মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

ওয়াহিদ নবি

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৫

আমাদের পরাধীনতার চরিত্রটা অদ্ভুদ ধরনের। সাধারণত একটি দেশ দৈহিক শক্তি প্রয়োগ করে অন্য একটি দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে। পাকিস্তান আমাদের যুদ্ধে পরাজিত করেনি ৪৭ সালে। আমরা পাকিস্তানে যোগ দেবার পক্ষে ভোট দিয়েছিলাম। কী পটভূমিকায় সেটা হয়েছিল সেটা আমাদের নতুন প্রজন্মের কতটুকু জানা আছে জানি না। লাহোর প্রস্তাবের ‘স্টেটস ও স্টেট’-এর বিভ্রান্তি বা ছলনার কথা আমাদের কতটা জানা সেটা আমাদের জানা নেই। তবে অন্যদের দোষ দেবার আগে এটুকু স্বীকার করতে হবে যে আমরা সাধারণভাবে মোহগ্রস্ত হয়েই পাকিস্তানে যোগ দিয়েছিলাম স্বেচ্ছায়। এই মোহ এখনও আমাদের স্বদেশবাসীর বেশ কিছু সংখ্যকের আছে। এজন্য এসব ইতিহাস আমাদের বুঝবার চেষ্টা করা উচিত এবং আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে পেশ করা উচিত। কারণ আমাদের বর্তমান রাজনীতিতে যে বিভ্রান্তি তার জন্য প্রধানত দায়ী আমাদের সেই পুরাতন মোহ যা আমাদের পাকিস্তানে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল ৪৭-এ।

একাত্তরে স্বাধীনতার জন্য আমাদের যে সংগ্রাম সেটাকে গৃহযুদ্ধ বলা হয়। সংজ্ঞা অনুযায়ী সেটাকে অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু ইতিহাসের অন্যান্য গৃহযুদ্ধের তুলনায় আমাদের একাত্তরের সংগ্রামের চরিত্র ছিল ভিন্ন ধরনের। আমরা যদি গোটা তিনেক গৃহযুদ্ধের কথা ভাবি তবে এটা বুঝতে আমাদের অসুবিধা হবার কথা নয়। সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝির একটু আগে ইংল্যান্ডে রাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের মধ্যে গৃহযুদ্ধ হয়েছিল। দাসপ্রথার পক্ষে ও বিপক্ষে গৃহযুদ্ধ হয়েছিল আমেরিকায়-শতাব্দীতে। স্পেনের গৃহযুদ্ধ হয়েছিল বিশ শতকের ৩০-এর দশকে। গৃহযুদ্ধ হয় একই দেশের মানুষের মধ্যে। প্রতিবেশীতে প্রতিবেশীতে। হয়ত কোন পক্ষ অন্য দেশের সাহায্য নেয়। একাত্তরে যেভাবে পাকিস্তানীরা পেশাদার সৈন্য এনে বাঙালীদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তাতে দেখা যায় যে যুদ্ধটা একই দেশের মানুষের মধ্যে হয়নি। পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। পাকিস্তানের পেশাদার সৈন্যরা নিরস্ত্র বাঙালী সিভিলিয়ানদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এক হাজার মাইল পেরিয়ে এসে। এক কথায় বলা যায় যে, সাতচল্লিশে যে অধীনতা আমরা মোহগ্রস্ত হয়ে বরণ করে নিয়েছিলাম সেই পরাধীনতাকে ‘ওল্ড স্টাইল’ পরাধীনতায় রূপ দিতে ওরা সৈন্যদের ব্যবহার করেছে।

পাকিস্তানী জেনারেলদের কেউ কেউ বই লিখেছেন একাত্তরের যুদ্ধের পরে। বইগুলো পড়লে তাঁদের মানসিকতা এবং বিশেষ করে বাঙালীদের সম্বন্ধে তাঁদের মনোভাব জানা যায়। নিয়াজি তাঁর ‘বিট্রেয়াল অফ ইস্ট পাকিস্তান’ বইতে লিখেছেন যে ‘বুখারায় চেঙ্গিস খান, বাগদাদে হালাকু খান এবং জালিয়ানওয়ালাবাগে ডায়ার যে নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছিল- বাংলাদেশে টিক্কা খান তার চেয়ে বেশি নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছে’। নিয়াজির এই উক্তির অর্থ এই নয় যে, তিনি বাঙালীদের প্রতি সহানুভূতিশীল। কারণ তিনি সমস্ত বাঙালী জাতিকে ‘হারামজাদা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। তারপর তিনি আস্ফালন করে বলেছিলেন যে ‘ওরা আমাকে চেনে না’। তারপর তিনি উর্দু ভাষায় হম্বিতম্বি চালিয়ে গেছেন যেগুলোর অর্থ আমার জানা নেই এবং জানবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই। নিয়াজি এবং অন্যান্য পাকি জেনারেলদের বই পড়লে বুঝা যায় যে নিয়াজি, টিক্কা খান, রাও ফরমান আলি, সিদ্দিক সালিক প্রমুখদের দেখতে পারতেন না। অন্যরাও তাঁকে দেখতে পারতেন না। টিক্কা খান বলেছিলেন, ‘আমি মানুষ চাই না। শুধু মাটি চাই’। রাও ফরমান আলি বলেছিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের মাটি রক্তে রাঙ্গা করে দেয়া হবে’। এঁরাই ছিলেন পাকিস্তানের হর্তাকর্তা। বাঙালীদের সম্বন্ধে তাঁদের মনোভাব স্পষ্ট তাঁদের উক্তিতে। এঁরা কি একই দেশের মানুষ হতে পারেন? পাকিস্তান কি একটি দেশ হতে পারে দুটি অংশকে নিয়ে?

সিদ্দিক সালিক তাঁর ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ বইতে উল্লেখ করেছেন যে, ২৬ মার্চ রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করা হয়। সেখানে বাঙালীরা ‘জয় বাংলা’ সেøাগান দিতে থাকে। পাক সেনারা সেখানে পৌঁছে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। কিছুক্ষণ পরে সেøাগান থেমে যায়। সালিক এর পরে লিখেছেন যে এই ঘটনার পরে ক্যান্টনমেন্টে উল্লাস নেমে আসে। বলাই বাহুল্য, ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানীরাই শুধু বাস করত। একই দেশের মানুষ হলে নিরস্ত্র মানুষকে শুধু সেøাগান দেবার অপরাধে সেনাবাহিনী এমনি করে হত্যা করত কি? আর হত্যা করবার পরে উল্লসিত হতো কি?

বাঙালীদের সম্বন্ধে কত বিরূপ ধারণা ছিল পাকিস্তানী জেনারেলদের তা রাও ফরমান আলির বই ‘দ্য বার্থ অফ বাংলাদেশ’ পড়লে বুঝা যায়। তিনি বর্ণনা করেছেন ‘বাঙ্গালি বাবু’, বাঙ্গালি জাদু’ আর ‘ভুখা বাঙ্গালি’। বাঙ্গালি বাবু বলতে তিনি বুঝাতে চেয়েছেন যে বাঙালীরা স্বল্প শিক্ষিত। তারা কেরানিগিরি করে ইংরেজদের তোষণ করত। তাঁর ‘বাঙ্গালি জাদুর’ বর্ণনাটি বেশ মজার। তিনি লিখেছেন যে বাংলার বাইরের যারা বাংলায় চাকরি বা অন্য কাজে আসতেন তাঁরা আর নিজের জায়গায় ফিরে যেতেন না। বাংলার রমণীদের মোহময় চোখ তাঁদের মোহগ্রস্ত করে রাখত। ‘ভুখা বাঙ্গালি’ বলতে তিনি বুঝিয়েছেন যে বাংলায় দুর্ভিক্ষ লেগেই থাকত। স্বভাবতই বাঙালীরা অনাহারে অর্ধাহারে থাকত। রমেশ চন্দ্র মজুমদারের প্রাচীন, মধ্যযুগ ও আধুনিক কালের ইতিহাস পড়লে বাংলার সম্পদ সম্বন্ধে তাঁর একটা ধারণা হতো। এসব হলো মুদ্রার একদিক। অন্যদিকে একটু তাকানো যাক। রাজাকার বাহিনী খান সেনাদের মদদে লেগে গেল। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত প্রতিনিধি দল বলে যে রাজাকাররা জামায়াতের লোক। তখন নিয়াজি আলবদর, আলশামস ইত্যাদি নামে তাদের মাঠে নামালেন। নাম যাই হোক এরা ছিল সবাই বাঙালী। এদের নিষ্ঠুরতার কথা সবাই জানে। শাহ আজিজুর রহমান আর আব্দুর রহমান বিশ্বসেরা পাক প্রভুদের সেবায় লেগে গেলেন। যারা স্বাধীনতার পক্ষের তাঁরা নিহত আর বিতাড়িত হলেন ৭৫-এ। কুলাঙ্গাররা হলো দেশের হর্তাকর্তা। তাদের গাড়ি শোভিত হলো জাতীয় পতাকায়। যারা নিজ দেশের সন্তানদের হত্যা করেছে তাদের বিচারের করার বিরুদ্ধে কত গলাবাজি। হুজুরদের হত্যা করা হয়েছে এই মিথ্যা অভিযোগের কারণে অন্ধকারের শক্তির পক্ষেই ভোট। একাত্তরের খুনী নেতার জানাজায় মানুষের ঢল। রাস্তায় রাস্তায় মানুষ পুড়িয়ে জনরোষে না পড়া। যাদের স্থান হওয়া উচিত ছিল অন্ধকার গহ্বরে তারা আজ প্রগতিশীলদের হত্যা করছে। মনে হচ্ছে জাতির এক অংশ আবার মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। আর তাদের অনুসরণ করছে ক্ষমতালোভী আর অর্থলোভীর দল। মুক্ত মানুষের সামনে সুবিশাল দায়িত্ব মানুষের মোহমুক্তি ঘটানো। হোসেন হক্কানি তাঁর ‘পাকিস্তান : বিটউইন মস্ক এ্যান্ড মিলিটারি’ বইতে বর্ণনা করেছেন কিভাবে ধর্মের দ্বারা মানুষকে মোহগ্রস্ত করা হয় এবং তারপর কিভাবে মিলিটারির সাহায্যে তাদের শাসন করা হয়। পাকিস্তানের এই পথ আমরা চাই না।

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৫

২৬/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: