কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অলৌকিক কণ্ঠস্বর

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৫
  • আলমগীর রেজা চৌধুরী

তখনো কথা বলছিলো ওরা। ঢেউগুলো জলের আস্তরণ ভেঙ্গে নদীর তটরেখায় এসে গড়িয়ে পড়ছিলো। মাঝ প্রহরের বার্তা জানিয়ে ডেকে উঠলো দুটো বিরহী কালিম পাখি। মাহফুজ নিশ্চুপ বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে বেলোয়ারী ঝাড়বাতির মতো ফুটে থাকা নক্ষত্রের মুখ দেখছে। তখনো নিরাকার দিকচক্রবাল ব্যেপে জমাট আঁধারিয়া মাঝ তিথির নির্জনতা! নদীর ওপারে গ্রামগুলো নিদ্রায় ডুবে আছে। যেন ‘আসহাব কাহাফ’-এর সারা দুনিয়ায়। লোহার পুলের পাশে ঝাকড়া একটা বট বিরিক্ষ। তাতে অনেকদিন থেকে বাস করে আসছে একটি চিল দম্পতি। ওদের কলরব শোনা গেলো। এই দিকটায় সাধারণত কেউ একটা আসে না। নিশি পাওয়া দু’একটা মানুষ হঠাৎ হঠাৎ মাঝ রাতের হাওয়া খেতে বের হলে শুনতে পায় আনাদিকাল থেকে বয়ে চলা ব্রহ্মপুত্রের কল কল জলধারার শব্দ। নিউ টাউন হলের পাশ ঘেঁষে শাহতকী বাবার মাজার থেকে ভেসে আসছে নেশাখোর বাউলের একতারার টুংটাং বাজনা।

আস্তে করে উঠে দাঁড়ায় মাহফুজ। তখনো কথা বলছিলো ওরা। শুকনো বালির ওপর পা পড়তেই ক্যাস করে বালি ধসের শব্দ হলো মৃদু করে। ওদের শরীরের অবস্থান স্পষ্ট করে দেখা যায় না। আবছা আবছা কথা বলার সময় হাত নাড়তে নিলে একজনের হাতঘড়ির সাদা ডায়েল অন্ধকারে চক্ চক্ করে ওঠে।

বালি ধসের শব্দের সঙ্গে ওদের কথা বলা থেমে গেলো। একজনের গলার আওয়াজ অবিকল গ্রামোফোনের কাটা রেকর্ডের মতো গর গর করে। ঠিক তেমনি গলায় বলে উঠলো-উঠলি ক্যান? আসলে কথাতো এখনো শুরু করাই হয়নি।

ততোক্ষণে দু’তিন গজ ব্যবধান ঘটেছে ওদের সঙ্গে। ঘুরে দাঁড়ায় মাহফুজ। দু’পা এগিয়ে আসে। রাগতস্বরে বলে, ‘এতক্ষণে কী আসল কথা বলা হয়নি। বক্ বক্্ করতে করতে ঘড়ির কাটা রাত দুটো পার হবার জোগাড় আর এখনো তোমাদের আসল কথা হয়নি? আমি আর তোমাদের সাথে আজকের মতো নেই। ঘুমে আমার দু’চোখ নেতিয়ে আসছে’।

আবার সামনের দিকে পা বাড়ায় মাহফুজ। নদীর উত্তরে বেশ কিছুটা জায়গাজুড়ে বিষ কাঁটালীর জঙ্গল। তা থেকে খেঁকশেয়ালের ডাক শোনা গেলো। আবার পা থেমে যায় মাহফুজের।

‘দুলু ভাই তোমরা যা সিদ্ধান্ত নিবা আমি তাতেই রাজী আছি। আমাকে এখন ছেড়ে দাও?’

‘দেখ মাহফুজ, এই সবে তোর মতামতেরও দাম আছে?’ দুলু ভাই দিশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে সিগারেটে আগুন ধরালো।

‘আমার আবার মতামত কী? এ যাবত তোমার কথা ফেলে দিছি কখনো।’ মাহফুজ মৃদুস্বরে কথা বলে। থানার ঘড়িতে রাত দু’টোর ঘণ্টা বাজলো। বেশ এক পশলা শীতল বাতাস ওদের গা ধুয়ে নিয়ে যায়। কোনো পক্ষের সাড়াশব্দ নেই।

‘ও দুলু ভাই কথা বলো না কেন? তাইলে তোমরা বসে বসে আকাশের তারা গুনতে থাকো আমি চললাম।’

দশ বারো গজ দূরে এসে পিছন দিকে একবার ফিরে তাকালো মাহফুজ। কিছু দেখা যায় না, শুধু জলরেখার কালো বুকে নক্ষত্রের চোখ ঢেউয়ের দোলায় দুলছে। যেমনি করে জেগে আছে দুলু ভাই আর দু’জনের চোখ।

নদীর তটরেখা ছেড়ে রাস্তায় উঠে এলো মাহফুজ। ঝিমিয়ে পড়া ল্যাম্পপোস্টের ক্ষীণ আলো। আশপাশটা ভালো করে চেয়ে দেখলো। না-কোন প্রাণিকুলের বিচরণ নেই। ল্যাম্পপোস্টকে পাহারাদার করে ওরা তামাম জীবনের স্বাদ অনুভব করছে। রাস্তার মোড়ে কদম গাছ ঘেঁষে দুটো ভিখিরি জড়োসড়ো হয়ে ঘুমাচ্ছে। পাশে এক কুকুর ওদের সমগোত্রীয় ভেবে চিৎপাত শুয়ে আছে।

পকেটে হাত দিলো মাহফুজ। দুলু ভাইকে দেবার পর অবশিষ্ট একটি সিগারেট থাকার কথা। তারা মার্কা সিগারেটটি প্যান্টের পকেটে রাখাতে কুচকে গেছে। ম্যাচ নেই। সিগারেট ধরানোর সময় কাকে যে দেয়া হয়েছিলো! মনে করত চেষ্টা করে মাহফুজ। সাব্বিরকে। ও শালার ওই এক অভ্যাস। ম্যাচ একবার হাতে গেলে ভুলেও ফিরিয়ে দেবার নামটি করে না।

‘শালা হারামখোর কোথাকার!’ একটু জোর গলায় গাল দিয়ে উঠলো মাহফুজ।

সামনেই মফিজ মিয়ার চা দোকান। ঘুমিয়ে থাকলেও ডেকে তুলে আগুন নেয়া যাবে। সেই ভরসাতে সিগারেট ঠোঁটের ফাঁকে গুজে একবার আকাশের দিকে তাকালো। নিকষ কালো অন্ধকার। ওর চোখ বরাবর বৃহস্পতির চোখ। বেশিক্ষণ তাকাতে পারলো না। কংক্রিট উঠে যাওয়া ক্ষতের মতো রাস্তায় পায়ের সাথে টক্কর খেলো ভীষণ জোরে। উল্টে পড়ে যাচ্ছিলো প্রায়। শরীরের ভারসাম্য কোন রকমভাবে রক্ষা করে আরেক দফা মিউনিসিপ্যালিটির গোষ্ঠী উদ্ধার করে মফিজ মিয়ার দোকানের সামনে দাঁড়ালো। না সবাই ঘুমিয়ে গেছে। রক্ষা এই মুলি বাঁশের ঝাপের পাশ ঘেঁষে চুলার উপর মাটির পাতিল সরিয়ে রেখেছে যাতে আগুন বাতাসে ছিটকে পড়তে না পারে। পাতিল সরিয়ে মাহফুজ দেখলো নিভন্ত আগুনের নিচে দু’এক টুকরো আগুন মিটমিট করে চেয়ে আছে। যাক, বাবা তাও তোমরা বেঁচে ছিলে নইলে তো আবার অনেক দূর হাঁটতে হতো, সিগারেটে আগুন ধরিয়ে সব ঠিকঠাক মতো রেখে বললÑ‘ঠিক আছে বাবারা তোমরা ঘুমাও আমি চলি।’

লম্বা করে একটা টান দেয় সিগারেটে। মুখ দিয়ে একগাদা ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে রাস্তায় পা বাড়ায়। মহিলা কলেজের সামনে আসতেই কামিনী ফুলের গন্ধ পায়। চমৎকার হাল্কা বাতাসে ফুলের সুরভি অন্যরকম একটা আমেজ। ভালো লাগে মাহফুজের। বুকে ফুর্তি ফুর্তি ভাব আসে। কতোক্ষণ পর ফুর্তির ভাব কেটে যায়। কোথায় যেন সার্থক বাদকের ব্যর্থতার পরিচয় মেলে।

মানুষের তো ছোটখাটো স্বপ্নটপ্ন থাকে। মাহফুজের বাবা ফুড অফিসের কেরানী ছিলো। দীর্ঘ বিশ বছর চাকরি করে বাবা ছোটখাটো স্বপ্নটপ্ন দেখেছিলো। যেমন ধরা যায়, শিক্ষার ক্ষেত্রে সন্তানদের সার্থক রূপায়ণ। শেষ বয়সে নিজের পয়সায় তৈরি বাড়িতে অবস্থান করে নিশ্চিন্তে মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করা। বাড়ির সামনে ছোট্ট এক টুকরো বাগান। তাতে রোজ সকাল বিকেলে পানি দেয়া। মাহফুজ মার কাছে বাবাকে এইসব কথা কোন কোন দিন বলতে শুনেছে। যুদ্ধের পর মূল্য বৃদ্ধির জন্যে নিজের সংসার চালাতে গিয়ে বার বার হাবুডুবু খাচ্ছেন বাবা। সারাজীবন সততার আশ্রয় নিয়ে বাবার স্বপ্নটপ্ন কোনো দিক দিয়ে সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। তার জন্যে বাবাতো একটা দীর্ঘশ্বাস ব্যতীত আর কোন দুঃখই করেনি! তেমনি সকাল থেকে বিকেল অব্দি অফিসের ঘানি টেনে যাচ্ছে। বড় ছেলে রাতে আদৌ বাসায় ফিরেছে কিনা সে হিসেব নেয় না আজকাল। যা দিন পড়েছে। প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজে মহাভারত অশুদ্ধ করে বসে সেই ভয়ে নিজেকে কেমন গুটিয়ে নিয়েছে! কখন আবার ‘ওল্ড হেগার্ড’ বলে গাল দিয়ে বসে কে জানে। মাঝে মাঝে মাকে বলে-‘বুঝলে আমেনা, এই সংসার-সংসার করে তুমিও তো আর কম কষ্ট পেলে না। কী দেখলে? সবাই কেমন তোমার আমার স্বপ্ন থেকে সরে দাঁড়ালো। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মাঝে আমাদের জীবন কেমন সেঁটে রইল।’

মার চোখ জলে ভরে যায়। কথা বলতে পারে না মা। মার যেন আকাক্সক্ষার সব মেরুদ- ভেঙ্গে গেছে। একদিন কী উজ্জ্বল দীপ্তি দেখেছিলো মার চোখে মুখে! যুদ্ধের আগের কথা। সংসদে যাবে না শেখ মুজিব! দেশ তুমুল একটা ঘটনার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে। ধর্মঘট চলছিলো সবখানে। প্রতিবাদের মিছিল যাচ্ছে কাতারে কাতারে। মানুষের ঢল নেমেছে রাস্তায় রাস্তায়। তপ্ত লাভার মতো জ্বলছে সারা দেশ। মিছিলের অগ্রভাগে মাহফুজকে দেখে ঘর থেকে দৌড়ে বের হলো মা। চিৎকার করে বলে উঠলো খোকা-‘জোরে জোরে বল জয়...বাংলা।’ অশিক্ষিত পাড়াগাঁয়ের মেয়ে মা উপলব্ধি করতে পেরেছিলো মানুষ তার ন্যায্য অধিকারটুকু ফিরে পেতে চায়।

সারা দেশে ক্ষ্যাপা কুত্তার মতো ছুটে আসছে হানাদার বাহিনী। আর দু’একদিনের মধ্যে এই শহরে উঠে আসবে ওরা। গভীর রাতে শহর ছেড়ে পালায় মাহফুজ। পালানোর সময় মার পা ছুঁয়ে ছালাম করতেই ছলছল করে ওঠে মার চোখ। কোনো কথা বলে না। এক সময় গল্ডদেশ বেয়ে টপটপ করে গড়িয়ে পড়ে দু’ফোঁটা জল। মার সিক্ত চোখের দিকে ঢিবির মতো জেগে থাকে এতোদিনের পরিচিত শহর। মার চোখের জল। চোখে ভাসতে থাকে রক্তের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে বাংলাদেশ। আমার মায়ের চোখের মতো অসহায়। বেদনায় কাতরাতে কাতরাতে চোখের ভেতরে জেগে ওঠে পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইলব্যাপী মানচিত্রের অপরূপ ছবি। মাহফুজের মুখ থেকে অস্ফুটস্বরে বেরিয়ে আসে-‘জয় বাংলা।’

নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর স্টেনগান কাঁধে নিয়ে জয় বাংলা বলতে বলতে এই শহরে ফিরে আসলো মাহফুজ। মুক্ত স্বদেশের হাওয়া বুকের ভেতর মাতম করে উঠলো স্বাধীনতার তীব্র স্বাদ। কী চমৎকার দিন! উসকো খুসকো চুলগুলো নিয়ে যখন মার সামনে দাঁড়ালো মাহফুজ, সদ্যজাত শিশুর মতো কলকল করে উঠলো মার কণ্ঠস্বর। বুকের কাছে চেপে ধরলো মাহফুজকে। পরম তৃপ্তি, আহা, বুকে জমে থাকা রোরুদ্যমান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাঁচলো মাহফুজ।

নয় মাসের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু, যার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে সদ্যজাত বাংলাদেশ। সেই প্রাণপ্রিয় স্টেনগানটি জমা দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে রইলো মাহফুজ। নির্বাক নির্লিপ্তের মতো সারা শহর চষে বেড়াতো। চেয়ে দেখতো অসহায় বাংলাদেশের বুক খাবলিয়ে খাচ্ছে কিছুসংখ্যক মানুষ। ওদের দিকে অসহায় দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে থাকতো। দুটো হাত অকারণে নিশপিশ করতো। ওর তখন রোমেলের কথা মনে পড়তো। এক সাথে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলো। কামালপুরের যুদ্ধে এক সাথে এক বাংকারে থেকে ক্রমাগত তিন দিন যুদ্ধ করেছিলো। গুলি ফাটার শব্দে রোমেলের রক্তের মধ্যে জয়ের কী উন্মাদনা দেখা যেতো! প্রতিপক্ষের আক্রমণ একটু স্তিমিত হলে নিজের পরিবেশ ভালো করে চেয়ে দেখতো রোমেল। ও শুধু বার বার বলতো- ‘বুঝলি মাহফুজ কী হবে যুদ্ধ করে। একদিনতো দেশ স্বাধীন হবে। যুদ্ধ শেষে ফিরে দেখবো ইয়াহিয়ার জায়গায় নতুন করে আরেকজন রক্তচোষা জন্ম নিয়েছে। সেদিন আমাদের এই রক্তলীন ভালোবাসা মিথ্যে হয়ে যাবে।’ রোমেল জয়ের পতাকা দেখে যেতে পারেনি। কামালপুর থেকে হানাদার বাহিনীকে হটিয়ে দিয়ে ধেনুয়ার কাছে এক ব্রাশ ফায়ারে রোমেলের বুক ঝাঝরা হয়ে যায়। রোমেল আর ঘরে ফেরেনি।

ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে রোমেলের কথাগুলো বার বার বিব্রত করে তুলতো মাহফুজকে। ওরাও তো এই দেশের জন্য যুদ্ধ করেছিলো। জয় বাংলা বলতে বলতে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার সবুজ প্রান্তজুড়ে প্রাণের সমস্ত ভালোবাসার বন্যা বইয়ে দিয়েছিলো।

এই রকম দোদুল্যমান চিন্তাধারায় যখন নিজের ভেতর ভাংচুর লক্ষ করে তখন মফিজ মিয়ার হোটেলে পরিচয় দুলু ভাইয়ের সঙ্গে। যুদ্ধফেরত দুলু ভাই। ইতো মেধ্যে শহরে নামডাক হয়েছে কিছু। লোকটার মধ্যে আশ্চর্য এক মোহিনী ক্ষমতা আছে। চমৎকার কথা বলতে পারে। যে কোন মানুষকে দু’মিনিটের মধ্যে তার দিকে টেনে আনতে পারে। কথা উঠেছিলো এভাবে-‘আমরা ক্রমাগত সাম্রাজ্যবাদের ধ্বজাকে শক্ত হাতে ধরতে যাচ্ছি। দুলু ভাইয়ের পাশে বসা ছোকড়া মতোন এক ছেলে বলে ওঠে।

‘আমরা তো শালার পোষা কুত্তার বাচ্চা। যা কইবো তাই শুনবো আমাদের আবার নীতি আমাদের আবার দেশ? কী অইবো দেশের? সোনার বাংলা তামা অইবো। দেখখা নিস? একটু চেঁচানো কণ্ঠে বলে দুলু ভাই।

চুপচাপ হোটেলের এক কোণে বসে চা খাচ্ছিলো মাহফুজ। ওদের কথা শুনতে শুনতে কখন নিজের টেবিল ছেড়ে ওদের টেবিলের পাশে ভিড়ে গেছে টের পায়নি। যখন বুঝতে পারে দুলু ভাই তখন অনেক নিকটের মানুষ হয়ে গেছে।

এমনি করে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর আসর জমতে লাগলো। রাত করে ঘরে ফেলে মাহফুজ। মা বলতে বলতে এক সময় থেমে যায়। মাহফুজ যেন একটা বৃত্তের মধ্যে আটকে গেছে।

একদিন দুলুভাই বলেÑ‘চল মাহফুজ আজ তোরে নেতার সাথে পরিচয় করে দিমু?’

সরুগলি দিয়ে ঢুকে পলেস্তারাহীন পুরোনো বাড়িটায় ঢুকলো ওরা কয়জন। দুলু ভাই, মাহফুজ, সাব্বির, মজিদ। দুলু ভাই তিনবার দরোজায় আঘাত করলো। খট করে ওপাশের খিল খোলার শব্দ হয়। ওদের সামনে মমতাজ তরফদারকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আবাক হলো মাহফুজ। তাকে সে ভালো করে চেনে। যুদ্ধের সময় পাকবাহিনীর সাথে দালালি করেছে। শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলো। যুদ্ধের পর তিন মাস জেল খেটে টাকার জোরে বের হয়ে আসে। মাহফুজের মাথার রক্ত আরেকবার কিলবিল করে ওঠে।

সোফায় আসন গ্রহণ করতে করতে দুলু ভাই বলে, ‘পরিচয় করিয়ে দেই মমতাজ ভাই, নতুন পার্টনার মাহফুজ। আমাদের সাথে কাজ করতে রাজি আছে।’

এক পাশের সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে পড়ে মাহফুজ। ঈষৎ অন্ধকার। ছড়িয়ে ছিটানো ঘরের আসবাবপত্র। বেলজিয়াম কাচে বাঁধানো শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণের ছবি একপাশের দেয়ালে টাননো রয়েছে। অকারণে হাসি পায় মাহফুজের। পরমুহূর্তে নিজকে সংযত করে নেয়।

ফিলটারটিপ সিগারেটে আগুন ধরাতে ধরাতে মমতাজ তরফদার বলে- ‘ভালই তো। কিন্তু আমাদের কাজের কথাগুলো কি ওকে ভালো করে বুঝানো হয়েছে? ও আমাদের পক্ষে কতোটা সততার পরিচয় দিতে পারবে যে ওকে তুমি বিশ্বাস করলে?’

দুলু ভাই বলে- ‘সে বিশ্বাস আপনি রাখতে পারেন মমতাজ ভাই। তাছাড়া ওকে আমি কিছুই বলিনি। আপনার সামনে নিয়ে এলাম আপনি ওকে বুঝিয়ে বলুন। সেটাই ভালো।’

লম্বা করে সিগারেট টান দেয় মমতাজ তরফদার। মাহফুজ একবার মমতাজ তরফদারের মুখের দিকে, আরেকবার দুলু ভাইয়ের মুখের দিকে তাকায়। বিজ্ঞের মতো নিঃশব্দে বসে থাকে।

মমতাজ তরফদারের মুখ থেকে যা শুনছিলো তা সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেনি মাহফুজ। ওদের রক্তের মধ্যে বহমান বিশ্বাসঘাতকের হিমোগ্লোবিন। তার সাথে যোগ দিয়েছে দুলু ভাই, সাব্বির, মজিদ ও আরও অনেকেই। দুলু ভাইয়ের আদর্শের বুলি ছিলো খোলস। আসলে এরা সাধারণ মানুষের মুক্তি কোনো দিনই চায়নি।

কিন্তু ততদিনে নিজকে দুলুভাইয়ের বৃত্তের মাঝে বন্দী করে ফেলেছে মাহফুজ। বের হবার কোনো পথ খোলা নেই! শুধু ঘুরছে তো ঘুরছে। ক’দিন পর ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়ে দুর্দান্ত দুঃসাহসিকতার পরিচয় দিলো মাহফুজ। মমতাজ তরফদারের সাথে সাথে দুলুভাইয়ের প্রিয়ভাজন হয়ে উঠলো। নানান দিক দিয়ে টাকাপয়সা আসতে লাগলো দেদার। একদিন বাবাকে পাঁচ হাজার টাকা সেধে দিতে গেলো মাহফুজ। বাবা মাহফুজের মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায়। বাবা প্রশ্ন করে –‘এতো টাকার উৎস কোথায়?’

মাহফুজ গম্ভীর কণ্ঠে বলে-‘নয় মাসতো যুদ্ধ করেছিলাম এই টাকা রোজগার করার জন্যে। ক্যান জানেন না? টাকাগুলো হাতে রাখেন সংসারের কাজে লাগবে!’

হঠাৎ বাবার চোখ জলে ছল ছল করে ওঠে। কথা বলতে পারে না। অসহায়ভাবে চেয়ে থাকেন। বুকের ভেতর রক্তের সংকোচন টের পায়। মাহফুজ বাবার সম্মুখ থেকে সরে যায়।

বাবা বলে-‘তুই তো আমার মতো একদিন বাবা হবিরে খোকা?’ কোনো কথাই শুনতে পায না মাহফুজ। টাকাগুলো টেবিলের উপর ছিলো। তেমনি পড়ে রইলো। শেখ মুজিব অনিমেষ চেয়ে রইলো একজন দুঃখী বাবার দিকে।

জমির মোল্লার শক্তি ঔষধালয় বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েকবার চটাস চটাস আঘাত করলো টিনের ঝাপের উপর। ওদিক থেকে কোনো শব্দ পাওয়া গেলো না। শালার আজকের রাতটাই মাঠে মারা গেলো। সুরা ব্যতীত ফজিলার ঘরে জমবে না ভালো। ভাবলো মাহফুজ। একটু এগিয়ে অন্ধকার গলিতে ঢুকলো। এতোরাতে মৃতের মতো ঘুমিয়ে সারা পাড়া। বরাবর দেখা যায় পাড়ার শেষ মাথায় ল্যাম্পপোস্ট মিটমিট চেয়ে আছে। ক্ষীণ আলো। রাস্তা খুব একটা পরিষ্কার দেখা যায় না। ফজিলার ঘরের দরোজার কাছে আসতে আরেকবার ইটের সাথে পায়ের টক্কর খেলো মাহফুজ।

মাগী, আবার কোন নাগরের গলা জড়িয়ে মজা লুটছে কে জানে! মনে মনে একবার ভেবে নেয় মাহফুজ। কান পেতে ঘরের ওপাশে কোনো শব্দ হয় কি না জেনে নিলো। না কোনো শব্দ নেই।

দু’তিনবার কড়া নাড়লো। কোনো সাড়া নেই। তেমনি অন্ধকারে অপেক্ষা করতে লাগলো মাহফুজ।

তারপর ক্ষীণ কণ্ঠে ডাক দিলো-‘ফজিলা অয় ফজিলা?’

ভেতরে চৌকির কর কর আওয়াজ হলো। আবার ডাক দিলো, মাহফুজ ভাই! এতো রাতে আবার ক্যান?’ বলতে বলতে লাইট জ্বালায় ফজিলা। ঘরের ভেতর আলোর বন্যা। আলুথালু বেশে দরোজার খিল খোলে ফজিলা।

‘পাখাটা একটু ছেড়ে দে। ঘামে ভিজা গেছি।’ মাহফুজ ক্লান্তকণ্ঠে বলে। অবিন্যস্ত কাপড় ঠিক করতে করতে ফজিলা বলে- ‘এতো রাই’ত আইলা ক্যান? ঘরে যদি মানুষ থাকতো?’

‘ফিরা যাইতাম।’

‘তোমাগো তো আর সময় জ্ঞান নাই। কহন কী কর কে জানে।’

তা‘হলে আজকাল বুঝতে পারতাছস আমরা কী করি?’

ফজিলা কোনো কথা বলে না। গুমোট এক নিস্তদ্ধতা ঘরময় বিরাজ করতে থাকে। চৌদিকে রি-রি শব্দ। মাহফুজের মাথার শিরায় আঘাত করতে থাকে। চেয়ারে বসে পড়ার সাথে সাথে শরীর এলিয়ে দেয় মাহফুজ। ফজিলার বুক থেকে কাপড় ঈষৎ সরে গেছে। স্ফীত স্তন যুগল লাফিয়ে বেরিয়ে আসতে চায়।

‘বুঝলি ফজিলা সব শালার কুত্তার বাচ্চা।’ নিঃস্তব্ধতা ভাঙে মাহফুজ। ঘুমজড়িত চোখে তাকিয়ে থাকে ফজিলা। কথা বলে না।

রক্ত যতোক্ষণ শরীরে আছে ততোক্ষণ জোর খাটায়। তারপর কী করে! ঘুমিয়ে যায়।

‘তোমার কী অইছে’ ফজিলা বলে।

‘অইব আর কী? তোর কী মনে হয় আমরা খেটে খাই না? আমাদের মতো রক্তের খাটুনি খেটে কয়জন পয়সা কামায়? বুঝলি, দুলুভাই আজ ঠিক বুঝতে পারছে আমি আর মমতাজ তরফদারের সিঁড়ি অইতে চাই না। আর দুলু ভাই শালার চোদনা মার্কা মানুষ। পায়ের নিচে থেকে ফুসকি চুলকাতে ভালোবাসে।’

‘ক্যান দুলু ভাইতো মানুষ খারাপ না। তুমি না একদিন কইছিলা?’

‘ও তুই বুঝবি না ফজিলা, সব শালা আদর্শের বুলি ঝেড়ে নিজেদের পথ করতে চায়।’

ফজিলার মনে পড়ে প্রথম যেদিন দুলু ভাইকে নিয়ে এলো মাহফুজ সেদিনই ভালো লাগেনি দুলু ভাইকে, কী করম ধূর্ত শিয়ালের মতো চোখ তার। পরে মাহফুজকে বলেছিলো ফজিলা। মাহফুজ সেদিন পাত্তা দেয়নি ফজিলার কথায়। ফজিলা নিজহাতে জুতোর ফিতে খুলে দেয় মাহফুজের। চোখ দু’টো নেতিয়ে আসছে ওর। ফ্যানের তাপমিশ্রিত বাতাস বার বার ওর ঝাকড়া চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছিলো।

এক গ্লাস পানি খেলো মাহফুজ। লাইট অফ করে দিয়ে বিছানায় এলো ফজিলা। নিরাকার অন্ধকারে ডুবে গেলো ওরা। ফজিলার মাথায় হাত রাখলো। ওর শরীরের উত্তাপ একটু বেড়েছে। নারীর শরীরের মধ্যে অন্য রকম একটা মমতার স্পর্শ আছে। ওর গা ছমছম করে ওঠে। কোনো শব্দ করে না। ফজিলা একবার বলে, ‘ঘুমাবা না এমনি ঘাপটি মেরে পড়ে থাকবা?’ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে মাহফুজ।

‘কী মনে হয় জানস! মনে হয় কতকাল মমতার স্পর্শ পাই না। বুকটা একেবারে খাঁ-খাঁ করছে।’ কথাগুলো ভেতরটা আটকে যায় মাহফুজের ।

ও পাশের মাঝখানে তাহমিনার ঘর। তাহমিনার ঘরের মাতালটা আবার ক্ষেপেছে। হঠাৎ এতো রাতে চিল্লাপাল্লা শুরু করে দিয়েছে। মাহফুজের অনর্গল কথা বলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ততোক্ষণে ফজিলার নাক ডাকার শব্দ হয়। চুপ হয়ে যায় ও নিজে। ঘুম আসে না মাহফুজের চোখে। অনেকক্ষণ পর বাইরে পদশব্দ শোনা যায়। কান সজাগ করে ও। সাথে সাথে টুকটুক করে দরোজায় ঘা পড়ে। কোনো কথা বলে না মাহফুজ। ক্রমশ শব্দ জোরে হতে থাকে। ঘুম ভেঙ্গে যায় ফজিলার। ঘরের গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে চোখ মেলে কিছুই দেখতে পায় না। শুধু মাহফুজের দ্রুত শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ পায়।

‘দরোজা খোল মাহফুজ আমি দুলু ভাই।’ গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসে।

‘এতো রাতে আবার এখানে কেন?’ মাহফুজ বলে।

‘কথা আছে।’

ডানহাত দিয়ে সুইচটা অন করে। আলোয় চোখ মেলে দেখে ফজিলার দু’টো চোখ চিকচিক করছে। একবার ফজিলার দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়। আড়মোড়া ভেঙ্গে দরোজার দিকে এগিয়ে যায়। দরোজা খুলতেই দেখতে পায় দুলু ভাইয়ের হাতে উদ্যত রিভলবার। পিছনে আরো দু’জনকে দেখে চিনতে পারে না। ঘরে ঢুকে দুলুভাই সাথের দু’জনের মুখ আলোয় ভেসে ওঠে। সাব্বির আর মতিন। রিভলবার হাতে দুলুভাইকে ঘরে ঢুকতে দেখে ফজিলা ভয়ে এক পাশে জড়োসড়ো হয়ে যায়। মাহফুজ একটু আঁতকে ওঠে। দুলুভাইয়ের দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকে।

‘তোর শেষ কথা শুনতে এলাম মাহফুজ।’ দুলুভাইয়ের মুখ ফুটে কথা বেরোয়।

প্রায় মিনিট খানেক কোনো জবাব দেয় না মাহফুজ । দুলুভাই অবাবার জিজ্ঞেস করে। সাব্বির মতিন আলনা ঘেঁষে অনড় দাঁড়িয়ে থাকে। ওদের রাতজাগা চোখ ক্লান্ত দেখায়।

‘তুমি তো এক সময় আমাদের আদর্শের কথা শুনিয়েছিলে দুলু ভাই। আজ তুমি আমাকে এই কথা জিজ্ঞেস কর কেন?’

‘মমতাজ তরফদার তোকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তা তুই জানস?’

‘জানি।’

‘তবুও?’

‘এক সময় সাধারণ মানুষের কথা বলে তুমি আমাকে আকৃষ্ট করেছিলে দুলু ভাই।’ নির্বিকারভাবে বলে মাহফুজ। দুলু ভাই গম্ভীর হয়ে যায়। উদ্যত রিভলবারটা নামিয়ে নেয়। অনেকক্ষণ মাহফুজের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে-‘আমাদের কোনো পথই আর খোলা নেইরে।’ অসহায় শোনায় দুলু ভাইয়ের কণ্ঠস্বর।

হঠাৎ আলো চলে যায়। গাঢ় অন্ধকার। কারো মুখ দেখা যায় না। জেগে থাকে কয়েকটি জ্বলন্ত প্রাণ।

‘আমরা রক্ত নিয়ে খেলতে খেলতে রক্তহীন মানুষ হয়ে গেছি। আমাদের রক্ত আর কারো জন্যে মঙ্গলকর হবে না।’ অন্ধকারে দুলুভাইয়ের কণ্ঠ আবার শোনা যায়।

কিন্তু রক্তাক্ত পথ দিয়ে তো আমরা হেঁটে যেতে পারব। মাহফুজের কণ্ঠস্বর শেষ হতে অন্ধকারে এক ঝাঁক আগুন ভেসে এলো ঠা-ঠা-ঠা শব্দে ভেসে উঠলো রাতের নিস্ততায়। বাইরে লক্ষ্মীপেঁচার চিৎকার শোনা গেলো। দুলুভাইসহ মাহফুজ মাটিতে পড়ে গেলো। সাব্বিরের হাতে রিভলবার। ওরা দু’জন দৌড়ে পালালো। ওদের দ্রুত পালানোর শব্দ শুনতে পায় মাহফুজ।

‘মরে গেলামরে মাহফুজ?’

মাহফুজের বুকের কাছে অসহ্য যন্ত্রণা আরম্ভ হলো। সহসা ঘরে আবার আলো এলো। আলোর বন্যায় মাহফুজ কিছুই দেখতে পেলো না। শুধু যন্ত্রণার মধ্যে তাৎক্ষণিক দৃশ্য ভেসে উঠলো। চারদিক একবার ভালো করে চেয়ে দেখলো। ফজিলার নিষ্ক্রিয় শরীর বিছানায় উবু হয়ে পড়ে আছে। ওর শরীরজুড়ে চাপ চাপ রক্ত। দুলু ভাই আর কাতরাচ্ছে না। মাহফুজের শরীরের তন্ত্র গুলোয় রক্তক্ষরণের তীব্র জ্বালা। ওর অস্তিত্ব আস্তে আস্তে আরো ক্ষীণ হয়ে আসতে লাগলো। এক সময় ও অনুভব করলো পৃথিবীটা এক বিশাল জলাশয়, মানুষগুলো এক একটি দ্বীপের মতো জেগে আছে। রোমেলের মুখ, মার মুখ, বাবার মুখ, দুলু ভারয়ে মুখ, ফজিলার মুখ দ্রুত সরে গেলো চোখ থেকে। হঠাৎ মনে হলো দিগন্ত কম্পিত করে মা যেন বলে উঠছে-‘খোকা, আরো জোরে জয় বাংলা বল।’

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৫

১৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: