কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ফিলিস্তিন রাষ্ট্রস্বপ্ন এখনও অধরা

প্রকাশিত : ১৪ জানুয়ারী ২০১৫

‘জাতিসংঘ আমাকে নেবে না, মৃত্যু আমাকে নেবে’Ñ সেই কবে ১৯৭৪ সালে লিখেছিলেন বাঙলা ভাষার কবি আবুল হাসান। আর এই বাক্য যেন সত্যিতে পরিণত ফিলিস্তিনীদের জন্য। কবে শেষ হবে তাদের নিরন্তর প্রাণহানি আর যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা...জানে না কেউ। জাতিসংঘও নয়। জাতিসংঘের অনুমোদনেই জন্ম নিয়েছিল ইসরাইল নামক রাষ্ট্র সেই ১৯৪৮ সালে, এবং তা ফিলিস্তিনেরই একটি অংশে। যার জনসংখ্যা বিশ শতকের শেষে দাঁড়৭ায় ৬০ লাখ। অথচ ফিলিস্তিনে আরবদের কোন রাষ্ট্র তৈরি হয়নি। যুদ্ধবিগ্রহ, হানাহানি, সন্ত্রাস সবই জুড়ে আছে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে। বর্তমানে তা গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে।

জাতিসংঘের গত সাধারণ পরিষদের ৬৯তম অধিবেশনে ফিলিস্তিনী রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস তার ভাষণে ফিলিস্তিনী রাষ্ট্র গঠনে নতুন করে প্রস্তাব রাখেন । সেই সঙ্গে ফিলিস্তিন হতে ১৯৬৭ সালে দখল করা ইসরাইলীদের সরিয়ে নেয়ার প্রস্তাবও করেছেন। যাতে তিন বছরের মধ্যে তারা অধিকৃত এলাকা হতে সরে যায়। ফিলিস্তিন আশা করে আরব রাষ্ট্রগুলো তাদের সমর্থন করবে। কিন্তু বাস্তবে তা কতটা করবেÑ সেটা এখন দেখার বিষয়। কারণ অতীতের দিকে তাকালে স্পষ্ট হয়, দু’পক্ষের মধ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বহু দেনদরবার, বহু আলোচনা হয়েছেÑ মধ্যস্থতায় পরাশক্তি থাকলেও সবই বৃথায় পর্যবসিত হয়েছে শেষাবধি। ফিলিস্তিনীরাও সন্ত্রাসবাদকে উস্কে দিয়েছে নানা সময়ে।

বাইশ বছর আগের একটি দৃশ্য এখনও চোখে ভাসে বিশ্ববাসীর সেই সময়েরজনদের। টিভি পর্দায় এক মহামিলনের দৃশ্যকাব্য বা দৃশ্যনাট্য অভিনীত হচ্ছিল। অভূতপূর্ব এই দৃশ্যপটটি মানুষের মনে আশাবাদ জুড়ে দিয়েছিল যে, বিবদমান গোষ্ঠীগুলো হত্যাযজ্ঞ ও যুদ্ধ বন্ধ করে শান্তি এবং স্বস্তির ভুবন গড়ে তুলবে। শান্তির পথে বিবদমান দুটি হাত করমর্দনে প্রস্ফুটিত করেছিল যেন নানা বর্ণের হৈমন্তী ফুল ক্রিসেনথিমাম। হোয়াইট হাউসের দখিনের সবুজ লনে আজন্ম শত্রু দুই জাতির দুই নেতা হাতে হাত মেলালেন যখন, তখন সারা বিশ্ব গেয়ে ওঠেছিল যেন, ‘আর নয় যুদ্ধ, আনো তবে শান্তি।’ কিন্তু শান্তি আর আসে না। করমর্দনকারির হাত রক্তাক্ত হতে বেশি সময় নেয়নি। আর তার ধারাবাহিকতায় গাজায় চলছে হত্যাযজ্ঞ, ধ্বংস, নিপীড়ন। যা বর্বরতাকেও হার মানায়। হোয়াইট হাউসের সবুজ লনে দীর্ঘ সংগ্রামের বিপরীতে শান্তির আবাহনে দুই পরস্পর শত্রু, আজন্ম দুশমন। ১৯৯৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর বিশ্ববাসী ‘লাইভ’ অবলোকন করেছে দৃশ্যটি। দুই জাতির দুই নেতা...হাতে হাত। মাঝখানে দাঁড়িয়ে মহাশক্তিধর দেশের রাষ্ট্রপ্রধান। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী আইজাক রবিন ও ফিলিস্তিনী নেতা ইয়াসির আরাফাত দু’পাশে দাঁড়ানো। মাঝে বিল ক্লিনটন। সেদিন বিশ্ববাসীর মনে তাঁরা জ্বালিয়েছিলেন আশার আলো। সংঘর্ষ, সহিংসতা, রক্তপাত দূরীভূত হবে। আরব ভূমিতে শান্তির পতাকা উড়বে। করমর্দন ও শান্তি চুক্তি একটি বিশাল মাইলফলক হিসেবে প্রতিভাত হয়েছিল। এই অসাধারণ অর্জনের জন্য পরের বছর ১৯৯৪ তে দুই নেতা শান্তিতে পেলেন নোবেল পুরস্কার। আর ‘টাইম’ ম্যাগাজিনের ৮৫ বছরের সেরা রিপোর্টের তালিকায় স্থান পেল ঘটনাটি। কিন্তু সবই হাতোস্মি! কোথাও কোন শান্তি আসেনি। চুক্তিপত্র কাগজেই স্থিত হয়ে পড়ে থাকে। শান্তি চুক্তি বা নোবেল পুরস্কারÑ কোনটাই বিবদমান দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে ন্যূনতম প্রভাব ফেলেনি। ‘উপরে চুক্তি, ভেতরে অন্তর্ঘাত’...বিষয়টা তাই দাঁড়ায়। শান্তির এই রোডম্যাপ অচিরেই মুছে গেল। ২০০৫ সালের মধ্যে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চুক্তি কাগজেই লিপিবদ্ধ হয়ে থাকল। বিবদমান ফিলিস্তিনী ও ইসরাইলীদের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষ দীর্ঘদিনের। আরব রাষ্ট্রগুলো ফিলিস্তিনীদের মুক্তিসংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ নয়। প্রথম মহাযুদ্ধের পর ফিলিস্তিন প্রশ্ন সামনে আসে। অটোমান তুর্কীদের হাত থেকে অঞ্চলটি আসে ব্রিটিশ শাসনে। অধিবাসীদের ৬ লাখ তখন আরব আর ইহুদী ৮০ হাজার। এই ইহুদী সংখ্যাটা আরবরা মনে করত অত্যন্ত বেশি। কিন্তু ২য় মহাযুদ্ধে জার্মান নাৎসীদের বীভৎস অত্যাচারে ইউরোপের ইহুদীদের ছিন্নমূল হয়ে উদ্বাস্তু জীবনযাপনকারীদের জন্য তাই প্রয়োজন দেখা দেয় একটি রাষ্ট্রের। ১৯১৭সালে ’ব্যালফোর’ সাহেবের ঘোষণায় ফিলিস্তিনে ইহুদীদের বাসস্থান নির্ধারিত হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল, ফিলিস্তিনে আরবদের সামাজিক আর ধর্মীয় অধিকার রক্ষিত হবে।

১৯৪৮ সালে ভূমধ্যসাগরের পাড়ে নতুন রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠে জাতিসংঘের অনুমতিতে ইসরাইল নামক ইহুদী বসতি। লেবানন, সিরিয়া, জর্দান, মিসর, ইসরাইলের তিনপাশে মুসলিম রাষ্ট্র। জর্দান নদীর পশ্চিম তীর আর গাজা ভূ-খ- নিয়ে জেরুজালেমকে রাজধানী করে ফিলিস্তিন বা প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র গড়ার জন্য ১৯৬৪ সালে গঠিত হয় প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন বা পিএলও। ১৯৭৪ সালে পিএলও জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক হিসেবে স্বীকৃত হয়। ইসরাইলের বাইরে যে ফিলিস্তিন, তা এক সময় শাসন করতেন পিএলও নেতা ইয়াসির আরাফাত, মৃত্যুর পূর্ব সময় পর্যন্ত।

ইসরাইল জেরুজালেমকে ভাগ করে ১৯৯৯ সালে। পুরনো জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনীদের রাজধানী করতে দিতে তারা রাজি নয়। কিন্তু পিএলও ‘অযৌক্তিক’ এই প্রস্তাবে আগ্রহী হয়নি। পিএলও শাসিত অঞ্চলে তখন অধিবাসী সংখ্যা ৩২ লাখ। পিএলও যখন ১৯৮৮ সালে স্বাধীন ফিলিস্তিন জন্মের কথা ঘোষণা করে, বাংলাদেশসহ ১৮টি দেশ সঙ্গে সঙ্গে তাকে স্বীকৃতি দেয়। ইসরাইল অবশ্য তা দেয়নি। বরং বিরোধিতা করে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে ইসরাইল যে স্বীকৃতি দেয়, সেটা পশ্চিম তীর আর গাজায় সীমিত স্বাধিকারের। ১৯৬৬ সাল হতে আরাফাত ছিলেন মত্যুর পূর্ব পর্যন্ত জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়া নেতা হতে প্রেসিডেন্ট। দু’দুটো পার্লামেন্ট চালিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী পদেও তখন দু’দফা রদবদল ঘটেছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসার মতো হলেও ফিলিস্তিনী উগ্র সংগঠন হামাস বিরোধিতা শুরু করে আরাফাতেরও। তারা প্রায়শই ইসরাইল এবং পিএলও’র সঙ্গে সংঘাতে যেত তখনও। (চলবে)

প্রকাশিত : ১৪ জানুয়ারী ২০১৫

১৪/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: