আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অসিদের বাজিমাত

প্রকাশিত : ১ এপ্রিল ২০১৫
অসিদের বাজিমাত
  • মোঃ নুরুজ্জামান

শেষ হলো ১১তম বিশ্বকাপ ক্রিকেট, যেখানে পঞ্চম বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হলো অস্ট্রেলিয়া। মেলবোর্নের একতরফা ফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে ৭ উইকেটের বড় ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে শিরোপা পুনরুদ্ধার করে মাইকেল ক্লার্কের দল। শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের পথে ফের বাজিমাত করে কুলিন অসিরা। একক কোন তারকার ওপর নির্ভর করে নয় বরং ‘টিম অস্ট্রেলিয়া’ হিসেবে শিরোপা পুনরুদ্ধার করে ক্লার্ক বাহিনী। আসরজুড়ে ব্যাটে-বলে চমৎকার নৈপুণ্য প্রদর্শন করেন মিচেল স্টার্ক, স্টিভেন স্মিথ, গ্লেন ম্যাক্সওয়েল, জেমস ফকনাররা।

ঘরের মাটিতে সপ্তমবারের মতো (১৯৭৫, ১৯৮৭, ১৯৯৬, ১৯৯৯, ২০০৩, ২০০৭ ও ২০১৫) ফাইনালে উঠেই ক্ষান্ত থাকেনি, টানা তিনবারসহ পঞ্চম (১৯৮৭, ১৯৯৯, ২০০৩, ২০০৭ ও ২০১৫) শিরোপা তুলে নেয় অস্ট্রেলিয়া! শিরোপা ও বিশ্বকাপ ফাইনালটাকে যেন ‘পৈত্রিক সম্পত্তি’ বানিয়ে ফেলেছে কুলির অসিরা। সব জিতে ফাইনালে আসা নিউজিল্যান্ডকে পাত্তাই দেয়নি স্বাগতিকরা। ৪৫ ওভারে ১৮৩ রানে অলআউট হয় কিউইরা। জবাবে ৩৩.১ ওভারে মাত্র ৩ উইকেট হারিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছে যায় ক্লার্কের দল। জীবনের শেষ ওয়ানডেতে দলকে শিরোপা উপহার দেয়ার পথে ৭৪ রান করে অধিনায়ক। তবে গুরুত্বপূর্ণ ৩ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হন তরুণ জেমস ফকনার। সর্বাধিক ২২ উইকেট নিয়ে আসরজুড়ে অবিশ্বাস্য বোলিং করে দলের সাফল্যে বড় অবদান পেসার মিচেল স্টার্কের। ফাইনালের কথা বললে সবার আগে উঠে আসবে ফকনার ও অবসরে যাওয়া অধিনায়ক ক্লার্কের নাম। অনায়াস জয়ের পথে তাকে ব্যাটিংয়ে নামতে হয়নি, বল হাতেই চমক দেখিয়েছেন ২৪ বছর বয়সী অলরাউন্ডার। নিউজিল্যান্ড ইনিংসের মেরুদ- ভেঙে দেয়া তিন উইকেট নিয়ে নিজের নামটি ইতিহাসে খোদাই করে নিয়েছেন ফকনার। তিন উইকেট নিয়েছেন দলটির ‘নাম্বার ওয়ান’ পেসার জনসনও। টুর্নমেন্টসেরা মিচেল স্টার্ক ২ শিকারের পথে ৮ ওভারে রান দিয়েছেন মাত্র ২০টি। বিদায়ী ম্যাচে অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক খেলেছেন ৭৪ রানের দারুণ ইনিংস। তবু কেন ম্যাচসেরা ফকনার? উত্তরটা সহজ। নিউজিল্যান্ড ব্যাটিংয়ের প্রাণ তিন তারকা রস টেইলর (৪০), গ্র্যান্ট ইলিয়ট (৮৩) ও কোরি এ্যান্ডরসনকে (০) তুলে নিয়ে মূলত তিনিই খেলার মোড় ঘুড়িয়ে দেন। ফলে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি কিউইরা, অলআউট হয়েছে মাত্র ১৮৩ রানে। সুতরাং গুরুত্বের বিচারে ফকনারকে ম্যাচসেরা হিসেবে বেছে নিতে অফিসিয়ালদের খুব বেগ পেতে হয়নি। দলীয় ৩৯ রানে তিন টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান মার্টিন গাপটিল, ব্রেন্ডন ম্যাককালাম ও কেন উইলিয়ামসনকে হারিয়ে বড় ধাক্কা খায় কিউইরা। সেখান থেকেই দলকে টেনে তুলছিলেন টেইলর-ইলিয়ট। চতুর্থ উইকেটে ১১১ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন তারা। প্রধান দুই পেসার স্টার্ক-জনসনকে স্বাচ্ছন্দ্যে খেলছিলেন। কিছুটা হলেও চিন্তার ভাঁজ অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক ক্লার্কের কপালে। তখনই ফকনারের দুর্দান্ত স্পেল। ১৪৯/৩ থেকে মুহূর্তে ১৫০/৫-এ পরিণত হয় নিউজিল্যান্ড! টেইলর ও ইলিয়টকে উইকেটের পেছনে ব্র্যাড হ্যাডিনের সহায়তায় তুলে নেয়ার পর রানে খাতা খোলার আগেই ‘ডেঞ্জারম্যান’ এ্যান্ডারসনকে পরিষ্কার বোল্ড করে সাজঘরে পাঠান ফকনার। বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। ৯ ওভারে ৩৬ রানে ৩ উইকেট নিয়ে নায়ক বনে যান তিনি। এটি অবশ্য তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা বোলিং ফিগার নয়। ৪ উইকেট নিয়েছেন দুবার। ৩ উইকেট ছয়বার। মাত্রই ২০১৩ সালে দলে সুযোগ পাওয়া ফকনারের ৪৪ ওয়ানডেতে শিকার সংখ্যা ৬০। অধিনায়ক ক্লার্কের মতো ইনজুরির জন্য বিশ্বাকপের প্রথম থেকে খেলতে পারেননি। ৬ ম্যাচে উইকেট নিয়েছেন ১০টি। তবু আজ তিনি ইতিহাস। অস্ট্রেলিয়ার পঞ্চম বিশ্বকাপ জয়ের পথে ফাইনালের ম্যাচসেরা। পঞ্চম শিরোপা জয়ের পথে আগের শেষ তিন বিশ্বকাপের ফাইনালে ম্যাচসেরা হয়েছিলেন শেন ওয়ার্ন (১৯৯৯), রিকি পন্টিং (২০০৩) ও এ্যাডাম গিলক্রিস্ট (২০০৭), ক্যারিয়ারে উষালগ্নেই সেসব কিংবদন্তিদের কাতারে নাম লিখিয়েছেন জেমস ফকনার।

স্বভাবতই উচ্ছ্বসিত তিনি, ‘মেলবোর্নে ৯০ হাজার দর্শকের সামনে ফাইনালে এমন অর্জনের অনুভূতি সত্যি ভাষায় প্রকাশের নয়। গত কয়েক বছর অনেক পরিশ্রম করেছি, এটা তারই ফসল। টস জিতে অধিনায়ক নিশ্চই আমার ওপর ভরসা করে বোলিং নেননি! তবু সঠিক সময়ে সেরা কাজটা করতে পেরে ভাল লাগছে। প্রতিপক্ষ যখন ব্যাটিং পাওয়ার প্লেতে গিয়ে রান তুলতে চেয়েছে, তখনই উইকেট পেয়েছি, এটা ভাগ্যের সহায়তা ছাড়া সম্ভব ছিল না। ক্লার্কের নেতৃত্ব, সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এ অর্জন সম্ভব হয়েছে’, ম্যাচসেরার পুরস্কার হাতে বলেন ফকনার। স্টার্কের কথাও বিশেষভাবে না বললেই নয়। বাঁ-হাতি পেসারদের ভিড়ে অস্ট্রেলিয়াকে স্বপ্নের এক বিশ্বকাপই উপহার দিয়েছেন তিনি। গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচটি বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত হয়। ফাইনাল পর্যন্ত বাকি আট ম্যাচের সব ক‘টিতেই বল হাতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন স্টার্ক। ম্যাচের পর ম্যাচ প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের জন্য হয়ে উঠেছেন আতঙ্কের নাম। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম সেই ম্যাচ হয়ে ফাইনাল পর্যন্ত সুপার স্টার্কের বোলিংÑ ২/৪৭, ৬/২৮, ২/১৮, ২/২৯, ৪/১৪, ২/৪০, ২/২৮ ও ২/২০! মোট ২২ শিকারে ইকোনমি মাত্র ৩.৫০। অবিশ্বাস্য বললেও কম বলা হবে। ইতিহাসে অসিদের পঞ্চম বিশ্বকাপ জয়ের সঙ্গে সঙ্গে অবধারিতভাবে উচ্চারিত হবে স্টার্কের নাম।

পাশাপাশি ক্লার্কের বিদায়টা হয় রাজসিক। তৃতীয় অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক হিসেবে দেশকে পঞ্চম বিশ্বকাপ ট্রফি উপহার দেন ৩৩ বছর বয়সী নিউসাউথ ওয়েলস হিরো। তার আগে অসিদের বিশ্বকাপ জয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন এ্যালান বোর্ডার (১৯৮৭), স্টিভ ওয়াহ (১৯৯৯) ও রিকি পন্টিং (২০০৩, ২০০৭)। ক্লার্কের এবারের বিশ্বকাপে মাঠে নামাটাই ছিল নাটকীয়, ইনজুরি-ফিটনেসহীনতায় খেলা নিয়ে ছিল সংশয়। সেই তিনিই আজ ইতিহাস! ‘এটা অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা। যা ভাষায় প্রকাশের নয়। ছেলেরা অসাধারণ খেলেছে। প্রতিটি ম্যাচেই আমরা উন্নতি করেছি। ফাইনাল ছিল যার চূড়ান্ত মঞ্চায়ন। বিদায়ের মুহূর্তে দেশবাসীকে শিরোপা উপহার দিতে পেরে ভাল লাগছে। কোন সন্দেহ নেই আজ আমার ক্রিকেট জীবনের সেরা দিন’, ম্যাচ শেষে ক্লার্কের প্রতিক্রিয়া।

লক্ষ্য এখন অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টের শীর্ষস্থানে নিয়ে যাওয়া। ‘টেস্ট ক্রিকেট অবশ্যই আমার কাছে অনেক বেশি গুরুত্ব পাবে। টেস্ট ফরমেটে ভাল করে দলকে সাফল্যম-িত রাখতে চাই। আমার ধারণা ওয়ানডে থেকে সরে দাঁড়ানোর কারণে টেস্টে পূর্ণ মনোযোগী হয়ে আরও ভাল কিছু দলকে উপহার দেয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। কিন্তু টি২০ লীগগুলোয় খেলার বিষয়ে আমি এখনও চিন্তাভাবনা করিনি। আমি শুধু বিশ্বকাপ নিয়েই মেতে ছিলাম। এবার কিছুদিন আরও ভালভাবে চিন্তা-ভাবনার সময় পেয়েছি। টেস্ট খেলার বিষয়টি এখনও আমার কাছে যথেষ্ট উত্তেজনার’, বলেন তিনি।

প্রকাশিত : ১ এপ্রিল ২০১৫

০১/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: