কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

চাকচিক্যটাই যদি চাই, তাহলে কেন রবীন্দ্রনাথ?

প্রকাশিত : ২১ মে ২০১৫
  • -অনিমা রায়

অনিমা রায়। এই প্রজন্মের গুণী রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী। তাঁর প্রথম এ্যালবাম ‘অচেনা পরদেশী’ মুক্তি পায় কলকাতা থেকে। তখন ২০০৮। এরপর যথাক্রমে প্রকাশিত ‘কোথা যাও’, ‘আমি চিত্রাঙ্গদা’, ‘ইচ্ছামতি’, ‘রবির আলো’ বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে শ্রোতামহলে। সম্প্রতি বেরিয়েছে আরেকটি নতুন এ্যালবাম, ‘তোমার বিরহে’। রাজধানীর বেশ ক’টি বিলবোর্ডেও

দেখা যাচ্ছে এ্যালবামের প্রচারণা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক তিনি। পাশাপাশি পিএইচডি করছেন

‘পঞ্চকবির ভাবনায় স্বদেশ’ বিষয়টি নিয়ে। সাক্ষাতকার নিয়েছেন মাহবুবুর রহমান সজীব

জনকন্ঠঃ অডিও এ্যালবামের ক্ষেত্রে বিলবোর্ডে প্রচারণার মতো অদ্ভুত চিন্তা কী করে মাথায় এলো?

অনিমা রায়ঃ এটা আমার চিন্তা না, স্পন্সরের চিন্তা।

জনকন্ঠঃ বাণিজ্যিক দিক থেকে এই ধরণের চিন্তা কতটুকু ফলপ্রসূ?

অনিমা রায়ঃ ওরা যেহেতু ব্যবসায়ী, আমার মনে হয় ওরা ওদের ব্যবসাটাকেই গুরুত্ব দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথের গান দিয়ে তো আসলে ওভাবে বাণিজ্যিকীকরণ কখনোই সম্ভব নয়, যেভাবে অন্য সাধারণ ব্যবসাগুলো হয়। তবে, ওরা চেয়েছে এ্যালবামটার শিরোনাম ‘তোমার বিরহে’টা অন্ততপক্ষে সবাই যেন জানে এবং সঙ্গে রাখার জন্য বাসনা পোষণ করে। সেদিক থেকে ওরা কিন্তুু সফল হয়েছে। সিডিটা প্রকাশের সাতদিনের দিনই রি-প্রিন্ট করতে হয়েছে আবার। প্রথমে যে অনেক কপি করেছে তা না, মাত্র ৫০০ করেছিলো। সেগুলো শেষ হয়ে গেছে দ্রুতই। আমি এটার পক্ষে ছিলাম না। আমি বরং ওদেরকে নিষেধই করেছিলাম যে বিলবোর্ডটা বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। পুরো এ্যালবামের গান নির্বাচন থেকে শুরু করে সবকিছুই ওদের ইচ্ছেমতো হয়েছে। আমি শুধু গানগুলো গেয়েছি। যদিও আমি দ্বিমত পোষণ করেছিলাম এবং ভেবেছিলাম যে, আমাদের দেশে ওভাবে এখন সিডি বিক্রি হয় না। কিন্তু আমি ভুল প্রমাণিত হলাম। ওরা ওদের ভাবনা থেকে সফল।

জনকন্ঠঃ আপনার বিষয়টা না হয় ভিন্ন; কিন্তু এখন যারা কাজ করছে রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে, তাদের অধিকাংশজনকেই বহুল প্রচলিত গানগুলোই নির্বাচন করতে দেখা যায় গাওয়ার জন্য। এটা কেন?

অনিমা রায়ঃ সব গানই যে খুব প্রচলিত গান থেকে নেয়া হয়, তা না। একটা এ্যালবামের ক্ষেত্রে হয়তো চার-পাঁচটা জনপ্রিয় গান করা হয়, বাকি পাঁচ-ছয়টা কিন্তু শিল্পী নিজের ক্ষমতা দেখানোর জন্য করে। বিষয়টা হচ্ছে- একটা এ্যালবামে যদি পরিচিত বেশ কয়েকটা গান থাকে, তাহলে মানুষ সেটার প্রতি আকৃষ্ট একটু বেশি হয়।

জনকন্ঠঃ রবীন্দ্রনাথের করা ১৯১৫টি গান থেকে যেগুলো খুব কম জনশ্রুত, সেগুলো করতে চাইলে বাণিজ্যিক দিক থেকে হয়তো একটু ঝুঁকি থাকে। শিল্পীরা সেই ঝুঁকিটা নিতে চাচ্ছে না। ব্যাপারটা কি এমন?

অনিমা রায়ঃ ঠিক তা না.. যেমন ধরুণ, ‘বেঙ্গল ফাউন্ডেশন’ থেকে যে সিডিগুলো করা হয়, সেগুলো কিন্তু খুব একটা বাণিজ্যিক চিন্তা করে করা হয় না। ওরা নিজেদের টাকা খরচ করে সিডি বের করে। সেটা বাজারে বিক্রি হয় কি হয়না, সেটা নিয়েও খুব একটা মাথা ঘামায় না। কিন্তু সাধারণ যে প্রতিষ্ঠানগুলো, তারা এক্সপেরিমেন্টাল গানের ঝুঁকিটা নিতে চায় না। এমনিতেই তো এখন শিল্পীদেরকে পকেটের টাকা খরচ করে এ্যালবাম করতে হয়। সেজন্য তারাও চায় কিছু পরিচিত গান হোক, কিছু অপরিচিত। আমার এ্যালবামেও কিন্তু একটা বৈতালিক গান আছে, ‘আমি রুপে তোমায় ভোলাবো না..’। আমরা যারা গানটাকে ভালবেসে করি, আমরা সাধারণত অপ্রচলিত গানগুলোই মানুষকে শোনানোর তাগিদ বেশি অনুভব করি। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মতো আরও কিছু সংগঠন যদি আমাদের জন্য এগিয়ে আসে, তাহলে বেশ ভাল হয়।

জনকন্ঠঃ আপনার প্রথম এ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে কলকাতা থেকে। ঢাকা থেকে কেন নয়?

অনিমা রায়ঃ তখন ২০০৮। আমি ওখানে যাই কাজ করতে। সংগীত পরিচালক অমিত বন্দ্যোপাধ্যায়। কাজ করতে করতেই এক সময় তিনি বললেন যে, ‘তুই তো খুব ভালো গাস। একটা এ্যালবাম করে ফেল। তোর কিছু করতে হবে না। আমি সব করে দেবো।’ তখন তো আসলে ভাল-মন্দও বুঝতাম না ঠিকঠাক। লোকে আমার গান কখনো শুনবে, সেটাও ভাবিনি। অনেকেই তো এ্যালবাম করে, আমারও একটু করবার স্বাধ জেগেছিলো আর কী। তখন আমি টিউশনের টাকা খরচ করে কাজটা করি। কেন নিজের দেশে না, কেন অন্যের দেশে প্রথম.. আমি আসলে অত কিছু ভেবে কাজটা করিনি। আসলে, অন্যের দেশে এ্যালবাম করে কোনো লাভই হয় না। এমনকি আমি জানতেও পারিনি আমার সিডি কতো কপি ছাপলো, ওটার কোনো প্রচার হলো কিনা।

জনকন্ঠঃ তার মানে শুধুমাত্র আপনার এ্যালবামের সংখ্যাটাই বাড়লো। তাই তো?

অনিমা রায়ঃ এটাই অনেকটা। আমার গান আদৌ কেউ শুনেছে কিনা ওখানে, এই খবরটাও জানি না। এমনকি কয়েকমাস পরে ওখানের দোকানে আমি সিডিটাও খোঁজ করে পাইনি।

জনকন্ঠঃ রবীন্দ্রনাথের গান এখন সিনেমায় ব্যবহৃত হচ্ছে, বিশেষ করে কলকাতার সিনেমায়। স্টেজেও গাওয়া হচ্ছে। কিন্তু তারা গানে একটু ভিন্নতা আনতে গিয়ে গানটার মূল যে আবহ, সেটাই পাল্টে ফেলছে। এটাকে কিভাবে দেখেন?

অনিমা রায়ঃ আমরা যারা রবীন্দ্রনাথের গানটাকে শিখেছি লেখাপড়ার মাধ্যমে, বাইরের কোথাও শেখাচ্ছি.. আমরা কিন্তু আহত হই এতে। খুবই কষ্ট পাই। কিন্তু সেই কষ্টের কথা বলবো কোথায় বলেন? এই যে আপনি প্রশ্ন করলেন, আপনাকে বলতে পারি। এখন দেখছি নতুন প্রজন্মের মধ্যেও এই যে পরিবর্তিত বা একটু দুলে দুলে বা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিন্নভাবে গাওয়ার চেষ্টাটা.. এভাবে আসলে কিছু হয় না। রবীন্দ্রনাথের গানের একটা মূল বৈশিষ্ট আছে। সেটা তো হারিয়ে ফেললে হবে না! বৈশিষ্টটা রেখে গানের মানেটা বুঝে যদি কেউ আলাদা কিছু করে দেখাতে পারে, সেটা ভিন্ন ব্যাপার। কিন্তু যা হচ্ছে, সেটা এই প্রজন্মের আমার কাছেও কিন্তু ভাল লাগছে না। আমার যারা সিনিয়র আছেন, তাদের তো আরও বেশি খারাপ লাগছে। এই ২৫এ বৈশাখ যেটা উপলব্ধি করলাম আমি, এই যে রবীন্দ্রনাথের গানকে রক বা ফিউশন করার বাপারটা, এটার চাহিদা বাড়ছে দিন দিন। আমি জানি না এই চাহিদাটা কেন বাড়ছে। এই চাহিদা যত বাড়বে, ততই আমাদের মূল ধারার ক্ষয় হতে থাকবে। আমাদের গুটিকয়েকের জন্য মূল ধারাটা ধরে রাখার সংগ্রামটা জটিল হচ্ছে ক্রমাগত। চাকচিক্যটাই যদি চাই, তাহলে কেন রবীন্দ্রনাথ? অন্য গান দিয়ে হোক না! রবীন্দ্রনাথের বাণীকে নিয়ে, সুরকে নিয়ে ভেঙে অন্য কিছু করা হোক; কিন্তু সেটা রবীন্দ্র সংগীত নয় নিশ্চয়ই! অন্য কিছু করে সেটা তার নামেই চালাক, লিখে দিক যে রবীন্দ্রনাথের বাণী বা সুরের আদলে বা অনুকরণে করা.. চ্যানেলগুলোর কিন্তু একটা দায়িত্ব আছে মূলধারাটাকে মানুষের কাছে পৌঁছাবার। সেই দায়িত্বটা তাদের বুঝতে হবে, পালন করতে হবে। নতুবা এক সময় কিন্তু এই বিকৃত রুপটা প্রচার পেতে পেতে লোকে ভাববে যে এটাই বোধহয় ঠিক। ব্যাপারটা খুবই আফসোসের, হতাশার..।

জনকন্ঠঃ আমরা সংস্কৃতিগত ভাবে পশ্চিমা দিকে অগ্রসর হচ্ছি ক্রমেই। এই মুহুর্তে এসে নজরুল-রবীন্দ্রনাথের শ্রোতা কমছে, না বাড়ছে?

অনিমা রায়ঃ বাড়ছে। এবার যেটা শুনলাম ‘লেজার ভিশন’ থেকে, তুলনামূলক ভাবে ওদের আধুনিক গানের এ্যালবামের চেয়ে রবীন্দ্র-নজরুল সারা বছর ধরেই বেশি চলেছে। এমনকি ভারতেও রবীন্দ্রনাথের গান কিন্তু সারাবছরই বিক্রি হয়। আমাদের রেজাওয়ানা চৌধূরী বন্যা বা অদিতি আপা.. ওনাদের এ্যালবামও কিন্তু যথেষ্ট ভাল চলে।

২০০৯ সালে আমার যে সিডিটা (কোথা যাও) বেরিয়েছে, তার কিন্তু এখনও রি-প্রিন্ট হচ্ছে। ২০১০ এ বেরিয়েছে ‘আমি চিত্রাঙ্গদা’, সেটাও এখনও বিক্রি হচ্ছে। যেহেতু বিক্রি হচ্ছে, তার মানে মানুষ শুনছে, ভালবাসছে। হতাশার কোনো কারণ নেই, সকল প্রজন্মের মানুষই এখনও রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের গানটা নিচ্ছে।

প্রকাশিত : ২১ মে ২০১৫

২১/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: