মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

জীবনযাপনে পহেলা বৈশাখ

প্রকাশিত : ৬ এপ্রিল ২০১৫
  • সুকান্ত গুপ্ত

প্রতিটি মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার এক ছকবাঁধা নিয়ম আছে। ঘুম থেকে ওঠা, অফিসে ছুটে চলা, কর্মজীবী মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক জীবনপ্রণালী। এর ফাঁকে কিছুটা প্রশান্তি, যা কাক্সিক্ষত, স্বাভাবিক এবং নৈমিত্তিক। এ জীবনকে আমরা সঠিকভাবে উদযাপনও করি না, যা প্রাত্যহিকতায় শেষ হয়; কিন্তু প্রতিটি মানুষ বছরের কয়েকটি দিনকে বিশেষভাবে মর্যাদা দেয়। সে কয়েকটি দিন যেন পুরাতনের মধ্যেও নতুনভাবে দেখা দেয়। এ রকম একটি দিন হচ্ছেÑ বাংলা নববর্ষ বা বাংলা বছরের প্রথম দিন। চান্দ্র সন-চন্দ্রের বর্ষ পরিক্রমার হিসাবে ২৯.৫ দিনের চান্দ্র সনের হিসাবে বর্ষ হতো ৩৫৪ দিন ৯ ঘণ্টায়। নক্ষত্র সন রাশিচক্রের মধ্য দিয়ে সাতাশটি নক্ষত্র পরিক্রমণের হিসাব চান্দ্র বছরের নক্ষত্র পরিক্রমা ২৯.৫ দিন লাগে। ২৯.৫ দিনকে প্রতিটি তিথি হিসাবে ৩০ দিন যদি ধরা যায়, তবে ৩০দ্ধ১২=৩৬০ দিনে নক্ষত্র সন হয়। অন্যদিকে এক এক সংক্রান্তি থেকে অন্য সংক্রান্তি হলো সৌরমাস সূর্যের বার্ষিক গতি অনুসারে সৌরবর্ষ হয় ৩৬৫ দিন ৬ ঘণ্টায়। খাজনা আদায়ের জন্য হিজরি সনে তারিখ হেরফের হয় বলে সম্রাট আকবর (১৫৫৬-১৯০৯) জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমীর ফতেহ সিরাজীকে দিয়ে আকবরের সিংহাসন আরোহন (১৫৫৬) কে শুরু ধরে ৯৬৩ হিজরি=১৫৫৬ খ্রি. ১১ এপ্রিল, পহেলা বৈশাখ হিজরি চান্দ্র সনের বদলে সৌর সন চালু করেন, যাকে মোগলী সনও বলা হয়। এর বাইরে বাংলা সনের আরেকটি ইতিহাস হচ্ছেÑ বাংলার প্রথম স্বাধীন শাসনকর্তা শশাঙ্ক (৫৯৩-৬৩৫ খ্রি.) বাংলা সনের প্রবর্তক। আবার এ কথা প্রচলিত আছে শশাঙ্কের প্রায় নয় শ’ বছর পর সিংহাসনে বসা আলাউদ্দিন হোসেন শাহ্্ (১৪৯৩-১৫১৯) বাংলা সন প্রবর্তন করেন। সম্রাট আকবরের প্রচলিত বাংলা সনের মাস গণনায় কিছুটা অসঙ্গতি ছিল, যেমন কোন কোন মাস শেষ হতো ২৮ দিনে, আবার কোনটি ৩২ দিনে (যেমন আষাঢ়)। তবে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলা সনের পরিমার্জিত এবং বিজ্ঞানভিত্তিক একটি রূপ পাই।

মহাকালের সড়ক বেয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি সামনের দিকে। এভাবেই পথ পরিক্রমায় আমরা প্রত্যক্ষ করি প্রতিদিনের সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তকে। নতুন আঙ্গিকে নতুন অভিজ্ঞতায় কালের গর্ভে নিক্ষিপ্ত হয় একটি বছর, একটি যুগ, একটি শতাব্দী। সভ্যতা এগিয়ে চলে সৃষ্টিলয়ের অমোঘ নিয়মে, প্রতিদিনকার জীবনযাত্রায় আমরা দেখি মানুষের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনা, জয়-পরাজয়। আর এভাবে চলে কালের গতি, সৃষ্টি থেমে থাকে না কখনও। জীর্ণ পুরাতনকে পেছনে ঠেলে দিয়ে নতুনের আগমনে উদ্ভাসিত হয়। প্রতিটি মানুষ প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিটি সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তেরও সঙ্গে একাত্ম করে দেখতে চায় আপন ব্যর্থতা এবং সফলতাকে। সর্ব ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে নতুন বছরের কাছে প্রার্থনায় রত হয় সফল একটি বছরের আশায়। তাই বিভিন্ন উৎসবে আয়োজনের মধ্য দিয়ে বরণ করা হয় নতুন বছরকে। নতুন বছরকে আড়ম্বরভাবে বরণ করে নেয়ার রীতি প্রায় সব দেশেই অতি প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। এই রীতি ইউরোপ মহাদেশে চালু হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ অব্দে জুলিয়াস সিজার কর্তৃক। তখন থেকে ইউরোপের একটি পঞ্জিকা বছর শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রার্থনালয়ে একসঙ্গে হয়ে পেছনে ফেলে আসা বছরের সফল্য এবং পরিপূর্ণের জন্য। পরে তারা উৎসব এবং আনন্দঘন পরিবেশে বরণ করে থাকেন নববর্ষকে। দেশ ভেদে, আচার-আচরণ ভেদে বর্ষবিদায় এবং নববর্ষের উৎসব চলে একনাগাড়ে এক মাস। উদাহরণস্বরূপ ইরানে এক মাস ধরে পালন করে থাকেন ‘নওরোজ’ উৎসব।

বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নেয়ার জন্য অতীতে এ দেশের হিন্দু এবং উপজাতীয় সম্প্রদায়কে মূলত উদ্যোগী ভূমিকা নিতে দেখা যেত। এ রকম উৎসব আয়োজনের মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের চৈত্রসংক্রান্তি, বরুণ ঠাকুরের পূজা, উপজাতীয়দের বৈষু বা বিজু উৎসব প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। নতুন বছরের সূর্যোদয়ের আগেই এসব সম্প্রদায়ের লোকজন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সøান সেরে নিয়ে পূজা-পার্বণে ব্যস্ত হন। হিন্দু সম্প্রদায় কর্তৃক সূর্য পূজাও একইভাবে তাৎপর্যবাহী। এ উপলক্ষে চৈত্রের শেষ রাতে উৎসব আয়োজনে মেতে থাকেন, বছরের প্রথম দিনে সকালে খোলা মাঠে একত্রিত হয়ে প্রথম সূর্যকে স্বাগত জানান, জানান অন্তরের নিবিড় শ্রদ্ধা, প্রাণের অর্ঘ্য, কবি গুরুর ভাষায়-

‘ওরে নতুন যুগের ভোরে দিস্নে সময়

কাটিয়ে বৃথা সময় বিচার করে।’

ছবি : তুহিন ইসলাম

কোরিওগ্রাফার : পান্থ আফজাল

মডেল : সত্যজিত ও দীপান্বিতা

পোশাক : ফানুস, অতঃপর ও বিসর্গ

প্রকাশিত : ৬ এপ্রিল ২০১৫

০৬/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: