মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

একজন সফল নারী

প্রকাশিত : ২৩ জানুয়ারী ২০১৫
একজন সফল নারী
  • নাজনীন বেগম

দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ যদি হাত গুটিয়ে বসে থাকে তাহলে নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। কেননা একজন নারী শুধু একজন স্ত্রী বা মাতাই শুধু নন, তিনি একজন গৃহিণীও। তাই তাঁর দায়িত্ব অনেক। সন্তান লালন-পালন, রান্নাবান্নার কাজ থেকে শুরু করে কেউ পুরুষের পাশাপাশি পেশাগত অনেক কাজ করে থাকেন। একজন নারী যখন কোন সরকারী কর্মকর্তা কিংবা বেসরকারী কোন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকেন তখন তাকেও ৯টা-৫টা পর্যন্ত অফিসে সময় দিতে হয়। তার ওপর আছে ঘরের সমস্ত কাজ । এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রান্না ও সন্তান লালন-পালনের কাজ। তাই একজন নারীর জন্য রান্নার কাজটি জানা জরুরী। ভাল রান্না তৈরির কাজ জানা থাকলে তা শুধু ঘরের কাজেই লাগে না, সেসঙ্গে এর মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের কাজও করা সম্ভব। পড়ালেখার জন্য যেমন নিয়মতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম-নীতি পালন করতে হয়, তেমনি অন্য কাজে নারীকে দক্ষ হতে হলে চাই যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণের। প্রায় ২৭ বছর আগে নারীদের রান্নার কাজে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য রীমা জুলফিকার নিতান্ত শখের বশে এবং পড়শীদের অনুরোধে খুলে বসেছিলেন গৃহ সুখন নামের একটি প্রতিষ্ঠান। আজ সেই প্রতিষ্ঠান এতটাই প্রসার লাভ করেছে যে, এখান থেকে রান্নার বাইরে হস্তশিল্প, ডেকোরেশন, টেইলারিং, ফ্যাশন ডিজাইনিং ও বিউটিশিয়ান তৈরির প্রশিক্ষণের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে এবং এখান থেকেই প্রায় ৭২ হাজার নারী প্রশিক্ষণ নিয়ে সার্টিফিকেট অর্জন করেছেন। এদের মধ্যে প্রায় ৭০ জন নারী কোন না কোন কাজের সঙ্গে জড়িত। অর্ধেক নারী অধ্যুষিত এই দেশে গৃহ সুখন নারীদের স্বাবলম্বী করতে বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়ে যাচ্ছে। আর এই বটবৃক্ষের মূলে যিনি রসদ দিয়ে সজীব করে রেখেছেন তিনি রীমা জুলফিকার। কীভাবে ছোট ড্রইংরুম থেকে সামান্য পুঁজি নিয়ে তিনি যাত্রা শুরু করেছিলেন, কীভাবে ধাপে ধাপে আজ তিনি এই অবস্থানে পৌঁছলেন সেটা এবার জানা যাক।

১৯৯০ সালে প্রকৌশলী স্বামীর চাকরির সুবাদে গেলেন চট্টগ্রামে। সেখানে অখ- সময়। কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। একসময় পড়শীরা আসেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। তিনি তাঁদের নিজের হাতের তৈরি করা মজাদার সব খাবার খাওয়াতেন। সবাই তাঁর হাতের রান্না খেয়ে তৃপ্ত হতেন, করতেন প্রশংসা। জানতে চাইতেন তাঁর এই ধরনের ভাল রান্না তৈরির কৌশল। এভাবে একসময় পড়শীদের অনুরোধে শুরু করেন রান্না শেখার ক্লাস। প্রথমে আগ্রহী ১২ জন নারীকে নিয়ে ড্রইংরুমেই তাঁদের শেখাতে শুরু করলেন। অল্প দিনের তাঁর সুখ্যাতি অন্যখানে ছড়িয়ে পড়ল। রান্না শিখতে ভিড় জমালেন তাঁর কাছে। কিন্তু সেখানে তিনি প্রশিক্ষণ বেশিদিন স্থায়ী করতে পারলেন না। স্বামীর বদলির সুবাদে চলে গেলেন খুলনা। সেখানেও অনেকে আগ্রহী হলেন তাঁর কাছে রান্না শিখতে। খুলনাতেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিল রান্না শেখার ক্লাস। রান্না শেখার পাশাপাশি শুরু করলেন বিভিন্ন ধরনের সেলাই, হস্তশিল্প ও বিউটিফিকেশন তৈরির কাজ। সবচেয়ে বড় অর্জন তিনি দুই জেলার আঞ্চলিক রান্না শিখলেন দক্ষতার সঙ্গে। তিনি বিশ্বাস করতেন, নারীর কিছু কাজ আছে যা তার গৃহে সুখ শান্তি বয়ে নিয়ে আসে। তাই তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের নাম দিলেন গৃহ সুখন। আর খুলনাতেই অঙ্কুরিত হলো গৃহ সুখন নামের প্রতিষ্ঠানের।

১৯৯৪ সালে ঢাকায় এসে এর বিস্তৃতি আরও বাড়ল। নিছক ঘরে রান্নার জন্য নয়, এই রান্নার প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেকে আজ স্বাবলম্ব^ী হয়ে উঠেছেন। অনেকে রেস্টুরেন্ট ও কনফেকশনারিতে খাবার সরবরাহ করেন, কেউবা নিজেই রেস্টুরেন্ট খুলে বসেছেন। কেউ বিউটিশিয়ান হয়েছেন, কেউ ফ্যাশন ডিজাইনার। আর এভাবেই গৃহ সুখন অনেক অসহায় নারীর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে রীমা জুলফিকার বলেন, ‘যার মনের গভীরে ভালবাসার বসত আছে তাকে কেউ আটকে রাখতে পারে না। একদিন না একদিন সাফল্য আসবেই। আর কোন বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হলে চাই প্রশিক্ষণের। গৃহ সুখন তা করে আসছে ২৭ বছর ধরে।’

গৃহ সুখন ২০০৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, এনজিও বিষয়ক ব্যুরো থেকে ও ২০০২ সালে ডাইরেক্টরেট অব উইম্যান এ্যাফেয়ার্স, বাংলাদেশ সরকার কর্র্তৃক নিবন্ধনকৃত। প্রতিষ্ঠানটি ২০০৯ সালে জয়েন্টস স্টক কোম্পানিজ এ্যান্ড ফার্মস থেকে ও নিবন্ধিত হয়।

রীমা জুলফিকার জানালেন, গৃহ সুখনের ভবিষ্যত কর্মভাবনার মধ্যে রয়েছেÑ প্রশিক্ষণ কর্মসূচী, শিক্ষা কর্মসূচী, পাচার (মানুষ কেনাবেচা) প্রতিরোধ কর্মসূচী, বিধবা, যৌতুক এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কর্মসূচী, নারী অধিকার, শিশু অধিকার কর্মসূচী, স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন কর্মসূচী, পুষ্টি ও মায়ের স্বাস্থ্য কর্মসূচী, বনায়ন কর্মসূচী, পারিবারিক সহিংসতা দূরীকরণ ও প্রতিরোধ কর্মসূচী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচী ইত্যাদি বিষয়ে কর্মসূচীর পরিকল্পনা রয়েছে।

২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ৭ম সার্ক কারুপণ্য মেলায় গৃহ সুখনের স্টলে এসে প্রতিষ্ঠানটিতে কিছু সময় অতিবাহিত করেন এবং প্রশংসা করেন। সেরা মহিলা নারী উদ্যোক্তা হিসেবে ডিসিআই থেকে পুরস্কার লাভসহ নানা ধরনের পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি।

রীমা জুলফিকার বিশ্বাস করেন, মানুষের মধ্যেই বাস করে ইচ্ছা শক্তি, শৌখিনতা। একটা কাজ শুরু করলে কিছুটা করার পর মনে হয় কাজটা কি ঠিক হচ্ছে না ? কিন্তু ৭০ ভাগ কাজ শেষ করার পর মন নিজেই একটা পরিকল্পনা তৈরি করে ফেলে। আর যখন সম্পূর্ণ কাজটি শেষ হয় তখন একটা প্রশান্তি মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তারপর আত্মবিশ্বাস নিয়ে পথ পাড়ি দিতে হয়, কাজে স্বচ্ছতা থাকতে হয় তাহলে আর জীবনে কোথাও হোঁচট খেতে হয় না। এটাই হলো জীবনের স্বচ্ছতা, এটাই জীবনের বাস্তবতা। তাই কোন কাজ শুরু করার আগে মনের ভেতরে ভালবাসার বসত তৈরি করতে হবে। গৃহ সুখন এভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রীমা জুলফিকারের একাগ্রতা, ভালবাসা। পরিচালনার দক্ষতা, কাজের প্রতি একাত্মবোধের কারণে দীর্ঘদিন ধরে নানা ঘাত-প্রতিঘাত উপেক্ষা করে তিনি আজ একজন সুপ্রতিষ্ঠিত নারী। তাঁর পরিচালিত গৃহ সুখন দাঁড়িয়ে আছে বটবৃক্ষের মতো প্রশান্তির নির্মল ছায়া নিয়ে।

প্রকাশিত : ২৩ জানুয়ারী ২০১৫

২৩/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: