আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ঢাকাইয়া যাত্রাপালার সংলাপ

প্রকাশিত : ২১ মে ২০১৫
  • মাহবুব রেজা

কেমন ছিল আদি ঢাকাইয়াদের সংস্কৃতি? এ নিয়ে নানা তর্ক-বিতর্ক আছে। মতান্তর ও কম নয়। কেউ কেউ আদি ঢাকাইয়াদের শত শত বছরের প্রবহমান সংস্কৃতি ও এর চর্চাকে খাটো করে দেখার অপচেষ্টা করলেও আদতে তা টেকে না। টেকে না এ কারণে যে, তাদের বক্তব্যে তারা কোন মজবুত যুক্তি দেখাতে পারেন না। কথার পিঠে কথা বলা আর যুক্তিতর্কের নিরিখে বিশ্লেষণ ভিন্ন কথা। ঢাকা নিয়ে অসামান্য দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ ‘তাওয়ারিখে ঢাকা’ লিখে মুনশী রহমান আলী নিজের জায়গা করে নিয়েছেন বেশ আগেই। তিনি তাঁর বইয়ে আদি ঢাকাইয়াদের কথা লিখতে গিয়ে বলেছেন, ‘প্রায় ১০০ বছর ঢাকা ছিল বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা, এই তিন প্রদেশের রাজধানী। এ সময় যত সুবেদার দিল্লী থেকে এখানে এসেছেন, সকলেই সব শ্রেণীর লোকজন নিজেদের সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। বিদ্বান, কেরানি, যোদ্ধা, কারিগর, শিল্পী, ব্যবসায়ী, দর্জি, স্বর্ণকার, শালকর, আমুদে, রুটি প্রস্তুতকারক, ময়রা সকলেই দিল্লী থেকে এসেছেন। এ শহর বিস্তৃতি, জনবসতি, জ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যা তখন দিল্লীর অনুরূপ ছিল। বইটি ১৯১০ সালে তিনি লিখেছিলেন।

তৎকালীন ঢাকায় বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ এসে বসতি গড়ে তুলেছিলেন। প্রধানত দিল্লী অঞ্চল থেকে আগত ভারতীয়দের ভাষা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি ঢাকাইয়াদের অনুরূপ ছিল। ঢাকাইয়াদের এই সংস্কৃতির সঙ্গে খুব সুন্দরভাবে সংমিশ্রণ ঘটে এ দেশে আগত অভারতীয় বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর শিক্ষা ও সংস্কৃতির। ফলশ্রুতিতে ঢাকাইয়াদের শিক্ষা, সংস্কৃতিতে নানামুখী প্রভাব এসে পড়ে। মুঘলপূর্ব যুগে আদি ঢাকাইয়ারা পুঁথি ও কিচ্ছা পাঠ, মুর্শিদী গান, বিয়ের গান, কীর্তন, বন্দনা সঙ্গীত, শোক ও বিচ্ছেদের গান, ধর্মীয় সামাজিক উৎসবে পালাগান ও জারিগান প্রভৃতির মাধ্যমে তাদের সংস্কৃতিচর্চা চালিয়ে যেত। এসবের মধ্য দিয়ে ঢাকাইয়া সংস্কৃতির সঙ্গে চিরায়ত বাংলার সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটত। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকাইয়া সংস্কৃতিতে নগর সভ্যতার ধাক্কা এসে লাগল। আর এর ফলে যাত্রাপালা বাঈজি ও হিজড়াদের নৃত্যগীত, ছন্দ, পিটাজি গান আর থিয়েটার যুক্ত হলো।

স্বাধীনতা সংগ্রামী ও কমিউনিস্ট নেতা বঙ্গেশ্বর রায় বিশ শতকের শুরুতে ঢাকাইয়াদের যাত্রাপালার চমকপ্রদ বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর ‘ঢাকা আমার ঢাকা’ বইয়ে। সে সময় ঢাকায় দুটো যাত্রাদলের নামডাক বেশ ছড়িয়ে পড়েছিল। এর একটি হলো নবাবপুর যাত্রাদল ও অন্যটি হলো শাঁখারীবাজার অপেরা পার্টি। এর বাইরেও আরও বেশ কয়েকটি যাত্রাদল ছিল। তবে এই দুই যাত্রাদল একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। নবাবপুর যাত্রাদল ও শাঁখারীবাজার অপেরা পার্টির যাত্রায় অভিনেতা-অভিনেত্রী দুই ভূমিকায়ই অভিনয় করত পুরুষরা। নিয়ম অনুযায়ী যাত্রা শুরু হওয়ার আগে সখীদের নাচ ও গান পরিবেশিত হয়। এসব গান বেশিরভাগই প্রেম-ভালবাসাকে উপজীব্য করে লেখা। বঙ্গেশ্বর রায় তাঁর বইয়ে যাত্রাপালার সখীদের পরিবেশিত গানের কয়েকটি চরণ তুলে ধরেছেন- ‘যাও হে চলিয়া প্রাণভোমরা বাসি ফুলে মধু মিলবে না-।’ আরও একটি গানে দেখা যায় নায়িকা নায়কের উদ্দেশ্যে বিরহকাতর কণ্ঠে গাইছেন- ‘আমার ভরা কলসি বধূ/খালি করো না, খা-লি করো না। আহা খা-লি করো না। ওপারে তুফান চলে/সাঁ সাঁ সাঁ/এপারে বধূয়া চলে/ঢেউ দিও না/ঢে-উ দিও না/আহা ঢে-উ দিও না।‘ অন্য এক গানে রয়েছে- ‘যারে যারে মন সপিলে কি হয়/যো তোমকো চাহে তোম উস্কো চাহো।’

তখনকার দিনে যাত্রাপালা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল ঢাকাইয়াদের মধ্যে। ঢাকাইয়াদের জীবনে এসব যাত্রাপালার ভূমিকা ছিল টনিকের মতো। যাত্রাপালার মধ্যে আনন্দ-বেদনা, দুঃখ-কষ্ট প্রকাশ পেত। যাত্রাপালার সংলাপগুলো শুদ্ধ বাংলায় রচিত হলেও ঢাকাইয়া পাত্র-পাত্রীরা নিজেদের সুবিধার্থে শুদ্ধ বাংলায় রচিত সংলাপকে আঞ্চলিক ভাষায় পরিবর্তিত করে দিত। এর ফলে দর্শক-স্রোতাদের মধ্যে যাত্রাপালার আবেদন আরও বেড়ে যেত। বিষয়টা একটু পরিষ্কার করে উপস্থাপন করলে এর অন্তর্নিহিত মজাটা উপলব্ধি করা যাবে। যেমন একটি যাত্রাপালায় নায়কের নাম সূর্য সিংহ আর নায়িকার নাম সংযুক্তা। যাত্রাপালার মূল পা-ুলিপিতে সংলাপ ছিল-

‘সংযুক্তা-

সূর্য সিংহ! সূর্য সিংহ!

কি হেতু প্রেরিয়াছ

সাক্ষাতের গোপন বারতা?

নহে এসবে মোরা বালক-বালিকা,

নহে শোভে নির্জন নিভৃতে

এহেন গোপন আলাপন?’

মূল পা-ুলিপিতে শুদ্ধ বাংলায় ওই রকম সংলাপ থাকলেও তখনকার ঢাকাইয়া যাত্রাপালার পাত্র-পাত্রীরা তাদের সুবিধামতো সংলাপগুলোকে আঞ্চলিক ভাষায় রূপান্তরিত করে নিত। আর সংলাপের এই রূপান্তরের ফলে যাত্রাপালা দেখতে আসা স্থানীয় মানুষরা নির্মল আনন্দলাভ করত। শুদ্ধ বাংলায় রচিত সংলাপগুলো ঢাকাইয়া ভাষায় পরিবর্তিত হয়ে কেমন রূপ ধারণ করত?

‘সংযুক্তা-

সূর্য সিং! সূর্য সিং!

ক্যালাইগা বোলাইছস?

আমরা তো আর

ছ্যাড়া ছ্যাড়ি নাই

মাঠে ময়দানে ঘোপে ঘাপে

বাৎচিৎ করুম?’

পুরান ঢাকার বিশেষ করে ঢাকাইয়া সংস্কৃতিতে যাত্রাপালার এ ধরনের প্রাঞ্জল গান ও সংলাপ মানুষের মুখে মুখে ফিরত।

প্রকাশিত : ২১ মে ২০১৫

২১/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: