কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অদৃশ্যমান অবরোধে রুদ্ধ

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী ২০১৫
  • জাফর ওয়াজেদ

জীবনের নানা স্তরে নানাভাবে নানা কারণে অবরুদ্ধ হয়ে আছে মানুষ। চলার পথ তার যে সব সময় বিপদমুক্ত তা নয়। মৃত্যু ওতপেতে থাকে হেথায় হোথায়। কোন কার্যকারণ ছাড়াই মৃত্যুকে বরণ করতে হয় নারকীয়ভাবে। সভ্যতার সঙ্কট যেখানে প্রকট, সেখানে মানুষই উল্লাসিত হতে পারে দানবীয়তায় মানুষ হত্যার ‘আনন্দ গৌরবে।’

বাঙালীর জীবনে রুদ্ধদ্বার বন্ধপ্রাণ সময় এসেছে বিভিন্ন সময়ে। কিন্তু সেসব উত্তরে জাতিটি ক্রমশ অগ্রগতির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের মাঝামাঝিতে দাঁড়িয়ে তাকে এক অদৃশ অবরোধে অবরুদ্ধ হওয়ার দৃশ্যপটে অবস্থান করতে হচ্ছে। বিষয়টা কেবল রাজনীতের নয়। বাঙালীর শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজ, অর্থনীতিরও। একটা ‘সোনার বাংলা’র স্বপ্ন বুকে নিয়ে ১৯৭১ সালে যে দেশের ছাত্র, যুবক, কৃষক, শ্রমিক, পেশাজীবী, পুলিশ, বিডিআর, সেনাবাহিনী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হানাদারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, সে জাতিকে পরাজিত শক্তি দিনের পর দিন অবরুদ্ধ করে রাখবেÑ এমন চিত্রকল্প বাস্তবে রূপলাভ করবে, ভাবনার বাইরে জাতির। বিষয়টিকে জাতির অগ্রসর অংশ যতই উপেক্ষা করুক, অবস্থাটা ‘তোমাকে বধিবে যে গোকুলে বাড়ছে সে’ যেন। মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশ নামক দেশ তথা রাষ্ট্রটি টিকবে কি টিকবে না, কিংবা পাকিস্তানী চেতনাধারায় সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত হবে কি হবে নাÑ এমন স্থানে নিয়ে যাওয়ার একটা আয়োজন এই দেশেই পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। যে পথ পরাজিত শক্তি বেছে নিয়েছে, সে পথ একাত্তরে স্তব্ধ হয়ে যে পুুরোপুরি যায়নিÑ তাকেই স্পষ্ট করে তোলে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী অস্ত্রের মুখে বাংলাদেশকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। অবরুদ্ধ দেশে তারা ব্যাপক গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ চালিয়েছিল। তাদের এ সব কাজে সহযোগিতাকারী সশস্ত্র সংগঠনগুলোর খুনীরা আবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে শুধু নয়, রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদারিত্ব পেয়েছে। সেই তারা এবং তাদের পুনর্বাসনকারী দলটি মিলেমিশে একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ শুধু নয়, দেশটিকে ‘পূর্ব পাকিস্তানে’ রূপান্তরিত করার লক্ষ্যেই দেশবাসী অবরোধ নামক ভয়াল কর্মসূচী ঘোষণা বহাল রেখেছেন। অনির্দিষ্টকালের এই অবরোধে ‘উলুখাগড়াদের’ প্রাণ যাচ্ছে। নাট্যজন সেলিম আল দীন বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রের দেহ আছে। মনুষ্যদিগেরও আছে। কিন্তু রাষ্ট্রের দেহ ছেদবিচ্ছেদে নিত্যই পূর্ণ। যেমন ছোটকালে পারদ দেখিয়াছিলাম, আধুলির সমান। তাহা কুচপাতায় রাখিলে অখ- আবার কচুপাতা হইতে ঝরিয়ে পড়িলে অনিতিবিলম্বে বহুসংখ্যক রূপালী বিন্দুতে পরিণত হইয়া বিচ্ছিন্নভাবে সম্পূর্ণতা লাভ করে। রাষ্ট্র সেইরূপ।’ এই রাষ্ট্রকে ধংস করার জন্য উদগ্রীব কারা হতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাব তো সকলেরই জানা। যারা রাষ্ট্রটি স্বাধীন হওয়ার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে হানাদার সহযোগী হয়ে স্বজাতিকে হত্যা করেছিল, যারা সে জন্য আজও অনুতপ্ত নয়। যারা এ দেশটির স্বাধীনতার আস্থা রাখা দূরে থাক বরং বিরোধিতা করে মানুষ খুনের উৎসবে নেমেছিল। সেই তারাই আজ শকুনের বেশে নেমেছে পাকিস্তানীমনাদের সঙ্গে নিয়ে। উদ্দেশ্যও জানা সহজÑ ঘোলা জলে মৎস্য শিকারের জন্য। অর্থাৎ কারাগারে অবরুদ্ধ সাজাপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন যুদ্ধপরাধীদের মুক্ত করা। আর অপরজনের উদ্দেশ্য মাতা-পুত্রকে দুর্নীতির মামলা থেকে মুক্ত করা। তাদের এ সব কুকর্মকে যে যেভাবেই মূল্যায়ন করুক বাস্তবতা হচ্ছে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে নিজেদের তা থেকে রক্ষা করা। এরা এ সব করছে রাজনীতির নামে। যে রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক নেই জনগণের।

আগে অস্ত্র থাকত সিপাই-সান্ত্রীর হাতে বিপদেআপদে তারা দুর্বল ও অসহায়কে রক্ষা করত। সেক্ষেত্রে অস্ত্র ছিল বীরের অঙ্গ-ভূষণ। মধ্যযুগে বিপন্নের উদ্ধারকারী বীরপুরুষেরা নাইট উপাধিতে ভূষিতে হতেন। সমগ্র সমাজ তাদের সন্ত্রাসের চোখে দেখত। যথার্থ শাস্ত্র ধর্ম তারাই পালন করেছেন। সেই বীরের অস্ত্র যখন রাম-শ্যামা সকলের হাতে এসে জোটে তখন দেশসুদ্ধ লোক কাপুরুষে অর্থাৎ গুপ্তঘাতকে পরিণত হয়। তারা নিরস্ত্র মানুষকে; ঘুমন্ত মানুষকে, স্ত্রী-পুরুষ নির্বিচারে হত্যা করে। আজকের এই পতিত সময়ে এ সব গুপ্তঘাতরাই রাজনীতির হিরো হিসেবে গণ্য। সরকারও এদের মূল্য দিচ্ছে।

জনগণের মঙ্গল কল্যাণ সাধন যাদের কাজ, সেই রাজনীতিকরা হয়ে ওঠেছে সমাস্ত্র। তারা চায় মানুষ সন্ত্রাস অবস্থায় থাকবে আর তাদের সমস্ত অপকর্মকে মান্য করবে। গুপ্ত পথে যে অস্ত্র আসে সে অস্ত্রের ব্যবহার গুপ্ত ঘাতকের হাতে। রাজনীতিকরা কখনও এতখানি মারমুখী স্বভাবের ছিল বলে তো মনে হয় না। তাদের কাছে রাজনীতি বলতে বুঝে রেখেছেন রাজপথে আন্দোলন। রাজনীতির যে একটা গঠনমূলক ভূমিকা রয়েছে সে কথা তারা কখনও ভেবে দেখেন না। তাদের আচরণে দেশের প্রতি বিন্দুমাত্র মমতা প্রকাশ পায় না; মায়া-মমতা তো দূরের কথা, চূড়ান্ত নির্মমতার ব্যাপার ঘটেছে। এক সময় শোনা যেত দেশের ধূলিকণাটিও আমার কাছে পবিত্র; মূল্যবান বস্তু। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে দেশের কোন জিনিসেরই কানাকড়ি মূল্য নেই। বাস, রেলের কামরা জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে রেললাইন উপড়ে ফেলে এই দরিদ্র দেশের শত শত কোটি টাকার সম্পত্তি বিনষ্ট করা হয়েছে। তাহলে এ বিরোধিতা কার সঙ্গে? দেশের সঙ্গে? দেশই শত্রু? দুঃখের কথা যে, এই ‘অপজিশন পলিটিক্স’ বিন্দুমাত্র ‘ডি গনিটি’র পরিচয় দিচ্ছে না, অপজিশনকেও হতে হয় নিয়মতান্ত্রিক। দায়িত্বজ্ঞানহীন হলে চলে না। আমাদের অপজিশনের দায়দায়িত্ব জ্ঞানকে আদৌ প্রখর বলা চলে না। আমরা অপজিশন বলতে বুঝি উচ্ছৃঙ্খলার প্রশ্রয়, বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি। যদৃচ্ছ ব্যবহারই নিয়মে দাঁড়িয়েছে। ডিসিপ্লিন নামক জিনিসটা রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণরূপে বিদায় নিয়েছে। এর অভাবে রাজনীতির বাঁধনগুলো আলগা হয়ে গিয়েছে। আমাদের বিরোধী রাজনীতি শুধুই শত্রুতার চর্চা করছে, মিত্রতার চর্চা কখনো করেনি।

দেশে বর্তমান অবরোধ নামক এক ভয়ের সংস্কৃতি চালু করা হচ্ছে। দেশের জীবনে রাজনৈতিক দলসমূহের ভূমিকা যদি ঘাতকের হয়, তবে স্থিতিশীলতা থাকে না। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট যে ঘাতকদের উত্থান, তাদের উত্তরাধীরা রাজনীতি ও সমাজ জীবনে অশান্তি বাড়িয়ে তুলছে। দেশে যা হচ্ছে তা রাজনীতি নয়। নিছক দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মারামারি, হানাহানি খুনোখুনিকে কেউ সম্মানের চোখে দেখে না। বোমা মেরে গুলি ছুড়ে নির্বিচারে গুপ্তহত্যা কাপুরুষতার চূড়ান্ত। এর মধ্যে বীরত্বের লেশমাত্র নেই। বিরোধী রাজনীতিকরা যতদিন বোমাবাজি এবং খুনখারাবিতে লিপ্ত থাকবে, ততদিন তাদের কেউ সম্মানের আসন দেবে না, নিছক বিরোধিতার জন্য। বিরোধিতায় নিজেদের শক্তিক্ষয়, দেশের সম্পত্তি ক্ষয় হয়। কথায় কথায় হরতাল, অবরোধ, কত মানুষের কত রকমের ক্ষতি। এক দিনের হরতালে এই গরিব দেশের কোটি কোটি টাকার লোকসান, এর মধ্যে নেতৃত্বের কৃতিত্ব নেই বিন্দুমাত্র। কিন্তু হৃদয়হীনতার প্রকাশ রয়েছে পর্যাপ্ত। এ সব হরতাল, অবরোধ আমাদের রাজনৈতিক অভিধান থেকে এ মুহূর্তে তুলে দেয়া উচিত। কারণ এ সবই নেতানেত্রীদের রাজনৈতিক থেকে ক্রমশ সন্ত্রাসের নেতানেত্রীতে পরিণত করেছে, যা শুভ নয়। আতঙ্কের নেত্রী যদি জনকল্যাণের কথা না বলেÑ সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু জনগণ আতঙ্কমুক্ত জীবন চায়।

একুশ শতক মানেই ডিজিটাল যুগ। এ যুগে পরাজিত শক্তিরা মাথা তুলে দাঁড়াবেÑ এমন দৃশ্যপট মুছে ফেলতে হবে। পাকিস্তানী ধারায় একাত্তরের মতো দেশকে অবরুদ্ধ করে যারা ধ্বংসের গর্জন হানছে, তারা গণরোষে পতিত হবেই।

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী ২০১৫

১৬/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: