মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

এখ্লাস ভাইকে যেভাবে দেখেছি

প্রকাশিত : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪
এখ্লাস ভাইকে যেভাবে দেখেছি
  • আখতার হুসেন

সালটার কথা মনে আছে। ছেষট্টি। ছেষট্টির মাঝামাঝি সময় সেটা। মাসসাতেক হলো ঢাকায় এসেছি। সব কিছু ভাল করে চেনা হয়ে ওঠেনি তখনও। সব কিছু এগুচ্ছে ধীরে ধীরে। যে চাকরির সন্ধানে ঢাকায় আসা, সেই চাকরিই আমার সঙ্গে রীতিমতো লুকোচুরি খেলা খেলছে তখন। এই হচ্ছি হবো করেও হচ্ছে না। এ রকমই অবস্থায় একদিন ঢাকা শহরের তখনকার সেই বিখ্যাত চারজনের জুটির সঙ্গে দেখা রামকৃষ্ণ মিশন রোডের ত্রিমোহনায়। ঢাকা শহরে তখন এত বাস-গাড়িটারি ছিল না। পথের পাশে দাঁড়িয়ে নিশ্চিন্তে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপ করা যেত। সেদিনও তাই চলছিল সেই বিখ্যাত চারজনের জুটির মধ্যে। তবে তিন বিখ্যাতকে তো চেনা গেলÑশিল্পী হাশেম খান, রফিকুন নবী আর শাহাদাত চৌধুরী; তাঁদের মধ্যে ফর্সা- উঁচু-লম্বা এবং স্বাস্থ্যবান মানুষটি কে? নিজেদের মধ্যে কী নিয়ে যেন তাঁরা তুমুল হাসাহাসি করছিলেন। আমি তাঁদের অদূর দিয়ে যাওয়ার সময় ধরা পড়ে যাই। নবীভাই কি হাশেম খান ভাই আমাকে দেখেই ডেকে ওঠেন, ‘এই আখতার, কোথায় যাও?’ সময়টা বিকেল। রোদের ঝাঁঝ কমে এসেছিল। তবুও আমি ঘামছিলাম। অতদূর থেকে হেঁটে আসার কারণে। বাংলাবাজার থেকে হেঁটে তোপখানা রোডের দিকে যাব। তাঁদের চারজনের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলি, ‘ভাল আছেন তো আপনারা?’

তাঁরা পাল্টা জিগ্যেস করেন, ‘তুমি কেমন আছো?’

আমি জবাব দেবার আগেই এখ্লাস ভাই জিগ্যেস করেন, ‘কোন্ আখতারের সঙ্গে কথা বলছ তোমরা?’

নবী ভাই বলেন, ‘ছড়াকার আখতার।’

এখ্লাস ভাই এবার প্রায় হা-হা করে ওঠেন। বলেন, ‘আরে, তোমাকেই তো আমি খুঁজছিলাম।

আমি এখ্লাস ভাইয়ের সৌম্যদর্শন মুখের দিকে তাকাই। এবার এখ্লাস ভাই নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘আমি এখ্লাস উদ্দিন আহ্মদ। ‘টাপুর-টুপুর’র সম্পাদক। গত সংখ্যায় তোমার একটা লেখা ছাপা হয়েছে। তার পারিশ্রমিক দেয়ার জন্য তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি আমি।

আমার তখন খুব টানাটানি চলছিল। পুরো বেকার দশা। আমি এবার ভাল করে তাকাই এখ্লাস ভাইয়ের মুখের দিকে। পলক না ফেলে চেয়েই থাকতে ইচ্ছে করে। এখ্লাস ভাই এবার অন্য তিনজনের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘ঠিক আছে হাশেম, নবী, শাহাদাতÑআজকে এ পর্যন্তই। কালকে আবার দেখা হবে।’ কথাটা বলেই একটা রিকশা ডাকেন। রিকশা ভাড়া করে বলেন, ‘চলো আজিমপুর কলোনি।’ রিকশায় যেতে যেতে আমাদের মধ্যে কথা চলতে থাকে। এখ্লাস ভাই জিগ্যেস করেন, ‘কদ্দিন হলো ঢাকায়?’ জানাতেই বলেন, ‘এই এতদিনেও তোমার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি?’ আমি যে চাকরির ধান্ধায় ব্যস্ত, ঘুম হারাম, সে কথা বলতেই বলেন, জানো ‘ছড়ায় ছড়ায় ছন্দে’ তোমার আর মাহমুদ উল্লাহর লেখা নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ঠিকানা না পাওয়াতেই তোমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে উঠতে পারিনি। এখন থাকো কোথায়? জানাই, কখনও দৈনিক ‘সংবাদ’ অফিসে খেলাঘর দফতরে, যেদিন সেখানে থাকতে পারি না, সেদিন কমলাপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে, নয়ত কোন মসজিদের চত্বরে। এখ্লাস ভাই আমার কথ শুনে চোখ কপালে তুলে বলেন, ‘সাংঘাতিক ব্যাপার তো।’

কথা বলতে বলতে আমরা আজিমপুর কলোনির এখ্লাস ভাইয়ের বাসার কাছে এসে যাই। আমাকে ভাল করে চেয়ার টেনে বসতে বলেন। তারপর তিনি নিজেই পাঁচ থেকে দশ মিনিট পর একটা প্লেটে করে কিছু হাল্খা খাবার নিয়ে এসে সামনের ছোট টেবিলে রাখেন। রাখেন পানিভর্তি একটা গ্লাসও। বলেন, ‘খাও। লজ্জা কোর না।’

খাবার শেষ হলে এখ্লাস ভাই আমার হাতে পনেরোটা টাকা তুলে দেন, ‘তোমার গত সংখ্যা ‘টাপুর টুপুর’এ প্রকাশিত লেখার পারিশ্রমিক। সেই আমলে পনেরো টাকা একটা ছড়ার বিল, অনেক টাকা। ভাবাই যায় না। আমি কেঁদে ফেলি। বলি, ‘এখলাস ভাই, ছাপার জন্য কেউ পারিশ্রমিক দিতে চায় না। আপনার এই পনেরো টাকা পনেরো লাখ টাকার সমান।

এখ্লাস ভাই প্রসঙ্গ পাল্টে এবার বলেন, ‘আমি ভাল লোক পাচ্ছি না লেখা সংগ্রহ করার কাজের জন্য। বিশেষ করে তরুণদের লেখা। তুমি এ কাজটা করতে পারলে তোমাকে মাসে আমি কিছু টাকা দিয়ে সাহায্য করতে পারব।’

আমি সানন্দে রাজি হয়ে যাই। প্রায় ছয় মাস কাজটা করেছিলাম। ষাটের দশকের অনেক ছড়াকারের লেখা সংগ্রহ করে এখ্লাস ভাইয়ের হাতে তুলে দিয়েছি। ছাপাও হয়েছে। এর-ওর গদ্যও সংগ্রহ করে দিয়েছি। আজ তাদের অনেকেই প্রতিষ্ঠিত। কেউ কেউ জীবিত, কেউ কেউ পরলোকগত।

এখ্লাস ভাই, হাশেম খান ভাই এবং রফিকুন নবী ভা“ বলতে গেলে আমাদের আদর্শ মানুষ ছিলেন। বড় ভাইয়ের মতো আদর-স্নেহ ও প্রশ্রয় দিয়ে তাঁরা যেভাবে আমাদের উৎসাহিত করেছেন, তার তুলনা নেই। আমরা যখন আইউববিরোধী আন্দোলনকে চাঙ্গা করার জন্য ছড়ার সংকলন বের করার উদ্যোগ নিচ্ছি, সেই উদ্যোগে শুধু নৈতিক সমর্থনই দেননি এখ্লাস ভাই, আইউব খানের পিন্ডি চটকানো লেখা দিয়েও সক্রিয়ভাবে সেই সংকলনের অংশীদার হয়েছেন। একদিন এখ্লাস ভাই আমাকে মতিঝিলের দৈনিক ‘বাংলার’ মোড়ে ধরে বসলেন। বললেন, ‘মহা ঘটনা ঘটে গেছে আখতার!’ আমি বিস্ময়ভরা চোখে তাকাতেই বললেন, ‘আকাশ বাণী থেকে দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় তোমার, মোহাম্মদ আবদুল মান্নান, মাহমুদ উল্লাহ আর ইফতেখার হোসেনের লেখা ছড়া পড়েছেন ‘চিচিং ফাঁক’এ প্রকাশিত লেখা থেকে।’

আমার আনন্দ দেখে কে।

‘টাপুর টুপুর’ সম্পাদনা করাই শুধু নয়, ছোটদের লেখায় প্রাণিত করে তাদের কাছ থেকে ধারাবাহিকভাবে লেখা আদায় করাÑএ ছিল এখ্লাস ভাইয়ের সম্পাদক হিসেবে সবচেয়ে বড় গুণ। সৈয়দ শামসুল হক আর শওকত আলী মনে হয় ছোটদের জন্য কলম ধরেছিলেন এখ্লাস ভাইয়েরই কল্যাণে। ষাটের দশকের প্রধান প্রধান শিশুসাহিত্যিক সবচেয়ে বেশি প্রশ্রয় পেয়েছিলেন তাঁর কাছ থেকেই। এত কিছু করার পরও নিজের লেখালেখি থেকে বিরত হননি তিনি। ‘ছড়ায় ছড়ায় চন্দর’র মতো অমন শোভন ছড়ার সংকলন সম্পাদনা করার পাশাপাশি মৌলিক লেখার পেছনে সময় ব্যয় করার ব্যাপারে এতটুকু অবহেলা করেননি তিনি। ছোটদের জন্য লেখার বাইরে এক কদম পাও ফেলেননি। ফলে তার মৌলিক রচনার সংখ্যা একটা ঈর্ষাজাগানো ব্যাপার। ষাটের কাছাকাছি তার সংখ্যা। সৃজনশীল মানুষের মৃত্যু, আমার কাছে, সব সময়ই অকালমৃত্যু। মাত্র ৭৪ বছর বয়সে নীরবেই চলে গেলেন তিনি। এ মৃত্যু আমাদের কাম্য ছিল না। তাঁর আত্মা শান্তি পাক!

প্রকাশিত : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪

২৭/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: