মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

বিশ্বকাপ ক্রিকেট ॥ অসিভূমে বাঙালী তারুণ্য

প্রকাশিত : ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • রুমেল খান

‘ঝিঁঝি পোকার’ ইংরেজী নাম থেকে যে খেলার জন্ম, তার বয়স নেহা কম নয়। ঝিঁঝি পোকার ইংরেজী নাম যদি জানা না থাকে, তাহলে কষ্ট করে আর ডিকশনারি ঘাঁটার দরকার নেই। সেটি হচ্ছে ক্রিকেট। এই খেলার উৎপত্তিস্থল ঠিক কোথায়- এ নিয়ে মতভেদ থাকলেও বেশিরভাগ ক্রিকেট প-িতের মতে, ইংল্যান্ডই হচ্ছে ক্রিকেটের জন্মদাতা (কারও মতে ফ্রান্স)। যে দেশই হোক না কেন, ক্রিকেটের প্রচার, প্রসার ও জনপ্রিয়তা যে দিনকে দিন বেড়েই চলেছে, সে বিষয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।

কদিন আগেই বিশ্ব ভালবাসা দিবসের দিনে শুরু হয়েছে ‘আইসিসি বিশ্বকাপ ক্রিকেট’র একাদশ আসর। এ নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল বিশ্বকাপের আসরে অংশ নিচ্ছে পঞ্চমবারের মতো। প্রিয় বাংলাদেশ দলের খেলা উপভোগ করতে এবং তাদের সমর্থন জানাতে বাংলাদেশ থেকেও বেশকিছু ক্রিকেটানুরাগী সেখানে (অস্ট্রেলিয়ায়) গিয়ে হাজির হয়েছেন। সেখানকার প্রবাসী বাংলাদেশীরাও পিছিয়ে নেই। সেখানে অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে তাদের সীমাহীন আনন্দ-উচ্ছ্বাস। বলা বাহুল্য, এই ক্রিকেটানুরাগীদেরও অধিকাংশই তরুণ প্রজন্মের। তাঁরা দেখিয়ে দিতে চান, স্বভাবে-আচরণে, কর্মে-সমর্থনে তাঁরা শুধু দেশের সেরা সমর্থকই নন, ক্রিকেটবিশ্বেরও সেরা ক্রিকেট সমর্থক।

বাংলাদেশ হয়ত নৈপুণ্যের বিচারে ক্রিকেট বিশ্বের এক নম্বর দেশ নয়। কিন্তু বিশ্ব ক্রিকেটের সবাই একবাক্যে স্বীকার করেÑ ক্রিকেট উন্মাদনায় বাংলাদেশ হচ্ছে এক নম্বর দেশ! এই ধারণা যে মোটেও ভুল নয়, সেটি চলমান বিশ্বকাপেই পরিলক্ষিত হচ্ছে। সিডনি, মেলবোর্ন, ক্যানবেরাÑ যেখানেই বাংলাদেশের খেলা হচ্ছে, সেখানেই দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশী ক্রিকেটপ্রেমী তারুণ্যের উচ্ছ্বাস। প্রিয় দেশের জাতীয় পতাকা, জাতীয় ক্রিকেট দলের জার্সি, ভুভুজেলা, জাতীয় পতাকার রঙে বানানো টুপি, টাইগারদের শুভকামনায় ব্যানার, ফেস্টুন, হেডব্যান্ড, গালে-মুখে, হাতে রং দিয়ে জাতীয় পতাকা আঁকা ... কী নেই!

অস্ট্রেলিয়ার এসব প্রবাসী বাংলাদেশীর অধিকাংশই শিক্ষার্থী এবং চাকরিজীবী। স্বভাবতই চাপে থাকতে হয় তাঁদের। পোহাতে হয় নানা ঝামেলা। করতে হয় অনেক পরিশ্রম। সময়ের ভীষণ মূল্য আছে তাঁদের কাছে। দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থাকলেও তাঁদের হৃদয়ে আছে বাংলাদেশ। যেদিন বাংলাদেশের খেলা থাকে, সেদিন তাঁরা সব ভুলে যান। ভুলে যান তাঁদের পড়াশোনা বা ক্লাস আছে। আছে চাকরিস্থলে যাবার তাড়া। দেশের টানে, মাতৃভূমির প্রতি অগাধ ও দুর্নিবার আকর্ষণে তাঁরা ছুটে যান খেলার টিকেট সংগ্রহ করতে, সবাই দলবেঁধে গ্যালারিতে হাজির হন। মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিকদের জয়ের জন্য গলা ফাটিয়ে চিৎকার করেন, জোগান উৎসাহ, তাঁদের সাফল্যে হন আনন্দে উদ্বেলিত, ব্যর্থতায় হন বিষণœ। কিন্তু তাই বলে তারা আশা হারিয়ে ফেলেন না। আবারও বুক বাঁধেন।

ক্রিকেটপাগল তরুণ প্রজন্ম অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিল কবে উঠবে বিশ্বকাপের পর্দা। কারণ বিশ্বকাপ ঘিরে তরুণ মনে সৃষ্টি হয় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। পড়াশোনার পাশাপাশি নির্মল বিনোদনের এ উপলক্ষে তরুণ প্রজন্ম কোনক্রমেই হেলায় হারাতে চায় না। এ জন্য হৃদয়ের সব আবেগ উজাড় করে দিয়ে প্রিয় দলের বিজয় কামনা করে থাকেন অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে। প্রিয় খেলোয়াড় ও দলের পোস্টার দিয়ে রুম সাজাতে তাদের একটুও ভুল হয় না। তারা কিনে থাকে প্রিয় দলের জার্সি এবং ক্যাপও। উৎসবের এ আমেজ তাই তারুণ্যের কাছে অনেকটাই বর্ণিল হয়ে ওঠে।

এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুব একটা সুবিধের নয়। কিছু রাজনৈতিক দলের ডাকা হরতাল-অবরোধে সৃষ্ট বিভিন্ন নাশকতা-সহিংসতায় দেশের নানা জায়গায় প্রতিদিনই আহত ও নিহত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে সম্পদের, লোকসান হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্যের। আমরা বাংলার মানুষ খুব কম উপলক্ষেই এখন একত্রে আনন্দ করতে পারি। রাজনৈতিক বিভাজন আজ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কোন কিছুতেই এখন আমরা আর একমত হতে পারি না! কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাফল্যে দল-মত-নির্বিশেষে রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে গিয়ে অতীতে আমরা একত্রে আনন্দের এ উপলক্ষ উপভোগ করেছি। এজন্যই এবারের বিশ্বকাপে এদেশের মানুষ মাশরাফি বাহিনীর সাফল্য চায়। সর্বান্তকরণে তারা টাইগারদের সাফল্য কামনা করে শুধু কষ্ট ভারাক্রান্ত হৃদয়ের কষ্ট লাঘব করার জন্য, সর্বস্তরের মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। আর এ হাসি ফোটানোর দায়িত্ব তরুণ টাইগারদের। তাদের বিজয়ে বা সাফল্যে সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বসিত হবে তরুণ প্রজন্মরাই।

তারুণ্য শক্তি, তারুণ্য বল, তারুণ্য কঠিন, শপথ অনল। একজন মানুষের জীবনে সবচেয়ে বেশি তেজ থাকে তারুণ্য কালে। এজন্যই হয়ত কবি লিখেছিলেন, ‘এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’ খেলাধুলায় অভিজ্ঞতার অবশ্যই প্রয়োজন আছে। কিন্তু সেই সঙ্গে দরকার টগবগে, দীপ্তময় তারুণ্যেরও। নইলে যে সাফল্য ধরা দেবে না তৃষ্ণার্ত হাতের মুঠোয়।

এ যুগটাই এখন নিয়ন্ত্রণ করছে তরুণরা। কী কর্মক্ষেত্রে, কী সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে, কী রাজনীতিতে, কী অর্থনীতিতে, কী ইন্টারনেট দুনিয়ায়, কী ক্রীড়াঙ্গনে। একজন মুসা ইব্রাহিম, মার্ক জুকারবার্গ, ক্যাটরিনা কাইফ, এমা ওয়াটসন, ক্যারোলিন ওজনিয়াকি, মাশরাফি মতুর্জা বা একজন সাকিব আল হাসানÑ এরা সবাই যে যার স্ব-স্ব অবস্থানে স্বমহিমায় উজ্জ্বল। এদের মধ্যে একটা মিল হচ্ছে, এরা সবাই বয়সে তরুণ। বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলছে। তাই এ নিয়ে এদেশের ও প্রবাসীদের অগুণিত ক্রিকেটমোদীদের হৃদয়ে বইছে আনন্দের ফল্গুধারা। প্রথম ম্যাচে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে আশাতীত নৈপুণ্য প্রদর্শন, দ্বিতীয় ম্যাচে বৃষ্টির কারণে খেলা না হওয়ায় স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে পয়েন্ট ভাগাভাগির পর ক্রিকেট অনুরাগীদের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস পরিলক্ষিত হয়েছে, তা ছিল দেখার মতো। যাঁরা এ আনন্দ-উৎসবে শামিল হয়েছিলেন, তাদের সিংহভাগই তরুণ প্রজন্মের। তাদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস এই বিশ্বকাপে যথাসম্ভব দীর্ঘায়িত হোক, সেটাই হোক নিগূঢ় প্রত্যাশা।

rumelboss@gmail.com

প্রকাশিত : ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২৪/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: