রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হ্রাসে বাংলাদেশের অভাবনীয় সাফল্য

প্রকাশিত : ১৫ মার্চ ২০১৫
  • দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত রিপোর্টে তথ্য

নিখিল মানখিন ॥ মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হ্রাসে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। গর্ভবতী মা ও নবজাতক শিশুর মৃত্যু হ্রাসে জোরালো ভূমিকা রাখছে জাতীয় অণুপুষ্টি উপাদানের (মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট) পর্যাপ্ত ব্যবহার। যা বিশ্বের সকল দেশের জন্য উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর বাংলাদেশের এ সাফল্য বিবেচনায় নিয়ে মা ও শিশু স্বাস্থ্যের ওপর বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার বিদ্যমান গাইডলাইনের সংস্কার আনা দরকার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত ৯ মার্চ ‘দ্য গার্ডিয়ানে’ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য দেয়া হয়েছে। এর আগেও কিছু আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বাংলাদেশের মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবার সফলতার বিষয়টি প্রকাশিত ও প্রশংসিত হয়।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বে প্রায় দু’শ’ কোটি মানুষ ‘গোপন ক্ষুধায়’ পীড়িত। এমন অবস্থার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে জাতীয় অণুপুষ্টি উপাদান (মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টস) এর অভাব। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের মা ও শিশু স্বাস্থ্য এখনও এ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এ সমস্যা উত্তরণে এ বিষয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অপুষ্টি এখন বড় সমস্যা। এখনও আড়ালে থেকে যাওয়া এ সমস্যাকে ‘গোপন ক্ষুধা’ হিসেবে বর্ণনা করে তারা বলেছে অপুষ্টিতে ভুগে সারা বিশ্বে এখনও প্রতি বছর মারা যাচ্ছে ৩১ লাখ শিশু। আয়োডিনের ঘাটতির জন্য প্রতি বছর অন্তত ১ কোটি ৮০ লাখ শিশু জন্ম নেয় মস্তিষ্কের সমস্যা নিয়ে।

মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট অপুষ্টি ॥ শুধু পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য পেলেই চলবে না, সেই সঙ্গে অতি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিকর পদার্থগুলো গ্রহণ করতে হবে। মানুষের উৎপাদনক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে, যার ফলে দেশের অর্থনীতির হানি ঘটতে পারে। ‘গোপন ক্ষুধা’ একদিকে ধনী দেশ অথবা দরিদ্র দেশ, অন্যদিকে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে ভেদাভেদ করে না; উন্নয়নশীল বিশ্বের বহু দেশ আজকাল অপুষ্টি, মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের অভাব এবং মেদবাহুল্য, এই তিনটি বিপদের বিরুদ্ধে লড়ছে; অপরদিকে পশ্চিমের ধনী দেশগুলোতেও অনেক মেদবহুল শিশু ও ব্যক্তি ‘গোপন ক্ষুধায়’ ভুগছে। তবে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট অপুষ্টির মূল শিকার হচ্ছে উন্নয়নশীল বিশ্বের আনুমানিক ১১ লাখ শিশু, যারা প্রতি বছর শুধু অপুষ্টির কারণে প্রাণ হারাচ্ছে। প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশু মস্তিষ্কের ত্রুটি নিয়ে জন্মাচ্ছে আয়োডিন ডেফিসিয়েন্সির কারণে। মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ডেফিসিয়েন্সি রোখার জন ‘বায়োফর্টিফায়েড’ খাদ্য গ্রহণ করা যেতে পারে; আবার শিশুদের ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট দেয়া যেতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়া ॥ সর্বাধুনিক বিশ্ব ক্ষুধা পরিমাপ রিপোর্ট থেকে দেখা যাচ্ছে, ক্ষুধাত্রাণের ক্ষেত্রে এশিয়ার দেশগুলো লক্ষণীয় উন্নতি করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রে ক্ষুধার পরিমাণ কমেছে ১২ পয়েন্ট, যা কিনা এশিয়ায় বৃহত্তম হ্রাস। বাংলাদেশে এনজিওগুলোর তৎপরতায় এবং সরকারী কর্মসূচীর ফলে সমাজের দরিদ্রতম স্তরে শিশু অপুষ্টি অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশ শিশুদের পুষ্টি নিয়মিতভাবে মনিটর করে থাকে। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে বয়সের তুলনায় কম ওজনের শিশুদের অনুপাত ছিল ৬২ শতাংশ, ২০১১ সলে যা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৭ শতাংশে। ভারতেও ৫ বছরের কম বয়সের শিশুদের মধ্যে যাদের ওজন বয়সের তুলনায় কম, তাদের অনুপাত কমেছে গত ৯ বছরে প্রায় ১৩ শতাংশ। ভারতের সামগ্রিক জিএইচআই স্কোরও ২৬ শতাংশ কমেছে। ‘ক্ষুধার’ পরিমাপে ভারতের পরিস্থিতিকে ‘উদ্বেগজনক’ থেকে ‘আন্তরিক’-এ নামিয়ে আনা হয়েছে। ভারত এখন ৭৬টি দেশের মধ্যে ৫৫ স্থানে- বাংলাদেশ ও পাকিন্তানের চেয়ে এগিয়ে, কিন্তু নেপাল ও শ্রীলঙ্কার থেকে পেছনে।

মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবায় ব্যাপক সফলতা দেখিয়েছে বাংলাদেশ ॥ মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হ্রাসে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। গত ১৫ বছরে দেশের মাতৃ মৃত্যুর হার প্রায় ৬০ শতাংশ এবং শিশু মৃত্যুর হার প্রায় অর্ধেক কমেছে। ১৯৯০ সালে সন্তান জন্ম দেয়ার সময় প্রতি ১ লাখ নারীর মধ্যে ৫৭৪ জন মারা গেছেন? এই সংখ্যা কমে ২০০১ সালে ৩২২ এবং ২০১১ সালে ১৯৪-তে নেমে এসেছে? ২০১৫ সালের মধ্যে ১৪৩ এ নামিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে? আর এক বছর বয়সী শিশুমৃত্যু (প্রতি হাজার জীবিত জন্মে) ৮৭ থেকে ৫২-তে এবং নবজাতকের মৃত্যুহার ৫২ থেকে ৩৭-এ নেমে এসেছে। তবে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০১৫ সালের মধ্যে দেশের মাতৃমৃত্যুর হার (প্রতি হাজার জীবিত জন্মে) ১.৪৩ এ নামিয়ে আনা প্রয়োজন। আর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো নবজাতকের উচ্চ মৃত্যুহার যা সকল শিশুমৃত্যুর শতকরা ৭০ ভাগ। দেশে এখনও প্রতি ঘণ্টায় ১৪টি শিশু মারা যায়, যাদের বয়স ১ মাসের মধ্যে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর ও স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় বলছে, মা ও শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এ জন্য বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন। বর্তমান সরকার স্বাস্থ্য খাতে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। শুধু আমাদের একার পক্ষে শতভাগ সফল হওয়া সম্ভব নয়। সমন্বিতভাবে কাজ করলে এ ক্ষেত্রে আরও এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রতিবেদন ॥ নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য বিশ্বের ১৭০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩০তম। ১৩০তম অবস্থান হলেও গত ১৫ বছরে বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমেছে। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের ‘বিশ্বে মায়েদের অবস্থান-২০১৪’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। বিশ্বব্যাপী মাতৃস্বাস্থ্য বিষয়ক ১৫তম এই বার্ষিক প্রতিবেদনটি সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে সেভ দ্য চিলড্রেন। ১৭০টি দেশের প্রসূতিদের স্বাস্থ্যসেবা, শিশুরমৃত্যু, শিক্ষা ও আয় বিশ্লেষণের মাধ্যমে স্টেট অব দ্য ওয়ার্ল্ডস মাদারস শীর্ষক প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে গত ১৫ বছরের মাতৃমৃত্যুর হার প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে শিশুমৃত্যুর হার কমেছে প্রায় অর্ধেক। স্কুলে যাওয়ার হার তিন বছরে বেড়েছে, মাথাপিছু আয় বিশেষ করে নারী এমপিদের আয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলেন ॥ মায়ের বয়স, প্রজনন স্বাস্থ্য এবং গর্ভকালীন খাবারের সঙ্গে মা ও শিশুমৃত্যুর হারের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। সমাজে গর্ভবতী মায়ের অপরিমিত খাবার একটা সাধারণ ব্যাপার। খাদ্যের বেলায় আর্থিক সঙ্গতি যতটা দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী কুসংস্কার অর্থাৎ শিক্ষার অভাব। মাতৃগর্ভে ভ্রƒণের যথাযথ পরিপুষ্টি প্রয়োজন। ভ্রƒণের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুষ্টির প্রয়োজনীয়তাও বাড়বে। তাই গর্ভবতী মায়ের সুষম খাদ্য ও পুষ্টিমানের বাড়তি খাবারের দরকার। বিশেষ করে, গর্ভধারণের শেষের তিন-চার মাস থেকে বাড়তি খাবারের প্রয়োজন খুবই বেশি। এ জন্য সুস্থ ও সবল শিশু পেতে হলে গর্ভাবস্থায় মাকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিমাণে পুষ্টিকর খাদ্য খেতে দিতে হবে।

সার্বিকভাবে দেশের কিশোর-কিশোরীদের পরবর্তীতে যারা মা হবেন, তাদের অপুষ্টি দূর করতে কিছু উদ্যোগ এখন থেকেই গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন আইসিডিডিআরবির পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা কেন্দ্রের পরিচালক তাহমিদ আহমেদ। তিনি বলেন, আসলে পুরো দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামো ঠিক করা উচিত। আলাদা করে কিশোর-কিশোরীদের জন্য কোন অবকাঠামো তৈরির দরকার নেই। আর শিশুদের মায়ের বুকের দুধ, উপযুক্ত সম্পূরক খাবার, ছয় মাস অন্তর অন্তর ভিটামিন এ খাওয়ানোর এই কার্যক্রম বাড়াতে হবে। শিশু বয়স থেকেই এটা করতে হবে। তাহলে শিশুরা অপুষ্টির হাত থেকে বাঁচবে। কিশোর বয়সেও অপুষ্টির শিকার হবে কম। তাহমিদ আহমেদ আরও বলেন, অন্যদিকে খাদ্য নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। আমরা পর্যাপ্ত ভাত খেতে পাচ্ছি। কিন্তু ধানের পাশাপাশি পর্যাপ্ত পরিমাণে ডাল ও শাক সবজির ফলন বাড়াতে হবে। সরকারকে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি এনজিওগুলোকেও কাজ করতে হবে।

প্রকাশিত : ১৫ মার্চ ২০১৫

১৫/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: