কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পথ চলতে পথের খাবার...

প্রকাশিত : ২৩ মার্চ ২০১৫
পথ চলতে পথের খাবার...

ভোজনরসিক হিসেবে বাঙালীদের পরিচিতি বিশ্বব্যাপী। বাঙালী নিজে যেমন খেতে পছন্দ করে, ঠিক তেমনি খাওয়াতেও সমানভাবে পছন্দ করে। তাইতো বিদেশী রাজনীতিবিদ থেকে শুরু“ করে, ভিনদেশী পর্যটক এমনকি বিদেশী খেলোয়াড়রাও বাংলাদেশের আতিথেয়তায় মুগ্ধ। তারা দেশ ছেড়ে গেলেও তাদের মুখ থেকে কেবলই ঝরতে থাকে আতিথেয়তার বন্দনা।

আতিথেয়তা দিতে শুধু যে পাঁচতারকা হোটেল কিংবা খুব নামী-দামী রেস্টুরেন্ট লাগবে, তা কিন্তু নয়। দেখা গেলো আপনার খুব কাছের একটা বন্ধুর সঙ্গে অনেক বছর পর দেখা। আপনার খুব ইচ্ছে করছে বন্ধুকে নিয়ে যে কোন ভাল একটি রেস্টুরেন্টে আপ্যায়ন করানোর। কিন্তু মাস শেষ হওয়ার কারণে আপনার পকেটে তেমন টাকা নেই। তাই বলে কি আপনি আপনার বন্ধু অথবা প্রিয় মানুষটিকে আতিথেয়তা দেবেন না ? আপনি চাইলে তুলনামূলক কম খরচের মধ্যেও বিভিন্ন ধরনের খাবারের স্বাদ দিতে পারেন আপনার প্রিয় বন্ধুটিকে।

‘বাইরের খাবার একদম মুখে ছোঁবে না’- ছোটবেলা থেকে এখন পর্যন্ত আমরা আমাদের বাবা-মায়ের কাছে এই কথাটি কম-বেশি সবাই শুনেছি। কিন্তু কঠিন বাস্তবতা আজ এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, মায়েরা যে তাদের সন্তানকে ভাল-মন্দ কিছু রান্না করে খাওয়াবেন তা করা হয়ে উঠছে না সময়ের অভাবে। আর সময় যদি কোনভাবে মিলেও যায়, তবে তা হয়ে উঠছে না গ্যাসের অভাবে। তাই বলে কি পরিবারের সদস্যদের মুখরোচক খাবার থেকে বঞ্চিত করা হবে? না, কখনোই না।

আপনি চাইলে আপনার পরিবারের সদস্য এবং বন্ধু-বান্ধব মিলে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে তুলনামূলক কম খরচে মুখরোচক এবং ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ গ্রহণ করতে পারেন। ঢাকা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে রয়েছে মুখরোচক খাবারের পসরা। এখানে ঢাকার কিছু ঐতিহ্যবাহী খাবারের দোকানের নাম এবং এর মূল্যতালিকা দেয়া হলো :

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়- হাকিম চত্বর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বরটি রোকেয়া হলের ঠিক অপর প্রান্তে অবস্থিত। এই হাকিম চত্বরকে কেন্দ্র করে অনেক ছোট-বড় খাবারের দোকান গড়ে উঠেছে। এ সকল দোকানের খাবারের মেন্যু মোটামুটি একই ধরনের। এখানে মূলত দুপুরের খাবার এবং বিকেল ও সন্ধ্যার নাস্তা বেশি চলে। দুপুরের খাবার মেন্যুতে রয়েছে চিকেন খিচুরি, চিকেন-ভেজিটেবল, ফ্রাইড রাইস এবং বিফ তেহারি। খাবারগুলোর মূল্য যথাক্রমে, ৩০, ৩০ ও ৪৫ টাকা। আর বিকেলের মেন্যুতে রয়েছে আলু চপ, পাকোরা, পেঁয়াজু, বেগুনি, টিকা কাবাব, মাশরুম ফ্রাই, চা প্রভৃতি। এগুলোর প্রত্যেকটির মূল্য ৫টাকা করে। আবার রয়েছে ডিম চপ, চিকেন ফ্রাই, ভেজিটেবল বন, টোস্ট। এগুলোর মূল্য ১০ টাকা করে। এছাড়াও হাকিম চত্বরে রয়েছে বিখ্যাত ফ্রেশ পেঁপের জুস। যার মূল্য প্রতি গ্লাস ২৫ টাকা।

কলাবাগানের ঐতিহ্যবাহী মামা হালিম

রাজধানীর অন্যতম জনবহুল এলাকা কলাবাগানে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী মামা হালিম। কলাবাগান ক্রীড়া চক্রের ঠিক অপরদিকে শামিয়ানা করে তৈরি মামা হালিমের দোকানটি অবস্থিত। এখানে বিফ, মাটন, চিকেন এই তিন ধরনের হালিম পাওয়া যায়। বাটিপ্রতি বিফ হালিমের দাম ৫০ টাকা এবং মাটন ও চিকেন হালিমের দাম ৬০ টাকা করে। মামা হালিমে পার্শ্বেল নেয়ার সু-ব্যবস্থা রয়েছে।

বিসমিল্লাহ্ কাবাব ঘর, নাজিরা বাজার

পরান ঢাকাকে বলা হয়ে থাকে ‘ঢাকা শহরের খাবারের স্বর্গ।’ পুরান ঢাকায় একটি কথা প্রচলিত আছে যে, ‘রাত ফুড়িয়ে গেলেও পুরান ঢাকায় খাবারের দোকানের ক্রেতা কখনোই ফুড়ায় না।’ রাত দু’টা-তিনটা পর্যন্ত ক্রেতারা খাবারের দোকানে ভিড় করে রাখে। ঠিক তেমনই একটি খাবারের দোকানের নাম হচ্ছে, ‘বিসমিল্লাহ কাবাব ঘর।’ যার বয়স ২৫ বছর। নাজিরাবাজার চৌরাস্তায় এই কাবাবের দোকানটি অবস্থিত। এখানে রয়েছে হরেক পদের কাবাবের আইটেম। একেকটা আইটেমের নাম শুনতে শুনতে আপনি ক্লান্ত হয়ে পড়লেও, আপনাকে খাবারের তালিকা বলতে থাকা বেয়ারা কিন্তু মোটেও ক্লান্ত হবে না! কাবাবের আইটেমের মধ্যে রয়েছে- গরুর চাপ-৫০ টাকা, বটি কাবাব- ৬০ টাকা, চিকেন চাপ- ৭০ টাকা, খাশির গুর্দা ফ্রাই- ১০০ টাকা, খাশির মগজ ফ্রাই- ১০০ টাকা, জালি কাবাব ১০ টাকা এবং টিকা কাবাব ৫টাকা। এছাড়া পরোটা প্রতি পিস ৪ টাকা করে।

তারা মসজিদ সংলগ্ন বিখ্যাত চটপটি-ফুচকা-আলুর চপ

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী স্থান তারা মসজিদ সংলগ্ন আবুল খায়রাত রোডের পাশে অবস্থিত ‘জুম্মন ফুড কর্নার।’ পারিবারিক এই ব্যবসাকে আজও লালন করে যাচ্ছেন জুম্মন নিজেই। তারা মসজিদের দেয়াল ঘেঁষেই এই দোকানটি অবস্থিত। এখানে রয়েছে স্পেশাল চটপটি, ফুচকা এবং আলুর চপ। এখানকার সবচেয়ে আকর্ষণীয় খাবারটি হচ্ছে স্পেশাল আলুর চপ। আলুর চপের সঙ্গে বাহারি মসলা এবং ডাবলি দিয়ে আলুর চপটি পরিবেশন করা হয়। দুই পিস এই আলুর চপের মূল্য ৩০ টাকা। এবং চটপটি ও ফুচকার মূল্য ৩০ টাকা প্রতি প্লেট। এগুলোর সঙ্গে খাওয়ার জন্য ঝাল টক, মিষ্টি টকসহ রয়েছে টক দই থেকে তৈরি এক বিশেষ ধরনের টক।

নূরানী কোল্ড ড্রিংকস, চকবাজার

দেশের ব্যবসাবাণিজ্যের অন্যতম ব্যস্ত জায়গার নাম চকবাজার। এই চকবাজারেই রয়েছে নূরানী কোল্ড ড্রিংকস নামের একটি ঐতিহ্যবাহী লাচ্ছি- লেবুর শরবতের দোকান। একটু বোধহয় অবাক হলেন! তাই না? হয়ত ভাবছেন শরবতের দোকান আবার ঐতিহ্যবাহী হয় কি করে? কেননা এই দোকানে বসেই তৎকালীন পাকিস্তানের গবর্নর আইয়ুব খান লাচ্ছি পান করেছিলেন। আর যিনি আইয়ুব খানকে লাচ্ছি তৈরি করে দিয়েছিলেন, তিনি হলেন মোঃ তাজুদ্দিন আহমেদ। নূরানী কোল্ড ড্রিংকসের ৭০ বছরের পথযাত্রার ৪৫ বছরের পথযাত্রী হলেন তাজুদ্দিন। বর্তমানে তার বয়স ৬৫ বছর।

নূরানী কোল্ড ড্রিংকসের একটি বিশেষ পদ্ধতি আছে। তারা কখনও লাচ্ছি তৈরিতে ব্লেন্ডার ব্যবহার করে না। স্টিলের গ্লাস দিয়ে ভালভাবে ফেটে লাচ্ছি এবং শরবত তৈরি করা হয়। এ প্রসঙ্গে দোকানের ম্যানেজার মোঃ ইকবাল বলেন, ব্লেন্ডার দিয়ে লাচ্ছি তৈরি করা হলে তা একেবারে পাতলা হয়ে যায়। আর এই পাতলা লাচ্ছিকে ঘন করার জন্য অনেকে পাকা কলা ব্যবহার করে থাকেন। যাকে লাচ্ছি বলা যায় না। তাই তারা হাতে ফেটে তৈরি করা লাচ্ছিকেই বেশি প্রাধান্য দেন। প্রতি গ্লাস স্পেশাল লাচ্ছির দাম পড়বে ২৫ টাকা। সাধারণ লাচ্ছি ও লেবুর শরবতের দাম পড়বে যথাক্রমে ২০ ও ১৫ টাকা।

এভাবেই আপনি আপনার পরিবার এবং বন্ধু-বান্ধব নিয়ে দল বেঁধে ঢাকার বিভিন্ন গ্রান্তের ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ গ্রহণ করতে পারে।

সতর্কতা

ব্যাস্ততা, আলসেমি ও শৌখিনতাÑ এই তিন কারণেই মূলত আমদের বাইরের খাবারের প্রতি বেশি দুর্বলতা। খাবার খেতে তো সমস্যা নেই। তবে খেয়াল রাখতে হবে আমরা যাই খাই না কেন, তা যেন হয় স্বাস্থ্যকর । এ ক্ষেত্রে দোকান মালিকেরা কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে পারেন। যেমন-

* পচা-বাসি খাবার পরিবেশন না করা।

* পোড়া তেলে কোন কিছু না ভাজা।

* খাবারগুলোকে সবসময় ঢেকে রাখা। যাতে মাছি- ধুলা বালি না পড়ে।

* খাবার পরিবেশনের পাত্র পরিষ্কার পানি দিয়ে ধোয়া।

* শরবত তৈরির সময় বিশুদ্ধ পানি ও বরফ দিয়ে তা তৈরি করা।

নাসিফ শুভ

প্রকাশিত : ২৩ মার্চ ২০১৫

২৩/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: