মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কবিতা

প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৪

স্বাধীনতা এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো

নির্মলেন্দু গুণ

একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে

লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে

ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে-

‘কখন আসবে কবি?’

এই শিশুপার্র্ক সেদিন ছিল না,

এই বৃক্ষে ফুলে শোভিত উদ্যান সেদিন ছিল না,

এই তন্দ্রাচ্ছন্ন বিবর্ণ বিকেল সেদিন ছিল না।

অথচ তখন প্রায় দুপুর গড়িয়ে গেছে যখন গম্ভীর মুখে

কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।

তাহলে কেমন ছিল সেদিনের সেই বিকেল বেলাটি?

তাহলে কেমন ছিল শিশুপার্কে, বেঞ্চ-বৃক্ষে, ফুলের বাগানে

ঢেকে দেয়া এই ঢাকার হৃদয় মাঠখানি?

জানি, সেদিনের সব স্মৃতি মুছে দিতে হয়েছে উদ্যত কালো হাত।

তাই দেখি কবিহীন এই বিমুখ প্রান্তরে আজ

কবির বিরুদ্ধে কবি

মাঠের বিরুদ্ধে মাঠ,

বিকেলের বিরুদ্ধে উদ্যান,

মার্চের বিরুদ্ধে মার্চ....।

হে অনাগত শিশুর হে আগামী দিনের কবি

শিশুপার্কের রঙিন দোলনায় দোল খেতে খেতে তুমি

একদিন সব জানতে পারবে- আমি তোমাদের কথা ভেবে লিখে রেখে যাচ্ছি সেই শ্রেষ্ঠ বিকেলের গল্প।

সেদিন এই উদ্যানের রূপ ছিল ভিন্নতর।

না পার্ক না ফুলের বাগান- এ সবের কিছুই ছিল না,

শুধু একখ- অখ- আকাশ যে রকম, সে রকম দিগন্ত প্লাবিত

ধু ধু মাঠ ছিল দূর্বাদলে ঢাকা, সবুজে সবুজময়।

আমাদের স্বাধীনতা প্রিয় প্রাণের সবুজ এসে মিশেছিল

এই ধু ধু মাঠের সবুজে।

কপালে কব্জিতে লালসালু বেঁধে এই মাঠে ছুটে এসেছিল

কারখানা থেকে লোহার শ্রমিক

লাঙল জোয়াল কাঁধে এসেছিল ঝাঁক বেঁধে উলঙ্গ কৃষক,

পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে এসেছিল প্রদীপ্ত যুবক,

হাতের মুঠোয় মৃত্যু চোখে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল মধ্যবিত্ত

নিম্নমধ্যবিত্ত, করুণ কেরানী, নারীবৃদ্ধ বেশ্যা ভবঘুরে আর

তোমাদের মতো শিশু পাতা কুড়ানীরা দল বেঁধে।

একটি কবিতা পড়া হবে তার জন্য কী ব্যাকুল প্রতীক্ষা মানুষের।

‘কখন আসবে কবি?’ ‘কখন আসবে কবি?’

শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে

অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।

তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,

হৃদয়ে লাগিল দোলা

জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার সকল দুয়ার খোলা-

কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?

গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালো তাঁর অমর কবিতাখানি :

“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,

এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

সেই থেকে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি আমাদের।

ব্লাক আউটের পূর্ণিমায়

শহীদ কাদরী

একটি আংটির মতো তোমাকে পরেছি স্বদেশ

আমার কনিষ্ঠ আঙুলে, কখনও উদ্ধত তলোয়ারের মতো

দীপ্তিমান খামের বিস্তারে, দেখেছি তোমার ডোরাকাটা

জ্বলজ্বলে রূপ জ্যোৎনায়। তারপর তোমার উন্মুক্ত প্রান্তরে

কাতারে কাতারে কত অচেনা শিবির, কুচকাওয়াজের ধ্বনি

যার আড়ালে তুমি অবিচল, অটুট, চিরকাল।

যদিও বধ্যভূমি হলো সারাদেশÑ রক্তপাতে আর্তনাদে

হঠাৎ হত্যায় ভরে গেল বাংলার বিস্তীর্ণ প্রান্তর

অথচ সেই প্রান্তরেই একদা ধাববান জেব্রার মতো।

জীবনানন্দের নরম শরীর ছুঁয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে বাতাস বয়েছে।

এখন সেই বাতাসে শুধু ঝলসে যাওয়া স্বজনের

রক্তমাংসের ঘ্র্রাণ এবং ঘরে ফিরবার ব্যাকুল প্ররোচনা।

শৃংখলিত বিদেশীর পতাকার নীচে এতকাল ছিলো যারা

জড়োসড়ো, মগজের কু-লীকৃত মেঘে পিস্তলের প্রোজ্বল আদল

শীতরাতে এনেছিলো ধমনীতে অন্য এক আকাক্সক্ষার তাপ।

আবাল্য তোমার যে নিসর্গ ছিলো নিদারুণ নির্বিকার,

সুরক্ষিত দুর্গের মতন আমাদের প্রতিরোধে সে হলো সহায়,

ব্লাক আউট অমান্য করে তুমি দিগন্তে জ্বেলে দিলে

বিদ্রোহী পূর্ণিমা। আমি সেই পূর্ণিমার আলোয় দেখেছি

আমরা সবাই ফিরছি আবার নিজস্ব উঠোন পার হয়ে নিজেদের ঘরে।

সৌন্দর্যÑসৈনিকের শপথ প্যারেড

রফিক আজাদ

ট্রিগারে আঙুল রেখে, পুনর্বার, বুঝে নিতে চাই

অধিনায়কের কণ্ঠে উচ্চারিত গাঢ় শব্দাবলি,

শপথ-প্যারেডে :‘তোমাদের মনে রাখা প্রয়োজন

এই যুদ্ধ ন্যায় যুদ্ধ; বিশ্বাসঘাতক নয়, আজ

সৌন্দর্যের প্রকৃত প্রেমিক চাই; তোমাদের কাজ

নয় মোটে সাহজিক। আনন্দের রক্ষণাবেক্ষণ

অত্যন্ত দুরুহ কর্ম- অনেকের ঘটে অন্তর্জলি।

সত্যের বিরুদ্ধে নয়, আজীবন সপক্ষে লড়াই।’

জলপাই-রঙ য়্যুনিফর্মে, সবুজাভ হেলমেটে,

স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে সজ্জিত সৈনিক আমি, কর্মরত।

সৌন্দর্যের রাজধানী ঘিরে অসংখ্য বিরোধী বীর

অবস্থান নেয়, সুবিধাজনকভাবে একচেটে

আছে যার শিল্পরুচি, তাকে প্রয়োজন- ব্যক্তিগত

কিংবা সার্বজন্য হরিষে বিষাদে-যে জন সুস্থির।

আগুন আমাকে

সরকার মাসুদ

অন্ধকার আমাকে হাঁটায়

এক আগুন আমাকে নিয়ে যায় দেয়ালের কাছে

আরেক আগুনের টানে ছুটে যাই কলাবাগান

মুখোমুখি বসে থাকার সময়কার স্তব্ধতার ভেতর

পাহাড় শিউরে ওঠে সন্ধ্যাবেলা।

আগুন আমাকে হাঁটায় অন্ধকারে।

আগুনের টানে ছুটে গেছি রাজদিয়া

কাঁঠালবাগানে কাঁটা বিঁধেছে আমার চিন্তায়

এখন আগুন আমাকে

একটা দাগবরা গর্ভবরা দেয়ালের কাছে নিয়ে চলে

আমাদের মুখোমুখি ঘন আলাপের আড়ালে

টিপটিপ করে সঙ্কেত জ্বলে।

হত্যাকা-

জাফর সাদেক

এই হত্যাকা শুধু নিজের সুঘ্রাণ নেবার প্রেক্ষাপট

দূর থেকে ক্ষরণে জারিত হবার আর কোন কৌশল

জানা নেই আমার

তবু জানি অবগাহন এমন এক জটিল বাণী

যার মর্মকথা দীর্ঘশ্বাসে অনির্দিষ্ট যাত্রাকাল

এই হত্যাকাে অন্ধকার সুচিন্তিত বন্ধুবর

তাকে ছুঁই, তার কাছে রেখে যাই অসমাপ্ত

চিঠির উত্তর

সেইসব নষ্টতায় সুঘ্রাণ নিতে এখনো বন্দীর শিকলে

ভ্রূণ হত্যার দায় আমার

এই হত্যাকা অবিরাম, জন্মের ভিন্নঅর্থে একজন খুনি

ভালোবাসে তার দুফোটা শরীরী ঘাম

অদ্ভুত কারিগরিতে বেঁচে থাকা

স্বপন নাথ

টেকসই করতে হয় বিশ্বাসের ধারাক্রম বংশ পরম্পরায়

অভ্যাসের বয়স বাড়ে ধাপে ধাপে জন্মান্তর প্রতিশোধ

রোদ কিংবা বৃষ্টির সাম্রাজ্যে ডানা মেলে মরণের ক্রোধ।

রাজা রাণী বদলায়, গৃহস্বামী পাল্টায়, বদলে না ভৃত্যদল

কামনার ছোঁয়ায় মাছের বড়শিতে গেঁথে রয় ফালতু-দঙ্গল।

নিজের কারণে আসিনি আমি, তারপর বলি এ আমার জন্মদিন

ভুলের জঠরে ভুল, অযাচিত পথচলার কিনারে কিনারে ঋণ।

কী স্বাদে জেগে থাকে অনন্তকাল- মায়াবাহী মায়াময়

কী থাকে পারাবার শেষে? তুলার মতো উড়ানো সঞ্চয়।

পিতা থেকে পুত্র, নরক ত্রাতার বুলিভারে খালি চাকা

মন্ত্রণার গল্প ভরা শূন্যের কলসিবিদ্যা সবই যে ফাঁকা।

উত্তম বাবু আপনার ঈশ্বরীকে

(কবি ড. উত্তম দাশ স্মরণে)

আব্দুল মান্নান সরকার

উত্তম বাবু আপনার ঈশ্বরীকে

আমিও দু’একটা কথা বলতে চাই ,

আপনি নিশ্চয় কিছু মনে নেবেননা জানি

কারণ ঈশ্বরীকে আপনি

আপনার মতো করেই গড়েছেন ।

ভদ্রজন এবং সংবেদনশীল ,

আপনার ঈশ্বরী মানবিকতায় ভরপুর

মানুষ ও প্রকৃতির প্রতি বড়ই উদার ।

তা ছাড়া আপনার ঈশ্বরী

এ এখন অনেক কিছু জেনে বুঝে গেছে

শিখেছে নৃত্যকলা , কাব্যভাষা, চুম্বন!

কারণটা আমরাও বুঝি

এই পৃথিবীর জল ও বাতাস

সে তো আর স্বর্গের নয়, এই পৃথিবীরই ।

আর কেমন যে ধার তার দেখুন

লোহাকেও করে ফেলে ক্ষয়।

তো আপনার ঈশ্বরীকে

এখন আমাদের সাথে নাচতে হবে খেমটা নাচ।

দু’চারটে প্রেমের আলাপ তার সাথে

আমিও চালাতে পারি ।

এ তো আর সেই স্বর্গের প্রেম নয়

পরকীয়া তাতেইবা কি দোষ!

কলজে ছেঁড়া টান একদিন জেনেছিল রাধা

আপনার ঈশ্বরীও এতদিনে নিশ্চয় বুঝেছে ।

স্বর্গের নৈবদ্য খেয়ে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘোরা

কতই আর ভালো লাগে বলুন।

এদিকে বুক শুকিয়ে তো নদীর চরা

বান চাই, দু’কুল ভাসিয়ে নেওয়া বান!

উত্তম বাবু আপনার ঈশ্বরী

এক বুক তৃষ্ণা নিয়েই মানুষের কাছে এসেছে

তাকে ভালবাসতে দিন।

মানচিত্র

(কাইয়ুম চৌধুরী নিবেদিত)

হাসান হাবিব

ছবিগুলো এই ধান ক্ষেত,এই লাল সূর্যের

মতোÑসমুদ্র মুখো, যে সফেদ ফেনা

সেই প্রাকার ছেড়ে

বুকের সবুজ প্রান্তর

ছবিগুলো সে দিকে

আমাদের মাঠগুলো ভরে আছে

হৃদসাতারে

আহা! বুলবুলির কী নাচিয়ে ঝুঁটি

বুনো শালিকের মতো কিচির মিচির

এই ¯িœগ্ধ নিবিড়

বিস্মৃত উঠোনে

আর কত জলছবি!

তোমার কবিতা-তোমার হৃদয়

এতো পাঁজর ভেঙ্গে

সাজিয়ে রাখা এই স্পন্দিত মৃতিকায়

শেকড়ের বুকে ফিনকি উঠে

চেয়েছিলে সুনীল সমুদ্র

শিকল ভেঙ্গে

বুকের মাঝে সেই লাল-সবুজের মানচিত্র।

প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৪

১৯/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: