মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সম্পদ রাখার গোপন বাক্স অপরূপ সৌন্দর্য নিয়ে এখন জাদুঘরে

প্রকাশিত : ১ এপ্রিল ২০১৫
সম্পদ রাখার গোপন বাক্স অপরূপ সৌন্দর্য নিয়ে এখন জাদুঘরে
  • দারু শিল্পের অনন্য নিদর্শন সিন্দুক

মোরসালিন মিজান ॥ সময় যথেষ্টই বদলে গেছে। এখন নিজের টাকা, মূল্যবান সম্পদ নিজের কাছে কেউ রাখেন না। রাখার দরকারই হয় না। কারণ ব্যাংক হয়েছে। গ্রাহকের সম্পদ সুরক্ষায় যা যা দরকার ব্যাংকগুলো করে দিচ্ছে। অথচ এক সময় ব্যাংক ছিল না। সেই তখন ব্যাংকের কাজটি করত সিন্দুক। নিকট অতীতেও ব্যক্তিগত সম্পদ রক্ষায় সিন্দুকের ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে। এটি গ্রামের মানুষের আভিজাত্যের প্রতীক। নানা রকম-সকম ছিল সিন্দুকের। তবে বৈচিত্র্যপূর্ণ ছিল কাঠের তৈরি সিন্দুক। এই ধরনের সিন্দুকের গায়ে অদ্ভুত সুন্দর কারুকাজ করা হতো। এভাবে বাংলার দারুশিল্পের উল্লেখযোগ্য নিদর্শনের মর্যাদা পায় সিন্দুক।

জানা যায়, উনিশ শতকে ব্যাংকে আমানত রাখার কোন ব্যবস্থা ছিল না। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ও সীমিত আকারে ব্যাংকিং হতো। বিশ শতকের গোড়া থেকে মধ্যকাল পর্যন্ত ব্যাংকের কাজ করত পোস্ট অফিসগুলো। ফলে গ্রামের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে সিন্দুকের ব্যবহার ছিল লক্ষ্যণীয়।

আজকের দিনের পাঠকদের জন্য বলা, সিন্দুক বড় ট্রাঙ্কের মতো দেখতে। ট্রাঙ্কের পায়া থাকে না। সিন্দুকের থাকে। ছোট আকারের হলে চারটি পায়া। বড়গুলোর বেলায় সংখ্যাটি বেড়ে হতো ছয়। সম্পদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার স্বার্থে প্রাচীনকাল থেকে এর ব্যবহার হয়ে আসছে। ব্যাংকের ভল্টের মতো কাজ করত সিন্দুক। জোতদার জমিদার গৃহস্থরা নিজেদের সম্পদ সুরক্ষার প্রশ্নে সিন্দুককে প্রাধান্য দিতেন। সিন্দুকের ভেতরে অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার, জমির দলিল ইত্যাদি মূল্যবান জিনিসপত্র তালাবদ্ধ করে রাখা হতো।

বাংলাদেশের দারুশিল্প নিয়ে কাজ করেছেন জাতীয় জাদুঘরের কর্মকর্তা মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম। তিনি জানান, সিন্দুকের দৈর্ঘ্য সাধারণত ৬ থেকে ৭ ফুট পর্যন্ত হতো। প্রস্থে তিন থেকে চার ফুট। উপরিভাগ দরজার কপাটের মতো বড় ঢাকনা দিয়ে আটকানো থাকত। এর মাঝখানে থাকত বর্গাকৃতির একটি ছোট ঢাকনা। ভেতরে জিনিসপত্র সংরক্ষণ করার জন্য ছোট ছোট খোপ বা কুঠুরি থাকত। তিনি জানান, সিন্দুক সাধারণত দুই ধরনের। একটি চার থেকে ছয় পায়াবিশিষ্ট, আয়তকার। এ ধরনের সিন্দুকের পায়ার উচ্চতা ৪ থেকে ২০ ইঞ্চি পর্যন্ত হতো। নড়াচড়ার সুবিধার্থে অনেকে আবার সিন্দুকের পায়ার সঙ্গে কাঠের চাকা যুক্ত করতেন।

সিন্দুকের ভেতরে রাখা সম্পদের নিরাপত্তার স্বার্থে খুব মজবুত ও ভারি কাঠ দিয়ে তৈরি করা হতো এর কাঠামো। বলা হয়ে থাকেÑ সিন্দুকের গায়ে কুপালে কুড়াল দূরে ছিটকে পড়ত। সিন্দুক থাকত অক্ষত। মূল্যবান সম্পদের নিরাপত্তায় অনেকে আবার খাটের সমান করে সিন্দুক তৈরি করতেন। বাংলার দারুশিল্পীরা কাঠের সিন্দুক এবং খাটের নির্মাণ কৌশল অবলম্বন করে সিন্দুক-খাটের প্রবর্তন করেন। পালঙ্ক জাতীয় সিন্দুকের উপরে থাকত ঘুমানোর ব্যবস্থা। সামান্য শব্দ হলে, শক্ত হাতে সিন্দুকের গায়ে কেউ হাত রাখলে মুহূর্তেই চোখ কচলে ঘুম থেকে ওঠে পড়তেন গৃহস্থ! ফলে চোররা কোন সুবিধা করতে পারত না।

সম্পদ সুরক্ষার পাশাপাশি, কাঠের সিন্দুকের গায়ের কারুকাজ বিশেষ উপভোগ্য। পালঙ্ক জাতীয় সিন্দুকের চার কোণে প্রায়শই চারটি ফুলকলি নক্সা দেখা যেত। জমিদার ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীর ব্যবহৃত সিন্দুকগুলো ছিল আধুনিক কারুকাজম-িত। সাধারণ পরিবারের কর্তারাও সিন্দুকে নিজ নিজ রুচি অনুযায়ী নক্সা করিয়ে নিতেন। বাটালির সাহায্যে সিন্দুকের কাঠ খোদাই করে ফুল, লতা-পাতা, বাঘ, সিংহ, পাখি, পৌরানিক কাহিনীর বিভিন্ন চরিত্র, মসজিদ, মন্দির, দেব-দেবীর ফিগার ইত্যাদি আঁকা হতো। কখনও দুই দিকে, কখনও তিন দিকে কারুকাজ করা হত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে উলম্ব আয়তকার খোপে বিভিন্ন নক্সা করে তা সিন্দুকের গায়ে বসানো হতো। এভাবে দারুণ নান্দনিক হয়ে ওঠত এক একটি সিন্দুক।

এই নান্দনিকতা সম্পর্কে ধারণা নিতে একবার জাদুঘর ঘুরে আসতে পারেন আগ্রহীরা। জাতীয় জাদুঘর ও সোনারগাঁও লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনে বাংলার প্রাচীন কাঠের সিন্দুকের একটি বড় সংগ্রহ রয়েছে। জাতীয় জাদুঘরের গ্যালারিতে প্রদর্শিত হচ্ছে বিশালাকৃতির চারটি সিন্দুক। উনিশ শতকের একটি সিন্দুক সংগ্রহ করা হয়েছে ফরিদপুর থেকে। একই সময়ের অপর সিন্দুক সংগ্রহ করা হয়েছে যশোর থেকে। সিন্দুকগুলোর চারপাশে প্রচুর কারুকাজ করা। দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না।

মজবুত কাঠে তৈরি করার কারণে গ্রামের পুরনো বাড়িতে খোঁজাখুঁজি করলে এখনও সিন্দুকের অস্তিত্ব চোখে পড়ে। এমনকি রাজধানী শহরেও সন্ধান মেলে সিন্দুকের। জানা যায়, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দীন ইউসুফ ও শিমুল ইউসুফের বাসায় আছে কাঠের তৈরি দুটি বিশাল সিন্দুক। এখন আর ব্যবহার করা হয় না। এত বড় জায়গা নেই। তবে ফেলেও দেয়া হয়নি। অমূল্য নিদর্শন হিসেবে স্টোররুমে এগুলো সংরক্ষণ করা হচ্ছে। নাসির উদ্দীন ইউসুফ সিন্দুক দুটি সম্পর্কে যে তথ্য দিয়েছেন তা জেনে বিস্মিত হবেন পাঠক। তিনি জানান, পারিবারিকভাবে পাওয়া একটি সিন্দুকের বয়স প্রায় দেড়শ বছর! অপরটির বয়স হবে প্রায় ১২৫ বছর! এভাবে বহুকাল আগের ইতিহাস বাঁচিয়ে রেখেছে সিন্দুক। গভীর গোপন বাক্সটি এখন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। শুকনো কাঠের গায়ে খোদাই করা শিল্পকর্ম বাংলার দারুশিল্পের অনন্য সুন্দর নিদর্শন হয়ে আছে।

প্রকাশিত : ১ এপ্রিল ২০১৫

০১/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: