মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

নগরজীবনে প্রকৃতির ছোঁয়া

প্রকাশিত : ১১ মে ২০১৫
  • মো. আবু হাসান তালুকদার

শহর নামক কংক্রিটের জঙ্গলে বসবাস করে প্রকৃতির একটু ছোঁয়া পাওয়ার জন্য মনটা বড়ই আনচান করে। বিশেষ করে যাদের শৈশব-কৈশর এবং যৌবনের প্রথমপর্ব কেটেছে গ্রামে তারা তো প্রায়ই নষ্টালজিয়ায় ভুগে। গ্রীষ্মের এই দুপুরে চোখ বন্ধ করলেই মন চলে যায় বাড়ির পাশের ছায়া ঘেরা গাছের নিচে। মনে হয় এখনি বুঝি বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠের ওপর ঢেউ খেলানো বাতাস এসে ছুঁয়ে যাবে তার শরীর। বাতাসের মমতা মাখানো স্পর্শ তার শরীর মন জুড়িয়ে যাবে। মনের অজান্তেই মনের গানের কলি বেজে উঠে ‘ধানের ক্ষেতে ঢেউ খেলানো এমন কোথায় নাইরে.....।’

মনে পড়ে পৌষের রোদমাখা সকালে সবজি বাগানের কথা। সবজির চারায় বিন্দু বিন্দু শিশিরের ওপর সকালের নরম আলোর চকমকানি। গ্রীষ্মে গাছ ভর্তি হলুুদ-লালে মেশানো পাকা আম, শীতে পাকা বড়ই এর ভারে নুইয়ে পড়া বড়ই গাছÑ সে কি ভুলা যায়।

বাচ্চারা বইয়ে পড়ে, যাহা মাটি ভেদ করিয়া উঠে তাহাকে উদ্ভিদ বলে। শহরের বাচ্চারা জানে না শিমের বীজ কিভাবে মাটি ভেদ করে টুপি মাথায় দিয়ে জন্ম নেয়। কথায় বলে ‘কচি লাউয়ের ডগার মতো নরম’। তারা কি জানে লাউ গাছের কচি ডগা আসলেই কত নরম, কত সুন্দর। কচি শসা, কচি কুমড়া, যাদের সারা শরীর এখনও হালকা নরম শালে আচ্ছাদিত। মাথায় এখনও আঁতুড়ঘরের চিহ্নস্বরূপ প্রায় খসে যাওয়া ফুল। যাদের দেখলে সদ্য জন্ম নেয়া শিশুর কথা মনে হয়। এ রকম কচি শসা, কচি কুমড়া ওরা কি কখনও গাছে দেখেছে? মাটি ভেদ করে জন্ম নেয়া একটি গাছের চারা কিভাবে একটু একটু করে বড় হয়ে যৌবনপ্রাপ্ত হয়ে ফুলে-ফুলে ভরে উঠে। এ আনন্দময় দৃশ্য দেখার অনুভূতি কি ওদের হয়েছে। শহরে বসবাস করা চোখগুলো বড়ই অভাগা। কতকাল সবুজ শ্যামল দেখা হয় না। সবুজের পানে তাকালে যে মন ভাল হয়ে যায় সে সবুজ কোথায়?

ভাবছেন এসব বলে লাভ কি? এসব তো দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছুই না। কিছুই তো করার নেই। উপায় কি? আপনি না হয় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে স্মৃতি রোমন্থন করে সুখ পেলেন। কিন্তু আপনার সন্তান যাদের জন্মই হয়েছে শহরে, তাদের তো আপনি এতটা বঞ্চিত করতে পারেন না। তা হলে উপায়? উপায় তো একটা আছেই। শহরে সবুজ শ্যামল প্রকৃতি এনে দেয়া যাবে না। তবে দুধের স্বাদ তো ঘোলে মেটানো যাবে। কিভাবে?

যাদের শহরে একটা বাড়ি আছে এবং বাড়ির ওপর একটা খোলা ছাদ আছে, তারা তা অনায়াসেই করতে পারেন। এ আর নতুন কি? অনেকেই ছাদে ফুলের গাছ, ফলের গাছ লাগায়। ঠিক আছে। ছাদে বিভিন্ন সাইজের ক্ষেত্র বিশেষে সুদৃশ্য টবে ফুলের গাছ, ফলের গাছ লাগায়। দেখতে ভালই লাগে। কিন্তু আপনার ছাদ কি প্রাকৃতিক হয়েছে? আপনার ছাদে কি প্রকৃতি এসেছে? টবে ফুল-ফলের গাছ লাগানো তো পুরনো কৌশল। এতে কৃত্রিম কৃত্রিম লাগে।

কিন্তু এই টবই যদি ইটের গাঁথুনি দিয়ে তৈরি করেন তাহলে দেখবেন ছাদের চেহারাই পাল্টে গেছে। ছাদের ওপর সরাসরি ইটের গাঁথুনি দিয়ে তৈরি করলে ছাদ ড্যাম হয়ে যাবে। তাই প্রথমে আরসিসি ঢালাই দিয়ে একটি স্ল্যাব তৈরি করুন। তারপর ছাদের বাউন্ডারি দেয়ালের পাশে ৬ ইঞ্চি থেকে ১ ফুট উঁচু করে বর্গাকারে ইটের গাঁথুনি দেন। গাঁথুনি শক্ত হলে তার ওপর স্ল্যাবটি স্থাপন করুন। এরপর স্ল্যাবের ওপর আপনার পছন্দের উচ্চতা অনুযায়ী ইটের গাঁথুনি দিয়ে চারদিকে দেয়াল তৈরি করুন। দেয়ালটি ১ ফুট বা ২ ফুট উঁচু এবং ৩ ইঞ্চি পুরু হলে ভাল হয়। মনে রাখবেন বাউন্ডারি দেয়ালের পাশের দেয়ালটি বাউন্ডারি দেয়াল থেকে একটু ফাঁক রাখবেন। এতে ছাদের বাউন্ডারির দেয়াল ড্যাম হবে না। এভাবে তৈরি করুন এক একটা হাউস। আর একটি বিষয় মনে রাখতে হবে হাউসের গাঁথুনি দেয়ার সময় নিচে এক টুকরো পাইপ দিতে হবে। যাতে হাউসের অতিরিক্ত পানি চুঁইয়ে এই পাইপ দিয়ে বের হতে পারে। না হলে অতিরিক্ত কাদা পানিতে গাছ মরে যাবে। হাউসে মাটি ফেলার পূর্বে পাইপের মুখে কিছু পাই সেপটিন (ইটের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টুকরা) দিয়ে দিন। এতে ভেতরের কাদা পানি ফিল্টার হয়ে বের হবে। ছাদ কর্দমাক্ত হবে না।

এভাবে আপনার ছাদের আকারের ওপর নির্ভর করে স্ল্যাব বানিয়ে বেইজ তৈরি করে ছাদের চারদিকে হাউস বানান। প্রয়োজন মতো মাটি ফেলুন। সাধারণত প্রতিটি বেইজ বা হাউস দেড় ফুট বা দুই ফুট চওড়া এবং লম্বায় ছয় থেকে দশ ফুট হলে ভাল হয়। প্রতিটি বেইজের মাঝে ২-৩ ফুট ফাঁক রাখুন। ইচ্ছে করলে ছাদের চারকোনায় ইংরেজী ‘ভি’ আকৃতির বেইজ বানাতে পারেন। এতে খুব সুন্দর লাগবে।

বেইজ বা হাউস বানানো সম্পন্ন হলে কোনটিতে শুধু ফুল, কোনটিতে শুধু ফল বা কোনটিতে সবজির চাষ করুন। এভাবে আম, পেয়ারা, জামরুল, পেঁপে, কুল, লেবু ইত্যাদি ফল এবং পুঁইশাক, টমেটো, বেগুন, মরিচ ইত্যাদি চাষাবাদ করতে পারেন। তাছাড়া বিভিন্ন রঙ-বে রঙের ফুল গাছ তো আছেই। পানির ট্যাঙ্কির পাশের হাউসটিতে করলা, লাউ, শসা, কুমড়া ইত্যাদি বুনুন। এখন দেখুন আপনার ছাঁদটি কেমন প্রাকৃতিক হয়েছে।

ছাদের মাঝখানে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বসার জন্য ইট, রড, সিমেন্ট দিয়ে তৈরি করুন রাউন্ড টেবিল এবং চারপাশে রাউন্ড বা পছন্দমতো চেয়ার। লাগিয়ে দিন একটি ছাতা বা টালি দিয়ে তৈরি করুন ছাঁদ। বিকেলে বা সন্ধ্যায় কোন জোছনা রাতে পরিবারের সদস্যদের বা বন্ধুদের নিয়ে বসুন, চায়ের আড্ডা দিন। দেখবেন জীবনটা অন্যরকম লাগছে। ভাল লাগায় মন ভরে যাবে। আর আপনার সন্তানরা বিভিন্ন গাছের সঙ্গে পরিচিত হবে। আপনার হৃদয়ের গভীরে শৈশবের যে প্রকৃতি বাস করে তা তাদের মধ্যেও সঞ্চারিত হবে। দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার পর আপনার কোন বন্ধু বা আত্মীয় দেশে ফেরার পথে বিমানের জানালা দিয়ে নিচে তাকাবে। অবাক হয়ে দেখবে ঢাকা শহর এত সবুজ! আসলে ঢাকা শহরের প্রতিটি ছাদে তৈরি হয়েছে এক একটি প্রাকৃতিক বাগান। এক একটি অক্সিজেন কারখানা।

ছবি : নাাসিফ শুভ

প্রকাশিত : ১১ মে ২০১৫

১১/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: