কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিশ্বের আউটসোর্সিং জগতে বাংলাদেশ এখন এগিয়ে

প্রকাশিত : ২০ ডিসেম্বর ২০১৪
বিশ্বের আউটসোর্সিং জগতে   বাংলাদেশ এখন এগিয়ে
  • মোহাম্মদ মনকিউল হাসানাত

বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। প্রযুক্তির ছোয়ায় বদলে যাচ্ছে জীবন ও কর্মপদ্ধতি। আর নবযুগের এ ধারায় গত এক দশকে বাংলাদেশের আইটি ক্ষেত্রে ঘটে গেছে এক নীরব বিপ্লব, যার কান্ডারী এ দেশের শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম। সারাবিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং জীবনে বাস্তব ভিত্তিক প্রয়োগের মাধ্যমে স্থাপন করেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত, উন্মুক্ত করেছে এক নতুন ও সম্ভাবনাময় বাণিজ্য দুয়ার। যার নাম ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিং। যেসব বিষয়ের ওপর ফ্রিল্যান্সিং এর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে সেগুলো হলো- ডেটা এন্ট্রি, ই-মেইল-মার্কেটিং, সার্চ ইঞ্জিন অপ্টমাইজেশন (SEO), ওয়েব পেজ ডিজাইনিং এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, ভিডিও এডিটিং, ইন্ডেক্সিং, গ্রাফিক্স ডিজাইনিং, কপি রাইটিং, প্রুফরিডিং প্রভৃতি। বাংলাদেশে আউটসোর্সিংয়ের যাত্রা শুরু ২০০৪ সালে। আর বর্তমানে এ খাত হতে বৈদেশিক আয়ের পরিমাণ ১২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। পাশাপাশি ২০১২-১৩ অর্থবছরে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিগত সেবা রফতানি আয় ছিল প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলার। ২০২০ সালের মধ্যে এ খাত হতে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। [সূত্র : BASIS Report-2013]। মাত্র দশ বছরে ফ্রিল্যান্সিং পেশা তরুণ প্রজন্মকে করেছে আলোড়িত ও উদ্দীপ্ত। তাই এ পেশায় শিক্ষিত তরুণদের সংখ্যা ক্রমাগত যেমন বাড়ছে, তেমন ভারত, পাকিস্তানসহ পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সর্বনিম্ন দর বিড এর মাধ্যমে প্রচুর কাজ সংগ্রহ করতে পারছে এবং কাজের মান বিশ্বের যে কোন দেশের তুলনায় উন্নততর। পাশাপাশি বিশাল শিক্ষিত বেকার যুবক শ্রেণীর কর্মস্পৃহা, বাংলাদেশি মুদ্রার নিম্নমান, নিম্নমজুরি কাঠামো এবং বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান আউটসোর্সিংয়ের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের এক অপার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দেশের শিক্ষিত তরুণ বেকার সম্প্রদায় বর্তমানে oDesk, Elancer, Free Lancer, BASIS প্রভৃতি আইটি কোম্পানিতে নিবন্ধিত হয়ে আবার কেউবা স্বউদ্যোগে প্রোফাইল খুলে আউটসোর্সিংয়ের কাজ সংগ্রহ করে থাকে। ২০১২ সালের ড়উবংশ এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী তাদের প্রায় দুই লাখ রেজিষ্টার্ড ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যে পঞ্চাশ হাজার ফ্রিল্যান্সারই ছিল বাংলাদেশি তরুণ। আর বর্তমানে এ সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ, যাদের অধিকাংশ এর বয়স ২৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। অন্যদিকে ২০১২ সালে ড়উবংশ এ নিবন্ধিত বাংলাদেশি কোম্পানির সংখ্যা ছিল প্রায় ১.৫ লাখ যার মধ্যে ৮০০০ কোম্পানি সক্রিয়ভাবে আউটসোর্সিং ব্যবসা করছে। এই অপার সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে দ্রুত গ্রহণীয় পদক্ষেপগুলোর মধ্যে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দ্রুতগতিসম্পন্ন ও সুরক্ষিত ইন্টারনেট সংযোগ, ইন্টারনেটের মূল্য হ্রাস, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত প্রবাহ ব্যবস্থা, সহজ ও নিরাপদ অর্থ বিনিময় ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, সর্বোপরি সরকারের ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত আউটসোর্সিংয়ের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে আমাদের তুলনায় অনেক এগিয়ে গেলেও ২০০৯ সালের তুলনায় তাদের শ্রম-মজুরি বেড়েছে ১০০ শতাংশ অপরদিকে আমাদের দেশে মজুরি কাঠামোতে তেমন কোন পরিবর্তন আসেনি, ফলে এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে আউটসোর্সিং বাজার সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তথাপি আমাদের দেশের উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ এখনও চালু করা সম্ভব হয়নি। সমুদ্র পথে সাবমেরিন কেবল এর সঙ্গে সংযুক্ত হলেও এ ক্ষেত্রে ইন্টারনেট সংযোগটি SEA-ME-WE-4, যেটি মাত্র ২৪ গিগাবাইট ব্যান্ডউইথ সম্পন্ন, যা দ্বারা পার্শ্ববর্তী দেশসহ প্রতিদ্বন্দ্বী দেশসমূহের সঙ্গে টিকে থাকা দুরূহ। তাই ফ্রিল্যান্সিংয়ের এই বাজার ধরে রাখতে হলে দ্রুতগতিসম্পন্ন ২য় আরেকটি সাবমেরিন কেবল সংযোগ অত্যাবশ্যকীয়। বর্তমান সরকারের আমলে বিদ্যুত সরবরাহ ব্যবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হলে এখনও পর্যাপ্ত নয়। আউটসোর্সিং ব্যবসা গতিশীল রাখতে তথা বায়ারদের অর্ডার সঠিক সময়ে ডেলিভারি দেয়ার পূর্বশর্তই হচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহ ও উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ, যা আমাদের দেশে এখনও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তারপরও থেমে নেই তারুণ্য, থেমে নেই ফ্রিল্যান্সিং; কেননা এখানে সময়-ই গতি; সময়-ই অর্থ। সুতরাং আইটি ফার্মগুলো নিজস্ব পাওয়ার জেনারেটর ব্যবস্থায় সচল করে রাখছে তাদের কর্মগতি। আমাদের মফস্বল শহরগুলোতে ও ফ্রিল্যান্সিং বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। গ্রামের শিক্ষিত যুবকেরা তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইউ এনডিপির সহযোগিতায় ধ২র এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত স্বনির্ভর বাংলাদেশ প্রকল্পে ‘আর্নিং এ্যান্ড লার্নিং’ শিরোনামে পরিচালিত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে নিজ-উদ্যোগে স্বল্প পরিসরে ফ্রিল্যান্সিং করতে শুরু করেছে। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহের অভাব ও শ্লথগতির ইন্টারনেট সংযোগের কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ই ‘ডেটা এন্ট্রি’ জব ব্যতীত টেকনিক্যাল বিষয়গুলোতে ফ্রিল্যান্সিং অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে ঘণ্টা প্রতি মাত্র ৫ থেকে ৭ ডলার এর বেশি আয় করা সম্ভব হয় না। আউটসোর্সিংয়ের ক্ষেত্রে পেমেন্ট পদ্ধতি এখনও বড় একটি সমস্যা। লক্ষাধিক তরুণ এ পেশায় নিয়োজিত থাকলেও অনেক সময় বায়রের কাছ থেকে পারিশ্রমিক নিজ দেশে আনা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, যা এই পেশাকে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অনলাইন ভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান চধুচধষ এর মাধ্যমে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে লেনদেন শুরু হলেও অদ্যাবধি আমাদের দেশে তা চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে অর্থ বিনিময়ের সহজ পদ্ধতির অভাবে পেশাটিতে তৈরি হয়েছে সীমাবদ্ধতা। লক্ষাধিক তরুণ ফ্রিল্যান্সার তাদের কষ্টার্জিত অর্থ দেশে আনাতে কখনও বা ব্যবহার করে বিদেশে বসবাসরত কোন আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব এর ব্যাংক হিসাব, কিংবা বাধ্য হয়েই মিথ্যা পরিচয়ে খুলে নেয় নতুন বিদেশি ব্যাংক হিসাব। আবার oDesk, নিবন্ধিত ফ্রিল্যান্সারদের অর্থ দেশে আনার জন্য oDesk এর নিজস্ব Money Transfer System রয়েছে। তবে প্রতিবার ট্রাঞ্জেকশনের জন্য তাদের ১ থেকে ৫ ডলার পর্যন্ত চার্জ দিতে হয়। ফলে পেশাটির নাম ফ্রিল্যান্সার বা স্বাধীন পেশা হলেও কষ্টার্জিত আয় নগদায়ণের ক্ষেত্রে তারা শৃঙ্খলিত। এতসব প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও ফ্রিল্যান্সিং তরুণ প্রজন্মের কাছে এক সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের হাতছানি, এক নতুন আশার স্বপ্ন। তাদের দক্ষতা, মেধা এবং অদম্য তারুণ্যের জোয়ারে সূচিত এক নবদিগন্তের নাম এই ফ্রিল্যান্সিং। তাই শত সীমাবদ্ধতা এবং বাধা অতিক্রম করেও বাংলাদেশের তরুণরা সারাবিশ্বে ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যে তৃতীয় স্থানের অধিকারী। অদূর ভবিষ্যতে এই অবস্থান হবে আরও সম্মানজনক। কেননা প্রতিনিয়ত বাংলাদেশী ফ্রিল্যান্সারদের চাহিদা বাড়ছে বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে আমেরিকা এবং ইংল্যান্ডের সঙ্গে সময়ের ব্যবধানের ফলে সেবাগ্রহণকারী দেশসমূহ পাচ্ছে ‘Real Time Service’ এবং পৃথিবীর সর্বনিম্ন পারিশ্রমিকের বিনিময়ে সর্বোৎকৃষ্ট সেবা।

প্রকাশিত : ২০ ডিসেম্বর ২০১৪

২০/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: