন পার্থক্য দেখেন।

মন্দিরা ভট্টাচার্য : দেশ ভাগের পর আমরা বিক্রমপুর ছেড়ে ঢাকায় চলে এলাম। ঢাকায় এসে আমরা প্রথমে উঠলাম যোগীনগরে। পরে সেখান থেকে বাবা বাড়ি কিনে পুরোপুরি থিতু হলেন ওয়ারীর র‌্যাংকিন স্ট্রিটে। আমাদের বাড়ির নম্বর ছিল ৩৭। অনেক বড় বাড়ি ছিল সেটা। বাড়ির সামনে বড় বাগান ছিল। কতরকম ফুল ফুটত সেই বাগানে। মহল্লার ছেলে-মেয়েরা দলবেঁধে প্রতিদিন চুরি করে নিয়ে যেত ফুল। বাবা একটু-আধটু রাগ করতেন। তখন আমার মা বাবাকে বলতেন, বাগানের ফুলে এলাকার ছেলে-মেয়েদের অধিকার আছে সুতরাং ওরা ফুল নেবে।

আমাদের ছোটবেলার ঢাকা বিশেষ করে পুরান ঢাকার পরিবেশ ছিল খুবই উদার। মহল্লার মানুষদের মধ্যে প্রগাঢ় আন্তরিকতা ছিল। একটা অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ ছিল। এক মহল্লার মুরব্বিকে অন্য মহল্লায় কঠোরভাবে সম্মান করা হতো। ছোট-বড়দের মধ্যে শাসন-শ্রদ্ধা-ভালবাসার একটা অলিখিত সম্পর্ক ছিল। বড়দের সামনে ছোটরা আদব-লেহাজ নিয়ে চলাফেরা করত। কথাও বলত সেভাবে। সব পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক ছিল আত্মীয়র মতো। এ মহল্লা থেকে ঐ মহল্লা- সব মহল্লাই যেন অদৃশ্য এক আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ। আমাদের ছোটবেলায় আমরা ঈদ পুজোর মধ্যে কোন পার্থক্য খুঁজে পেতাম না।

আমি ১৯৫০ সালের ঢাকার কথা বলছি। তখনকার ঢাকা শহর ছিল খুবই ছোট। সবাই সবাইকে চিনত। জানত। আমার বাবার কাছে প্রচুর মানুষজন আসতেন। তিনি সে সময়ের ঢাকার একজন নামকরা ডাক্তার ছিলেন। তাঁর হাতের জাদুও ছিল বেশ। আমার বাবার সম্পর্কে সেসময় ঢাকা শহরে একটা কথা খুব প্রচলিত ছিল সেটা হলো- ডাক্তার নন্দীর নাম শুনলেই নাকি রোগীর ছোট-খাটো অসুখ বিসুখ যেমন জ্বর-সর্দি কাশি ভাল হয়ে যেত। বাবা ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় কর্মী। নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বাবা সবসময় বলতেন, আমি হিন্দু না, আমি কমিউনিস্ট।

আমাদের বাসায় সবসময় একটা মুক্ত পরিবেশ ছিল। শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, অভিনেতা- সব ধরনের মানুষ আমাদের বাসাকে নিজের বাসা বলে মনে করত। বিভিন্ন রকম আড্ডা বসত।

আমি ঢাকার পরিবর্তনের কথা জানতে চাচ্ছিলাম। মানে আপনার চোখে ঢাকার কোন পরিবর্তন দেখলেন কিনা?

মন্দিরা ভট্টাচার্য : ঢাকার পরিবর্তন তো হয়েছেই। ভাল করে দেখলে সেই পরিবর্তনটা বেশ মোটা দাগে ধরা পড়ে। আগের মতো ছিমছাম, নিরিবিলি পরিবেশটা নেই। আমরা যখন ছিলাম তখন পাখ-পাখালির কলরব ছিল। মানুষের উচ্ছ্বাস ছিল। এবার আমার কাছে মনে হলো ঢাকা যেন অনেক বদলে গেছে। ঘিঞ্জি-ঘিঞ্জি অট্টালিকা, বাড়িঘর গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। কোন বাড়ির সামনে কিংবা বারান্দায় গাছপালা দেখি না, ফুলের গাছ তো নেই-ই। মানুষের মধ্যেও এক ধরনের উন্মুল পরিবর্তনের প্রতিযোগিতা দেখেছি।

আপনি পড়াশোনা কোথায় করেছেন?

মন্দিরা ভট্টাচার্য : আমি তো তোমাকে আগেই বলেছি আমার জীবনটা কেটেছে যাযাবরের মতো। জন্ম বিক্রমপুরে। ওখানেই পড়াশোনা শুরু। তারপর দেশভাগের পর ঢাকা চলে এলাম। প্রথমে যোগীনগর পরে ওয়ারীর ৩৭ নম্বর র‌্যাংকিন স্ট্রিটে। ঢাকায় এসে বিদ্যাময়ী স্কুল, নারীশিক্ষা মন্দির আর বাংলাবাজার স্কুলে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়েছি।

মেট্রিক কোন স্কুল থেকে দিলেন?

মন্দিরা ভট্টাচার্য : বাংলাবাজার স্কুল থেকে ১৯৫৯ সালে ঐ পরীক্ষাটা দেই। পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করলাম। তারপর পড়লাম হলিক্রস কলেজে। কলেজ থেকে আইএসসি পাসের পর বাবা-মা বললেন, এবার পড়ার জন্য তোমাকে কলকাতায় যেতে হবে। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার জন্য ১৯৬১ সালে আমি ওখানে চলে যাই।

ছোটবেলার বান্ধবীদের কথা কি মনে পড়ে?

মন্দিরা ভট্টাচার্য : এই বাহাত্তর বছর বয়সে স্মৃতিশক্তি খুব একটা ভাল থাকার কথা না। শরীরের ওপর দিয়ে যে ধকল গেছে তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া গিয়ে পড়েছে মস্তিষ্কেও। আজকাল অনেক কিছু ভাল করে মনেও করতে পারি না। স্কুল জীবনের অনেক বান্ধবীর স্মৃতি এখনও আমার মনের মধ্যে জায়গা করে আছে। কোনটা জ্বলজ্বল করে জ্বলছে, কোনটা ধূসর হয়ে নিভু নিভু করছে। সবার নাম মনে করতে পারছি না। তবে মালেকা বেগম, শামসুজ্জাহান নূর, মমতাজ, হাজেরা খান ( ওর ডাক নাম ডালি। আমরা বলতাম ডালি খান) সহ আরও অনেকের মুখ ভেসে আসছে মনের ক্যানভাসে কিন্তু আর কারও নাম মনে করতে পারছি না। নাম মনে করতে না পারা আমার সেই সব বন্ধুদের কাছে আমি এই মুহূর্তে করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

এবার আপনার বাবা মন্মথ নাথ নন্দী সম্পর্কে কিছু বলুন?

মন্দিরা ভট্টাচার্য : প্রথমে একটা কথা বলে দিতে চাই, আমরা ভাইবোন সবাই বাবা মন্মথ নাথ নন্দীর জীবনাচরণ ও আদর্শকে মেনে চলি। চল্লিশ থেকে ১৯৬৫ সালে দেশভাগের আগ পর্যন্ত ঢাকা শহরের মানুষজনের কাছে ডাঃ নন্দী ছিলেন খুবই সম্মানের মানুষ। তার ব্যক্তিত্বের জন্য, আদর্শের জন্য সবাই তাকে শ্রদ্ধা করতেন। বাবার দেশের বাড়ি মানিকগঞ্জের ঘিওর থেকে একটু দূরের গ্রাম কুষ্টিয়ায়। আমার মা-ও মানিকগঞ্জের। মায়ের বাড়ি পালোরা নামের একটা জায়গায়।

আমার বাবা কলকাতায় ডাক্তারি পাস করেন ১৯৩৯ সালে। ভাল ছাত্র ছিলেন।ডাক্তার হওয়ার পর স্কলারশিপ পেয়েছেন। দেশের Ÿাইরে যাবেন। কিন্তু তখন বিক্রমপুরের শ্রীনগরে একটা হাসপাতাল হলো। সে সময় ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। তিনি তখন বাবাকে বললেন, তোমাকে বিক্রমপুরে গিয়ে কাজ করতে হবে। বাবা পার্টির নির্দেশ মেনে উচ্চশিক্ষায় বিদেশ না গিয়ে কলকাতা থেকে চলে এলেন বিক্রমপুরে।এখানে এসে বাবা বিক্রমপুরের মানুষকে ভালবেসে ফেলেছিলেন। দেশভাগের পর বাবা চলে এলেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে।

বাবা আমাদের সবসময় মানুষের জন্য কাজ করে যেতে বলেছেন। মানুষ সম্পর্কে বাবার ছিল অগাধ বিশ্বাস। নিজে মুক্তমনা ছিলেন বলে আমাদের ঘরে সবসময় বিরাজ করত খোলামেলা পরিবেশ। নীচতা, ক্ষুদ্রতা, সঙ্কীর্ণতা থেকে মুক্ত ছিলেন। পুরান ঢাকার মানুষকেও বাবা আপন করে নিয়েছিলেন। তাদের বিপদে-আপদে, সুখে-দুঃখে তাদের পাশেই থাকতেন।

আমাদের বাসায় সবসময় আড্ডা চলত। সেই আড্ডার পরিবেশ আর ধরন ছিল আলাদা। বিভিন্ন বিষয়ে সেসব আড্ডা জমে উঠত। সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম,সমাজতত্ত্ব, তুলনামূলক বিশ্লেষণÑ সব বিষয়ে প্রাণবন্ত আড্ডা। ছোটবেলায় আমরা আমাদের বাড়িতে কত বড় বড় মানুষদের আসতে যেতে দেখেছি, তাদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের সঙ্গে মিশেছি তা বলে শেষ করা যাবে না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শওকত ওসমান, আনিসুজ্জামান, জয়নুল আবেদিন, সুফিয়া কামাল, কামরুল হাসান, বদরুদ্দিন উমর, হাসান হাফিজুর রহমান, সন্তোষ গুপ্ত, ফয়েজ আহমদ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, কামাল লোহানী, বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই, নূরজাহান, মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মুর্তজা বশীর, শওকত আলী, নির্মল সেন- আরও কত নাম সব মনেও করতে পারছি না। চেহারাগুলো ভেসে উঠছে। কথাগুলো বলতে বলতে মন্দিরা ভট্টাচার্য আর্দ্র হয়ে ওঠেন। গলার স্বর নিচে নেমে যায়- খানিকটা বুঝি ধরেও আসে। অনেকক্ষণ নীরব থাকলেন। তারপর আর্দ্রকণ্ঠে বললেন, জানো, ঢাকায় এলেই না একটা রোগ আমার মধ্যে বাসা বাঁধে।

ঢাকায় এলেই একটা রোগ বাসা বাঁধে- মানে কী!

মন্দিরা ভট্টাচার্য : ঢাকায় এলে রাজ্যের যত স্মৃতি আছে সব ভর করে আমার মাথায়। তখন আমি স্মৃতি-জাগানিয়া রোগে ভুগতে থাকি। কোন স্মৃতি খুব জ্বলজ্বল করে , কোন স্মৃতি অস্পষ্ট, কোন স্মৃতি ঘোলা, কোন স্মৃতি ছিটেফোঁটা, কোন কোন স্মৃতি আবার পেঁজা তুলোর এদিক ওদিক ওড়াউড়ি করে। সব স্মৃতি ধরতে পারি না। তবে এবার ঢাকা আসার পর কেন যেন পুরনো স্মৃতিরা আমাকে ভীষণভাবে পেয়ে বসেছে। জড়িয়ে ধরেছে। আমি যেন ফিরে গিয়েছি সেই পঞ্চাশ দশকের ঢাকায়। যে ঢাকা আমার কাছে ছিল মায়ার মতো। যেখানে আমার কৈশোর কেটেছে। ছেলে বেলার স্বর্ণোজ্জ্বল দিনগুলো অতিক্রম করেছি।

আবার কবে আসছেন ঢাকায়?

মন্দিরা ভট্টাচার্য : ইচ্ছে তো করে সবসময় এই ঢাকায়ই থেকে যেতে। কিন্তু জীবনের প্রয়োজনে, পেশার টানে জীবন-লাটাইয়ের সুতো চারদিকে ছড়িয়ে দিয়েছি। সবদিক থেকে টান লাগে। কোথাও স্থির হয়ে থাকতে পারি না। তবে বাংলাদেশ সবসময়ই আমাকে খুব টানে। ঢাকা তো আরও বেশি।

প্রকাশিত : ২২ মে ২০১৫

২২/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: