কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

তুই বেঁচে গেলি শালা!

প্রকাশিত : ৩০ জানুয়ারী ২০১৫
  • শেখ আতাউর রহমান

রাত পৌনে বারোটা

তীরবেগে ছুটে চলেছে অটোবাইক

আমিসহ আরো তিন যাত্রী-সবাই উদগ্রীব

আঁধার হিমেল জোছনায় কেমন যেন অলৌকিক চারিদিক

অঘ্রাণের শীতল হাওয়া ঝাপটা মারে চোখে মুখে-করে করাঘাত

প্রবল দুশ্চিন্তায় উপেক্ষিত হয় এই হাওয়ার হিমেল আঘাত

আমার ভাবনা কেবল ফার্মেসি খোলা পাবোতো? আনকোরা এক

গ্লুকোমিটারের খোঁজে উড়ে চলেছি আমি সুদূর ওষুধ পাড়ায়-

ঘরণী যে ঘরে কাতরায়-

আনকন্ট্রোলড ব্লাডসুগার!-

পুরনো গ্লুকোমিটার রেজাল্ট দিচ্ছে কেবল বেতাল বাতুলের মতো

কখনো ২২, কখনো বা ২৭/২৮ তাই উড়ে চলেছি আমি

আনকোরা এক যন্ত্রের খোঁজে, সুস্থির করতে হবে ঘরণীকে

ইনসুলিনের সঠিক নির্ভুল ডোজে

অবশেষে ছুটন্ত অটো ঘ্যাচ করে ব্রেক কষে, আমিও লাফিয়ে পড়ি-ছুটি-

দেখি আরাধ্য ফার্মেসি বন্ধ হবার পথে, তবে আমার বিনীত বিনয়-

দোকানিও দ্রবীভূত হয়,

কিন্তু কি আকাশছোঁয়া দাম!- তবু নিয়ে নিই-পার্স শূন্য হয়ে যায়

বল কি করে উপেক্ষা করি জীবনের দায়।

আবার দৌড়ে ফিরে চলা- ধরতে হবে রাতের শেষ অটোটি

হঠাৎ এসময় সোডিয়াম লাইটের নিচে আধোআলো আধোআঁধার

ভূত দেখার মতো চমকে উঠি,

এক ভৌতিকস্বর আমার গতিরোধ করে, ‘কিছু দিয়্যা যান স্যার’-

দেখি কিম্ভূত এক অর্ধমানব হাত বাড়িয়ে দিয়েছে আমার দিকে,

পুরুটায়ারে মোড়া তার দুই ঊরু-হাতদুটোও বনসাই আঁকাবাঁকা

ঠিক যেন বেকনের ‘থ্রি স্টাডিজ ফর্ম দা হিউম্যান বডি’ অবিকল আঁকা!

ভ্রƒক্ষেপ করিনা ওকে, চলে আসি, কিন্তু পেছন থেকে আবারো তার

কাতর কাতরানি শুনি, ‘চারদিন হরতাল স্যার-’

এবার থমকে দাঁড়াই-মধ্যবিত্ত দরদ উথলে ওঠে, পার্সে পড়ে আছে কেবল

পাঁচ আর দু’টাকায় দুটি নোট। ত্বরিত বের করি পাঁচটাকা-দিতে যাই-

হঠাৎ মনে পড়ে, অটো ভাড়া? পলকে পার্সে পাঁচ টাকা পুরে দু’টাকার নোট দিই ছুড়ে,

ওদিকে হর্ন দিচ্ছে অটো-হেডলাইটের তীব্র ভ্রƒকুটি-

উর্দ্ধশ্বাসে ছুটিÑ

বাসায় ফিরে আনকোরা মিটারে সঠিক সুগার মেপে স্বস্তির ঢেকুর তুলি।

সঠিক ইনসুলিন নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন গৃহিমেয়ে- ‘নিশ্চিন্ত নিরপরাধ ঘুম’!

রাত তখন স্তব্ধ নিঝুম।

হে পাঠিকা-পাঠক হৃদয়, এত ধকল কি এ বয়সে সয়? আসেনাকো ঘুম-

তাই আনকোরা যন্ত্রের লিটারে চর পড়ে পড়ে অতন্দ্র প্রহর কাটাই-

এবং এভাবে রাত দুইটা বাজাই

হঠাৎ অকস্মাৎ

বুম! বুম!! বুম!!!

ট্র-ট্র-ট্র-ট্র

প্রচ- শব্দে রাত ফেটে চৌচির হয়! ছড়ায় আতঙ্ক, সন্ত্রাস, ভয়-

আমাকে বিহ্বল করে দিয়ে দূরাগত ক্ষীণ মানুষি আর্তনাদ

বিথোভিনের সকরুণ বেদনার মতো মিলিয়ে যায়

অঘ্রাণের শীতলবৃক্ষের পাতায় পাতায়

এবং কে যেন আর্তরবে ভেজাঘাসের ওপর হিম হিম শিশির ঝরায়!

যথারীতি পরদিন ভুলে যাই সব- একঘেয়ে মধ্যবিত্ত জীবনের

কেটে যায় আরো কিছুটা সময়।

তার পরদিন সকাল বেলা সাদামাটা প্রাতরাশ সেরে

এক মগ চা নিয়ে যথারীতি দৈনিকের পতাখুলে বসি।

কিন্তু একি?

প্রথম পাতায় দেখি সেই বিকলাঙ্গ ভিখেরির ছবি-মাথার আধেক

নেই যেন কেউ ধারালো করাত দিয়ে কেটে নিয়েছে তার আধেক মাথা-

একটা বিস্ফারিত চোখ কেবল ড্যাবড্যাব চেয়ে আছে অপলক! আমার দিকে?

অসহ্য! বুঝিনা কেন এত হত্যাকা-? কেন? কেন? কেন?

হঠাৎ ছলকে ওঠে মনে, হয়তো ভেবেছিলো সে মধ্যরাতেও যদি

এমন একটি দু’টাকার নোট পাওয়া যায় তবে আরো কিছুটা সময়

অপেক্ষা করলে কি হয়- হয়তো দয়ার্ত হয়ে ছুড়েও দিতে পারে।

দু’টাকার নোট কেউ কেউ-

হায়! এই তার পরিণাম? আমার দু’টাকাই তবে দিয়েছিলো তাকে

মরণের হাতছানি? বিস্ফারিত চোখে তাই এত ক্ষোভ?- এত গনগনে জ্বালা?-

বুঝলাম আমাকেই বলছে এ চোখ, তোর দু’টাকার জন্যেই মলাম আমি,

তুই বেঁচে গেলি শালা!

প্রকাশিত : ৩০ জানুয়ারী ২০১৫

৩০/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: