আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ফিলিস্তিন রাষ্ট্রস্বপ্ন এখনও অধরা

প্রকাশিত : ২১ জানুয়ারী ২০১৫
  • জাফর ওয়াজেদ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

ফিলিস্তিন আর ইসরাইলের পক্ষে যুদ্ধ সংঘাত বন্ধ করে একটা সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হবে কিনা, তা নির্ভর করে মার্কিন আরবদের চাওয়া-পাওয়ার ওপর অনেকটাই। একুশ শতকের একযুগ পার হয়ে যায়, তবু উভয় গোষ্ঠী একটি সফল সমাধানের পথ পায় না । যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় সাধারণের প্রাণ যায়। ফিলিস্তিনীদের পক্ষে বিশ্ব দরবারে রাশিয়া, তুরস্ক অবস্থান নিয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৯তম অধিবেশনে ফিলিস্তিনীদের পক্ষাবলম্বন করেন। স্বাধীন রাষ্ট্রকে আবারও সমর্থন করেছেন। সম্প্রতি গাজায় ইসরাইলীরা শিশু ও নারীদের যেভাবে হত্যা করেছে তা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিলেও নেতৃস্থানীয়রা সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ নিতে তেমন আগ্রহী হয়ে ওঠেনি। বরং শেখ হাসিনা দৃঢ়তার সঙ্গে বিশ্বের বিবেকবান মানুষদের আহ্বান জানিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ২০১৪ সালে ফিলিস্তিনে সংঘটিত হত্যাকা-কে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গ্রাহ্য করছে। সে কারণে আদালতের প্রসিকিউটররা সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে। প্রথমবারের মতো গৃহীত এই আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ থেকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হতে পারে। ফিলিস্তিনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এ ব্যাপারে তদন্তের বিষয়টি আমলে নিয়েছে। ২০১৪ সালের জুনে ফিলিস্তিন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কাছে আবেদন জানিয়েছিল বিষয়টি তদন্তের জন্য। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র জোরালোভাবে আদালতের ভূমিকার সমালোচনা করেছে। ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী এতে রীতিমতো ক্ষুব্ধ হয়েছেন। ফিলিস্তিন সংঘাতের পথ বেছে নিয়েছে বলে বেনঞ্জামিন নেতানিয়াহু মন্তব্যও করেছেন। তাঁর মতে, ফিলিস্তিনীরাই যুদ্ধাপরাধ করেছে। বেসামরিক এলাকায় মিসাইল নিক্ষেপ করে। টানা ৫০ দিনের যুদ্ধকালে এসব ঘটনা ঘটে। অপরদিকে ফিলিস্তিনীদের দাবি ইসরাইলী হামলায় ২ হাজার ১শ’ জনের বেশি ফিলিস্তিনী নারী ও শিশু নিহত হয়েছেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে ফিলিস্তিন স্বাগত জানিয়েছে। তবে ইসরাইল বলছে, এতে ফিলিস্তিনীদের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধে এটি একটি উস্কানিমূলক পদক্ষেপ। প্রস্তাবিত তদন্তে ইসরাইল সহযোগিতা করবে না বরং আদালতকে ভেঙ্গে দেয়ার চেষ্টা চালাবে। এই আদালত মূলত ইসরাইলবিরোধী প্রতিষ্ঠান। এটি কপটতারই প্রতীক এবং সন্ত্রাসবাদকে উৎসাহিত করছে।

ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ এটিকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছে। গত জুন-জুলাই মাসে আন্তর্জাতিক আইনের পদ্ধতিগত ও নির্লজ্জলঙ্ঘনসহ গাজায় অন্যান্য সহিংসতার জন্য ইসরাইলকে দায়ী করে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ বলছে, বিচার থেকে রেহাই পাওয়ার সংস্কৃতির অবসান ঘটানো সর্বজনীন মূল্যবোধ সমুন্নত রাখা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং শান্তি অর্জনের লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

যুদ্ধাপরাধ তদন্ত নিয়ে নতুন করে যে তৎপরতা শুরু হয়েছে তাতে আপাতত শান্তি হলেও উভয়ের মধ্যে বিবাদের মাত্রা আরও বেড়ে যেতে পারে। কারণ অতীতে নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও একপর্যায়ে তা মুখ থুবড়ে পড়েছে।

ইতিহাস বলে, ১৯১৭ সালের ব্যালফোর ঘোষণার সময় বৃটেন মেনে নিয়েছিল যে, ওই অঞ্চলে আরবদের প্রাধান্য থাকবে এবং ইহুদীরা ইসরাইল রাষ্ট্রে তাদের সীমিত সংখ্যা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে। কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ‘ওয়ার্ল্ড জায়নিস্ট কংগ্রেস’ ঘোষণা করে যে, উদ্বাস্তু ইহুদীদের ফিলিস্তিন আসতে দিতে হবে। এরপর ইহুদীদের ক্রমাগত আগমণ বেড়ে যায়। আমেরিকা ইহুদীবাদের সমর্থক। কারণ মার্কিন নির্বাচনে ইহুদীদের ভোট প্রাপ্তি নিশ্চিত করা যেমন রয়েছে, তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা-দীক্ষা, ধনে মানে ইহুদীরা অগ্রগণ্য, বিশ্বের বড় বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান তাদের, সুতরাং তাদেরও চাই বাসস্থান। জায়নিস্টদের লক্ষ্য ‘ফিলিস্তিনেই ফিরে চলো’। সব ইহুদীই অবশ্য জায়নিস্ট নয়। যে দেশে আছে, সে দেশের সঙ্গেই মিশে যাওয়া উচিত, এমন ভাবনার শরিক যারা, তারা জায়নিস্ট নয়। ফিলিস্তিনে যে আক্রমণ-প্রতি আক্রমণ চলে আসছেÑ তার শুরুও ১৯২০-এর দশকে। ফিলিস্তিনের বিভাজন আরবরা কখনই মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু এর বিরুদ্ধে কিছু করতেও পারেনি। ব্যালফোরের ঘোষণার পর থেকেই আরব এবং ইহুদী সশস্ত্রদের চোরাগোপ্তা হামলাও চলে আসছে।

ইসরাইলের জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই মিসর নতুন রাষ্ট্রটিতে হামলা চালায়। জর্দান আর ইরাকও সাহায্য করে ফিলিস্তিনিদের। কিন্তু যুদ্ধে ইসরাইল কাবু হয়নি সেই সময়েও। জাতিসংঘের মধ্যস্থায় অবশেষে যুদ্ধ থেমেছিল। ১৯৪৯ সালে ইসরাইল জেরুজালেম অধিকার করে নেয়। যে অঞ্চলে কোন রাষ্ট্রই ছিল না ২৭ বছর আগেওÑ সেখানে সুসংগঠিত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো রাশিয়া আর যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে। তখন ইংল্যান্ডের ক্ষমতা ক্ষীয়মাণ। ইসরাইল থেকে ক্রমাগত উৎখাত হলো ফিলিস্তিনীরা। এই সময়ে মিসর ও জর্দানে সাড়ে সাত লাখ ফিলিস্তিনী উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নিল। এক পর্যায়ে উদ্বাস্তু সংখ্যা দাঁড়াল ১৪ লাখে। ১৯৬৭ সালে ৬ দিনের যুদ্ধে মিসর আক্রমণ করেছিল ইসরাইলে। সঙ্গে জর্দান ও সিরিয়া। কিন্তু রণকৌশলে তারা বিধ্বস্ত হলো। উপরন্তু পশ্চিমপাড় আর গাজা দখল করে নিল ইসরাইল। পূর্ব জেরুজালেম তাদের অধিকারে চলে গেল।

১৯৬৭ সালের পর অবশ্য সংগ্রামের চেহারা বদলে যেতে থাকে। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় রুশ-মার্কিন উভয়েই সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু ১৯৬৭ তে বিশ্ব দুই শিবিরে ভাগ হয়ে যায়। রুশ ও মার্কিন দুই পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। জোট নিরপেক্ষ দেশগুলো, এমনকি রাশিয়ারও সমর্থন ফিলিস্তিনীদের পক্ষে। কিন্তু মার্কিনের অর্থে ও অস্ত্রে সজ্জিত ইসরাইল নিজেদের শক্তি সংহত করতে থাকে ফিলিস্তিনিদের উপেক্ষা করেই। ১৯৭৩ সালে মিসর ও সিরিয়া আবার ইসরাইলে আক্রমণ চালায়। রাশিয়ার সাহায্য সত্ত্বেও সেবারও ইসরাইলকে কাবু করতে পারেনি আরবরা। বিশ্বজুড়ে অর্থনীতি বিধ্বস্ত করে দিল আরব দেশগুলো একযোগে তেল বিক্রি বন্ধ করে দিয়ে। উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ যেন ইসরাইলকে সমর্থন করা হতে বিরত থাকে। তবে উদ্দেশ্য সফল হয়নি প্রথমবারের মতো এক হওয়া আরব দেশগুলোর। হলোকাস্ট-এর গ্লানি, জার্মানিতে ইহুদী নিধনযজ্ঞের পাপবোধ আমেরিকা ও ইউরোপকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। জাতিসংঘের

মধ্যস্থতায় মধ্যপ্রাচ্যে আবার যুদ্ধবিরতি ঘটে।

ইসরাইল মনে করে, তাদের পবিত্র দেশ প্যালেস্টাইনে তাদের থাকার অধিকার রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন মেনেই তাদের রাষ্ট্রের জন্ম। কিন্তু জন্মলগ্ন থেকেই প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলো তাদের রাষ্ট্রকেই ধ্বংস করতে বদ্ধপরিকর। অতএব অস্ত্রের সাহায্যেই তাদের বেঁচে থাকতে হবে।

যুদ্ধে আরবরা সুবিধে করতে পারেনি। তাই গেরিলাযুদ্ধের কায়দায় সন্ত্রাসের সাহায্যে তারা ইসরাইলকে কাবু করতে বদ্ধপরিকর। ইসরাইলের শিশু, মেয়ে, বৃদ্ধ, বৃদ্ধারা মুহূর্তের জন্য স্বস্তিতে না থাকে, সেই পথ তারা বেছে নেয়। আরবদের চোরাগোপ্তা হামলায় ইসরাইলীরা থাকত শঙ্কিত। ইয়াসির আরাফাতের মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত যে পিএলও ফিলিস্তিনিদের শাসন করত, সে দলটি ছিল আদতে সন্ত্রাসবাদী। এদের সঙ্গে যুক্ত ছিল ‘পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন’ এবং ‘প্যালেস্টাইন লিবারেশন ফ্রন্ট’ বা পিএলও। এই দলগুলো ভেঙেচুরে পরবর্তীতে নতুন করে নিজেদের তৈরি করেছে ভিন্ন ভিন্ন আদলে। যেমন হামাস, ফাতাহ, ইসলামিক জেহাদ ও হিজবুল্লাহ। নানা গ্রুপে বিভক্তরা এক হতে পারেনি...নিজেদের মধ্যে নানা মত ও পথ তাদের।

প্রকাশিত : ২১ জানুয়ারী ২০১৫

২১/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: