মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

শাওইলের কম্বল হাট

প্রকাশিত : ৪ জানুয়ারী ২০১৫
  • এসএম মুকুল

আদিকাল থেকে তাঁতশিল্প মিটিয়েছে এদেশের মানুষের প্রয়োজন। যান্ত্রিকপ্রযুক্তি এসে তাঁতশিল্পের জায়গা দখল করলেও শিল্পটি ঠিকই তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে নিজস্বতায়। বাংলাদেশের তাঁতশিল্পের ঐতিহ্য রক্ষায় বগুড়ার শাওইল ও তার আশপাশের অঞ্চল ভূমিকা অনন্য। বগুড়া শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার পশ্চিমে আদমদীঘি উপজেলার নশরতপুর ইউনিয়নের ছোট একটি গ্রামের নাম শাওইল। বাংলাদেশের তাঁতশিল্পের ইতিহাসে শীতবস্ত্র তৈরিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে এই শাওইল গ্রাম। ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে আছেন শাওইল গ্রামের আশপাশের গ্রামের তাঁতশিল্পীরাও। জানা যায়, প্রায় ১৫০ বছর আগ থেকেই তাঁতি শ্রেণী মানুষের বসবাস শুরু হয় এখানে।

আশপাশের প্রায় ৭৫টি গ্রামের এ পেশাকে কেন্দ্র করে শাওইল গ্রামে এক ভিন্নধর্মী হাট গড়ে ওঠে। যার মূল শীতের চাদর কম্বল উলের (উলেন) সুতা কেনাবেচা। ব্যতিক্রম এই হাটের প্রাচীন আভিজাত্য আর জনপ্রিয়তা যেন গ্রামের নামটিকেও পাল্টে দিয়েছে ‘চাদর কম্বল হাটের গ্রাম’। শাওইল ছাড়াও দত্তবাড়িয়া, মঙ্গলপুর, ধামাইল, ঘোড়াদহ, মুরাদপুর, ছাতিয়ানগ্রাম, লইকুল, ছাতনী, দেলিঞ্জাসহ আশপাশের গ্রামগুলোর চিত্র একই। গ্রামগুলোতে তাঁতশিল্পকে ঘিরে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছে। আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে তাদের নীরব অবদান অনেকেরই হয়ত অজানা। কম্বলকেন্দ্রিক এই শিল্প বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে।

তাঁতের খটখট শব্দে মুখরিত গ্রামের পরিবেশ আর নারী-পুরুষসহ নানা পেশার মানুষের কর্মব্যস্ততায় মনোমুগ্ধকর পরিবেশ দেখে মন ভরে যাবে। গ্রামীণ অর্থনীতির অগ্রগতির নজির হতে পারে এই এলাকাটি। প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় ও ঘরে বসানো পরিপাটি তাঁত যন্ত্র অবিরত চলছে দিন-রাত। শীত শুরুর আগেই শাওইলসহ আশপাশের তাঁতিরা শুরু করে কম্বল তৈরির কাজ। এখানকার চাদরগুলো উন্নতমানের হওয়ায় এর ব্যাপক চাহিদা। চাহিদা মিটিয়ে শাওইল গ্রামের চাদরগুলো পৃথিবীর নানা দেশেও রফতানি হচ্ছে।

শাওইল গ্রামের অধিকাংশ মানুষের মূল পেশা তাঁত শিল্পকে ঘিরে। কোন ধরনের প্রচার ও সরকারী-বেসরকারী সাহায্য সহযোগিতা ছাড়াই এখানে গড়ে উঠেছে বিশাল এ কর্মক্ষেত্র। কারও রয়েছে নিজের তাঁত আবার কেউ শ্রম দিচ্ছে অন্যের তাঁতে। আশপাশের ৭৫ গ্রামের প্রায় ৭ হাজারেরও বেশি তাঁতি পরিবার আছে। শাওইলের প্রত্যেক বাড়ির নারীরা বাড়িতে সোয়েটার থেকে সুতা খুলে রং ও চরকায় দিয়ে ববিন করার কাজ করে। আর পুরুষ সদস্যরা চরকা দিয়ে কম্বল ও চাদর বুননের পর তা বাজারজাত করার কাজ করে। একটি কম্বল বুনতে প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগে। আর সুতা লাগে ১২ ববিন। একটি পরিবারের সদস্যরা মিলে দিনে ১২-১৫টি কম্বল তৈরি করতে পারে। শীত শুরুর আগেই শাওইলসহ আশপাশের তাঁতিরা শুরু করে কম্বল তৈরির কাজ। তবে বছরজুড়ে চলে তাঁত বোনা ও সুতার তৈরি বড় চাদর, বড় কম্বল, বিছানার চাদর, লেডিস চাদর, সিঙ্গেল কম্বল, লুঙ্গি, গামছা, তোয়ালেসহ নানা ধরনের শীতবস্ত্র ও পোশাক। বিভিন্ন গার্মেন্টসের সোয়েটারের সুতা প্রক্রিয়া করে তাঁতে তৈরি হয় কম্বল, চাদরসহ আনুষঙ্গিক পণ্য। ব্যবসায়ী সূত্রে জানা গেছে, শাওইল হাটে ছোটবড় মিলে প্রায় এক থেকে দেড় হাজার দোকান রয়েছে। চাদর তৈরির পাশাপাশি এখানে গড়ে উঠেছে শীতবস্ত্র তৈরির মেশিন, সুতা, রং, তাঁতের চরকা, তাঁত মেশিনের সরঞ্জাম ও লাটায়ের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। গড়ে উঠেছে তাঁতিদের সংগঠনÑ নশরতপুর ইউনিয়ন তন্তুবায় সমবায় সমিতি এই সুবিশাল কর্মক্ষেত্রে প্রতিনিয়তই তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন কারিগর। তৈরি হচ্ছে নতুন, আধুনিক ডিজাইনের কম্বল ও অন্যান্য বস্ত্র।

বছরের পিক সিজনের ৪ মাস অর্থাৎ শীতের ৩ মাস আর শীত শুরুর আগের ১ মাস হাটের ছোটবড় প্রায় ১ হাজার থেকে দেড় হাজার দোকান মিলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ কোটি টাকা লেনদেন হয়। আর অফসিজনের ৮ মাসে গড়ে প্রতিদিন অন্তত দেড় কোটি টাকার লেনদেন হয়। এ হিসেবে বছরে প্রায় গড়ে ৯৫০ কোটি টাকার লেনদেন হয়। বাজারের আশপাশে গড়ে উঠেছে ছোটবড় অনেক দোকান। দোকানগুলোয় বেচাকেনায় নিয়োজিত আছেন অন্তত ৮ হাজার শ্রমিক।

শাওইলের চাদর আর কম্বলের গ্রামকে ঘিরে হাজারো সম্ভাবনা থাকলেও তা সম্ভাবনার খাত হিসেবে কেউ দেখা হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয় তাঁতি ও ব্যবসায়ীদের। অনেকের অভিমত, তাঁতিদের মধ্যে সরকারি সুবিধা বাড়ালে রফতানির ক্ষেত্রে এই গ্রামটি হতে পারত উৎপাদন আর গ্রামীণ সচল তাঁতশিল্পের অনন্য দৃষ্টান্ত । কে ভাববে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পে সম্ভাবনা নিয়ে। সরকার চাইলে শিল্পটি ফিরে পেতে পারে শত বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রাণসঞ্চারণ। ছড়িয়ে পড়তে পারে শাওইল গ্রামের তাঁত মডেল। গ্রামীণ অর্থনীতিতে জাগরণ সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু যোগাযোগ অবকাঠামো ও নিরাপত্তাহীনতা অন্যতম প্রতিবন্ধক হয়ে আছে। আদমদীঘি থেকে এ বাজারের দূরত্ব প্রায় ১১ কিলোমিটার আর সান্তাহার থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার। এ দূরত্বের ছোট রাস্তার মোড় রয়েছে ৩৭টি আর রাস্তাজুড়ে রয়েছে খানা-খন্দক। এ কারণে ট্রাকের মালামাল বহনে অনেক অসুবিধা হয়। শাওইল গ্রামে একটিও ব্যাংক নেই। টাকা লেনদেনের জন্য আসতে হয় সান্তাহারে। ব্যবসাকেন্দ্রিক এ জায়গায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য যেমন একটি পুলিশ ফাঁড়ির বিশেষ প্রয়োজন ঠিক তেমনি লেনদেনের সুষ্ঠুতা বজায় রাখার জন্য একটি ব্যাংকও দরকার।

এ অঞ্চলের অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল রাখতে সরকারীভাবে সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও নিরাপত্তার বিধান করলে সরকারও এখান থেকে প্রতিদিন রাজস্ব আয় করতে পারবে। তাছাড়া তাঁতশিল্পদের পর্যাপ্ত মুলধনের যোগান, সুষ্ঠুভাবে বাজারজাতকরণের সুযোগ এবং ঠিকমতো কাঁচামাল সরবরাহ করলে জনপ্রিয় আর গৌরবময় এ তাঁতশিল্পকে টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ তড়িত ব্যবস্থা নিবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

এসএম মুকুল, উন্নয়ন গবেষক ও কলাম লেখক

প্রকাশিত : ৪ জানুয়ারী ২০১৫

০৪/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: