কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত : ১০ এপ্রিল ২০১৫
  • অনু ইসলাম

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের কবি সম্প্রদায়ের কাছে রাজনৈতিক কোন মতাদর্শ প্রাধান্য পায়নি। যার ফলে তখনকার কবিদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন অনুষঙ্গ স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে ছিল কবিতার বিষয়বস্তু হিসেবে।

আমাদের কবি সম্প্রদায় তখনকার সমসাময়িক যুদ্ধচলাকালীন পরিস্থিতি এবং মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ-উদ্দীপনা দেয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে তারাও সাহিত্যের মাধ্যমে এক অনন্য আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কবিতাগুলোর মাঝে আমরা সেই চেতনার প্রভাব নানাভাবে উদ্ভাসিত হতে দেখি।

দীর্ঘ সময়ের যে পরাধীনতা। সেই পরাধীনতার গ্লানি মোচন করার জন্য যুদ্ধই যে একমাত্র পথ এবং সেই পথকে অবলম্বন করেই আমাদের বাঙালী জনতা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল।

সৈনিকের মতো বজ্রকণ্ঠে শপথ নিয়েছিলেন কবি হাসান হাফিজুর রহমান তার ‘শত্রুর লাশ চাই’ কবিতায়। তাই তিনি শত্রুর বিরুদ্ধে হুঙ্কার দিয়ে প্রতিরোধ গড়তে চেয়েছেন এভাবেÑ নিহত ভায়ের লাশ কাঁধে লয়ে ঢের/গড়েছি মিনার, হেঁটে গেছি পথ/আর নয়, চাই শত্রুর লাশ চাই/এই বার এই বজ্র শপথ। দেশজুড়ে যখন স্বাধিকার আন্দোলন। এই আন্দোলন যে ক্রমান্বয়ে দেশকে মুক্ত করার দৃপ্তপ্রত্যয়ে জেগে ওঠেছিল এবং প্রতিটি মানুষ যে আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে সেই দিকটি ফুটে ওঠেছে কবি আহসান হাবীবের ‘মিছিলে অনেক মুখ’ কবিতায়। এই কবিতায় কবি স্বদেশের মানুষের মাঝে সেই জাগ্রত রূপকে তুলে ধরেছেন- মিছিলে অনেক মুখ /দেখো প্রতিমুখে তার/সমস্ত দেশের বুক থরো থরো/উত্তোজিত/শপথে উজ্জ্বল/দেখো লক্ষ জনতার প্রাণ/অমর দীপ্তিতে জ্বলে মিছিলের সারামুখে দেখো।

বাঙালী যখন একটি মারাত্মক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দিকে অগ্রসর তা প্রত্যক্ষ হয় শামসুর রাহমানের ‘টেলেমাকাস’ কবিতায়। এই কবিতায় স্বদেশের জন্য প্রকাশিত পায় তার ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং ঘাতকের যে তা-ব তা কবে শেষ হবে তার জন্য উদাত্ত প্রতিবাদী উচ্চারণ-কখনও এড়িয়ে দৃষ্টি ছুটে যাই অস্ত্রাগারে; ভাবি/লম্পট জোচ্চোর আর ঘাতকের বীভৎস তা-ব/কবে হবে শেষ? সূর্যগ্রহণের প্রহর কাটবে কবে/সমস্তই থাকা, গরগরে জনগণ প্রতিষ্ঠিত/অনাচার, অজাচার ইত্যাদির চায় প্রতিকার। শহরের বুকে যখন ক্রমাগত পদশব্দ শোনা যায় পাকিস্তানী সৈনিকের তখন তাদের উপস্থিতিতে শহরের মানুষ কেউ যেন কারও সঙ্গে কথাই বলতে পারে না। শহরের সেই অবরুদ্ধ চালচিত্র প্রত্যক্ষ করে কবি সৈয়দ শামসুল হক উচ্চারণ করেন- আমি যেখানে যাই এ শহরে অবেলায় ক্রমাগত বেলা পড়ে যায়। রেস্তরাঁয় যে ছেলেটি কাজ করত সে জানত না রাজনীতি কী? অথচ সেই ছেলেটি কে নির্মমভাবে হত্যা করেছে বর্বর বাহিনী। জীবনের যে কোন নিরাপত্তা ছিল না। সে সময় শহরের মানুষ যে অবরুদ্ধ নগরীতে পরিণত হচ্ছে কবি শহীদ কাদরী তার ‘নিষিদ্ধ জার্নাল’ কবিতায় সেই চিত্র তুলে ধরেছেন- ধ্বংসস্তূপের পাশে, ভোরের আলোয়/একটা বিকলাঙ্গ ভায়োলিনের মতো দেখলাম তে- রাস্তার মোড়ে/সমস্ত বাংলাদেশ পড়ে আছে আর সেই কিশোর, যে তাকে/ইচ্ছের ছড় দিয়ে নিজের মতো করে বাজাবে বলে বেড়ে উঠছিলো/সেও শুয়ে আছে পাশে, রক্তাপ্লুত শার্ট পরে। একজন মুক্তিযোদ্ধার আগে পিছনে যে মৃত্যু তাকে তাড়িত করে তবুও সে শত্রু হননের মোহে রাত্রি জাগরণ করে সেই দিকটি কবি জসীমউদ্দীন তার ‘মুক্তিযোদ্ধা’ কবিতায় একজন মুক্তিযোদ্ধার রূপকে তুলে ধরেছেনÑ আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা, মৃত্যু পিছনে আগে/ভয়াল বিশাল নখর মেলিয়া দিবস রজনী জাগে। বাঙালী যে নিজ হাতে নিজেরাই স্বদেশ কে পরিচালনা করতে পারবে তার জন্য পশ্চিমা ছায়া সরে যেতে উদাত্ত কণ্ঠে প্রতিবাদ করেছিলেন কবি সিকান্দার আবু জাফর তার ‘বাংলা ছাড়ো’ কবিতায়- আমার হাতেই নিলাম আমার/নির্ভতার চাবি/তুমি আমার আকাশ থেকে/সরাও তোমার ছায়া।

যুদ্ধ যখন শেষ তখন বাঙালী একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিকারে প্রতিষ্ঠিত। ঠিক তখন যুদ্ধের সমস্ত সৈনিকেরা তাদের আগ্নেয়াস্ত্র পুলিশ স্টেশনে জমা দিতে থাকে। কিন্তু কবি নির্মলেন্দু গুণ স্বাধীনতাকে হৃদয়ের মতো মারাত্মক একটি আগ্নেয়াস্ত্রের সঙ্গে তুলনা তার সেই অস্ত্র জমা দেননি। সেই অভিব্যক্তি তার ‘আগ্নেয়াস্ত্র’ কবিতায় ফুটে ওঠেছেÑ পুলিশ স্টেশনে ভিড়, আগ্নেয়াস্ত্র জমা নিচ্ছে শহরের/সন্দিগ্ধ সৈনিক/অথচ আমার সঙ্গে/হৃদয়ের মতো মারাত্মক একটি আগ্নেয়াস্ত্র আমি জমা দিইনি। মানুষ নিঃসঙ্গচারী। তখন স্বাধীনতা প্রাপ্তির কথা স্বরণে রেখে মানুষ বেদনাকে দূরে ঠেলে যন্ত্রণার পোকাকে সরিয়ে ফেলেন সান্ত¡নার বোধে। তাই কবি আবুল হাসান তাঁর ‘উচ্চারণগুলি শোকের’ কবিতায় সেই হতাশার মাঝে যে প্রাপ্তি তার চিত্র তুলে ধরেছেনÑ অনেক যুদ্ধ গেল/অনেক রক্ত গেল/শিমূল তুলোর মতো সোনা রুপো ছড়ালো বাতাস/কেবল পতাকা দেখি/স্বাধীনতা দেখি!/ তবে কি আমার ভাই আজ ওই স্বাধীন পতাকা?

মুক্তিযুদ্ধের কবিতায় যে স্বদেশ প্রেমের স্বরূপ বিম্বিত হয়েছিল তা হলো- স্বপ্ন যেন দুঃস্বপ্নের অন্ধকার রাতের দীর্ঘ ব্যস্ততার মতো প্রশস্থ। সেই সময়কার এরূপ পরিস্থিতি আমাদের কবি সম্প্রদায়দের সমৃদ্ধ করেছে যুদ্ধ উত্তরণের জন্য এবং দেশকে রক্ষার করার প্রত্যয়ে তাদের কবিতাও হয়েছে প্রসিদ্ধ। শুধু কবিতায় নয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এই চেতনা জেগে থাকুক প্রতিটি বাঙালী হৃদয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পর্যন্ত।

প্রকাশিত : ১০ এপ্রিল ২০১৫

১০/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: