মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাঙালী মুসলমানের শিক্ষা সমস্যা

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী ২০১৫
  • আবুল হুসেন

দেশের কল্যাণ বৃদ্ধি যদি শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হয়, তাহলে মোটের উপর বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতি যে কি হিন্দু কি মুসলমান কাহারও পক্ষে উপযোগী নয়, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু মুসলমানদের শিক্ষা পদ্ধতি অনেকটা ভিন্ন এবং তার ফলও ভিন্ন। এজন্য আমি এস্থলে শুধু মুসলমানের শিক্ষাসমস্যা সম্বন্ধেই বলতে চাই। এই শিক্ষা পদ্ধতির ফলে মুসলমান সমাজ যে, অনেকটা উন্নতিমুখী জাতির উপর ক্রমশ বোঝাস্বরূপ হয়ে উঠছে তা এখনই ভাল করে দেখা প্রয়োজন। বর্তমান জগতের যে যে দেশে মুসলমান আছে সেই সেই দেশে তাদের অবস্থা নিতান্ত হীন। তাদের দুরবস্থা দেশের অমুসলমান সম্প্রদায়ের উন্নতির পরিপন্থী হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেদিন আমাদের শ্রদ্ধেয় শহীদুল্লাহ সাহেবের পত্রে পড়লাম যে, ফ্রান্সের মুসলমান সম্প্রদায়ের অবস্থা বাংলার মুসলমানদের চেয়ে খুব ভাল নয়। গত বছর অধ্যাপক লিমের মুখে শুনেছিলাম চীনের কোটি কোটি মুসলমান নিতান্ত দুস্থ নিরক্ষর ও নির্Ÿোধ। এ সমস্ত কথায় আস্থা স্থাপন আমরা নাও করতে পারি। কিন্তু একথা ঠিক যে, বর্তমান জগতের জ্ঞানবৃদ্ধির জন্য কোন দেশের কোন মুসলমান উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি কিছুই করেননি। বর্তমান দর্শন, বিজ্ঞান, আর্ট ঘেঁটে দেখুনÑ মুসলমানদের সৃষ্টি কিছুই নাই বললেও বোধ হয় অত্যুক্তি হবে না। অবশ্য আমার জ্ঞানের পরিধি সীমাবদ্ধ। যদি কেউ আমাকে দেখিয়ে দিতে পারেন তবে আমি খুব বাধিত হব। কিন্তু যদি এই কথা সত্য হয়, তাহলে কি খুব লজ্জার কথা নয়। এই যে জ্ঞানের রাজ্যে মুসলমান একদিন নূতন নূতন তথ্য আবিষ্কার করে মানুষের শ্রীকল্যাণ ও জ্ঞানকে বহুমুখী করে ছড়িয়ে দিয়েছিল তারই বংশধর আজ বিপুল অন্ধকারে সমাচ্ছন্ন। এটা ভাববার কথা।

সেনসাস্ ঘেঁটে দেখি একটি হিন্দু ছেলে আট বছর বয়সে যা আয়ত্ত করে, ঠিক তাই আয়ত্ত করে একটি মুসলমান ছাত্র এগারো বছর বয়সে। কাজেই শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষত উচ্চ শিক্ষায় মুসলমান হিন্দুর কাছে হটে যেতে বাধ্য। এর কারণ মসুলমানদের ধর্মশিক্ষার জন্য উৎকট উদ্বিগ্নতা। শিশু কথা না বলতে শিখতেই দুর্বোধ্য আরবী শব্দের সঙ্গে লড়াই করতে বাধ্য হয়। হয় পিতা না হয় শিক্ষক বেত্রহস্তে সেই আরবী শব্দ কণ্ঠস্থ করতে প্রাণপণ চেষ্টা করেন। প্রতিদিন প্রাতে যখন শিশু প্রকৃতির মনোরম দৃশ্যের সহিত একটু পরিচয় করবে ঠিক সেই সময় তাকে কোরান বগলে কি কাঁধে করে মসজিদে যেতে হয়। সেখানে উস্তাদজীর সেই নিদারুণ বেত্রাঘাতের সহিত তার জীবনযুদ্ধ আরম্ভ হয়। সেই নিষ্ঠুরতার দৌরাত্ম্যের মধ্যে মসুলমান ছাত্রের ধর্মশিক্ষা আরম্ভ হয় অতি কষ্টে আরবী শব্দ কণ্ঠস্থ করতে করতে তার শিক্ষার প্রতি তীব্র ঘৃণার উদ্রেক হয়। সুকুমারমতি শিশু অনেকেই এই নিষ্পেষণের চাপে একেবারে ভেঙে পড়ে। একদিকে তাদের সম্মুখে আরবী ভাষা অন্যদিকে উস্তাদজীর তাম্বি ও বেত্রাঘাত- এই উভয় সঙ্কটের মধ্যে মুসলমান শিশুর শিক্ষা শুরু হয়। এই জবরদস্তির ফল যে বিষময় হয়েছে, সমাজপতিরা আজও তা খতিয়ে দেখছেন না। কোরান খতম করে অনেকেই শিক্ষার হাত চিরবিদায় গ্রহণ করে এবং উত্তরকালে তারাই নানাবিধ অধর্মের অনুষ্ঠান করে। কোন দার্র্শনিক বলেছেন, সড়ৎধষরঃু বহভড়ৎপবফ রং রসসড়ৎধষরঃু রহ ভধপঃ, জবরদস্তিতে ধর্ম শিক্ষা দিলে তার ফল বিপরীত ফলে। মুসলমান সমাজের মধ্যে আজ যারা নানা কু- আচারে লিপ্ত তাদের বাল্যজীবনের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, তাদের অনেককেই উস্তাদজীর একমাত্র সম্বল সেই বেত্রাঘাত খেতে হয়েছে এবং সেই বেত্রাঘাতই তাদিগকে বিপথে চালিয়েছে। শিক্ষার প্রতি তীব্র বিতৃষ্ণা যে এহেন কোরান আশুফল শিক্ষার পড়েছে তাদের কয়জন শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নতি করেছে? আর যারা সৌভাগ্যক্রমে কোরান শিক্ষার আশু ফল তা প্রমাণ করার জন্য বেশি কষ্ট পেতে হয় না। যে সমস্ত ছাত্র মসজিদে কোরান পড়েছে তাদের কয়জন শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নতি করেছে? আর যারা সৌভাগ্যক্রমে কোরান শিক্ষার পর বিদ্যালয়ে প্রবেশ করে তারা সাধারণত পরিণত বয়স্ক। কিন্তু তাদের মস্তিষ্কের শক্তি দুর্Ÿোধ্য ভাষা কণ্ঠস্থ করতে করতে যথেষ্ট পরিমাণে কাহিল হয়ে পড়ে এবং তাদের মানসিক স্ফূর্তি একেবারেই থাকে না। এমন অবস্থায় মসুলমান ছাত্র অনেকটা আধমরা হয়েই যেন শিক্ষা লাভ করতে যায়। তার নিকট হতে বেশি আশা করাই বাতুলতা। এজন্য আমাদের শিক্ষা পদ্ধতি সম্পূর্ণরূপে দায়ী।

ইংরেজী ও আরবীর যে সমন্বয়ে বর্তমান যুগের প্রয়োজন সিদ্ধ হতে পারে তেমন সমন্বয়ে চেষ্টা আজও হয় নাই। ফলে ইংরেজী আরবী দ্বন্দ্ব এখনও প্রবলরূপে বিদ্যামন থাকায় সমাজ মনের ঋজুতা ও একাগ্রতা সম্ভবপর হচ্ছে না। কিন্তু এই দ্বন্দ্ব চুকিয়ে ফেলবার জন্য কিছু চেষ্টা যে হয় নাই তা বলা যায় না। দুঃখের বিষয় সে চেষ্টায় এমন কোন শক্তিমান পুরুষের হাত পড়েনি, যাঁর জ্ঞান ও রুচি পাচ্য প্রতীচ্যের সংযোগসাধন করতে পারে এবং মুসলমানের মুক্তির জন্য যাঁর বুদ্ধি ও অনুভূতি সম্পূর্ণ সজাগ। যে চেষ্টা হয়েছে তার ফলে ১৯১২ সালে পুরাতন আরবী মাদ্রাসাগুলোর পরিবর্তে নূতন মাদ্রাসা ও মক্তব প্রতিষ্ঠিত হয়। পরিবর্তন কিছুই হয় নাইÑ পাঠ্য তালিকায় ইংরেজী ও বাংলা সংযুক্ত হয়েছে মাত্র। পুরাতন শাস্ত্র কণ্ঠস্থ করার ব্যবস্থা যেমন ছিল, তেমনি রয়েছে। ইংরেজী যুক্ত হয়েছে, কেননা তা না হলে চাকরি পাওয়া দুষ্কর। সরকারের ঘরে চাকরি জোটাতে হলে ইংরেজী জানা দরকার। কিন্তু জনসাধারণ শুধু ইংরেজী শিখতে নারাজ অথচ চাকরির জন্য উদ্বিগ্ন। এমন অবস্থায় ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টিপাত না করে কিংবা আধুনিক জগতের দাবির দিকে লক্ষ্য না করেই নব মাদ্রাসাশিক্ষা পদ্ধতি প্রবর্তিত করা হলো। তাতে পুরাতন মাদ্রাসার সমস্তই থাকল কেবল এক ফার্সির পরিবর্তে ইংরেজী ভাষা ও উর্দুর পরিবর্তে বাংলা শিখবার ব্যবস্থা করা হলো। এই পদ্ধতি মুসলমান সমাজের যে মনোপুত হয়েছে তা সরকারের কাগজপত্র হতে প্রমাণ করা যায়। মুসলমান জনসাধারণ এখন ছাত্রকে মধ্য ইংরেজী বা উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ে না পাঠিয়ে পাঠায় জুনিয়র ও সিনিয়র মাদ্রাসায়। তাদের ধারণা এক গুলিতে দুই বাঘ পড়বে-দীনও হবে দুনিয়াও হবে। ছেলেরা ইংরেজী শিখে আর কাফের হবে না। তাদের লুঙ্গি, টুপি, কুত্তা সমস্তই ঠিক থাকবে- মনের মধ্যে কোন বদখেয়াল ঢুকবে না। মাতাপিতার আর শঙ্কার কারণ থাকবে না। এমন চমৎকার শিক্ষা পদ্ধতি আর কোথায় পাওয়া যাবে? এইরূপে জনসাধরণের অন্ধ-বিশ্বাসকে এমনি করেই ব্যবহার করা হয়েছে যে গ.ঊ ও ঐ.ঊ. ঝপযড়ড়ষ হতে মুসলমান ছাত্র সংখ্যা ক্রমশ কমে যাচ্ছে।

আজ নব-মাদ্রাসায় বর্তমান জগতের দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস বা আর্টস কিছুরই স্থান নাই, অথচ যে সমস্ত শিক্ষাকেন্দ্রে এইসব বিষয়ের স্থান করা হয়েছে, সেখানে মুসলমান যাচ্ছে না। আর কিছুকাল পরে মুসলমান ছাত্রের সংখ্যা সাধারণ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিতান্ত কম হয়ে যাবে। তখন এই নব-মাদ্রাসা হতে উত্তীর্ণ ছাত্ররাও তাদের সংকীর্ণ মন, স্বল্পদৃষ্টি আড়ষ্ট বুদ্ধি নিয়ে মুসলমান সমাজকে জগতের অন্যান্য শক্তিমান জ্ঞানদীপ্ত জাতির সম্মুখে নিতান্ত হেয় বলে প্রতিপন্ন করবে। নব-মাদ্রাসা-শিক্ষা পদ্ধতি শিক্ষা ও জীবনের সঙ্গে যোগ সাধন করতে পারে নাই। এরূপ শিক্ষা মনকে মুক্তি দিতে পারে না, শক্তিও বাড়াতে পারে না। আর যদি জীবনের সঙ্গে শিক্ষা খাপ না খায়, মনকে মুক্ত করতে না পারে, সে শিক্ষা জীবনকে সরস সুন্দর করতে পারে না। যে শিক্ষা মনকে মুক্ত ও শক্তিশালী করতে পারে না সে শিক্ষা শিক্ষাই নয়।

এস্থলে শিক্ষার উদ্দেশ্য কি, এ সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ আভাস দেওয়া প্রয়োজন মনে করি। শিক্ষার উদ্দেশ্য দেশ-কাল-পাত্র ভেদে বিভিন্ন। কোন দেশে কোন কালে কোন এক ব্যক্তি শিক্ষার উদ্দেশ্য একান্ত করে চিরকালের জন্য নির্ধারিত করতে পারে না। যুগ-পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের প্রয়োজনও পরিবর্তিত হয়। সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার উদ্দেশ্য এবং সেই উদ্দেশ্য সাধনের উপায়ও পরিবর্তিত হয়। মানুষের জীবন বিবিধ উপকরণ দ্বারা পুষ্ট হয়। সেই সমস্ত উপকরণ সংগ্রহ করবার শক্তি অর্জন এবং মানুষের মস্তিষ্ক, হৃদয় ও হস্তপদার্দি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সম্পূর্ণ বিকাশ সাধনই শিক্ষার উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যে শিক্ষার আবশ্যক তাতে মানুষ আপনার শক্তি প্রখর করে জগতের রহস্য অবগত হয়, সমাজের সঙ্গে পরিচিত হয় এবং বিশ্বস্রষ্টার অপরূপ শক্তিতে আস্থাবান হয়ে তাঁর দিকে ক্রমশ আকৃষ্ট হয়। ব্যক্তি হিসেবে মানুষকে জানতে হবেÑ কি তার বর্তমান, কি তার অতীত এবং ভবিষ্যতে কি তাকে হতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে তার হৃদয় ও মনকে সম্পূর্ণরূপে বিকশিত করতে হবে। বুদ্ধি প্রখর হলে তার দৃষ্টি শক্তি বাড়ে, এবং হৃদয় সম্প্রসারিত হলে প্রেম ও অনুভূতি জাগে। যে শিক্ষা হৃদয় ও মনের চর্চায় বিঘœ ঘটায়, সে শিক্ষা জাতির পক্ষে মারাত্মক। হৃদয়, মন, ইন্দ্রিয়াদির বিকাশ সাধনের সঙ্গে ধর্মস্পৃহাকে ও জাগ্রত করতে হবে। তবেই মানুষের সুমদয় শক্তি প্রখর হবে। এইরূপে মানুষের সম্ভাবনাকে ফুটিয়ে তুলতে হবে। যে শিক্ষা দ্বারা, সে শিক্ষার চরম উদ্দেশ্য হচ্ছে সামাজিক উন্নতি ও ঐশীগুণ সাধন। এজন্য হজরত বলেছেন, ‘তাখাল্লাকু বি আখ্লাকিল্ল্াহ (খোদার গুণাবলী লাভ করতে চেষ্টা কর)। মানুষের চরম বিকাশের প্রথম পথ হচ্ছে মুক্ত বুদ্ধি (বসধহপরঢ়ধঃরড়হ ড়ভ রহঃবষষবপঃ), যাতে জগতের প্রয়োজন অনুসারে, যুগধর্মের ইঙ্গিত অনুসারে স্বীয় জীবন নিয়ন্ত্রত করা সহজ হয়। অতীতের কোন যুগ বিশেষের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে যারা বর্তমানকে অস্বীকার করেÑ তাদের বুদ্ধি মুক্ত নয়। সুতরাং তাদের শিক্ষাও অস্পূর্ণ। বর্তমান জগতে যে সমস্ত জাতি জগতের জ্ঞান ও সুখ বৃদ্ধি করতে প্রাণপণ চেষ্টা করছে তারাও একদিন অতীতের কোন ধর্মগুরুর বাণীকে চিরন্তন সত্য মনে করে সম্মোহিত হয়েছিল। জগত আপন মনে নানা আবর্তন বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলছিল। কিন্তু তাদের কোন খেয়ালই ছিল না। হঠাৎ একদিন কোন বিদ্রোহীর চরম আঘাতে জেগে উঠে দেখে- যে সত্য তারা আঁকড়ে বসে আছে সে সত্য কোন সমস্যাই তাদের সমাধান করতে পারছে না। তখন থেকে তারা সে সত্যকে পরিবর্তনশীল জগতের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ব্যস্ত হয়েছে। তা করতে গিয়ে তারা অনেক প্রাচীন সত্যকে ত্যাগও করেছে। তার কারণ তাদের বুদ্ধি মুক্ত হয়েছে। বুদ্ধি মুক্ত হলে জগত ও জীবনই যে পরম সত্য, তা বুঝতে শক্ত হয় না। তখন মানুষ আপনার সম্পদ শ্রী সমস্ত একে একে আয়ত্ত করতে সমর্থ হয়। তখনই সে সমাজের সমস্ত অভাব পূরণ করতে ও তার দাবি রক্ষা করতে পারে। সমাজ স্থির হয়ে থাকে না। জগত যেমন চলে সমাজও তেমনি চলে। আপনা হতেই সমাজ মন পরিবর্তন লাভ করে। মানুষ শিক্ষা দ্বারা বিকশিত শক্তি সমাজের উন্নতি সাধনে, ও তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিবর্তন সাধনে ব্যবহার করে। পরিবর্তনশীল সমাজের অভাব ও দাবি অনুসারে মানুষের শক্তি প্রবল হওয়া আবশ্যক। তারজন্য শিক্ষা পদ্ধতিও ক্রমশ সেই শক্তিকে প্রখর করবার জন্য পরিবর্তিত পরিবর্ধিত হওয়া ও জীবনের প্রয়োজন অনুসারে শিক্ষা-পদ্ধতি নিয়ন্ত্রিত হওয়া আবশ্যক। যুগ বিশেষের মন্ত্র ও শাস্ত্র কণ্ঠস্থ করাই শিক্ষার চরম পদ্ধতি বলে গণ্য হলে সে শিক্ষা জীবনকে সংযত সুন্দর করতে পারে না। সেরূপ শিক্ষার অধীনে যাঁরা একেবারে অপরিচিত। ফলে, দুঃখ দৈন্যই তাদের ভাগ্যে ঘটে। জীবন যা চায় সে শিক্ষা তাঁকে তা দেয় নাই। আমাদের দেশের সাধারণ শিক্ষা অনেকটা এই দোষে দুষ্ট। বিশেষত মুসলমানদের শিক্ষা-পদ্ধতি আর জীবনধারা একেবারে পৃথক।

কেউ কেউ বলেন, মাদ্রাসায় ছেলেরা অল্প খরচে লেখাপড়া শিখতে পায়। কথাটি ঠিক। কিন্তু একথা হয়ত আপনারা জানেন- ‘সস্তার তিন অবস্থা’। সস্তা জিনিস সব সময়ই আক্রা। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর অনেকেই জায়গীর থেকে পড়েন। এই জায়গীরে যাঁরা থাকেন তাঁদের জীবন অতি কঠোর। কিন্তু জায়গীর থেকে শিক্ষা লাভ করে তাঁরা যতটুকু লাভ করেন, আমার মনে হয়, তাঁরা তার দশগুণ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। জায়গীরে থেকে গৃহ প্রভুর হুকুম তামিল ও সুনজর বজায় করতে করতে শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থা যে, দিন দিন কত হীন হয়ে পড়ে তা বলাই বাহুল্য। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর দিকে দৃষ্টিপাত করলে বুঝা যায় তার জীবন কত ক্ষীণ, আকাক্সক্ষা কত দুর্বল, সাহস কত কম, মুখ কত বিশীর্ণ! সমস্ত চেহারাতে যেন তাঁর দৈন্য ফুটে পড়ছে।, জীবনের স্বাদ যেন তাঁর ফুরিয়ে গেছে। কোন বস্তুতেই যেন তার আর স্পৃহা নাই। এরূপ জীবস্পৃত হয়ে এই ঝঞ্ঝাপীড়িত সংসারে তাঁর পথ কেটে বের করতে হয়! কিন্তু সে পথ কাটতে যে শক্তির দরকার সে শক্তি অর্জন করার শিক্ষা মাদ্রাসা হতে পাওয়া যায় না।

এখানে আমি আমাদের শিক্ষা সমস্যার মাত্র একটি দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে প্রয়াস পেয়েছি। এই সমস্যার অন্যদিক যথা স্ত্রীশিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষা সম্বন্ধে আলোচনা এস্থলে করতে গেলে আপনাদের ধৈর্য হারিয়ে ফেলব। এরই মধ্যে আপনাদের ধৈর্যের অনেকখানি পরীক্ষা হয়েছে।

উপসংহারে আমি এই বলতে চাই যে, আজ আমাদের সকল দুর্গতির কারণ হচ্ছে আমাদের আড়ষ্ট বুদ্ধিÑ অন্ধ বিশ্বাস, বর্তমান জীবন সম্বন্ধে ঔদাসীন্য এবং বর্তমান জগতের জ্ঞানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কহীনতা। তার জন্য মাদ্রাসা শিক্ষা পদ্ধতি অনেকখানি দায়ী। মুসলমান সমাজের ঐক্য-সাধন বা একদিল করতে হলে আমাদের শিক্ষা-পদ্ধতি একমুখী করতে হবে- জগতের সমস্ত বিদ্যা বর্তমান জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। আজ আমাদের সকল শুভ চেষ্টা আমাদের জ্ঞান ও বুদ্ধিকে মুক্ত করতে নিয়োজিত হোক। (সংক্ষেপিত)

সূত্র : শিখা সমগ্র

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী ২০১৫

১৬/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: