কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

যুদ্ধাপরাধী বিচার ॥ রাজাকার কমান্ডার হাসান আলী নিজ হাতে লালু ভূঁইয়াকে হত্যা

প্রকাশিত : ১১ মার্চ ২০১৫
  • সাক্ষী সুরাইয়ার জবানবন্দী

স্টাফ রিপোর্টার ॥ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্রাক্ষণবাড়িয়ার পলাতক রাজাকার কমান্ডার হাসান আলীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের ২১তম সাক্ষী মোঃ হাদিস ও ২২তম সাক্ষী সুরাইয়া ওরফে ফসিলা জবানবন্দী প্রদান করেছেন। মোঃ হাদিস তার জবানবন্দীতে বলেছেন, রাজাকাররা লালু ভুঁইয়াকে আটক করে, এক পর্যায়ে সে পালানোর চেষ্টা করলে হাসান আলী নিজ হাতে তাকে গুলি করে হত্যা করে। পরের দিন পুকুর থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। অন্যদিকে ২২তম সাক্ষী সুরাইয়া ওরফে ফসিলা জবানবন্দীতে বলেন , আমার স্বামী ও মেয়ে আমার বাবার বাড়ি রায়টুটিতে যাই। এর দুই-তিন দিন পর আমার বাবার বাড়িতে থাকা অবস্থায় লোকমুখে খবর পাই যে, পাকিস্তানী আর্মি ও রাজাকার কমান্ডার হাসান আলীর নেতৃত্বে রাজাকাররা আমাদের বাড়ি আক্রমণ করে লুটপাট করে জ্বালিয়ে দিয়েছে। জবানবন্দী শেষে রাষ্ট্র নিয়োজিত আইনজীবী সাক্ষীকে জেরা করেন। পরবর্তী সাক্ষীর জন্য ২২ মার্চ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন সদস্য বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মঙ্গলবার এ আদেশ প্রদান করেছেন। ট্রাইব্যুনালে অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক। সাক্ষীকে জবানবন্দী প্রদানে সহায়তা করেন প্রসিকিউটর আবুল কালাম। আর জেরা করেন রাষ্ট্র নিয়োজিত আইনজীবী আব্দুস শুকুর খান।

২১ সাক্ষী তার জবানবন্দীতে বলেন, আমার নাম মোঃ হাদিস। আমার বর্তমান বয়স আনুমানিক ৫৭ বছর। আমার ঠিকানা-গ্রাম-কোনাভাওয়াল, থানা-তাড়াইল, জেলা-কিশোরগজ্ঞ। ১৯৭১ সালে আমি কৃষি কাজ করি। আমি পড়ালেখা করি নাই। ১৯৭১ সালের ২৩ আগস্ট রাত আনুমানিক দুটা/ আড়াইটার দিকে পাকিস্তানী আর্মি ও রাজাকাররা আমাদের গ্রাম আক্রমণ করে। গ্রামের ভুঁইয়া বাড়ির দিক হতে আমরা গুলির শব্দ শুনতে পাই। ভোর হলে গ্রামের লোকজন ভুইয়া বাড়ির দিকে যাওয়া শুরু করলে আমরাও ভুঁইয়া বাড়িতে যাই। ভুঁইয়া বাড়ি যাওয়ার পরে লালু ভুঁইয়ার এমদাদ আমাদের জানায়, রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে কিছু লোক তাদের বাড়ির দরজায় এসে দরজা খুলতে বলেন। তারা দরজা না খুললে আগ লোকদের একজন বলে আমি হাসান আলী দারোগা তাড়ালি থানার ওসি, দরজা খোল। তখন তারা দরজা খুলে দিলে রাজাকাররা তার বাবা লালু ভুঁইয়াকে আটক করে। লালু ভুঁইয়া এক পর্যায়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে আসামি হাসান আলী দারোগা তাকে লক্ষ্য করে গুলি করে।

সাক্ষী বলেন, লালু ভুইয়া জীবন বাঁচানোর জন্য পার্শ্ববর্তী তাদের তাদের মালিকানাধীন পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে। সেখানেও তাকে লক্ষ্য করে আসামি হাসান আলী দারোগা গুলি করে। সকাল হলে আমিসহ গ্রামের যুবক ছেলেরা ওই পুকুরে নেমে লালু ভুঁইয়ার গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করি এবং গ্রামের মসজিদের পাশে লাশ কবর দেই। আমি সেখানে গিয়ে আরও শুনতে পাই যে, রাজাকাররা লালু ভুঁইয়ার আপন চাচা জাহিদ ভুঁইয়া এবং জাহিদ ভুঁইয়ার স্ত্রীকে কিশোরগজ্ঞ শহরে নিয়ে গেছে। পরদিন জাহিদ ভুঁইয়ার স্ত্রী আমাদের গ্রামে এসে জানায় তাদের কিশোরগঞ্জ ডাকবাংলোয় আটক করে রাখা হয়েছিল। সে আরও বলে যে, তার ছেলে কামরুজ্জামান ভুঁইয়া যে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছে তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য রাজাকাররা তাকে ছেড়ে দিয়েছে। জাহিদ ভুঁইয়ার স্ত্রী তখন গ্রামের গোদার বাপকে বর্ডার এলাকায় পাঠিয়ে তার ছেলে কামারুজ্জামানকে ফিরিয়ে আনে। কামরুজ্জামানকে ফিরিয়ে আনা হলে একজন দালালের মাধ্যমে কামারুজ্জামানকে কিশোরগজ্ঞ ডাকবাংলোয় পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেখানে রাজাকাররা তকে পরীক্ষা করে মুক্তিযুদ্ধের কোন ট্রেনিংয়ের প্রমাণ না পেয়ে কামারুজ্জামানকে ছেড়ে দেয়।

অন্যদিকে প্রসিকিউশনের ২২তম সাক্ষী কিশোরগঞ্জের তাড়াইল থানার সুরাইয়া ওরফে ফসিলা জবানবন্দীতে বলেন, আমাদের পরিবারের লোকজন সকলে আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল বিধায় পাকিস্তানী আর্মিরা আসার পরে ভয়ে আমি, আমার স্বামী ও মেয়ে আমার বাবার বাড়ি রায়টুটিতে যাই। এর দুই-তিন দিন পর আমার বাবার বাড়িতে থাকা অবস্থায় লোকমুখে খবর পাই যে, পাকিস্তানী আর্মি ও রাজাকার কমান্ডার হাসান আলীর নেতৃত্বে¡ রাজাকাররা আমাদের বাড়ি আক্রমণ করে লুটপাট করে জ্বালিয়ে দিয়েছে।

সুরাইয়া ওরফে ফসিলা তার জবানবন্দীতে বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাড়াইল থানা সদরে পাকিস্তানী আর্মিরা এসে ক্যাম্প করে। আমাদের পরিবারের লোকজন সকলে আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল বিধায় পাকিস্তানী আর্মিরা আসার পরে ভয়ে আমি, আমার স্বামী ও মেয়ে আমার বাবার বাড়ি রায়টুটিতে যাই। আমাদের বাড়ির অন্যান্য লোকজন ভয়ে বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে যায়। এর দুই-তিন দিন পর আমার বাবার বাড়িতে থাকা অবস্থায় লোকমুখে খবর পাই যে, পাকিস্তানী আর্মি ও রাজাকার কমান্ডার হাসান আলীর নেত্রিত্বে রাজাকাররা আমাদের বাড়ি আক্রমণ করে লুটপাট করে জ্বালিয়ে দিয়েছে।

সাক্ষী তার জবানবন্দীতে আরও বলেন, উক্ত ঘটনা শোনার তিন চারদিন পরে আমি ও আমার স্বামী আমাদের বাড়িতে ফিরে এসে দেখি তখনও আগুন জ্বলছে। আমাদের দেখে গ্রামের অনেক লোকজন আসে। তাদের মধ্যে আবুনি আমাদের জানায় যে, পাকিস্তানী আর্মি, রাজাকার কমান্ডার হাসান আলী দারোগার নেত্রীত্বে রাজাকাররা আমাদের বাড়ি আক্রমণ করে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করেছে। সে সময় আমাদের গোয়ালে তিনটি গরু বাঁধা ছিল। আবুনি এসে ওই গরুগুলোকে বাঁচানোর জন্য রশিগুলো কেটে দেয়। উল্লেখ্য, গত ১৫ সেপ্টেম্বর হাসান আলীর অনুপস্থিতিতে মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরুর নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে তার পক্ষে কোন আইনজীবী না থাকায় আব্দুস শুকুর খানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আসামি পক্ষের আইনজীবী নিয়োগ দেয়া হয়।

প্রকাশিত : ১১ মার্চ ২০১৫

১১/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: