কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অস্কারে আবারও নাফিস লতিফুল বারী নিবিড়

প্রকাশিত : ২২ জানুয়ারী ২০১৫
অস্কারে আবারও নাফিস লতিফুল বারী নিবিড়

হলিউডের সিনেমা বিশ্বজুড়ে সমাদৃত শুধু মাত্র শিল্পীদের অভিনয়ের কল্যাণে নয়, বরং সিনেমার প্রতিটি ভাঁজে সায়েন্স ও টেকনোলজির ব্যবহারের মাধ্যমে দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখার ক্ষমতাও একটা কারণ। আর সে কাজের নেপথ্যের কারিগর যদি হয় এই বঙ্গদেশের সন্তান তাহলে তো কথাই নেই। সিনেমা দেখে নির্মল বিনোদনের পাশাপাশি গর্বে বুকটাও ফুলে যায়। সেই বিহাইন্ড দ্য সিন-এর কারিগর আর কেউ নয়, নাফিস বিন জাফর যিনি ইতোমধ্যেই ২০০৮ সালে অস্কার জিতেছেন ‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান : এ্যাট ওয়ার্ল্ডস এনড’-এর জন্য। শুধু তাই নয়, নাফিস অস্কার যুদ্ধে নামছেন ২০১৫ তেও। ‘২০১২’ ছবিতে ভিজুয়াল ইফেক্ট তৈরিতে ড্রপ ডেসট্রাকশন টুলকিটের অসামান্য ব্যবহারের জন্য নাফিস ও তাঁর সহকর্মীরা মনোনীত হয়েছেন। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি লস এ্যাঞ্জেলসে অনুষ্ঠিত হবে চলচ্চিত্র জগতের এই বৃহত্তম আসর।

জন্ম ঢাকায়। তবে সামরিক কর্মকর্তা বাবার সঙ্গে চাকরির সুবাদে ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশের নানা প্রান্তে। ১৯৮৯ সালে বাবা-মার সঙ্গে সুদূর যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান নাফিস মাত্র ১১ বছর বয়সে। চার্লটন কলেজ থেকে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং-এ গ্রাজুয়েশন করেন মাত্র ১৯ বছর বয়সে। কম্পিউটার প্রোগ্রামিং-এর নেশা ছিল সেই সময় থেকেই। বিশেষ করে নাসার প্রোগ্রামিং-এ অংশ নেয়ার পর তার উৎসাহ বেড়ে যায় অনেক খানি। গ্রাজুয়েশন শেষ করার পর তিনি যোগ দেন ‘ড্রিম ওয়ার্কস’ নামক প্রতিষ্ঠানে। আর এখানেই তিনি তৈরি করেন ফ্লুইড ডায়নামিকস যা পরবর্তীতে পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান ব্যবহার করা হয়।

শুধু তাই নয়, নিজের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং-এর বিদ্যা ও ভিজুয়াল ইফেক্ট তৈরিতে সৃজনশীলতা ব্যবহার করেছেন আরও অনেকগুলো বিশ্বনন্দিত হলিউডের ছবিতে। যেমন ‘মাদাগাস্কার ৩ ইউরোপস মোস্ট ওয়ান্টেড’, ‘পুস ইন বুটস’, ‘কুংফু পান্ডা ২’, ‘মেগামাইন্ড”, “শ্রেক ফরএভার আফটার’,‘পার্সি জ্যাকসন এ্যান্ড দ্যা অলি¤িপয়ানস : দ্যা লাইটনিং থিফ”, “ফ্ল্যাগস অব আওয়ার ফাদার’ ইত্যাদি তাদের মধ্যে অন্যতম।

হলিউডের নামকরা সিনেমার নামকরা সব পরিচালকদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা। কিভাবে সামাল দেন? নাফিসের মতে, এটা নির্ভর করে পরিচালক কিভাবে তার ছবিতে ভিজুয়াল ইফেক্ট চাচ্ছেন এবং আমার কাজের ধরন কতটা তার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে তার উপর। তবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি ইফেক্ট এনিমেশন নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করেন। পাশাপাশি ক্লাউড রেন্ডারিং ও ইমেজ প্রসেসিং নিয়েও আগ্রহের কমতি নেই যা তার কাজ করা বিভিন্ন কাজে প্রকাশ পেয়েছে।

তবে তার এই ক¤িপউটার প্রোগ্রামিং-এ আসাটাও এক মজার গল্প। আর দশজন বাবা-মার মতো তার বাবা-মাও চেয়েছিলেন ছেলে ডাক্তার হবে। সে অনুযায়ী বায়োকেমিস্ট্রি মেজর করে পড়াশোনাও শুরু হয়েছিল। কিন্তু ছেলের মন মজে থাকত প্রোগ্রামিং-এ। শুধু মজা করার জন্যই প্রথম দিকে প্রোগ্রামিং ভাষা লিখত নাফিস। ফলে বায়োকেমিস্ট্রি ক্লাসে ফাঁকি। অবশেষে ব্যাটে-বলে মেলা শুরু করল এবং ক¤িপউটার সায়েন্সে মেজর করে তার গ্রাজুয়েশন শেষ হলো। বাকিটা ইতিহাস যা বিশ্ববাসী জানেন ইতোমধ্যেই।

সমসাময়িক বাংলা চলচ্চিত্র দেখার তেমন সুযোগ না পেলেও নাফিস যখনই সুযোগ পান, উত্তম কুমারের চলচ্চিত্র দেখার চেষ্টা করেন। সেই সময়ের আবহ সঙ্গীত, সেট ডিজাইন বা সিনেমাটোগ্রাফি সব কিছুই ছিল অসাধারণ জানালেন এই গুণী গ্রাফিক্স আর্টিস্ট। আর বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি সত্যজিৎ রায় তাঁর প্রিয় বাঙালী পরিচালক। তাঁর বানানো ছবিগুলো দেখে ফেলেছিলেন সেই শৈশবেই। শুধু তাই নয়, তার বাবা সেসব ছবির ভিডিও টেপ নিয়ে গিয়েছিলেন সেই আমেরিকায়, সেখানেও নিয়মিতই গিলেছেন সত্যজিৎ রায়। তবে এ যাবত কালে তার সঙ্গে কাজ করা সেরা পরিচালকের নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন ক্লিন্ট ইস্টউডের কথা। শুধু কি তাই? তাঁর মতে জীবিত পরিচালকদের মাঝে সেই সেরা। কারণ হিসেবে বললেন, ইস্টউড তাঁর ছবিতে কি চান তা তিনি ভাল করেই জানেন। তাঁর সঙ্গে কাজ করা ‘ফ্ল্যাগস অব আওয়ার ফাদার’ ছবিতে কাজ করতে যেয়ে নাফিসের মতামত, এটি গত ১০ বছরে সবচেয়ে সেরা ছবি এমনকি তার কাজ করা ছবিগুলোর মাঝেও সেরা।

তবে সায়েন্স ও আর্টের এমন সমন্বয়ে নাফিসের পারিবারিক ভূমিকাকেও অস্বীকার করা যাবে না কোন মতেই। তার প্রো-মাতামহ বরেণ্য কবি গোলাম মোস্তফা, তাঁর নানা বাংলাদেশের প্রখ্যাত পাপেট শিল্পী মুস্তফা মনোয়ার। এছাড়াও সদ্য প্রয়াত জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থপতি মাইনুল হোসেন তাঁর মাতৃকূলের আত্মীয় । সুতরাং প্রজন্ম তো এমন সৃজনশীল পথেই হাঁটবে।

বর্তমানে নাফিস চীনের সাংহাইয়ে বসবাস করছেন। কাজ বিশ্বখ্যাত এনিমেশন প্রতিষ্ঠান ওরিয়েন্টাল ড্রিম ওয়ার্কসের রিসার্চ এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগের পরিচালক হিসেবে। বিশ্ব চলচ্চিত্রের জগতে বাঙালী এ মেধাবী আরও বেশি দাপিয়ে বেড়াবে এটাই আমাদের কামনা। জয়তু নাফিস।

প্রকাশিত : ২২ জানুয়ারী ২০১৫

২২/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: