আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ভালোবাসার বিরোধী যারা

প্রকাশিত : ১ মে ২০১৫

এক অমোঘ সত্য উচ্চারণ-‘কোন যুদ্ধই ধর্মযুদ্ধ না/সব যুদ্ধই বর্বর...’ (কোন যুদ্ধই ধর্মযুদ্ধ না) আমরা পাই বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের আরেকটি কাব্যগ্রন্থ ‘ভালোবাসার বিরোধী যারা’তে। এ কবিতার বইটি কবিকে নতুন করে পাঠকের মনে স্থান করে দেবে নিঃসন্দেহে। বইয়ের কবিতাগুলো আলোড়িত করবে পাঠকে, ভিন্ন কোণ থেকে ফেলবে শিল্পের আলো।

‘এই জমি বিষণœ’ কবিতাটি একটু ভিন্নভাবে দোলা দেয় মনে। রূপক কবিতাটি নির্দিষ্ট কোন গ্রামের চিত্র থাকে না, অনুভূতি থাকে না ব্যক্তিকেন্দ্রিক; তা হয়ে ওঠে সর্বজনীন। শিকড়ের দৃশ্যকল্পকে অবলম্বন করে তিনি বলেন- ‘এই জমি বিষণœ এই জমিতে কিছু হয় না/এ হচ্ছে গ্রামের হৃদয়/এতো বিষণœ/মনে হয় না এখান থেকে কিছু ফসল হবে/এই জমির অভিজ্ঞতা নিয়ে/আমি কৃষকদের মতো বেঁচে থাকি।’

বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের কবিতা পাঠক পড়বেন অথচ উপহাস পাবেন নাÑ এমনটা যেন ভাবাই কঠিন। তবে তাঁর উপহাসের মার্গটাও যে ভিন্ন হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ক্ষমতাবান আর ক্ষমতা নিয়ে যে বাস্তবতা সৃষ্টি হয় তা কবির কাছে হাস্যকর। সিংহাসন তাঁর কাছে রঙ্গালয়, সেই রঙ্গালয়কে আঁকড়ে থাকার চেষ্টা করেন তাদের ভাবেন তিনি সঙ। তাঁর সাহসী উচ্চারণ আমরা দেখি এভাবেÑ

‘...ক্লাউনকে বিশ্বাস করুন/ভাঁড়ামিই শেষ সত্য,/মহিমান্বিত যোদ্ধারা বিদায়/দেখছেন না/ সিংহসান ঘিরে পর্দা নামছে।’ (মহিমান্বিত যোদ্ধারা বিদায়) ‘ভালোবাসার বিরোধী যারা’ কাব্যগ্রন্থে রয়েছে ৩৭টি কবিতা। প্রায় প্রতিটি কবিতার মধ্যেই রয়েছে চমৎকার দৃশ্যকল্প, যা পাঠককে শিল্পীত ডানায় ভর করে কল্পরাজ্যের বিস্তৃতি ঘটাতে সাহায্য করবে। রসোত্তীর্ণ কবিতাগুলো পাঠকের আদরণীয় হবে বলে বিশ্বাস করার উপাদান রয়েছে। বইটি প্রকাশ করেছে রূপসী বাংলা প্রকাশ। চমৎকার প্রচ্ছদ এঁকেছেন শিবু কুমার শীল।

প্রাচীনকালের যে-সব ভয়

মরিয়ম শিউলি বা শিউলি মরিয়ম। এই নামেই সে পরিচিত। হতে পারে সে মুসলমান বা হিন্দু। হিন্দু কিংবা মুসলমান। আবার হিন্দু-মুসলমান কোনটাই নয়। এসব ধর্মীয় পরিচয় থাকা না থাকাটায় তার কোন সমস্যা হয় না। পালক পিতা-মাতা থেকে বয়ঃপ্রাপ্তির পর জানতে পারে পাকিস্তানী সৈন্যদের গুলিতে অনেকের সঙ্গে শহীদ হন বাবা-মা নৌযানে। মা’র দুগ্ধপানরত অবস্থায় কুড়িয়ে পান এক দম্পতি। বাবা-মা তাকে হিন্দু-মুসলমান কোনটাই করেননি।

গল্পের ভাষ্য এ রকম : ‘পাকিস্তানীরা হিন্দু মারতে গিয়ে, মুসলমানদের মারতে গিয়ে সবাইকে না-হিন্দু না-মুসলমান করে দিয়েছে। সবাই এখন মানুষের কথা কয়।’ ...‘পাকিস্তানীরা হিন্দু মেরে মেরে মুসলমান করেছে, মুসলমান মেরে মেরে মানুষ অপবিত্র করেছে। হিন্দুদের ঠাকুর দেবতা আমাদের বাঁচাতে পারেনি, মুসলমানদের আল্লা খোদা আমাদের বাঁচাতে পারেনি। ...’ উদ্ধৃত কাহিনী ও অংশটুকু বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের গল্প গ্রন্থ ‘প্রাচীনকালের যে-সব ভয়’-এর ‘নদীটা রাষ্ট্র হয়ে যায়’ নামক গল্পের। যেখানে সব পরিচয় ছাপিয়ে মানুষ হিসেবে পরিচিতি পেতে চায় গল্পের চরিত্র। যে পরিচয়টিই সবচেয়ে বড় সত্য। এ এক মহৎ প্রচেষ্টা। রাষ্ট্র নিয়ে, মানুষ নিয়ে, সমাজ আর মানবিকতা নিয়ে উচ্চকিত গল্পসম্ভার ‘প্রাচীনকালের যে-সব ভয়’। এ গ্রন্থটিও বেরিয়েছে গত একুশে বই মেলায়।

সব্যসাচী বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর তাঁর গদ্যের শৈলী নানাভাবে উপস্থাপন করেছেন এ গ্রন্থে। যেখানে আছে আমাদের সামাজিক রাজনৈতিক আন্দোলনের গতির ওপর আলোকপাত। ’৪৭ থেকে ’৭১ কী নেই সেখানে। গল্পে এসেছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর উচ্চতা, শৃঙ্খল ভাঙার আলোক রেখা, নর-নারীর প্রেম, শিকড়ের দিকে ফিরে যাওয়ার পথনির্দেশ, আন্তর্জাতিকভাবে উপজীব্য করে স্বদেশীকতায় প্রবাহের নান্দনিক প্রচেষ্টা। তাঁর এ গল্পগ্রন্থ বাংলা কথাসাহিত্যে নিরীক্ষার এক উৎকৃষ্ট উপহার হিসেবে বিবেচিত হবে। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে বিপিএল। নান্দনিক প্রচ্ছদ এঁকেছেন অনিন্দ্য রহমান।

সিরাজুল এহসান

প্রকাশিত : ১ মে ২০১৫

০১/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: