মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বইছে ফাগুন হাওয়া

প্রকাশিত : ৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
বইছে ফাগুন হাওয়া
  • ভিলিয়া রেজা

কুয়াশাধূসর আস্তরণ সরিয়ে নিসর্গের কোলে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে আলোকোজ্জ্বল রোদেলা প্রহর। শীতের কাতরতাকে পাশে রেখে ফাল্গুনের উষ্ণতা যেন ধীরে ধীরে দৈনন্দিন জীবনধারার অলিন্দে ছায়া ফেলছে নিবিড় আমেজে। গাছে গাছে নতুন পত্রপল্লবের সবুজাভ কিরণ প্রকৃতিকে দিতে শুরু করেছে বসন্ত আগমনের মুখর তারবার্তা। আর এই বার্তা বাহকরূপে কোকিলের মধুর স্বরগুঞ্জন ঝরে পড়ছে শীতার্ত বেলা-অবেলার প্রান্ত ছাড়িয়ে, গ্রাম-গ্রামান্তর পেরিয়ে বসন্তের এই আসন্ন সময়ের ছাপ এসে পড়তে শুরু করেছে নগর জীবনে আর অনুরণিত হচ্ছে। জীবনের ছন্দ-অনুছন্দে বসন্তের মনোহর আবেশ। ধুলিধূসর শীতের ঝাপসা ক্ষণ ফুরিয়ে এসে ফ্ল্যাটবাড়ির কার্নিশে কার্নিশে খয়েরি শালিকের মতো পালক ছড়িয়ে বসার উদ্যোগ নিয়েছে ঋতুরাজ্য বসন্তের মায়াবী মাধবী ফোটা দিনের উষ্ণীষ।

পাখিদের শীতে আচ্ছন্ন ডানাগুলো বাসন্তী আবহে ইতোমধ্যে ঝলমল করতে শুরু করেছে; যার ছোঁয়া লেগেছে জনজীবনেও। যে জীবন এই কদিন আগেও ছিল স্যুট-ব্লেজার, জাম্পার, শোয়েটার, মাফলার, গলাবন্ধ, কার্ডিগান, শাল-চাদরে আবৃত। সে জীবন এখন হলুদ বসন্তের মৃদুমন্দ হাওয়ায় যেন ক্রমে উষ্ণ আর উন্মীলিত হওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। ঋতুবৈচিত্র্য ম-িত বাংলার এ মৌলিক বৈশিষ্ট্য। তার অন্যতম বিষয় হলো প্রতিঋতুতে নৈসর্গিকতায় আসা নিবিড় পরিবর্তন। আর এই পরিবর্তনের ছাপ অত্যন্ত গভীরভাবে আন্দোলিত করে প্রাত্যহিক জীবনাচারকে। যার প্রতিচ্ছাপ পড়ে জীবনের প্রতিটি অনুষঙ্গে। এবং এর প্রধান অনুষঙ্গ হলো পরিধেয় বস্ত্র তথা পোশাক পরিচ্ছেদ। দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য এই অনুষঙ্গটি এখন আর শুধু প্রয়োজনের মাত্রার সীমায় সীমাবদ্ধ নেই।

নিত্য প্রয়োজনের রেখা অতিক্রম করে পোশাক এখন ফ্যাশনেবল কনসেপশন মর্মে ধারণ করে মেলে দিয়েছে তার উজ্জ্বল রেশমি পালক।

শীতের ফুরিয়ে আসা শিশিরস্নাত প্রহরকে বুক পকেটে তুলে রেখে ঝনাৎকার শব্দে নতুন কাঁচাপয়সার মতো বসন্ত এখন যেন সমগ্র প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়ার অপেক্ষায়। কিন্তু প্রকৃতির ক্যানভাসে বসন্তের রূপ ও রঙের তুলির টানে অপূর্ব ঋতুর আগমনকে অভিনন্দিত করার তোড়জোড় ইতোমধ্যে সূচিত হয়ে গেছে। একইভাবে ফাল্গুনের গুঞ্জরিত আনন্দঘন রৌদ্রময় ইমেজ গহন মুখরতা নিয়ে ছড়িয়ে পড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ফ্যাশন ভুবনের প্রতিটি পল্্-অনুপলে।

বসন্ত ঋতু মানেই একটা অন্যরকম আবেদন। ভিন্নরকম এক অনুভূতি মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে বসন্তে হিল্লোলিত হয়। শীতের মলাট খসে পড়তে পড়তে জীবনের প্রতিটি পঙ্ক্তিতে যেন কবিতার শব্দমধুর এক অনুরণন স্পন্দিত হয় এই বসন্তে। মন কেমন করা, উন্মনা, উদাস হয়ে যাওয়া বসন্তকে অভিবাদন জানাতে যেন সবার মধ্যেই থাকে একটা আগাম প্রস্তুতি। যে প্রস্তুতির স্পর্শে ইতোমধ্যে দেশীয় শাড়ি থ্রি-পিসি, ফতুয়া, টি-শার্ট, শার্টসহ ফ্যাশন ধারার সব পোশাকেই উন্মোচিত হয়েছে। বসন্তের এই বাক্সময় ঔজ্জ্বল্যের নির্জন কিন্তু গুঞ্জরনশীল বাসন্তী মুগ্ধ রঙিন নিসর্গকে বরণের শব্দ যেন এরই মধ্যে নগরজীবনের মুহূর্তগুলোকে উন্মুখ করে তুলেছে।

আর ক’দিন বাদেই প্রকৃতির সবুজ দরোজায় ভোরবেলা বাজিয়ে এসে নিসর্গের বসার ঘরে জড়ির ঘাগড়া ছড়িয়ে বসবে বর্ণোজ্জ্বল ঋতুরাজ বসন্ত। তার আগেই বাঙালীর জীবনের এক অনন্য গাঁথা সাংস্কৃতিক ধারার এক অনন্য প্রতিচ্ছবি অমর একুশে গ্রন্থমেলা শুরু হয়ে যাবে ১ ফেব্রুয়ারি। বইপ্রেমী, শিল্পমনা এবং দেশীয় পোশাকের প্রতি আকণ্ঠ আগ্রহী মানুষের প্রাণখোলা আনন্দের ধারায় সিক্ত মন নিয়ে কবি, লেখক, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, পাঠকদের এক মহামিলন ঘটবে বাংলা একাডেমি চত্বরে। যাদের অবয়বে শোভা পাবে বাঙালী সংস্কৃতিসমৃদ্ধ দেশীয় মোটিফে তৈরি পোশাক। যে পোশাকের বুকজুড়ে আলো ছড়াবে হাজার বছরের বাঙালী সংস্কৃতির প্রতিবিম্ব, লোকজ-গ্রামীণ পটভূমির অজস্র চিত্রময়তা। প্রিয় কবিতার পঙ্ক্তি রবীন্দ্র, নজরুল, জীবনানন্দ, লালন এবং বঙ্গবন্ধুসহ জগৎ বিখ্যাত মনীষীদের মুখাবয়ব।

সুতোয় বোনা রুমালের ভাঁজে ভাঁজে হেম শিখার মতো জেগে ওঠা বসন্তের আলাপনে আবহমান বাংলার রূপসুধা যে স্পন্দনে উৎসারিত হয় তা যেন এক চিরকালীন ভাল লাগারই প্রতিরূপ। নিবিড় সুরমূর্ছনা নিয়ে আসে বসন্ত। যে সুরের মোহনীয়তায় মুগ্ধ হয়ে ওঠে সারা বাংলা। বাংলার নারী ও পুরুষ প্রবল কাব্যিকতায় ভিজে যায় হৃদয়। যার ছবি ভেসে ওঠে জীবনের প্রতিটি প্রাসঙ্গিকতায়। বিশেষ করে বাংলার সব বয়সী নারীর মধ্যে এর স্ফুরণ ঘটে অন্য এক প্রাণাবেগে। গাঁদা ফুল আর রজনীগন্ধার ঐশ্বর্যে ভরে ওঠে মায়াবি খোঁপা। আর চারদিকে শুরু হয় বসন্ত উৎসব। যে উৎসবকে ঘিরে ফ্যাশনেবল পোশাকের আবেদনটাও ফুটে ওঠে পরিবেশগত কারণে।

শীতের হিমেল হাওয়া উত্তরে মিলিয়ে যেতে না যেতেই দখিনা হাওয়া এসে লুটিয়ে পড়বে বাসন্তী প্রহরের খোলা ব্যালকনিতে। ফুলেল নিসর্গের সান্নিধ্যে যখন ব্যস্ত জীবন অভিষিক্ত হবে তখনই বলবে মনÑএকটু দাঁড়াও। থমকে থাকা রোদের ড্রয়ার থেকে খুঁজে নেবে সিল্কের বসন্ত সকাল।

উঠোনের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা গোলাপের চারায় ফোটা ফুলের ব্যাকুল গন্ধে অন্তর হয়ে উঠবে তুমুল ফুরফুরে। তখনই খিড়কির জান্্লার পাশে এসে বসবে প্রিয় কোন ছায়ার গোলাপ। থেমে থেমে অন্দরমহল থেকে ভেসে আসবে মৃদুলয়ে গ্রামাফোন-রেকর্ডে বেজে ওঠা বসন্তের গান। আর প্রাণে জেগে উঠবে দূর বনের কোন গাছের শাখায় বসা কোকিলের হিল্লোলিত নরম কুহুতান।

প্রকাশিত : ৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০৯/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: