মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

পলাশের ফুল

প্রকাশিত : ৭ মার্চ ২০১৫
  • ইকবাল খন্দকার

পলাশকে দুই চোখে দেখতে পারেন না তোফাজ্জলের বাবা। পলাশের অপরাধÑ সে সুযোগ পেলেই চুরি করে। তোফাজ্জলের বাবা তাকে অনেক বুঝিয়েছেন। বলেছেন, টোকাইগিরি করা খারাপ কিছু না। কিন্তু চুরি করা খারাপ। খালি খারাপ না। গুনাহর কাজ। এছাড়া পাবলিকের হাতে ধরা পড়লেও খবর আছে। কিন্তু পলাশ তার কথা এক কান দিয়ে শুনেছে, আরেক কান দিয়ে বের করে দিয়েছে। তার এসব নীতিকথা ভাল লাগে না। কাগজ কুড়িয়ে আর কয় টাকাই বা আয় করা যায়। অথচ কারও স্যান্ডেল, কারও বাটি ঘটি বস্তায় ঢুকিয়ে ফেলতে পারলে আয়টা ভালই হয়। সেই টাকা দিয়ে দুপুরের খাবারটা মজা করে খাওয়া যায়। কিছু টাকা সঞ্চয়ও হয়।

তোফাজ্জলও টোকাই। সে পলাশের ভাল বন্ধু। একসঙ্গে কাগজ কুড়ায়, খেলাধুলা করে, হৈহুল্লোড় করে। কোন কোন দিন পাশাপাশি বেঞ্চে শুয়ে ঘুমায়ও। তবে তোফাজ্জল তাকে বলে রেখেছে যখন তার বাবা আশপাশে থাকেন, তখন যাতে সে ধারে কাছে না আসে। কারণ বাবা সাংঘাতিক রাগী মানুষ। তিনি রেগে গিয়ে তাকে লাঠি নিয়ে তাড়াও করতে পারেন। পলাশের অবশ্য ডর-ভয় নেই। সে হাসতে হাসতে বলেছে, তর আব্বায় আমারে জীবনেও দৌঁড়ায়া ধরতে পারব না। পুলিশেই আমারে ধরতে গিয়া তিন গেলাস পানি খায়! তর আব্বারে কইস ভালা কইরা দৌঁড় শিখ্যা যাতে আমারে ধরতে আসে। হুদাহুদি দৌঁড়ায়া কাহিল হইয়া লাভ আছে?

ঘরে বসে ছোট বোনের সঙ্গে লুডু খেলছিল তোফাজ্জল। ঘর বলতে পলিথিন আর তালপাতা দিয়ে মোড়ানো ছাপরা। বছর তিনেক আগে বড় একটা গাছের গোড়ায় ছাপরাটা বানিয়েছিলেন তোফাজ্জলের বাবা। তাদের ছাপরার আশপাশে আরও কয়েকটা ছাপরা আছে। ওইসব ছাপরার বাসিন্দাদের সঙ্গে তোফাজ্জলদের ভালই খাতির। বোনের সঙ্গে তোফাজ্জলের লুডু খেলা যখন ঠিকমতো জমে উঠল, তখনই তার কানে ভেসে এলো কান্নার আওয়াজ। তোফাজ্জল কান খাড়া করল। তারপর সে দৌঁড়ে বের হলো ঘর থেকে। কিছুদূর যেতেই সে দেখতে পেল একদল মানুষ গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে তারা দাঁড়িয়ে কী দেখছে, সেটা বোঝা যাচ্ছে না।

তোফাজ্জল ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকল। এবার সে দেখতে পেল পলাশ মাথা নিচু করে বসে আছে। তার দুই হাত পিঠমোড়া বাঁধ দিয়ে বাঁধা। তোফাজ্জল অস্থির হয়ে বলতে থাকেÑ কী হইছে? পলাশরে বানছে কেরে? কেডা বানছে? ভিড়ের মধ্য থেকে একজন কর্কশ গলায় বলে ওঠে, কেডা বানছে, সেই কৈফিয়ত তোরে দিতে হইব? চোরের লাইগা দরদ উথলায়া উঠতাছে মনে হয়? ভাগ এইখান থেইকা! নইলে কিন্তু তোরেও বাইন্ধা ফালায়া রাখমু। তোফাজ্জল ভিড়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে। বেরিয়েই দেখতে পায় বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। তোফাজ্জল বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে ভয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। কারণ সে নিশ্চিত পলাশের সঙ্গে মেশার অপরাধে বাবা তাকে এখন বকা দেবেন।

তোফাজ্জল অবাক হয়। কারণ বাবা তাকে বকা দেন না। বরং আড়ালে ডেকে নিয়ে নিচু গলায় বলেন, পলাশরে কত কইরা কইলাম না চুরি না করার লাইগা? আমার কথা শুনল না। চোরের দশদিন, গিরস্থের একদিন। আজকা খাইছে ধরা। এখন মজা বুঝুক! পাবলিকে তারে পুলিশের কাছে দিবো। তোফাজ্জল অসহায়ের মতো বলে, আব্বা, পলাশরে ছাড়ানির কি কোন ব্যবস্থা নাই? বাবা বলেন, কোন ব্যবস্থা তো দেখতাছি না। তবে সে যদি ওয়াদা করে আর কোনদিন এই এলাকায় আইব না, তাইলে মনে হয় পাবলিকে তারে মাফ করতে পারে। কারণ সে এই এলাকা না ছাড়লে চুরি-চামাড়িও বন্ধ হইব না। যা, তুই গিয়া তারে জিগা সে এই এলাকা ছাড়তে রাজি আছে কিনা।

পলাশ কান ধরে উঠবস করতে করতে ওয়াদা করে, আজই সে এলাকা ছেড়ে চলে যাবে। যদিও তার যাওয়ার তেমন কোন জায়গা নেই। তার বয়স যখন ছয়, তখনই তার মা মারা গেছেন। বাবা নিখোঁজ। তাই তোফাজ্জলকে পরম বন্ধু মনে করে তার কাছে কাছেই থাকতে চাইত। কিন্তু এখন থেকে আর সেটি সম্ভব না। পলাশ চলে যেতে থাকে। তোফাজ্জল তাকে ডাক দেয়। দুই বন্ধু মুখোমুখি দাঁড়ায়। দু’জনের চোখই ছলছল করতে থাকে। একসসময় তারা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। পলাশ কাঁদতে কাঁদতে বলে, আমাগো কি আর কোনদিন দেখা হইবো না তোফাজ্জল? তোফাজ্জল কোন উত্তর দিতে পারে না। পেছন থেকে বাবা বলেন, যদি কোনদিন চুরি ছাইড়া ভাল মানুষ হইতে পার, তাইলে দেখা হইব।

পলাশ চলে যায়। কিন্তু তোফাজ্জলের বাবার শেষ কথাটি তার কানে বাজতে থাকে। এক মাস পর। তোফাজ্জলদের প্রতিবেশী আসাদুল্লাহ সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখতে পায় পলাশ দাঁড়িয়ে আছে। আসাদুল্লাহ চেঁচামেচি শুরু করে দেয়। অবশ্য চেঁচামেচি করাটাই স্বাভাবিক। কারণ এক মাস আগে পলাশ আসাদুল্লাহর স্যান্ডেল জোড়া চুরি করতে গিয়েই ধরা পড়েছিল। চেঁচামেচি শুনে আশপাশের সবাই ছুটে আসে। তারা পলাশকে ঘিরে ফেলে। একজন দড়ি নিয়ে আসে। তাদের একটাই কথা, পলাশ এই এলাকা ছেড়ে যাওয়ার ওয়াদা করার পরও কেন এলো। নিশ্চয়ই সে আবার কোন চুরির পরিকল্পনা নিয়েই এসেছে।

পলাশকে দড়ি দিয়ে বাঁধতে গিয়ে চমকে ওঠে করিম মিয়া। কারণ সে দেখতে পায় পলাশ কী যেন একটা পকেটে ঢুকিয়েছে। যা এতক্ষণ তার হাতে ছিল। হাতটা পেছনে থাকায় জিনিসটা দেখা যায়নি। করিম মিয়া বলতে থাকেÑ এ্যাই, পকেটে কী রাখছস? ক কী রাখছস? আইজ কী চুরি করছস ক! পলাশ বলে, আমি অনেক আগেই চুরি ছাইড়া দিছি। আমি ভাল হইয়া গেছি। আসাদ ভেংচি কাটেÑ হেহ্, চুরি ছাইড়া দিছে! তাইলে পকেটে এইটা কী লুকাইছস? আর এত সকাল সকালই বা এই এলাকায় ক্যান আইছস? কথা না বাড়ায়া পকেটে কী রাখছস বাইর কর!

করিম মিয়া জোর করে পলাশের পকেটে হাত ঢোকায়। সবাই কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে থাকে তার হাতের দিকে। পকেটে তেমন কিছুই পাওয়া যায় না। একটি লাল টকটকে গোলাপ ছাড়া। সবাই প্রশ্নবোধক আর বিস্মিত চোখে তাকায় পলাশের দিকে। পলাশ বলতে থাকেÑ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের জন্যই আমরা স্বাধীনতা পাইছি। আমি শুনছি এই সরোয়ার্দী উদ্যানে দাঁড়ায়া বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিছিলেন। আজকা মার্চ মাসের সাত তারিখ তো! তাই যেই জায়গাডায় দাঁড়ায়া উনি ভাষণ দিছিলেন, সেই জায়গাডায় এই ফুলডা দিতে আইছি। তবে ফুলডা কিন্তু আমি চুরি কইরা আনি নাই। শাহবাগ থেইকা কিন্না আনছি। আজ থিকা কথা দিতাছি আমি আর চুরি করুম না।

প্রকাশিত : ৭ মার্চ ২০১৫

০৭/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: