কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

ভাল থাকুন যৌথ পরিবারে

প্রকাশিত : ১৮ মে ২০১৫
  • মো: আবু হাসান তালুকদার

সারাদিন অফিসে শেফার অস্তিরতার মধ্যে কাটল। না জানি ছেলেটা কেমন আছে? কোন কাজেই ভালভাবে মন বসাতে পারছে না। সে কয়েকবার বাসায় ফোন করেছে। প্রতিবারই বড় ভাবী বলেছে, ‘চিন্তা কর না। আমরা আছি।’

বিদেশী ডেলিগেট, অফিসের ব্যস্ততা, যানজট সব মিলিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে তার রাত হয়ে গেল। বাসায় ফিরে সব শুনে, দেখে কৃতজ্ঞতায় তার মন ভরে গেল। বড় ভাসুর অফিসে যেয়েই গাড়ি ফেরত পাঠিয়েছিল। বড় ভাবী ও মেঝো ভাসুর ছেলেটাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছে। অনেক প্যাথলজিক্যাল টেস্ট করিয়েছে। টাইফয়েড-প্যারাটাইফয়েড হয় কিনা তাই। অনীক এখন প্রায় সুস্থ। সে ভাইবোনদের সঙ্গে তার বড় আপু শামার ঘরে খেলছে। অনীকের জ্বরের খবর পেয়ে তার ননদও চলে এসেছে। সে শ্বশুর বাড়িতে বলে এসেছে অনীক অসুস্থ তাই আজ বাসায় ফিরবে না।

অনীক বায়না ধরেছে আজ সে বড় মার কাছে ঘুুমাবে। বড় মা মানে শেফার বড় জা শায়লা। সারাদিন বড় ভাবী ওকে কোলে কোলে রেখেছে। একটু পর পর গা মুছে দিয়েছে। হাতে তুলে খাইয়েছে। আসলে বেশির ভাগ সময় বড় ভাবীই খাওয়ায়। ছোট ভাইয়া বাসায় নেই তাই শেফার ননদ আজ শেফার সঙ্গে ঘুমাবে।

ঘুমানোর আগে শেফা অনীককে দেখতে গেল। দরজা প্রায় খোলাই ছিল। দরজায় দাঁড়িয়েই সে দেখল অনীক তার বড় মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়েছে। পাশে সেজুতী ঘুমাচ্ছে। বাচ্চারা ঘুমাবে বলে বড় ভাইয়া আজ অন্য রুমে ঘুমাতে গেছে। ভাবী তখনও মাথা হাতের ওপর ভর দিয়ে ঘুম জড়ানো চোখে ঘুম পাড়ানি গান গাইছে। হয়ত টের পায়নি যে বাচ্চারা এর মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছে। ভাবীর ঘুম পাড়ানি গান শুনতে খুব ভাল লাগে। মন ভরে যায়।

এ দৃশ্য দেখতে দেখতে নিজের অজান্তেই কখন যে গাল গড়িয়ে চোখের পানি ঝরেছে শেফা তা টেরই পায়নি। এ কান্না তো আক্ষেপের কান্না নয়। এ কান্না তো দুঃখের কান্না নয় যে, ছেলে তার সঙ্গে না ঘুমিয়ে অন্য কারও সঙ্গে ঘুমিয়েছে এজন্য। ভাবী কি অন্য কেউ? ভাবী তো আমার ছেলের বড় মা। সত্যিকারে মা। কষ্টের কান্না আটকে রাখা যায়। সুখের কান্না আটকানো যায় না। তার চোখের পানি মুছতে ইচ্ছে করছে না। এ যে সুখের অশ্রু। আনন্দের অশ্রু। হঠাৎ একটা হাতের মৃদু স্পর্শে সে সম্বিত ফিরে পেল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে তার শাশুড়ি। মা রে, আমার সংসারে এরকম দৃশ্য আছে বলেই তো আরও বেশি দিন বাঁচতে ইচ্ছে করে। যাও, ঘুমুতে যাও।

উপরের ঘটনাটি একটি যৌথ পরিবারের হাজারো ঘটনার একটি ঘটনা মাত্র। এ রকম দৃশ্যপট, এরকম পরিবার এখন দেখা যায় না বললেই চলে। অথচ এ রকম পরিবার এক সময় বাংলার গ্রাম শহর সর্বত্রই ছিল। আগে পরিবারের কর্তাব্যক্তিদের অন্যতম কাজই ছিল পরিবারের সবাইকে অটুট বন্ধনে আবদ্ধ রাখা। পরিবারের একজনের বিপদে অন্যজন ঝাঁপিয়ে পড়া। একজনের সুখকে সবার মধ্যে বিস্তৃত করা। সুখ-দুঃখ সকলেই ভাগাভাগি করে নেয়া। সবাইকে সব কিছুর অংশীদার করে নেয়া।

উপরের বর্ণিত ঘটনার পরিবারের একজন ছোট শিশুর অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে ওই পরিবারের এই দিনটি আবর্তিত হয়েছে। যে যার অবস্থান থেকে তার মতো করে এগিয়ে এসেছে। নিজের অজান্তেই তাদের মধ্যে ভালবাসার বন্ধন হয়েছে। শেফার মনোবল বৃদ্ধি পেয়েছে। সে জেনেছে বিপদে সে একা না, পুরো পরিবার তার সঙ্গে আছে। কেউ ভাবেনি ছেলেটি শেফার। ভেবেছে ছেলেটি সবার। তাই তো শেফার চোখে এই আনন্দ অশ্রু।

কিন্তু এই ঘটনাটি যদি আজকের প্রেক্ষাপটে চিন্তা করা হয়। একক পরিবারের প্রেক্ষাপটে চিন্তা করা হয়। তাহলে কি দেখব? দেখা যাবে এই বিপদ শুধুই শেফার একার। সে নির্ঝঞ্ঝাট জীবনযাপন করবে বলে স্বামী-সন্তান নিয়ে একা একটি বাসায় থাকে। নেই শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করার জালাতন। নেই বড় ভাই-ভাবীদের মাতব্বরি। নেই ননদ-দেবরের উটকো ঝামেলা। সে স্বাধীন। তার রাজত্বে সে মহারানী। স্বামীর অন্য ভাইয়েরাও ওদের মতো করে আলাদা থাকছে। একই শহরে বসবাস করেও কালে ভদ্রে দেখা-সাক্ষাত হয়। আর শ্বশুর-শাশুড়ি? ছেলেদের সংসারকে তাদের কাছে আপন সংসার মনে হয় না। নিজেদের পরগাছা পরগাছা লাগে। ছেলের বউরা তাদের কিছুদিনের মেহমান ভাবে। বাসায় মেহমান আছে বা মেহমান এসেছে বউদের আড়ালে আবডালে এরকম কিছু বলতে শুনে। তাই নীরব অভিমান নিয়ে সন্তানদের, নাতি-নাতনির প্রতি তাদের ভালবাসা বুকে চেপে রেখে গ্রামের জীর্ণ বাড়িতে থাকে। অবশ্য মুখে বলে পূর্বপুরুষদের মায়া ত্যাগ করে, বাড়ির মায়া ত্যাগ করে যেতে ইচ্ছা করে না। আমরা তো এখানে ভালই আছি। কি যে ভাল থাকে ছেলেরা তো আর তা জানে না। তারা মাঝেমধ্যে টাকা পাঠিয়ে আর ঈদ বা কোন অনুষ্ঠানে এসে দেখে যায়। এতেই তারা পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালনের কৃত্রিম সুখ উপভোগ করে। আবার সব ঈদেও আসতে পারে না। তাদের তো আবার শহরে আলাদা সোসাইটি আছে। সেখানে সময় দিতে হয় না!

যৌথ পরিবারে যা সমস্যা মনে হয় আসলে সেখানেই মূল শক্তি নিহীত। একক পরিবারের জন্মই হয়েছে ব্যক্তি স্বার্থকে কেন্দ্র করে। তাই এই পরিবারে বেড়ে উঠা সন্তান-সন্তুতির স্বার্থ নিয়ে বেশি করে ভাবতে পারে না। অন্যের সমস্যা সহজে তার চোখে পড়ে না। পড়লেও ভাবে এতে তার কি করার আছে? তার নিজের সব সমস্যাই তো সমাধান করেছেন তার মা-বাবা। অন্যদের বঞ্চিত করে হলেও। ভালবাসায় মন উদার হয়। কিন্তু কিছু ভালবাসা মানুষকে স্বার্থপর করে। আজকাল প্রায়ই চোখে পড়ে কোন বাসে বা ট্রেনে একজন যুবক বসে আছে। অথচ তার পাশেই একজন বৃদ্ধ বা বয়স্ক লোক দাঁড়িয়ে কষ্ট করছে সেদিকে তার ভ্রƒক্ষেপ নেই। এখন চারদিকে চিন্তা শুধু ব্যক্তির সমষ্টির নয়।

যৌথ পরিবারে স্বামী-স্ত্রী বা পরিবারের দু’জন সদস্যের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হলে অন্য সদস্যদের মধ্যস্থতায় তার সুন্দর সমাপ্তি ঘটে। একক পরিবারে যা প্রাইভেসি নষ্ট বা নাক গলানো হিসেবে ধরে নেয়া হয়। একক পরিবারের শিশুরা একা থাকতে থাকতে কখনও আত্মীয়স্বজনদের উপস্থিতি তাদের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠে। তারা সহজে মিশতে পারে না। যৌথ পরিবারে শিশুরা সহনশীলতা, সমঝোতা শিখে। আসলে যৌথ পরিবার হচ্ছে সবচেয়ে উর্বর জমিন যেখানে মানব চারা সবচেয়ে ভালভাবে বিকশিত হয়। শিক্ষার জন্য স্কুল, শিক্ষক ও পুস্তকই যথেষ্ট নয়। প্রকৃত শিক্ষা নিতে হয় পরিবার থেকে। একটা শান্তিময় পরিবার থেকে ভাল পরিবেশ আর কি হতে পারে। যৌথ পরিবারেও খারাপ কিছু থাকতে পারে। সব কিছুতেই খারাপ থাকে। কিন্তু খারাপের মধ্য থেকে আমাদের ভালটাকে বেছে নেয়ার মন মানসিকতা থাকতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাইÑ ঞযরহশ ঢ়ড়ংরঃরাব, ফড় ঢ়ড়ংরঃরাব, নব ঢ়ড়ংরঃরাব. আর চিন্তা করুন সমষ্টির, ব্যক্তির নয়। কাজ করুন সবার স্বার্থে, ব্যক্তি স্বার্থে নয়। অন্যের মতামতকে গুরুত্ব দিন। পরিবার, সমাজ ও পরিবেশ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন। তাহলে দেখবেন আপনি ভাল থাকবেন। পরিবার ভাল থাকবে, সমাজ ভাল থাকবে। তাহলে দেশটা এমনি এমনিই ভাল হয়ে যাবে।

প্রকাশিত : ১৮ মে ২০১৫

১৮/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: